আধুনিক ব্যবস্থাপনায় জলাবদ্ধতার প্রতিকার

সময়টা বর্ষাকাল। প্রকৃতির নিয়মে আষাঢ়ে বৃষ্টিই এখন স্বাভাবিক। কিন্তু সামান্য বৃষ্টিতেই নগরবাসীকে জলজট ও জলাবদ্ধতায় চরম ভোগান্তি পোহাতে হবেÑ এটাই যেন এ নগরের নিদারুণ বাস্তবতা। বছরের পর বছর গৃহীত নানা উদ্যোগেও মুক্তি মিলছে না রাজধানীবাসীর। আবার জনসংখ্যার চাপ সামলাতে বাড়ছে নগরের পরিসর। কিন্তু ক্রমবর্ধমান এ জনপদে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত এখানকার ড্রেনেজ ও বৃষ্টির পানি নির্গমনের ব্যবস্থাপনা। যাতে কেবল বাড়ছেই নগরবাসীর দুর্ভোগ। ভারী বৃষ্টি হলে সড়কে যানবাহনের বদলে চালাতে হয় নৌকা, বাড়ে যানজট। সমস্যা সমাধানে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন (উত্তর ও দক্ষিণ) ও ওয়াসার নেওয়া ব্যয়বহুল নানা প্রকল্পগুলোতেও মিলছে না কাক্সিক্ষত সাফল্য। এ পরিস্থিতিতে জলজট ও জলাবদ্ধতায় উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে প্রথাগত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি প্রয়োজন আধুনিক প্রকৌশল-প্রযুক্তিসম্পন্ন উদ্যোগ, কর্মপরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়ন। এমন কর্মপ্রক্রিয়াসমূহ যেমন ব্যয়সাশ্রয়ী তেমনি কার্যকরী। বিশে^র বিভিন্ন দেশ এসব কৌশলকে কাজে লাগিয়ে বৃষ্টির পানি ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থায় এনেছে যুগান্তকারী সাফল্য।

নগরে জলাবদ্ধতার নেপথ্যে

অতীতে ঢাকার চারপাশে এমনকি অভ্যন্তরেও জালের মতো বিস্তৃত ছিল অসংখ্য নদী, খাল, পুকুর ও জলাভূমি; যেগুলোর মাধ্যমে বৃষ্টির পানি ধারণ ও পয়োবর্জ্য নিষ্কাশিত হতো। কিন্তু যুগের পর যুগ এগুলো ভরাট ও বেদখল করে অপরিকল্পিতভাবে অবকাঠামো গড়ে তোলায় নগরের পানি ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটেছে চরমভাবে। অবশিষ্ট নদী-খাল-জলাভূমি সংকীর্ণ হওয়ায় ভরাট হয়ে যাচ্ছে। দখল ও ভরাট ছাড়াও চওড়া ও গভীর খালগুলোকে পরিণত করা হয়েছে কংক্রিটের ড্রেন ও বক্স কালভার্টে। সিটি করপোরেশন মূল সড়কের নিচ দিয়ে ওয়াসার প্রবহমান পাইপের বাইরে ফুটপাতের তলা বা তার পেছন দিয়ে আরেকটি সারফেস ড্রেন বা খোলা ড্রেন তৈরি করা হয়েছে। এতে খালগুলো সরু নালায় পরিণত হওয়ায় বৃষ্টির পানি নিষ্কাশিত হয়ে জমা হওয়ার জায়গা পাচ্ছে না। শহরে যতটুকু ড্রেনেজ ব্যবস্থা আছে, সেটি কাজ করছে না পরিপূর্ণভাবে। ময়লা জমে পানি নিষ্কাশনক্ষমতা ক্রমেই কমছে। এতে বৃষ্টির পানির অতিরিক্ত চাপ নিতেও ব্যর্থ হচ্ছে ড্রেনগুলো। ফলে বর্ষায় খুব সহজেই জলমগ্ন হচ্ছে নগর ঢাকা।

