একটি ঘরকে দুটি ঘর করতে কিংবা এক ঘর থেকে অন্য ঘরকে আড়াল করতে প্রয়োজন পার্টিশনের। যেনতেন পার্টিশন ঘরের সৌন্দর্যহানি ঘটায়। কিন্তু শৈল্পিকতার ছোঁয়ায় ঘরের পার্টিশন বাড়িয়ে দিতে পারে ঘরের সৌন্দর্যও। ঘরের মাঝেই তৈরি করে নিতে পারেন একটুখানি আড়াল। নান্দনিক ডিজাইনের পার্টিশন বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় অন্দরের সৌন্দর্য।
বড় একটি ঘরের মাঝে খানিকটা জায়গা নিজের মতো করে পাওয়া গেলে কেমন হয় বলুন তো? নিশ্চয়ই বেশ ভালো। মনের মতো করে সাজিয়েও নেওয়া যাবে নিজের ছোট্ট জগৎটিকে। পার্টিশনের বিভিন্ন উপায়ের মাধ্যমে একটি ঘর থেকে অন্য ঘর আড়াল করা যায় সহজেই। এ ক্ষেত্রে অনেক ধরনের উপকরণই বেছে নেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা আর এর সঙ্গে নান্দনিক ভাবনা। ঘরের কোনো অংশকে আড়াল করার জন্য প্রথমে ভাবতে হবে, ওই অংশটি কেন আড়াল করা হচ্ছে। সেটার আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে কি?
কোনো কোনো বাড়ির প্রধান ফটক থেকে অন্দরমহলে যেতে একটাই দরজা ব্যবহার করা হয়। সে ক্ষেত্রে অতিথির সামনে দিয়ে বসার ঘর পেরিয়ে যেতে অনেকেরই খুব অস্বস্তি লাগে। সে জন্য আজকাল প্রায়ই বাড়িতে প্রধান দরজা আর বসার ঘরের মাঝে থাকে অস্থায়ী দেয়াল, যা স্লাইডিং ডোর অথবা পার্টিশন তৈরির কাজ করে। এতে বাড়িতে যদি অতিথিও থাকে, তখন বাইরে থেকে কারও অন্দরমহলে প্রবেশ নিয়ে বিব্রতকর কোনো অবস্থায় পড়তে হয় না। যেহেতু অতিথিদের আপ্যায়ন করা হয় বসার ঘরে, সেহেতু অন্দরের সঙ্গে বসার ঘরের সংযোগ পথটি আড়াল করা জরুরি। অন্যথায় আপনার পাশাপাশি অস্বস্তিবোধ করতে পারেন অতিথিরাও। অনেকেই আবার খাবার ঘর থেকে বসার ঘর কিংবা খাবার ঘর থেকে রান্নাঘরের মধ্যবর্তী জায়গায় দেয়াল রাখতে চান না। তখন এই জায়গায় ব্যবহার করা যেতে পারে অস্থায়ী দেয়াল, ভারী কাপড়ের পর্দা অথবা ভিন্ন কোনো পার্টিশন। যেটা চাইলেই সহজেই স্থানান্তর করা যাবে। তবে যাঁদের ড্রয়িং কাম ডাইনিংরুম, তাঁরা যখন মাঝে অস্থায়ী একটি দেয়াল তুলে দেবেন, তখন সেটার বাহ্যিক সৌন্দর্যটাও বিবেচনায় রাখতে হবে। বিভিন্ন উপকরণের পার্টিশন বেছে নিতে পারেন ড্রয়িংরুমের জন্য। পার্টিশনের সঙ্গে ঘরের বাকি আসবাবের সঠিক সামঞ্জস্য থাকা জরুরি। ঘরে যদি থাকে দেশীয় আবহ, তবে বাঁশ বা বেতের পার্টিশনে নান্দনিকতা আনতে পারেন। জমকালো আসবাবে সজ্জিত ঘরে ডেকোরেটিভ গ্লাসের পার্টিশন বেশ লাগবে। এ ছাড়া কাঠ, পারটেক্স বা বোর্ডের দেয়াল দিয়েও আড়াল করে নিতে পারেন