দেয়াল চুনকামের আদ্যন্ত

সবকিছুরই রয়েছে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য। তবে বাহ্যিক সৌন্দর্যই সবার নজর কাড়ে। স্থাপনার ক্ষেত্রেও তা-ই। দেয়ালের রং ভবনের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলে। শুধু তা-ই নয়, রং ভবনের প্লাস্টারকে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও আর্দ্রতা থেকে রক্ষা করে ভবনকে রাখে টেকসই। ভবনকে রং করতে অনেক আগে থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে চুন বা সোমোসেম। একসময় চুনকামের জন্য প্রাকৃতিক চুন ব্যবহার করা হলেও সম্প্রতি বাজারে পাওয়া যাচ্ছে চুনের আধুনিক সংস্করণ ওয়েল সিলার, ওয়াটার সিলার ও সুমোসেম।

ওয়েল সিলার

চুনকামের একটি উপকরণ ওয়েল সিলার। ওয়েল সিলার ড্রাম ও গ্যালন দুভাবে বাজারে পাওয়া যায়। ৪ লিটারের ওয়েল সিলার গ্যালন বিক্রি হয় ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকায়। সিলার বেশ গাঢ় তাই দেয়ালে লাগানোর আগে ওয়াল সিলারের সঙ্গে ২ থেকে ২.৫ লিটার তারপিন তেল বা স্পিরিট মেশাতে হয়।

ড্রাম হিসেবেও বাজারে ওয়েল সিলার পাওয়া যায়। এক ড্রামের মধ্যে ১৮ লিটার ওয়েল সিলার থাকে। কোম্পানিভেদে ২ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হয় এই সিলার। দেয়ালে লাগানোর আগে এর সঙ্গে ৫ লিটার পানি মেশাতে হয়।

ওয়াটার সিলার

চুনকামের আরেকটি উপকরণ হলো ওয়াটার সিলার। ওয়াটার সিলারও ওয়েল সিলারের মতোই গ্যালন ও ড্রাম এই দুভাবে বাজারে পাওয়া যায়। ৪ লিটারের গ্যালন ওয়াটার সিলার বিক্রি হয় ১ থেকে দেড় হাজার টাকায়। আর ১৮ লিটার ওয়াটার সিলার ড্রামের দাম ব্র্যান্ডভেদে ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। ওয়াটার সিলারেও সমপরিমাণ তারপিন তেল মেশাতে হয়।

সুমোসেম

চুনকামের আধুনিক উপাদান হিসেবে হালে চুনের বিকল্প হিসেবে সুমোসেম ব্যবহৃত হচ্ছে। সুমোসেম কঠিন পদার্থ হওয়ায় লিটারের পরিবর্তে কেজির মাপে বিক্রি হয়। এটি সিমেন্টের মতো গুঁড়ো গুঁড়ো। ২০ থেকে ৪০ কেজি ওজনের সুমোসেমের প্যাকেট বাজারে পাওয়া যায়। বিভিন্ন কোম্পানির সুমোসোমের দাম বিভিন্ন রকম। ২০ কেজি ওজনের প্রতি প্যাকেটের দাম ৩৮০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা। আর ৪০ কেজি ওজনের সুমোসেমের প্যাকেট বিক্রি হয় ১ হাজার ৬৫০ থেকে ৪ হাজার ৭০০ টাকায়। সুমোসেম ভেজা ও দুর্বল দেয়ালেও লাগানো যায়। গুঁড়ো গুঁড়ো সিমেন্টের মতো হওয়ায় পানির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়ালে লাগাতে হয়।

দেয়ালের চুনকাম আরও সাদা ধবধবে করতে চাইলে সঙ্গে নীল ও প্লাস্টিকে রং মেশাতে হয়। এ দুই মিশ্রণ আস্তরের ওপরে দিলে দেয়াল হবে সাদা ও ধবধবে। দেয়ালে পানি না লাগলে তিন বছর পর্যন্ত চুনকাম ভালো থাকে। তবে বৃষ্টির পানি জমে থাকলে তা দ্রুত নষ্ট হয়। বৃষ্টির পানির পরিমাণের ওপর চুনকামের স্থায়িত্ব নির্ভর করে।