১৯৮৮ সালের আগে ঢাকায় বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের দায়িত্ব ছিল জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের। কিন্তু পরে এ দায়িত্ব পায় ঢাকা ওয়াসা। তবে বিগত ৩৩ বছরে পানি নিষ্কাশনের ব্যাপারে তেমন কার্যকরী কোনো দায়িত্ব পালন করেনি ঢাকা ওয়াসা। রাজধানীতে এখন খাল রয়েছে ৪৩টি। এর মধ্যে ঢাকা ওয়াসা সম্প্রতি ২৬টি খালের দায়িত্ব দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করেছে। বাকি ১৭টির দায়িত্ব এখনো গণপূর্ত, রাজউক, পাউবো (পানি উন্নয়ন বোর্ড) ও জেলা প্রশাসকের অধীনে। তবে দাপ্তরিকভাবে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের দায়িত্ব এখনো ঢাকা ওয়াসার। প্রশাসনিক এই জটিলতার মধ্যেই বৃষ্টির পানি নিরসনে কাজ করছে দুই সিটি করপোরেশন। খালের দায়িত্ব পেয়ে জলজট নিরসনে সিটি করপোরেশন খাল খনন, সংস্কার, পরিষ্কারকরণের মতো কাজ করছে। এতে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও বৃষ্টিতে জলজট কাটছে না। কারণ ঢাকার চারদিকের নিম্নাঞ্চলগুলো দিন দিন ভরাট হয়ে যাওয়ায় ঢাকা এখন হয়ে পড়েছে ‘বালতির’ মতো। তাই মতিঝিল, শান্তিনগর, মালিবাগ, রাজারবাগসহ বেশ কিছু এলাকা থেকে পাম্পিংয়ের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন করতে হয়। খালের সঙ্গে বেশ কিছু যন্ত্রপাতিও সিটি করপোরেশনকে হস্তান্তর করেছে ওয়াসা। কিন্তু এসব যন্ত্রপাতির ৮০ শতাংশই বিকল। এ ছাড়া বিভিন্ন স্টেশনের ছয়টি পাম্পের তিনটিই এখন বিকল হয়ে পড়ে আছে। এখানকার প্রতিটি পাম্প প্রতি সেকেন্ডে ৫ হাজার কিউসেক পানি নিষ্কাশন করতে পারে। পাম্প বিকল থাকায় অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে এলাকাগুলো সহজেই হয়ে পড়ে জলমগ্ন। আবার পাউবোর ৫৫টি স্লুুইসগেটের মধ্যে বিকল হয়ে আছে ৩৭টি। সব মিলিয়ে নগরের পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা এ মুহূর্তে বেশ নাজুক।

যে কারণে সাফল্য পাচ্ছে না উন্নয়ন প্রকল্পগুলো

প্রতিবছর লাখো-কোটি টাকা বাজেটে বরাদ্দ থাকলেও জলাবদ্ধতা ও জলজট নিরসনে বাস্তব কোনো সমাধান মেলেনি। কারণ একাধিক সমস্যায় জর্জরিত পানি নিষ্কাশনব্যবস্থাটি। উদ্ভূত সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত ও সমাধান না করে যত বড় প্রকল্পই গ্রহণ করা হোক না কেন, তা সঠিক সমাধান দিতে ব্যর্থ। বিশেষ করে দরকার সঠিক ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা, যেটা শহরের বৃষ্টির পানির নিষ্কাশন নিশ্চিত করবে; একই সঙ্গে নগরের ভেতরের ও আশপাশের খাল, জলাশয় ও নদীসমূহের ব্যবস্থাপনাটাও ঠিক রাখবে, যাতে সহজেই বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হয়। এখনো সময়োপযোগী ও আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। খাল ও জলাধার কমে যাওয়া ছাড়াও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। এ ছাড়া ডিসিসির পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের নিয়মিত রাস্তা ও পানি পরিবহনকারী ড্রেন বা নালা পরিষ্কার করে রাখার দায়িত্ব থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা লক্ষণীয় নয়। পরিষ্কারের পরেও ড্রেনের আবর্জনা রাস্তা বা ড্রেনের পাশে স্তূপ করে রেখে দেওয়া হয়, যা বৃষ্টির পানির সঙ্গে আবারও ড্রেনে গিয়ে মেশে। এতে পানি চলাচলের রাস্তা বন্ধ বা সংকীর্ণ হয়ে পড়ায় বৃষ্টির পানি সহজে সরে যেতে না পারায় সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতার। এ ছাড়া নানা কারণ রয়েছে জলাবদ্ধতার নেপথ্যে। কারণগুলো হলো-