অন্দর। ঝিনুক, শামুক, কড়ি, সিরামিক, পুঁতি কিংবা পাটের দেয়ালও ব্যবহার করতে পারেন। বেশ ভিন্নতা চলে আসবে ঘরের সাজে। আজকাল রঙিন কাগজ কিংবা কাপড়ের দেয়ালও বেশ জনপ্রিয়। কাঠের ওপর নিখুঁত কারুকাজ করা নজরকাড়া পার্টিশন অন্দরে আনে শৈল্পিক ছোঁয়া। ঘরের ভেতর আলো-বাতাস প্রবেশ করাতে চাইলে খাঁজকাটা পার্টিশন বেছে নিতে পারেন। পার্টিশনে কাচ, পুঁতি কিংবা পাথর বসিয়ে বাড়িয়ে নিতে পারেন এর জৌলুশ। চাইলে বসার ঘরের মাঝে স্লাইডিং ডোর বা পাল্লা লাগিয়ে দেওয়া যায়। তবে এগুলো লাগানো বেশ ঝামেলাপূর্ণ। কাচের দেয়াল দিয়েও আলাদা করে ফেলতে পারেন ঘরকে। তবে সে ক্ষেত্রে টেনে খোলা যায় এমন ধরনের পার্টিশন হলে ভালো হয়। ঘরের মধ্যে একটু আড়াল করে শিশুদের পড়ার জায়গা করতে পারেন। তবে সে ক্ষেত্রে পার্টিশনটা একটু মোটা হলে ভালো হয়। এতে মনঃসংযোগে ব্যাঘাত ঘটবে না। রান্নাঘর ও খাবার ঘরের মাঝে ভারী বুননের পার্টিশন দেবেন না। এতে রান্নার ধোঁয়া আটকে অস্বস্তিকর পরিবেশের সৃষ্টি হতে পাবে। এ ক্ষেত্রে হালকা ধরনের পার্টিশন দিন, যা প্রয়োজনমতো গুটিয়ে ফেলা যায়। অন্যান্য ঘর থেকে ফ্যামিলি লিভিংরুমকে স্বতন্ত্র করতে চাইলেও ব্যবহার করতে পারেন পার্টিশন। শোয়ার ঘরটি ছিমছাম রাখা জরুরি। তাই খুব প্রয়োজন না হলে শোয়ার ঘরে পার্টিশন দেবেন না। কারণ, অন্যান্য অংশ আড়াল করতে গিয়ে জানালা কিংবা নীল আকাশের একাংশ ঢেকে গেলে সেটা ঘরের প্রশান্তি কমিয়ে দেবে অনেকটাই।
অনেকে আবার বড় বারান্দার মাঝে খানিকটা আড়াল করে অপ্রয়োজনীয় জিনিস রাখেন। পার্টিশন নির্বাচনের ক্ষেত্রে ঘরের আকার-আয়তনের কথা মাথায় রাখাও জরুরি। জমকালো ও ভারী নকশার পার্টিশন ভেতরের ঘরে না রাখাই ভালো। এ ধরনের দেয়াল রাখুন অতিথিদের ঘরে। ছোট ঘরে একাধিক পার্টিশন রাখতে যাবেন না। এতে ঘরের সৌন্দর্যহানি ঘটে।
ঘরের পার্টিশনের ক্ষেত্রে বেত, কাঠ, বাঁশ, পারটেক্স বোর্ড, গ্লাস ভার্টিক্যাল রাইন্ড ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে। এ ছাড়া বাজারে আজকাল নানা ধরনের ঝিনুকের পর্দা, পাটের পর্দা, পুঁতি ও কাচের টুকরা দিয়ে তৈরি পর্দা পাওয়া যায়। সেগুলো দিয়েও খুব সহজেই অল্প খরচে দুটো কক্ষকে আলাদা করা যেতে পারে। এ ছাড়া কাঠের ফ্রেমে ডেকোরেটিভ গ্লাস আটকিয়ে অথবা কাঠের ওপর নকশা করেও অস্থায়ী দেয়াল তৈরি করা যেতে পারে। অনেকে আবার জায়গার স্বল্পতার জন্য স্লাইডিং অথবা ফোল্ডিং পাল্লাকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। এসব পাল্লা যদি কাঠের ফ্রেমে গ্লাস