মার্বেল টাইলসে স্থাপত্যের আভিজাত্যে

হালে ঘরের নান্দনিকতা বাড়াতে টাইলসের অবস্থান পছন্দে সবার শীর্ষে। টাইলসের মাধ্যমে কি রান্নাঘর, কি বাথরুম, ঘর-বারান্দার মেঝে ও দেয়ালে মনের মাধুরী মিশিয়ে শিল্পীর মতো সাজিয়ে নেওয়া যায় সহজেই। মানুষের চাহিদা ও রুচির ওপর ভিত্তি করে টাইলসেরও রয়েছে নানান আঙ্গিক। ফুল, পাখি, লতা-পাতা, ক্যালিগ্রাফি, ত্রিমাত্রিক ডিজাইনসহ রংবেরঙের টাইলস পাওয়া যায় বাজারে। কেউ কেউ আবার টাইলসের মাধ্যমেই তুলে ধরতে চান স্থাপনার আভিজাত্য, এমনকি নিজের রুচিও। আর সেক্ষেত্রে টাইলসের জগতে অনন্য অবস্থান ধরে রেখেছে মার্বেল টাইলস।

মার্বেল টাইলস সাধারণত প্রাকৃতিক পাথর বা খনি কেটে তৈরি। ভূগর্ভস্থ তাপ ও চাপে রূপান্তরিত শিলা থেকে মার্বেল টাইলস উৎপন্ন হয়। প্রকৃতপক্ষে ক্ষৃদ্র ক্ষুদ্র ক্রিস্টালের সমন্বয়ে এ ধরনের শিলা পাথর তৈরি হয়, যা পাহাড় বা শিলা থেকে সংগ্রহ করে মেশিনে কেটে বিভিন্ন রূপ দেওয়া হয়। এই পাথর টাইলসের আকার, আকৃতি, রং এমন কি নকশা নির্ভর করে প্রাকৃতিক পাথরের অবস্থানের ওপর। তুলনামূলকভাবে ভারী ও দামি এই টাইলস প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে অনেক সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। সংগ্রহের পর এগুলো কেটে গ্রাইন্ডিংয়ের মাধ্যমে পলিশ করা হয়। তারপর প্যাকেটজাত করে বিপণন করা হয় বিক্রির উদ্দেশ্যে।

আগে যাবতীয় টাইলস বিদেশ থেকে এ দেশে আমদানি করা হতো। পরে দেশেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে দেশীয় চাহিদার মাত্র ৮০ শতাংশ মেটানো সম্ভব। বাকি ২০ শতাংশ আমদানি করা হয়। মার্বেল টাইলস যেহেতু প্রাকৃতিক পাথর খনি কেটে বানানো হয়, তাই এগুলো আমাদের দেশে নেই। পুরোটাই আসে বিদেশ থেকে। আমদানীকৃত টাইলসের বেশির ভাগই মার্বেল ও গ্রানাইট পাথর টাইলস। বাংলাদেশে বেশির ভাগ মার্বেল টাইলসই আনা হয় চীন থেকে। এ ছাড়া ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নরওয়ে, ইতালি, স্পেন, মালয়েশিয়া ও তুরস্ক থেকেও টাইলস আমদানি করা হয়। এর মধ্যে তুরস্কের মার্বেল টাইলসের দাম তুলনামূলক বেশি। বর্তমানে খনিজাত পাথরের বিশাল বিশাল বোল্ডার বা চাই এনেও প্রয়োজনীয় আকার প্রদানের কাজ হচ্ছে দেশেই।

মার্বেল টাইলসের রকমফের

মার্বেল টাইলস মূলত ফোর গ্রেডের বা চার শ্রেণির। যার মধ্যে রয়েছে-এ, বি, সি ও ডি। সাধারণত টাইলসের মসৃণতা বা পিচ্ছিল ভাবের ওপরেই এর গ্রেড নির্ভর করে। মার্বেল টাইলস যত বেশি পিচ্ছিল হবে, গ্রেড তত উন্নত হবে। দামও হবে বেশি। টাইলসের মান নির্ধারণের ক্ষেত্রে এর ঔজ্জ্বল্যও বিবেচ্য। উজ্জ্বল ও কম উজ্জ্বল এই দুই ধরনের মার্বেল টাইলস রয়েছে বাজারে। রঙের মধ্যে লাল, কমলা, সোনালি ও হলুদ রঙের টাইলসগুলো তুলনামূলক বেশি উজ্জ্বল এবং কালো, মেটে, ধূসর, খয়েরি ও সবুজ রঙের ঔজ্জ্বল্য কিছুটা কম। 