  • পানি পরিবহনকারী ড্রেনের সঠিক ও উপযুক্ত নকশার অভাব
  • পানি নিষ্কাশনের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ পাম্পের অভাব
  • স্লুইসগেটের অপর্যাপ্ততা
  • জনসচেতনতার অভাবে ড্রেনসহ যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা
  • ডিসিসি কর্তৃক নিয়োজিত পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দায়িত্বে অবহেলা
  • নগরের বিভিন্ন স্থানে অপরিকল্পিতভাবে বর্ষা মৌসুমে খোঁড়াখুঁড়ি
  • পানি নিষ্কাশনের জন্য নির্মিত অবকাঠামোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব
  • খাল ও লেকগুলো নিয়মিত খনন করে পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানোর প্রচেষ্টার অভাব প্রভৃতি।

জলাবদ্ধতা প্রতিকারে আধুনিক-প্রযুক্তিবান্ধব যত উপায়

রাজধানীর জলাবদ্ধতা নির্মূল কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। তবে সর্বাগ্রে শুধু খাল আর ড্রেনকেন্দ্রিক পরিকল্পনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বৃষ্টির অতিরিক্ত পানি যেন দ্রুত বেরিয়ে যেতে পারে সে জন্য প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে পানি নিষ্কাশনের জন্য উন্মুক্ত জায়গা ও বন সৃষ্টি করতে হবে, যেন পানি ধরে রাখা যায়। এ জন্য খাল উদ্ধার ও খনন, ড্রেন নির্মাণ ও সংস্কার, নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কারসহ অন্যান্য অবকাঠামোর উন্নয়ন প্রয়োজন। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা অনিয়ম আর বিশাল জনসংখ্যার এ নগরীতে জলাবদ্ধতা দূর করা রীতিমতো চ্যালেঞ্জিং। তবে প্রথাগত চিন্তাভাবনা বাদ দিয়ে আধুনিক, প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব সহজেই। যেমন-

আধুনিক ও কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা

ঢাকা নগরীতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার ছোট ড্রেনেজ লাইন রয়েছে। এর বেশির ভাগই আবার ইট-পাথর আর প্লাস্টিকের বর্জ্য জমে বিকলপ্রায়। বিভিন্ন অংশের খোলা স্ল্যাব কিংবা ম্যানহোল দিয়ে প্রবেশ করছে কঠিন বর্জ্য। ফলে জমে থাকা পানি ছোট ড্রেন থেকে বড় ড্রেন বা খাল পর্যন্ত যেতে পারছে না। ড্রেনেজ ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো যখন বৃষ্টি হবে তখন যত দ্রুত সম্ভব তা নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা। আধুনিক ও সঠিক ড্রেনেজ ব্যবস্থাই পারে কাজটি ঠিকভাবে করতে। এ জন্য ড্রেন ডিজাইনে দিতে হবে সর্বাধিক গুরুত্ব। এ ছাড়া এসব ড্রেনে যেন কঠিন বর্জ্য প্রবেশ করতে না পারে এবং সহজেই যেন পরিষ্কার করা যায় সে জন্য পর্যাপ্ত ম্যানহোল রাখতে হবে। তবে কিছুতেই খালগুলোকে বক্স কালভার্টে পরিণত করা যাবে না। বক্স কালভার্ট করতে গিয়ে খালের প্রস্থ কমিয়ে কংক্রিট দিয়ে ঢালাই করা হয় খালের তলদেশ। ফলে পানি মাটির নিচে প্রবেশ করতে না পারায় অনবরত কঠিন বর্জ্য এতে প্রবেশ করে সুয়েজ পচন ক্রিয়ার মাধ্যমে তলায় জমে তা ধীরে ধীরে শক্ত হয়। এতে বক্স কালভার্ট হয়ে পড়ে সংকুচিত; হারায় পানি প্রবাহের সক্ষমতা। এ জন্য বিশ্বের অনেক শহরে পাইপ ড্রেনেজ ব্যবস্থা বদলে প্রাকৃতিক কাঁচা ড্রেন করার পরিকল্পনা করছে কর্তৃপক্ষ। আমাদেরও উচিত এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া।

