ড. সাইফুল ইসলাম নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্বরত। এর আগে তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন স্থাপত্য বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে। শিক্ষাজীবনে আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আর্কিটেকচারে ব্যাচেলর ও যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ইউনিভার্সিটি থেকে একই বিষয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। পরে তিনি টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি নেন। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালীন তিনি সেখানকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি শিক্ষক হিসেবে পড়িয়েছেন। তিনি ন্যাচারাল ভেন্টিলেশন, সোলার এনার্জি, নেট জিরো বিল্ডিং, এনার্জি এফিসিয়েন্ট আর্কিটেকচার সর্বোপরি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যবিষয়ক গবেষণায় যুক্ত। তিনি বিশ্বব্যাপী Passive & Low Energy Architecture (PLEA) কনফারেন্সে নিয়মিত অংশ নেন। গুণী এ শিক্ষাবিদ কাম স্থপতির সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফয়সাল হাসান সন্ধী
প্রথমেই জানতে চাই ‘সাসটেইনেবল আর্কিটেকচার’ বা ‘টেকসই স্থাপত্য’ বলতে আসলে কী বোঝায়?
ইদানীং নির্মাণের ক্ষেত্রে ‘সাসটেইনেবল আর্কিটেকচার’ বা ‘টেকসই স্থাপত্য’ কথাটি বহুল ব্যবহৃত। তবে আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো, আসলে স্থাপত্যের ক্ষেত্রে টেকসই কথাটি আলাদা করে ব্যবহার করাটা বাহুল্য। আমি মনে করি, স্থাপনা মানেই সেটা টেকসই। স্থাপত্যের ক্ষেত্রে সঠিক মান নিয়ন্ত্রণ ও যথাযথ গাইডলাইন অনুসরণ করলে যেকোনো স্থাপনা স্বাভাবিকভাবেই টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি হতে বাধ্য। তাই আমার ব্যক্তিগত মত হলো ‘সাসটেইনেবল আর্কিটেকচার’ বা ‘টেকসই স্থাপত্য’ বলে আসলে কিছু নেই। আমার কাছে আর্কিটেকচার বা স্থাপত্য মানেই সেটা দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই।
সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্থাপনাগুলোকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
এ ক্ষেত্রে আমি কিছুটা মিশ্র অভিজ্ঞতার কথা বলব। আমি মনে করি, বাংলাদেশে যে ধরনের স্থাপনা ইদানীংকালে হচ্ছে সেগুলোর চেয়ে আমাদের পুরোনো স্থাপনাগুলো অপেক্ষাকৃত টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো অনেক বেশি বসবাসের উপযোগী ও পরিবেশবান্ধব। যেমন, ধরুন আমাদের দেশের একটু পুরোনো, ধরুন ষাট, সত্তর বা আশির দশকের স্থাপনাগুলো কিন্তু অনেক বেশি বাসযোগ্য। আগেকার দিনের অধিকাংশ স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রেই ভূমির পরিমাণের সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করতে হতো না। সেই কারণে স্থপতি দেশীয় ধারা অনুসরণ করে মনের মতো করে স্থাপনার খোলামেলা নকশা করতে পারতেন। আশির দশকের যেকোনো স্থাপনার ক্ষেত্রেই একটা বিষয় লক্ষ করে থাকবেন যে সেগুলোতে কি উত্তর, কি দক্ষিণ, কি পূর্ব, কি পশ্চিমÑ চারদিকেই প্রশস্ত জানালা থাকত। সেই সঙ্গে সম্ভব হলে চারদিকেই খোলা বারান্দা দেখা যেত; থাকত সানশেড। আর স্থাপনার দেয়াল কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছিল ১০ ইঞ্চি গাঁথুনির। কিন্তু এরপর থেকে দেখা গেল যে আমরা পশ্চিমা স্থাপত্যরীতি অনুকরণ এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যয় সংকোচন করতে গিয়ে আমাদের জানালাগুলো ছোট করে ফেলছি, জানালার সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছি। আবার জায়গা ও খরচ বাঁচাতে ১০ ইঞ্চির জায়গায় ৫ ইঞ্চির গাঁথুনি দেওয়া শুরু করেছি। এতে আমাদের লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়েছে বলে মনে করি আমি। কারণ, পশ্চিমা স্থাপত্যের ক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হবে যে ওই দেশগুলো শীতপ্রধান। স্থাপনা নকশায় ওদের মূল লক্ষ্যই থাকে তাপ ধরে রাখা। আর আমাদের মতো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশের পরিস্থিতিটা ঠিক তার উল্টো। আমাদের দরকার পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচলের জন্য বড় বড় খোলা জানালা, ঝুলবারান্দা। ঠিক এই বিষয়টিই আবার নতুন করে উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন আমাদের দেশের স্থপতিরা। তাঁরা আবার আগের সেই আশির দশকের ধারায় ফেরত যাচ্ছেন এবং বাংলাদেশের প্রকৃতি ও জলবায়ুর উপযোগী স্থাপনা নকশায় উদ্যোগী হচ্ছেন। স্থাপনা তখনই উত্তম হবে যখন সেটি প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে ভালোভাবে খাপ খাওয়াতে পারবে ও মানুষের জীবনযাপনকে স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তুলবে।
পশ্চিমা দেশের অনুকরণের কথা যেহেতু চলেই এল তাহলে প্রাসঙ্গিক আরেকটি প্রশ্ন করি আপনাকে। ইদানীং আমাদের দেশের নতুন স্থাপনাগুলোতে বাইরের দেয়ালের স্থানে কাচের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে ব্যাপক হারে। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?
হ্যাঁ, আপনার কথার সঙ্গে আমি একমত। ইদানীং বাংলাদেশে বিভিন্ন স্থাপনায় বাইরের দেয়ালে কাচের ব্যবহার লক্ষ করা যাচ্ছে অনেক বেশি। এ ক্ষেত্রে আমি ঢালাওভাবে এটিকে ভালো বা খারাপ বলে মন্তব্য করতে চাই না। কারণ, এর ভালো-খারাপ দুইই আছে। পশ্চিমা শীতপ্রধান দেশগুলোতে এর ব্যবহার অনেক বেশি। কারণ, এটি গ্রিন হাউসের মতো কাজ করে। সূর্যরশ্মি কাচ ভেদ করে ঢোকে ও ভেতরের তাপ ধরে রাখে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটিই সংকটের কারণ। ভালো স্থপতি দিয়ে সঠিকভাবে কাচের ব্যবহার না করলে স্থাপনা দৃষ্টিনন্দন হলেও আরামদায়ক ও এনার্জি এফিসিয়েন্ট হয় না। আমি এ ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টিনন্দন ও পরিবেশবান্ধব স্থাপনার কথা বলতে চাই। গ্রামীণফোনের সদর দপ্তর ‘জিপি হাউস’-এর ক্ষেত্রে লক্ষ করলে আপনি দেখবেন যে তার বহিঃআবরণ কাচের হওয়ায় সেটি যেমন দৃষ্টিনন্দন, ঠিক তেমনি পরিবেশবান্ধব ও আরামদায়কও। কেননা কাচের বহিঃআবরণে ল্যুভর (Louver) ব্যবহার করা হয়েছে, যা কি না সূর্যরশ্মি কাচের দেয়ালে পড়ার আগেই আলো ও তাপের একটা বড় অংশ নিজের ওপরে নিয়ে নিচ্ছে। ফলে স্থাপনার ভেতরটা তেমনভাবে তাপ পাচ্ছে না ও এর ফলে এয়ারকন্ডিশনিংয়ে তুলনামূলক কম এনার্জি ব্যয় হচ্ছে। সেই সঙ্গে বাইরের এয়ার ও সাউন্ড পলিউশন থেকে রক্ষা করছে ভেতরের মানুষদের। স্থাপনার দেয়ালে কাচ ব্যবহারের আরেকটি বড় সুবিধা হলো এটির রক্ষণাবেক্ষণ বেশ সাশ্রয়ী। কারণ, এটি ইটের দেয়ালের মতো বছর বছর রং করতে হয় না। তাই আমি বলব, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্থাপনায় কাচের দেয়াল ব্যবহার করতে চাইলে তা অবশ্যই ভালো স্থপতির পরামর্শক্রমে করতে হবে। তাহলে স্থাপনা যেমন দৃষ্টিনন্দন হবে ঠিক তেমনি হবে পরিবেশবান্ধবও।
