কেমিক্যালের দহন নগরে… 

পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা। কয়েক দিন আগেও যে লোকালয়টি ছিল দিনভর কর্মব্যস্ততায় মুখর, অথচ ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে আজ সেখানে শুধুই মৃত্যু যন্ত্রণা; ধ্বংসযজ্ঞের হাহাকার। এ যেন এক মৃত্যু উপত্যকা! ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স আর সাধারণ মানুষের প্রাণান্ত চেষ্টা সত্তে¡ও সর্বগ্রাসী আগুন যেন নিভতেই চায় না। কয়েক মুহূর্তেই সব পুড়ে অঙ্গার। অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি আর আহাজারিতে যেমন হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তেমনি বিশাল বিশাল ভবন পড়ে হুমকির মুখে। ওই এলাকার বিভিন্ন ভবনে থাকা বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক পদার্থের কারণেই আগুন হয়ে ওঠেছিল সর্বগ্রাসী, যা অবিরাম পানি ধারায়ও নিভতে চাইনি। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রাসায়নিক কারখানা গড়ে তোলা দন্ডনীয় অপরাধ। এর আগে নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকান্ড থেকে আমরা শিক্ষা নেয়নি। ফলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। অথচ রাসায়নিক মানেই চরম দাহ্য পদার্থ। এতে সংঘটিত আগুন স্বাভাবিক আগুনের মতো নয়। আগুনের তীব্রতা হয় ভয়াবহ; কয়েকগুণ বেশি। আগুন নির্বাপণে নিতে হয় ব্যতিক্রমী কর্মপন্থা। 

রাসায়নিক আগুনের বৈশিষ্ট্য

আগুন দ্রুত প্রজ্জ্বলনশীল পদার্থের রাসায়নিক বিক্রিয়াবিশেষ। এর মাধ্যমে উত্তাপ, আলোসহ বহুবিধ রাসায়নিক উৎপাদিত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এটা আগুনের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলেও রাসায়নিক পদার্থের ক্ষেত্রে এর প্রজ্জ্বলন সক্ষমতা, উত্তাপ, স্থায়িত্ব সবকিছুই হয় অনেক বেশি। বিশেষ করে ম্যাগনেসিয়ামজনিত শিখার সাহায্যে সৃষ্ট  আগুনের সর্বগ্রাসী বিচ্ছুরণকে আটকানো কঠিন। এটি কার্বন ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন এবং অন্যান্য অগ্নিনিবারক-সহায়ক যৌগকেও পুড়িয়ে ফেলতে সক্ষম। ম্যাগনেসিয়াম ছাড়াও সোডিয়াম, পটাশিয়াম, বিভিন্ন ধরনের অ্যাসিড ও অন্যান্য রাসায়নিকের আগুনও অত্যন্ত মারাত্মক। এগুলো থেকে শুধু মারাত্মক আগুনই নয়, ক্ষতিকর অনেক গ্যাসও নির্গত হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।  

আগুন নিয়ন্ত্রণে করণীয়

আগুন জ্বালাতে প্রয়োজন মাধ্যমের। এই মাধ্যম বা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয় কাঠ, কয়লা, তৈল এবং অন্যান্য দাহ্য পদার্থ। একবার আগুন জ্বলতে শুরু করলে পরে এটি নিজেই তাপ উৎপাদনে সক্ষম। কখনো কখনো এটি নিজেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাপ উৎপাদনের মাধ্যমে জ্বলতে শুরু করে। আগুনকে তিনটি পৃথক উপায়ে নির্বাপণ করা সম্ভব। তা হচ্ছে- 

যদি আগুনকে সহায়ক জ্বালানি এবং অপরাপর জ্বালানিকে দূরে রাখা যায়, তাহলে আগুন জ্বলবে না।

অক্সিজেন প্রত্যাহারের মাধ্যমে আগুন নেভানো সম্ভব, যা শ্বাসরোধকারী আগুন নামে পরিচিত। আগুন খালি জায়গায় জ্বলতে পারে না অথবা এটি কার্বন ডাই-অক্সাইড দ্বারা আবৃত থাকাবস্থায় জ্বলে না।