জলবায়ু পরিবর্তন, ব্যাপক নগরায়ণ, বনভূমি উজাড় প্রভৃতি কর্মকাণ্ডের ফলে বৈশি^ক উষ্ণতা বেড়ে অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টির হার বাড়ছে পৃথিবীজুড়ে। বিগত কয়েক বছর যাবৎ অধিক বৃষ্টিপাত, বন্যা ও জলজট বেশ ভোগাচ্ছিল চীনকে। পুরোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা ব্যর্থ হচ্ছিল স্থানীয় জলজট নিরসনে। এ জন্য ২০১৩ সালে দেশটি সারা দেশের ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়নের পরিকল্পনা হাতে নেয়। পাশাপাশি তারা কিছু সহজ অথচ কার্যকরী ব্যবস্থাও গ্রহণ করে। উল্লেখ্য, এই পদ্ধতিগুলো শুধু চীন নয়, বরং বিশে^র অনেক দেশই গ্রহণ করছে। জলজট নিরসনের এমনই কিছু আধুনিক কৌশল হলোÑ 

ড্রেন সক (Drain Sock)

ড্রেন সক হচ্ছে মোজার আদলের একধরনের নেট বা জাল, যা ড্রেনেজ পাইপের মুখে লাগানো হয় যেন তা পানির সঙ্গে মিশে থাকা প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, বিস্কুটের প্যাকেট, অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল, জুসের ট্রেটাপ্যাক ও অন্যান্য বর্জ্য সহজেই আটকে দিতে সক্ষম। জালে আটকানো বর্জ্য পদার্থগুলো পরে সহজেই সংগ্রহ করে তা রিসাইক্লিং করা যায়; অনেকটা জাল থেকে মাছ ছাড়ানোর মতো! এতে এসব বর্জ্য নদী, খাল ও বড় ড্রেনগুলোতে মেশার কোনো সুযোগ থাকে না বিধায় ভরাট ও দূষণ থেকে মুক্তি মেলে সহজেই। নাইলন রোপের এই সক অত্যন্ত ফ্লেক্সিবল ও মজবুত, যা সহজেই তৈরি করা যায়। আর এর মাথার রিং লাগানো থাকে বিধায় প্রচণ্ড পানির চাপ সহনীয়, যা পাইপ থেকে সহজে খুলে যায় না। এটা পরিষ্কার করে বারবার ব্যবহার করা যায়। এই চমৎকার উদ্ভাবন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিশ^ব্যাপী তা ব্যাপক সাড়া ফেলে। ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ার অনেক শহরে শুরু হয়েছে এর ব্যবহার। এই সাধারণ, ব্যয়সাশ্রয়ী অথচ কার্যকর একটি ধারণা বদলে দিতে পারে ড্রেনেজ বর্জ্য সংগ্রহের সব পূর্ব অভিজ্ঞতাকে। কিন্তু ঢাকার বাস্তবতায় বিপুল পরিমাণের প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সত্যিই বিশাল চ্যালেঞ্জ। তবে সঠিক ব্যবস্থাপনা ও কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছাই পারে এই কৌশলের সফল প্রয়োগ বাস্তবায়নে। 