পরিবেশবান্ধব স্থাপনার ক্ষেত্রে ‘জিরো এনার্জি স্থাপনা’ ধারণাটি সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
‘জিরো এনার্জি বিল্ডিং’ বা ‘শূন্য শক্তির স্থাপনা’ ধারণাটি বিশ্বে বেশ নতুনই বলা চলে। এটির কথা বলতে হলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে। একটা সময় ছিল যখন বিশ্বব্যাপী ফসিল ফুয়েলের নতুন নতুন উৎস এত ঘন ঘন আবিষ্কৃত হচ্ছিল যে এনার্জি খরচের বিষয়ে মানুষ তেমন একটা সচেতন ছিল না। কিন্তু ধীরে ধীরে সে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। মানুষ এই সীমিত শক্তির শেষ এবং পরিবেশের ক্ষতি সম্পর্কে উপলব্ধি করতে শুরু করে। আর তখন থেকেই এনার্জি এফিসিয়েন্ট স্থাপনা নির্মাণ শুরু হয়। অর্থাৎ এটি এমন এক স্থাপনা, যা কি না অনেক কম শক্তি খরচ করবে। এ থেকেই পরে এমন ধারণা আসে যে স্থাপত্যের সব নিয়মনীতি সঠিকভাবে অনুসরণ করলে এমন ধরনের স্থাপনা বানানো সম্ভব, যা কি না ন্যাশনাল গ্রিড বা ফসিল ফুয়েলের মতো কোনো উৎস থেকে কোনো এনার্জিই নেবে না। বরং নিজের স্থাপনা থেকেই এনার্জি নিয়ে চলবে। একেই মূলত বলা হচ্ছে ‘জিরো এনার্জি বিল্ডিং’ বা ‘শূন্য শক্তির স্থাপনা’। ইতিমধ্যেই বিশ্বে এমন স্থাপনা নিয়ে বেশ জোরেশোরে কাজ শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশে কীভাবে ‘জিরো এনার্জি বিল্ডিং’ নির্মাণ করা সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?
অবশ্যই সম্ভব। বাংলাদেশে গাছপালায় ঘেরা জায়গা পাওয়া সম্ভব। ধরুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মতো প্রচুর পরিমাণে রেইন ট্রি রয়েছে, এমন একটা জায়গায় যদি এক তলা একটি ভবন তৈরি করা হয় স্থপতির পরামর্শ মোতাবেক যথাযথ বিল্ডিং কোড মেনে, সেই ভবনের চারপাশে রাখা হবে বড় বড় জানালা, দেওয়া হবে সানশেড। যার মাধ্যমে ভবনটিতে ক্রস ভেন্টিলেশন বা অব্যহত বায়ু চলাচল নিশ্চিত হবে। তাহলে ভবনটি আশপাশের সবুজ গাছপালা ও নকশার কারণে এমনিতেই প্রচুর আলো-বাতাস পাবে ও ভেতরের তাপমাত্রা থাকবে সহনীয়। এখন ভবনটিতে প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহের জন্য ভবনটির ছাদে বড় আকারের চৌবাচ্চা স্থাপন করা হলো, যা কি না বৃষ্টির সময় পানি ধরে রাখবে এবং সে পানি ভবনের মানুষের আনুষঙ্গিক কাজে ব্যবহার করা যাবে। আবার ভবনটিতে লাইট-ফ্যান ইত্যাদি বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি চালানোর জন্য প্রয়োজন বিদ্যুৎ। সেই বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে ভবনটির ছাদে স্থাপন করা যাবে সোলার প্যানেল। এভাবেই ভবনটি জাতীয় গ্রিড থেকে এক মেগাওয়াটও বিদ্যুৎ খরচ না করে হয়ে উঠতে পারে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এককথায় আদর্শ মানের ‘জিরো এনার্জি বিল্ডিং’ বা ‘শূন্য শক্তির স্থাপনা’।
আমাদের দেশে বিল্ডিং কোডের যে নীতিমালা রয়েছে তা কি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই স্থাপত্য নিশ্চিত করতে যথেষ্ট?