তাপশক্তিকে দূরে সরিয়ে রাখার মাধ্যমে আগুনকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। সবচেয়ে প্রধান ও সাধারণ উপায় হচ্ছে পানি ব্যবহার করা, যা আগুনের বিস্তার রোধ করে।

আগুন নেভাতে সাধারণত পানি ব্যবহার করা হলেও রাসায়নিক আগুনের ক্ষেত্রে তা সহজে কাজ করে না। রাসায়নিক অনেক সময় পানির চেয়ে হালকা হওয়ায় তা পানির ওপর ভেসে ওঠে। সেক্ষেত্রে পানি ছিটিয়ে আগুন নেভাতে গেলে আগুন আরও বেশি জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। এই ধরনের আগুন নেভাতে ভিন্ন পন্থা নিতে হয়। ব্যবহার করতে হবে ফায়ার এক্সটিংগুইসার। উল্লেখ্য, আগুন নেভানোর সিলিন্ডারেও কার্যত পার্থক্য রয়েছে, যা জানা অতি জরুরি। মূলত তিন ধরনের ফায়ার এক্সটিংগুইসার রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে-

  •  ডিসিপি এক্সটিংগুইসার 
  •  সিওটু এক্সটিংগুইসার এবং
  •  ফোম-জাতীয় এক্সটিংগুইসার।

ডিসিপি এক্সটিংগুইসার

ডিসিপি যার পূর্ণরূপ ড্রাই কেমিক্যাল পাউডার। এটা সাধারণত কাপড়, পাট, কাঠ এবং শুকনো কঠিন পদার্থের আগুন নেভাতে ব্যবহার করা হয়। এই সিলিন্ডার দামি ও সূক্ষ্ম মেশিনের আগুন নেভানোর কাজে ব্যবহৃত হলে আগুন নিভবে কিন্তু মেশিনগুলো পুনরায় ব্যবহার না করাই ভাল। কারণ পাউডারের জন্য মেশিনের অভ্যন্তরীণ দামি ও সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশ চিরতরে ক্ষতির আশংকা থাকে। ডিসিপি সিলিন্ডার চেনার উপায় হলো এর এই সিলিন্ডারের হোজ পাইপটির পাউডার বেরোনোর দিকটি বেশি বড় নয়, তবে আগার তুলনায় সামান্য চওড়া থাকবে। এই ফায়ার এক্সটিংগুইসারের সাহায্যে সাধারণত কঠিন পদার্থের আগুন নেভানো যায়। তবে বিদ্যুতের আগুন, গ্যাসের আগুন ও ছোট ধরনের তেলের আগুনও নেভানো সম্ভব। 

সিওটু এক্সটিংগুইসার

সিওটু বা কার্বন ডাই-অক্সাইড দামি ও সূক্ষ্ম মেশিনারিজের আগুন নেভাতে ব্যবহৃত হয়। বাসায় ব্যবহার করার জন্য সিওটু আদর্শ। এর সাহায্যে সাধারণত বৈদ্যুতিক আগুন নেভানো হয়।

ফোম-জাতীয় এক্সটিংগুইসার

ফোম-জাতীয় সিলিন্ডার রাসায়নিক পদার্থ ও গ্যাসের আগুন নেভানোর কাজে ব্যবহৃত হয়। এই এক্সটিংগুইসার আবার দুই ধরনের হয়। তা হচ্ছে-