ড্রেন ফিল্টার সক/সিল্ট সক

ড্রেন পরিষ্কার ও দূষণমুক্ত রাখতে ড্রেন সক-এর মতো ফিল্টার বা সিল্ট সকও বেশ আধুনিক, সহজ ও কার্যকরী এক আবিষ্কার। এর বাড়তি সুবিধা হচ্ছে মেশ ফেব্রিকে তৈরি এই সকের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করতে পারে না ছোট ছোট পার্টিকেলও। এই ফিল্টার টিউব ড্রেনের ঢাকনা ও ম্যানহোলের চারপাশে স্থাপন করা হয়। ফলে বর্জ্য ড্রেনগুলোতে মেশার কোনো সুযোগ না থাকায় আটকানো বর্জ্য পদার্থগুলো সহজেই সংগ্রহ করা যায়। স্বল্পব্যয়ের এই কৌশলটি আমাদের দেশেও প্রয়োগ করা যেতে পারে।

অটোমেটিক ড্রেনেজ ট্রাস কালেক্টর

নদী, খাল বা ড্রেনে স্থাপন করা হয় এই স্বয়ংক্রিয় মেশিনটি, যার সংস্পর্শে কোনো প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, কাঠের টুকরো পেলেই তা পাঠিয়ে দেবে গার্বেজ বিনে। এই মেশিনটি একটি মোটরচালিত সাধারণ মানের ট্রাস কালেক্টর। এর নির্মাণপদ্ধতি অত্যন্ত সহজ। এমনকি সাধারণ একজন মেকানিক্যাল জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ ইউটিউব দেখে সহজেই মেশিনটি বানিয়ে ফেলতে পারে। মেশিনটিতে একটি মোটরের সঙ্গে চেইন লাগানো থাকে, যা বিভিন্ন স্টিল মেশ নেটের পয়েন্টে থাকে চিরুনির মতো ফলা। স্টিল মেশ নেট, যা অনবরত ঘুরতে থাকে আর চিরুনির ফলা কোনো বর্জ্য পদার্থ পেলে তা সংযুক্ত বা পাশে রাখা ট্রেতে পাঠিয়ে দেয়। এই মেশিন স্থাপন ও পরিষ্কার করাও বেশ সহজ। স্বল্পব্যয়ে এ ধরনের মেশিন তৈরি করে ঢাকার খাল ও ড্রেনগুলোতে স্থাপন করে জলাবদ্ধতা নিরসন করা যায় সহজেই।

ট্রাস ট্র্যাপ

ট্রাস ট্র্যাপ অনেকটাই ড্রেন সক-এর মতো কিন্তু তা তৈরি হয় স্টিলের পাত দিয়ে। ড্রেনের মুখে এই অনুষঙ্গটি লাগানো থাকে যেন বর্জ্য সেখানে আটকে যায়, মিশতে পারে না নদী, খাল বা জলাশয়ে। এই উপকরণটি খুব সহজেই তৈরি করা যায় কিছু স্টিল বার বা রড দিয়েই। একটি ফ্রেমে উল্লম্ব ২-৩ ইঞ্চি ফাঁকা করে একাধিক রড জোড়া দিলেই তৈরি হয়ে যায় বেশ কার্যকরী ট্রাস ট্রাপ। এতে পানির ধারাও থাকে স্বাভাবিক। তা ছাড়া খুব সহজেই ট্রাপে জমা ময়লা সংগ্রহ করা যায়।