দেশে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত যে বিল্ডিং কোড ছিল তার ক্ষেত্রে রয়েছে অনেক সীমাবদ্ধতা। সে কারণে সেই পুরোনো বিল্ডিং কোডটিকে পুরোপুরি পরিবেশবান্ধব বলা সম্ভব নয়। কিন্তু এরপরে ২০০৮ সালের যে বিল্ডিং কোড হয় তা বেশ পরিবেশবান্ধব। যদিও এতে আরও অনেক সংযুক্তির অবকাশ রয়েছে। তবুও বর্তমান পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা করে আমি বলব, যা রয়েছে বিল্ডিং কোডে সেটাও অনেক পরিবেশবান্ধব। যদি এই বিল্ডিং কোড যথাযথভাবে অনুসরণ করে ভবনের নকশা ও নির্মাণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়, তাহলে নির্মিত নতুন ভবনগুলো সত্যিকার অর্থেই পরিবেশবান্ধব হবে বলে আমার বিশ্বাস। যেমন, ২০০৮ সালের বিল্ডিং কোডে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে কতটুকু জমি কোথায় কীভাবে ছাড়তে হবে তা সুস্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে। মাঝখানে এমন একটা প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছিল যে মানুষ অর্থনৈতিক লাভের জন্য জমির বিন্দুমাত্র না ছেড়ে একেবারে গায়ে গা লাগিয়ে পাশাপাশি স্থাপনা গড়ে তুলছিলেন। কিন্তু এখন আর সেটা অনুমোদন করে না বিল্ডিং কোড-২০০৮। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো এই কোড সব ধরনের স্থাপনার ক্ষেত্রে পুরোপুরি কার্যকর করা। আর বিল্ডিং কোড মানা না হলে ভবনের মালিক থেকে শুরু করে স্থপতি, অনুমতিদানকারী কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঠিক জবাবদিহি নিশ্চিত করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাহলেই শুধু আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে পরিবেশবান্ধব স্থাপনা নির্মাণ করে মানুষকে স্বাস্থ্যকর বাসযোগ্য বাংলাদেশ উপহার দেওয়া, যা কি না একজন স্থপতির স্বপ্ন।
আপনারা নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা কি পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণবিষয়ক গবেষণায় আগ্রহী?
আমি মনে করি শুধু নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সারা বিশ্বেই আজ পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির জয়-জয়কার। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদেরও তা নাড়া দিয়েছে সমভাবে। তাই আমরা আমাদের সব কোর্সেই পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যকে গুরুত্বসহকারে তুলে ধরছি শিক্ষার্থীদের মাঝে। সেই সঙ্গে দেশীয় স্থাপত্যের ঐতিহ্য সম্পর্কে তাদের যাবতীয় ধারণা দিতে আমরা দৃঢ় পরিকল্পনাবদ্ধ। শিক্ষার্থীদের আগ্রহও লক্ষণীয়। তারাও চায় পরিবেশবান্ধব স্থাপত্য নিয়ে কাজ করতে। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে নিয়মিত। বিশ্ববিদ্যালয় তাদের এসব প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণে সব সময় উৎসাহিত করে আসছে। শিক্ষার্থীদের নতুন ধরনের সৃষ্টিশীল কার্যকলাপে বরাবরই উৎসাহ দিয়ে থাকে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়।
আপনাদের সিলেবাসে কি পরিবেশবান্ধব টেকসই স্থাপনা সম্পর্কিত বিষয়াদি সংযোজনের যথোপযুক্ত সুযোগ রয়েছে?