ভবনের ভেতরের দেয়ালের প্লাস্টারে সাধারণত চুনকাম করা হয় চার ধাপে। সেগুলো-

  • সারফেস প্রিপারেশন
  • প্রাইমার বা আস্তর
  • পুটি
  • রঙের কোট।

সারফেস প্রিপারেশন

প্লাস্টার অবশ্যই পর্যাপ্ত শুকনো হতে হবে এবং খুব ভালোভাবে কিউরিং করতে হবে। প্লাস্টার করার ৪৫ দিন পরে এর ওপর কাজ শুরু করা উচিত। যেকোনো ধরনের ড্যাম্প, স্যাঁতসেঁতে, ভেজা ভাব থাকলে তা ঠিক করে নিতে হবে। এরপর পাথর বা স্যান্ড স্টোন দিয়ে ভালোভাবে ঘষে নিতে হবে। প্লাস্টার করা দেয়াল সমতল হতে হবে। সমতল না থাকলে পাথর দিয়ে ঘষে সমতল করতে হবে। এতে কোনো আলগা ময়লা বা অন্য কোনো পদার্থ থাকলে তা সরিয়ে ফেলতে হবে। এরপর ধুয়ে ফেললে ভালো হয়। এতে করে প্লাস্টার ভালোমতো শুকিয়ে যায়। এরপর স্যান্ডপেপার বা সিরিশ কাগজ দিয়ে ঘষে নিতে হবে।

প্রাইমার বা আস্তর

সারফেস প্রিপারেশন হয়ে গেলে প্রাইমার বা আস্তর দিতে হয়। এক আস্তর দেওয়া হয় এই প্রাইমারে। মূলত প্লাস্টার এবং রঙের মধ্যে আঠালো ভাব তৈরি করে এই প্রাইমার। প্রতি গ্যালন প্রাইমারে ৪৫ স্কয়ার মিটার আস্তর দেওয়া যায়। রোলার বা ব্রাশ দিয়ে প্রাইমার দেওয়া হয়। দেওয়ার আগে এই প্রাইমার পানি দিয়ে পাতলা করা হয়। এর প্রয়োগের ফলে আঠালো সম্পর্ক তৈরি হওয়ার পাশাপাশি এটি সারফেসকে মসৃণ করে, শোষণক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং রং সুন্দরভাবে ও বেশি জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।

পুটি

কোনো ফাটল বা সমস্যা থাকলে পুটি করা হয়। একে ছিট পুটিও বলা হয়। কমপক্ষে চার দিন এই পুটি শুকিয়ে নিতে হবে। বেশি পুটি যেখানে থাকবে, সেখানে স্ক্র্যাপ করে নিতে হবে। সারফেস বা রঙের তলকে আরও মসৃণ করতে এই পুটি করা হয়। ১ গ্যালন প্লাস্টিক পেইন্টের সঙ্গে ১ লিটার এনামেল পেইন্ট এবং ২৫ কেজি চক পাউডার মিশিয়ে এই পুটি তৈরি করা হয়।

রঙের কোট

রং দুই-তিনবার প্রলেপ দেওয়া হয়। প্রথম প্রলেপের পর তা সাত দিন শুকানোর জন্য সময় দিতে হয়। এরপর দ্বিতীয়বার প্রলেপ দেওয়া হয়। এতেও যদি রং ভালো না হয়, যেমন- পরিচ্ছন্ন না হয়ে ছোপ ছোপ থাকে বা রং হালকা হয় তাহলে দ্বিতীয় প্রলেপের তিন দিন পর তৃতীয় প্রলেপ দেওয়া হয়। প্রথম প্রলেপের সঙ্গে সর্বোচ্চ ২০ মতাংশ পানি মেশানো হয়। দ্বিতীয় প্রলেপের সঙ্গে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পানি মেশানো হয়। ড্যাম্প, স্যাঁতসেঁতে বা ভেজা দেয়ালে চুনকাম না করাই ভালো। আর্দ্রতা ২০ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে থাকা অবস্থায় ব্যবহার করা ভালো। সরাসরি সূর্যের আলো যেন না আসে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

সতর্কতা

  • চুনকামের সময় অবশ্যই নাক-মুখে মাস্ক পরে বা গামছা দিয়ে বেঁধে নিতে হবে
  • বাতাস অনুকূলে এটি প্রয়োগ করা উচিত নয়
  • কড়া রৌদ্রে বা কম তাপমাত্রার সময় প্রয়োগ করা যাবে না
  • তাপমাত্রা ২০ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সময় প্রয়োগ করতে হবে
  • প্লাস্টিকের বালতির পরিবর্তে মাটির চাড়ি বা ড্রামে চুন গুলানোই উত্তম
  • অবশ্যই শিশুদের নাগালের বাইরে রাখতে হবে।

পাওয়া যাবে যেখানে

বাংলাদেশের যেকোনো হার্ডওয়্যারের দোকানে চুনকামের এই উপাদানগুলো পাওয়া যায়। বার্জার, এশিয়ান পেইন্টস, এলিট পেইন্টস, রক্সিসহ বিভিন্ন কোম্পানির রয়েছে চুনকামের এই উপাদান।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৮তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৭।

মোহাম্মদ রবিউল্লাহ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top