পাতা হয়, সে ক্ষেত্রে টেম্পার গ্লাস ব্যবহার করা ভালো। পড়ার ঘরটাকে অন্য ঘর থেকে আলাদা করতে চাইলে তৈরি করে নিতে পারেন বুক শেলফ, যা কি না বই রাখার পাশাপাশি পার্টিশনের কাজ করবে। বাইরের কোনো শব্দ যেন শিক্ষার্থীর মনঃসংযোগে ব্যাঘাত না ঘটায় এ ক্ষেত্রে পারটেক্স বোর্ড দিয়ে অস্থায়ী দেয়াল বানানো যেতে পারে। ইচ্ছা করলে সেই দেয়ালে পাঞ্চ করে রেখে দিতে পারেন ছোট ছোট শোপিস অথবা চাইলে সে দেয়ালটায় অন্য একটা রং ব্যবহার করে আনতে পারেন ভিন্নমাত্রা। আবার কোথাও কোথাও পার্টিশনে লাগাতে পারেন বড় আয়না, এতে করে ঘরটা যেমন বড় দেখাবে আবার আপনি যে পার্টিশন দিয়েছেন সেটাও বোঝা যাবে না। আজকাল অনেকে কাঠ অথবা রড আয়রনের সঙ্গে বাঁশ, বেত, তামা, পিতল ব্যবহার করে তৈরি করছেন নান্দনিক পার্টিশন। তবে লক্ষ রাখতে হবে, সেগুলোর যেন ঘরের আসবাবের সঙ্গে মিল থাকে। যে ধরনেরই দেয়াল ব্যবহার করুন না কেন, লক্ষ রাখতে হবে তা যেন খুব বেশি ভারী না হয়। ঘরের মধ্যে সবুজের স্নিগ্ধতা আনতে বড় বড় ইনডোর প্ল্নান্টস দিয়ে আড়াল করা যেতে পারে এক ঘর থেকে অন্য ঘরকে। ডিজাইন বুঝে ইনডোর প্লান্টস বা শোপিস দিয়ে সাজিয়ে নিতে পারেন পার্টিশনের সামনের অংশটি।
অফিসেও আজকাল অস্থায়ী পার্টিশন ব্যবহার করা হয়। অফিসের স্পেস ও প্রয়োজনকে মাথায় রেখে পার্টিশন নির্বাচন করুন। যেহেতু অফিস এবং সেখানে অনেক লোকজন একসঙ্গে কাজ করেন, তাই ওয়ার্কিং এরিয়াটা সব সময় আলাদা রাখার চেষ্টা করেন সবাই। একসঙ্গে বসে কাজ করলেও সবারই একটু প্রাইভেসির দরকার। সে জন্য এ ক্ষেত্রে ওয়ার্কিং প্লেসে লোহা, ইট পার্টিশন দিয়ে প্রত্যেকেই আলাদা করে জায়গা দিতে পারেন অনায়াসেই। আবার জায়গার স্বল্পতার জন্য টানা টেবিল টপের উপরি ভাগে শুধু পার্টিশন ব্যবহার করতে পারেন। অফিসে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের রুম সাধারণত আলাদা হয়, সে ক্ষেত্রে ফুল হাইট পার্টিশন ব্যবহার করুন। আজকাল পার্টিশন শুধু পার্টিশনই নয় বরং সৌন্দর্যবর্ধনের একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অস্থায়ী দেয়াল, অফিস সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে। ওপেন অফিস আর ক্লোজ অফিস। ওপেন অফিসে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লোহা আর ইটের পার্টিশন অথবা পুরো অফিসে খোলামেলা একটা আমেজ রাখতে গ্লাস পার্টিশনই বেশি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ক্লোজ অফিসে ফুলহাইট পার্টিশনের প্রচলনটা বেশি। অফিস পার্টিশনে সাধারণত গর্জন কাঠের ফ্রেম তৈরি করে বিভিন্ন ধরনের বোর্ড লাগিয়ে পার্টিশন বানানো হয়। অনেকে আবার বোর্ডের পরিবর্তে কিছু অংশে ফেব্রিক ব্যবহার করে থাকেন।