  • গ্যাস কার্টিজ টাইপ এবং
  • প্রেসার টাইপ।

ফায়ার এক্সটিংগুইসার ব্যবহারে সতর্কতা

  • সর্বদাই বাতাসের অনুকূলে থেকে প্রয়োগ করতে হয়। নইলে আগুনের কেন্দ্রে রাসায়নিক পৌঁছাবে না।
  • আগুনের সর্বোচ্চ দুই মিটার দূর থেকে এক্সটিংগুইসার প্রয়োগ করতে হয়। নইলে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক ঠিকমতো কাজ করবে না।
  • বাঁ হাতে হোস পাইপ ধরার সময় অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, কোনো অবস্থাতেই হাতের আঙুল যেন হোস পাইপের মুখে না থাকে। এতে অগ্নি প্রতিরোধক রাসায়নিক নির্গমনে বাধাপ্রাপ্ত হবে। তা ছাড়া কার্বন ডাই-অক্সাইড জাতীয় গ্যাস এক্সটিংগুইসারের সিলিন্ডারে অতি শীতল অবস্থায় কমপ্রেসড আকারে থাকে বলে হোস পাইপ দিয়ে প্রচন্ড শব্দ করে চাপমুক্ত হয়ে বের হওয়ার সময় আঙুলে লাগলে ভয়ঙ্কর শীতলতায় আঙুল সাময়িক বা স্থায়ীভাবে অসাড় হয়ে যেতে পারে।
  • ফায়ার এক্সটিংগুইসার একবার ব্যবহৃত হলে একই সঙ্গে পুরোটাই ব্যবহার করতে হয়। দ্বিতীয়বার তা আর ব্যবহারযোগ্য থাকে না।
  • কোনো কারণে এক্সটিংগুইসার ব্যবহার করেও আগুনের নিয়ন্ত্রণ আনা না গেলে বা আগুন বেড়ে গেলে ধরে নিতে হবে আগুনের প্রাথমিক অবস্থা পেরিয়ে গেছে। তখন অবশ্যই নিরাপদ অবস্থানে চলে যেতে হবে এবং দ্রুত ফায়ার সার্ভিসে খবর দিতে হবে।
  • কার্বন ডাই-অক্সাইড টাইপ এক্সটিংগুইসার প্রয়োগ করা হলে আগুন নিভুক বা না-নিভুক, ঘটনাস্থলে বেশি সময় অপেক্ষা করা যাবে না। নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড অচিরেই অবস্থানকারী ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাসে বিঘ্ন সৃষ্টি করবে।
  • তবে বিবেচনায় নিতে হবে, মুক্ত স্থানে বা প্রবহমান বাতাসযুক্ত স্থানে কার্বন ডাই-অক্সাইড টাইপ এক্সটিংগুইসার প্রয়োগ খুব একটা কার্যকর হয় না। এ ক্ষেত্রে বালু বা পানি (প্রয়োজন অনুযায়ী) ব্যবহারই উত্তম।

আগুন নেভাতে করণীয়

বাসাবাড়িতে, কর্মক্ষেত্রে আকস্মিক অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটলে সাধারণত আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। স্বাভাবিক বোধ কাজ করে না। তড়িঘড়ি করে আগুন নেভাতে বা পালাতে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এমনকি ধ্বংসযজ্ঞও বেশি হয়। অথচ কিছুটা ঠান্ডা মাথায় চেষ্টা করলে আগুন দ্রুত নেভানো সম্ভব। এ জন্য আমাদের যা যা করতে হবে: 

  • প্রথমেই গ্যাস ও বিদ্যুতের সুইচ ও সংযোগ বন্ধ করতে হবে। এরপর নির্দিষ্ট স্থানে রক্ষিত ফায়ার এক্সটিংগুইসারটি খুলে নিয়ে আগুনের উৎসস্থল খুঁজে বের করুন।
  • গ্যাসের চুলায় আগুন ধরলে ভেজা কাঁথা, কম্বল বা বস্তা ইত্যাদি দিয়ে ঢেকে দিলে আগুন নিভে যায়।
  • কয়েকজন ছাড়া বাকি সবাইকে নিরাপদে এক্সিট রোড দিয়ে বের করে নিতে হবে। 
  • এক্সটিংগুইসার প্রয়োগেও আগুন নিয়ন্ত্রণে না এলে অফিসে/ফ্লোরে ফায়ার হাইড্রেন্ট সিস্টেম সক্রিয় থাকলে তা ব্যবহার করতে হবে। 
  • ভুলেও লিফট ব্যবহার করবেন না। ভেতরে আটকে যেতে পারেন। নির্গমন সিঁড়ি ব্যবহার করুন।
  • এক্সিট পথে বা সিঁড়িতে সবাইকে ডিঙিয়ে আগে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। এতে স্বাভাবিক নির্গমনে জটিলতা সৃষ্টি হয়ে জ্যাম লেগে যেতে পারে। আগেরজনকে আগে বেরিয়ে যেতে সহায়তা করুন।
  • কারও গায়ের পোশাকে আগুন লেগে গেলে দৌড় দেওয়ার চেষ্টা করবেন না, এতে আরও বেশি অক্সিজেনের সংস্পর্শে আগুন বেড়ে যাবে। সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়ুন এবং মাটিতে গড়াগড়ি দিন। অক্সিজেন না পেয়ে আগুন নিভে যাবে।
  • কখনো কখনো কেউ অগ্নিকান্ড থেকে নিরাপদে বেরিয়ে এসে আবারও কোনো গুরুত্বপূর্ণ জিনিস উদ্ধারের জন্য আগুনের উৎসের দিকে ছুটে যান। কখনো এ রকম করতে যাবেন না। এতে করে নিজের ঝুঁকি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অন্যের নিরাপদে বেরিয়ে আসা বিঘ্নিত হবে। প্রাণের চেয়ে অধিক মূল্যবান আর কিছু হতে পারে না। 