মার্বেল টাইলসের আকার

আয়তাকার ও বর্গাকার এই দুই ধরনের মার্বেল টাইলস ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন স্থাপনার সৌন্দর্যবর্ধনে। সাধারণত আয়তাকার টাইলস বিভিন্ন স্থাপনার দেয়ালে বেশি ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে বিভিন্ন স্থাপনার ফ্লোর বা মেঝেতে বর্গাকার টাইলসের ব্যবহার বেশি। ইদানীং নান্দনিক ফ্ল্যাটে ষষ্টভুজাকৃতি বা মৌচাকের আকৃতি টাইলসের ব্যবহার করতেও দেখা যায়। তবে এগুলো অত্যন্ত দামি এবং লাগানোর খরচও বেশি হওয়ায় কম স্থাপনার মধ্যেই ব্যবহার করা হয়।

সাধারণত ৮” /১২”,  ১২”/১২” ,  ১৬” /১৬” , ১০” /১৬” ,  ১২” /১৮” , ১২” /২০” , ২০” /২০” , ২৪” /২৪”  সহ বিভিন্ন আকারের টাইলস বাজারে পাওয়া যায়। এ ছাড়া কাউন্টার টপ বা অন্য প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য অর্ডার দিয়ে প্রয়োজনমতো টাইলস প্রস্তুত করে নেওয়া যায়। এ ছাড়া বাজারে প্রাপ্ত টাইলসের পুরুত্ব হয় সাধারণত ১/২” , ৩/৪” , ১” , ৩/৮” , ৭/১৬”  প্রভৃতি।

মার্বেল টাইলসের ব্যবহার

মার্বেল টাইলস স্থাপনার বিভিন্ন অংশে ব্যবহৃত হয়। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য-

  • নামফলক
  • দেয়াল
  • বাড়ির প্রধান ফটক
  • মসজিদের মেঝে
  • রিসিভশন ডেস্ক
  • হাসপাতালের কাউন্টার
  • ড্রয়িংরুম
  • সিঁড়ি প্রভৃতি।

মার্বেল টাইলসের দরদাম

টাইলসের ব্র্যান্ড, কোয়ালিটি ও ডিজাইনভেদে বাজারে মার্বেল টাইলসের দামের কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। যেকোনো টাইলস সাধারণত বর্গফুট হিসেবেই বিক্রি হয়। মার্বেল টাইলসও এর ব্যতিক্রম নয়। মার্বেল টাইলসের দাম বেশি। প্রতি বর্গফুট মার্বেল টাইলস সর্বনিম্ন ৩৫০ টাকা ও সর্বোচ্চ ৩,৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। তবে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ কোনোটাই ক্রেতা চাহিদার শীর্ষে নয়। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় মাঝামাঝি দামের মার্বেল টাইলস। ৮৫০-১০০০ ও ১০০০-১২০০ টাকা দামের মার্বেল টাইলসের চাহিদাই বাজারে বেশি। এই দামের মার্বেল টাইলসই বাজারে বেশি বিক্রি হয়। তাই আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে এর দাম নির্ধারিত হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি বর্গফুট সর্বনিম্ন ৬-৮ মার্কিন ডলার আর সর্বোচ্চ ৩৫-৪০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত বিক্রি হয়। তবে ১০-১২ ডলার দামের মার্বেল টাইলসই ক্রেতারা বেশি কেনেন। 

প্রাপ্তিস্থান

ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বিভিন্ন জায়গায় টাইলস বিক্রি হলেও ঢাকার বেশির ভাগ টাইলসের দোকান বাংলামোটরে। এ ছাড়া রাজধানীর মিরপুর, হাতিরপুল, বনানী, কুড়িল, বিশ্বরোড, ফার্মগেট, উত্তরা ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় টাইলস ও স্যানিটারি মার্কেট গড়ে উঠেছে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৯তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৮।

মোহাম্মদ রবিউল্লাহ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top