আবার কাঠের ফ্রেমের পরিবর্তে প্লাস্টিক অথবা থাই ফ্রেমও ব্যবহার করতে পারেন। পার্টিশনের মধ্যে নান্দনিকতা ফুটিয়ে তুলতে বিভিন্ন রঙের পলিশ কিংবা ডুকো পেইন্ট করা যেতে পারে। নানা ধরনের ডিজাইনের মাধ্যমেও আনা যেতে পারে বিভিন্নতা। গ্লাস পার্টিশনের ক্ষেত্রে অফিসগুলোতে রঙিন গ্লাস নির্বাচন না করাই ভাল। যদি গ্লাসে ডেকোরেটিভ লুক দিতে চান, তাহলে এচিং করুন অথবা সাদা রঙের ডিজাইনের গ্লাস নির্বাচন করুন। আপনি চাইলে পেপার পেস্ট করে তাতে নানা ধরনের কাটিংয়ের মাধ্যমেও নতুনত্ব আনতে পারেন।
রেস্টুরেন্টের পার্টিশন সাধারণত একটু গর্জিয়াস হয়। কাঠ ও বোর্ডের মধ্যে নানা ধরনের কম্পোজিশন তৈরি করে পার্টিশনে আনুন নান্দনিকতার ছোঁয়া। রেস্টুরেন্টের পার্টিশনে চাইলে আপনি নানা ধরনের রঙিন ডেকোরেটিভ গ্লাস ব্যবহার করতে পারেন। চাইলে কিছু ফ্লোডিং পার্টিশনও রাখতে পারেন। সব সময় ফ্লোডিং পার্টিশন ব্যবহার করুন বড় কোনো অনুষ্ঠানের সময়, প্রয়োজন অনুযায়ী ফ্লোটিং পার্টিশন সরিয়ে স্পেসকে বড় করে তুলুন। রেস্টুরেন্টের গঠন অনুযায়ী এবং আশপাশের আসবাবের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পার্টিশন নির্বাচন করুন। কাঠ, গ্লাস, বেত, বাঁশ, থাই যা-ই ব্যবহার করুন না কেন, অবশ্যই রেস্টুরেন্টের থিমকে মাথার রেখে সাজিয়ে তুলুন নান্দনিক পার্টিশন।
খোঁজখবর
আড়ং, যাত্রা ছাড়াও বেশ কিছু ফ্যাশন হাউসে কিনতে পাওয়া যাবে এই অস্থায়ী দেয়াল বা পার্টিশন। বেত বা বাঁশের পার্টিশন কিনতে চাইলে তা বাঁশ কিংবা বেতের আসবাবের দোকানগুলোতে পাবেন। চাইলে দোকানগুলোতে অর্ডার দিয়ে পছন্দমতো নকশার পার্টিশন বানিয়ে নিতে পারেন।
জেনে রাখুন
- অকারণে ঘরের মাঝে পার্টিশন দিতে যাবেন না। আড়ালের প্রয়োজন হলে তবেই পার্টিশন দিন।
- অস্থায়ী দেয়ালটি যেন চলাফেরার রাস্তাকে আটকে না ফেলে সেদিকে লক্ষ রাখা জরুরি। স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটাচলা করা যায়, এমন স্থান নির্বাচন করুন।
- পার্টিশনের উচ্চতা ছয় থেকে সাত ফুট হওয়া উচিত।
- ঘরের মাঝে রাখা পার্টিশনটি মাঝেমধ্যে এদিক-সেদিক করে রাখতে পারেন। এতে অন্দরসজ্জায় আসবে নতুনত্ব।
- গ্লাসের পার্টিশন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন।
প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৮তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৫