প্রতিকার নয়, দরকার প্রতিরোধ

সাবধানতা সত্ত্বেও আগুন লাগতে পারে। সে ক্ষেত্রে দ্রুত প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে আগুন থেকে বাঁচার শ্রেষ্ঠ উপায় হচ্ছে সম্ভাব্য অগ্নিকান্ডের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও সচেতনতা সৃষ্টি। সম্ভাব্য অগ্নিকান্ড প্রতিরোধ বা প্রতিকারে প্রাক্-প্রস্তুতি যেমন হবে:

  • ভবনে বা বাসাবাড়িতে নিজস্ব উদ্যোগে একটি করে ছোটখাটো ফায়ার এক্সটিংগুইসার সংরক্ষণ করুন।
  • কর্মক্ষেত্রে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতিগুলোর অবস্থান দেখে রাখুন এবং মাঝে মাঝে চেক করুন।
  • বিদ্যুতের সংযোগ লাইন ও ওয়ারিংগুলো মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ প্রকৌশলীর মাধ্যমে নিয়মিত চেক করিয়ে নিন। প্রয়োজনে টেম্পার নষ্ট হয়ে যাওয়া পুরোনো বৈদ্যুতিক তার/যন্ত্রপাতি পরিবর্তন করিয়ে নিন।
  • গ্যাস পাইপে কোনো লিক হচ্ছে কি না নিশ্চিত হয়ে নিন। 
  • অপ্রয়োজনীয়ভাবে গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে রাখা থেকে বিরত থাকুন। গ্যাসের চুলা জ্বালানোর আগে সতর্কতা হিসেবে কিছুক্ষণ জানালা-দরজা উন্মুক্ত করে সম্ভাব্য জমে থাকা গ্যাস ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিন। কাজ শেষে চুলা নিভিয়ে সন্দেহাতীতভাবে সুইচ অফ রাখুন, যাতে কোনো গ্যাস লিক না করে।
  • গ্যাস-সংকটের কারণে আবাসিক, বাণিজ্যিক ও হোটেল-রেস্টুরেন্টে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডারের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। মানহীন সিলিন্ডারে বাজার সয়লাব। নিরাপত্তার স্বার্থে ব্যবহারের আগে সিলিন্ডারের মান পরীক্ষা করা অবশ্যই উচিত।
  • বাড়িতে, ভবনে বা আশপাশে অতিসংবেদশীল দাহ্য পদার্থ সংরক্ষণ থেকে বিরত থাকুন, অন্যকেও তা করা থেকে বিরত রাখুন। স্টোররুমকে আজেবাজে জিনিস দিয়ে অযথা ভারাক্রান্ত করবেন না।
  • কারখানায় রাসায়নিক পদার্থ এবং জ্বালানি পদার্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ লোক নিয়োজিত রাখুন।
  • নিজের নিরাপত্তার পাশাপাশি অন্যের জান-মালের নিরাপত্তাকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিন। অতি-উৎসাহী হয়ে অগ্নিনির্বাপক ও উদ্ধারকারী দলের কাজে অযথা বাধার সৃষ্টি করবেন না। এতে ক্ষতির মাত্রা অনেক বাড়তে পারে।

প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৭তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৯

মঈন আহমেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top