সি-বিন

সাগর ও জলাশয়ের ভাসমান বর্জ্য সংগ্রহের কাজেই উদ্ভাবন করা হয় সি-বিন। বিশে^র প্রায় ৭০টি দেশে এরই মধ্যে এই বিন নিয়ে শুরু হয়ে গেছে অসংখ্য প্রজেক্ট। এটি এখন সাগরের বর্জ্য সংগ্রহ ছাড়াও নদী, খাল, ড্রেন সর্বত্রই ব্যবহৃত হচ্ছে। একটি সাধারণ প্লাস্টিকের বালতি আকৃতির জারে একটি ফিল্টার কাপড় লাগানো থাকে। একটি পাম্প দিয়ে টানা হয় পানি। এই পানির সঙ্গেই বিনে আটকে যায় ভাসমান যত বর্জ্য পদার্থ। ভলেন্টিয়ার বা দায়িত্বপ্রাপ্তরা এই বর্জ্যগুলো সহজেই সংগ্রহ করতে পারে। তবে একে কর্মক্ষম রাখতে এই বিন নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। আমাদের দেশেও যত দ্রুততার সঙ্গে কৌশলটি কাজে লাগানো যেতে পারে।

ড্রেন গার্ড/গ্রেট

উন্মুক্ত ড্রেনে বর্জ্য প্রবেশ করবে এটা স্বাভাবিক। রাজধানীর অসংখ্য ড্রেন রয়েছে, যেগুলোতে কোনো স্ল্যাব নেই। এসব  স্ল্যাববিহীন ড্রেনে এই গার্ড বা গ্রেট স্থাপন করা যেতে পারে। এতে বাইরের ময়লা প্রবেশের সুযোগ থাকে কম। তা ছাড়া স্টিল মেশ ড্রেন গ্রেটের ওপর দিয়ে হাঁটাচলা করা এমনকি যানবাহনও যেতে সক্ষম। 

জলাবদ্ধতা নিরসনে আন্ডারগ্রাউন্ড ডিসচার্জ চ্যানেল

যে পরিমাণ বৃষ্টির জন্য জলজট হয়, সেটার জন্য আসলে শুধু বৃষ্টিই দায়ী নয়। এর অন্যতম কারণ শহরে যেটুকু ড্রেনেজ ব্যবস্থা আছে, সেটা পূর্ণাঙ্গভাবে কাজ করছে না। আবার খাল-জলাশয় না থাকায় বৃষ্টির পানি নিষ্কাশিত হয়ে কোথাও পতিত হতে পারছে না। ফলে ড্রেনেজ ব্যবস্থা যত আধুনিক হোক না কেন, তা চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ। ঢাকার যে ঘনবসতি তাতে নতুন করে খাল-জলাশয় সৃষ্টিও প্রায় অসম্ভব। সেক্ষেত্রে দারুণ এক পন্থা হতে পারে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড ডিসচার্জ চ্যানেল’। বন্যার পানি যেন জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করতে না পারে সে জন্য জাপান এই চ্যানেল নির্মাণ করে, যা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২০০ ঘনমিটার পানি নিষ্কাশনে সক্ষম। এই চ্যানেলটি প্রায় ৫০ মিটার গভীরে নির্মিত প্রায় ৬ দশমিক ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ, যা দেখতে অনেকটা বৃহৎ আকৃতির ট্যাঙ্কের মতো। প্রবল বর্ষণেও এই চ্যানেলটি প্রায় ১২ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি নিষ্কাশন করে নদীতে ফেলতে সক্ষম। তবে এ ব্যবস্থাটির উদ্ভব হয় রোমে খ্রিষ্টপূর্ব ৮০০ থেকে ৭৫০ অব্দে। তারা ল্যাট্রিনের নিচে একটি বিশাল ট্রেঞ্জ কাটাত, যার সংযোগ থাকত একটি কেন্দ্রীয় সুয়ারেজের সঙ্গে। অধিক বৃষ্টিপাত হলে এই ট্রেঞ্জগুলো বিপুল পরিমাণ পানি বেশ কিছুক্ষণ ধরে রাখত আর উপচে পড়া পানি মিশে যেত কাছের কোনো নদীর ধারায়। ফলে নগরের বৃষ্টির পানি নেমে যাওয়ার সময় পেত। ফলে হতো না কোনোরকম জলজট। এ ধরনের বিশাল ভূগর্ভস্থ চ্যানেল নির্মাণ করা গেলে তা ঢাকার জলজট নিরসনে রাখবে কার্যকরী ভূমিকা।