হ্যাঁ, রয়েছে। এ দিক থেকে আমরা বেশ স্বাছন্দ্যবোধ করছি। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিলেবাসকেই সরাসরি অনুসরণ করা হয়েছে। কিন্তু নর্থ সাউথের সিলেবাসের ক্ষেত্রে নর্থ আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিলেবাসকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এ কারণে উন্নত বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিবেশবান্ধব ও টেকসই স্থাপত্যবিষয়ক আপডেটেড টপিকসমূহ আমরা আমাদের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করি প্রয়োজনমতো। আমরা শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ফিল্ড ভিজিটে নিয়ে যাই তাদের আমাদের দেশীয় স্থাপত্যের খুঁটিনাটির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য। কারণ, একটু লক্ষ করলেই দেখা যায়, আমাদের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো কিন্তু ছিল অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দৃষ্টিনন্দন ভবন সম্পর্কে কিছু বলবেন কি? এটা কতটুকু পরিবেশবান্ধব বলে আপনি মনে করেন?
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসটি পূর্ব-পশ্চিমে লম্বালম্বিভাবে বিস্তৃত। আর উত্তর-দক্ষিণ দিকে একাডেমিক ভবন ও ক্লাসরুম। স্থাপত্যের নীতিতে এমন পূর্ব-পশ্চিমে লম্বালম্বিভাবে বিস্তৃত স্থাপনায় প্রচুর পরিমাণে আলো-বাতাস খেলা করার সুযোগ পায়। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের একদম মাঝের উন্মুক্ত এলাকাটি পরিচিত ‘প্লাজা’ নামে। এটি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য একটা ‘ভাইব্রেন্ট’ আবহ তৈরি করেছে। নর্থ সাউথ বিশ^বিদ্যালয়ের সুপরিসর আধুনিক লাইব্রেরি ভবনের কথা না বললেই নয়। এটির উন্মুক্ত স্টাডি জোন শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোনিবেশে দারুণ সাহায্য করে।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগ থেকে যারা বের হচ্ছে, তাদের আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
এখন পর্যন্ত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সব আর্কিটেকচার গ্র্যাজুয়েটই জব মার্কেটে বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। তাদের মধ্যে একটা বড় অংশই দেশের বাইরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানে কৃতিত্বের সঙ্গে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের বিভিন্ন ধরনের গবেষণায় যুক্ত। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় তার অ্যালামনিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখে। আমরা মনে করি, আমাদের অ্যালামনিরাই আমাদের আসল সম্পদ।
সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশের স্থাপত্য কোন দিকে যাবে বলে মনে করছেন?
আমি মনে করি, স্থাপত্যও ফ্যাশনের মতো। এটি দিনে দিনে, দেশে দেশে, বিভিন্ন জাতির হাত ধরে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও অনেক অনেক পরিবর্তন হবে। এটা বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্বের জন্যই সত্য। এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। এর সঙ্গেই তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে হবে আমাদের। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সারা বিশ্বের স্থাপত্যের নিত্যনতুন বিষয়গুলোর সঙ্গে আপটুডেট থাকতে হবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সেসব বিষয় চর্চা করতে হবে। সেই সঙ্গে নিজের দেশের সংস্কৃতি, জলবায়ু ও প্রাকৃতিক পরিবেশের কথা মাথায় রেখে ভবিষ্যতের স্থাপনাগুলো নকশা করতে হবে। একটি স্থাপনা যেন একই সঙ্গে দৃষ্টিনন্দন, আরামদায়ক ও পরিবেশবান্ধব হয় সে লক্ষ্যে কাজ করে যেতে হবে অবিরত।
আপনাকে ধন্যবাদ
আপনাকে ও বন্ধনসংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৮তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৭।