জলাবদ্ধতা নিরসনে আরও যত সুপারিশ

  • নদী, নালা, খাল, বিল, পুকুরসহ সব ধরনের জলাশয় রক্ষায় সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতিমালা প্রয়োজনে সংশোধন ও তার বাস্তবায়ন করাসহ দোষী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ
  • খাল ও নদীর মধ্যে সৃষ্ট বাধা দূর করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিতকরণ
  • দখল করা খালসমূহ পুনরুদ্ধার করা এবং খাল পুনরায় খনন করে এর পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানো
  • ঢাকার চারদিকের নদীগুলোর বেদখল হওয়া জায়গা উদ্ধার ও ড্রেজিং করে বৃত্তাকার নৌপথটি সক্রিয়করণ
  • রাজধানীতে অসংখ্য খাল, জলাভূমি ও পুকুর যেহেতু পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়, সেহেতু উন্মুক্ত স্থানে লেক (হাতিরঝিলের আদলে), জলাধার, পুকুর খনন করা যেতে পারে
  • বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহারে রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিংয়ের মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে প্রতিটি ভবনে। প্রয়োজনে তা রাজধানীর ভবনসমূহের জন্য বাধ্যতামূলক করতে হবে
  • খাল উদ্ধার ও আধুনিকায়ন করে জলজট দূর করার পাশাপাশি তা ইতালির ভেনিসের মতো নৌপথ হিসেবে ব্যবহার এবং ‘চ্যাংগেচেয়ন’ দক্ষিণ কোরিয়ার মতো মাল্টিপারপাস স্পেসে পরিণত করা যেতে পারে
  • সঠিক কর্মপরিকল্পনা ঠিক করে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে
  • ডিসিসি ও ওয়াসার দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে
  • খাল, নদীসহ সব জলাশয়ে ময়লা ও আবর্জনা ফেলা থেকে বিরত রাখতে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি জরিমানার ব্যবস্থা করতে হবে
  • বর্ষা মৌসুমে বন্ধ করতে হবে অহেতুক খোঁড়াখুঁড়ি
  • বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনায় আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে তা থেকে বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি উপাদান, সার ও সড়ক নির্মাণে ব্যবহার করতে হবে 
  • বাড়াতে হবে আধুনিক ও শক্তিশালী পানি নিষ্কাশন পাম্প ও স্লুইসগেট।

নগর কাঠামোব্যবস্থায় কৌশলগত পরিবর্তন, আধুনিক নির্মাণকৌশল ও প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের মাধ্যমেই কেবল সম্ভব আমাদের প্রাণের শহর ঢাকাকে রক্ষা করা। গড়ে তোলা সম্ভব বাসযোগ্য এক নগর। পাশাপাশি যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা না ফেলতে দরকার ব্যাপক জনসচেতনতা। প্রয়োজনে কঠোর আইন ও জরিমানার ব্যবস্থা করতে হবে। জাপানে যত্রতত্র ময়লা ফেললে ৫ বছরের কারাদণ্ড ও প্রায় ১০ মিলিয়ন ইয়েন (১ ইয়েন = ০.৭৮ টাকা) জরিমানার মতো কঠোর বিধান রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই জরিমানার হার প্রায় ১০০ মিলিয়ন ইয়েন। এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া গেলে জলজট খানিকটা হলেও কমবে। তবে সবকিছুই হতে হবে রাজধানীর সব সংস্থার সমন¦য়ের ভিত্তিতে। কারণ নগরে উন্নয়নকাজে জড়িত সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে নেই কোনো ধরনের সমন্বয়। আর এ ধরনের সমন্বয়হীনতা আমাদের জলাবদ্ধতার সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাকেই করে তুলছে দুর্বল।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১৩১তম সংখ্যা, ‍জুলাই ২০২১।

মঈন আহমেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top