ওয়েদার কোটের আদ্যোপান্ত

ইট, সিমেন্ট, রড, বালু দিয়ে স্থাপনার কাঠামো তৈরির পর চলে আসে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ। সে ক্ষেত্রে স্থাপনার ভেতর ও বাইরে রং করাই সবচেয়ে উপযোগী পন্থা। তবে শুধু যে ভবন রাঙাতেই রং করা হয় সে ধারণাও পুরোপুরি ঠিক নয়। বরং আবহাওয়া ও জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব থেকে ভবনকে সুরক্ষা দিতেও রং করা হয়। তবে যেনতেন রঙে ভবন রাঙানো গেলেও প্রকৃতির বিরূপ প্রভাব থেকে স্থাপনাকে রক্ষা করা সম্ভব হয় না। এ জন্য প্রয়োজন দেয়ালের উপযোগী রঙের। আর সে রংটিই হচ্ছে ওয়েদার কোট পেইন্ট। ওয়েদার কোট প্রাচীর বা দেয়ালের বাইরের জন্য উৎকৃষ্ট মানের রং। এই রং আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াই করে দেয়ালকে রাখে সুন্দর ও শক্তিশালী। ওয়েদার কোট দেয়ালের জুতসই সহায়ক হিসেবে কাজ করে। একই সঙ্গে বৈরী আবহাওয়ায় দেয়ালকে সুরক্ষা দেয় পাশাপাশি তাপ ও ধুলাবালু প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। কোম্পানিভেদে বিভিন্ন রকমের ওয়েদার কোট রয়েছে বাজারে। এবারের আলোচনায় ওয়েদার কোটের আদ্যন্তÑ

ওয়েদার কোট স্মুথ

ওয়েদার কোট স্মুথ দেয়ালের ‘ওয়ান ওয়ে বেরিয়ার’ বা একপ্রকার বাধাও বলা হয়। দেয়ালকে সুরক্ষিত রাখতে এ ওয়েদার কোটের জুড়ি মেলা ভার। এটি দেয়ালের ভেতরে পানি ও তাপমাত্রা প্রবেশ থেকে সুরক্ষা দেয়। এটি তাপ প্রতিরোধক প্রযুক্তির মতো কাজ করে ঘরকে সর্বোচ্চ ৫ ডিগ্রি পর্যন্ত ঠান্ডা রাখে।

ওয়েদার কোট অ্যান্টি ডাস্ট

বাইরের দেয়ালকে ধুলাবালু থেকে সুরক্ষার জন্য এই কোট ব্যবহার করা হয়। এটি আপনার বাড়ির বাইরের দেয়ালের ধুলা প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। এটি আপনার বাড়িকে প্রতিনিয়ত এমনকি বছরের পর বছর রাখবে নতুন, ঝলমলে ও চকচকে।

ওয়ালমাসতা

ওয়ালমাসতা হচ্ছে বাইরের দেয়ালে আরেক প্রকারের ওয়েদার কোট। এটি শতভাগ পানিভিত্তিক। ঘরের বাইরের দেয়ালে শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহারের জন্য খুবই উপযোগী কোট এটি। সিমেন্ট পেইন্টের মধ্যে ওয়ালমাসতা তুলনামূলক কম খরচে পাওয়া যায়।

ওয়েদার কোট টাইল প্রোটেক্টর

এই কোট পানি প্রতিরোধী। এটি প্রাকৃতিক রাবারগাছ থেকে তৈরি। এই কোট কঠিন পদার্থ, অধিকতর সুরক্ষাকারী। এটি ইট ও টাইলসে ব্যবহারের উপযোগী কোট। ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে স্যাঁতসেঁতে, আর্দ্রতা, শৈবাল বা শেওলা, ছত্রাক থেকে সুরক্ষা দেয়। এই কোট ব্যবহারের ফলে ইট ও টাইলসকে একদম নতুন দেখায়।

ওয়েদার কোট কুল অ্যান্ড সিল

এই কোটও পানিভিত্তিক। এই কোট নমনীয় ও পানি নিরোধক। এটি ছাদ ও প্যারাপটে ব্যবহারের উপযোগী কোট। এটি খুবই দীর্ঘস্থায়ী। এটি তাপমাত্রা ও বিকিরণ প্রতিরোধক। স্থাপনার উপরিভাগে তাপ জমে থাকা হ্রাস করে ওপরের পৃষ্ঠকে রাখে শীতল। এ ছাড়া এই কোটের বড় গুণ হচ্ছে এটি দেয়ালে পানি জমতে দেয় না। পানি জমে থাকলেও সহজেই তা বাষ্পে পরিণত করতে সহায়তা করে।

বাইরে রং করার ক্ষেত্রে যে রং ব্যবহার করা হয়, সেটি রোদ-বৃষ্টিতে টেকসই হবে কি না সেটি মাথায় রাখতে হয়। বাড়ির বাইরের দেয়ালের জন্য এ ধরনের রঙের চাহিদাই ক্রেতাদের কাছে বেশি। এ জন্য বিভিন্ন নামে রং তৈরির প্রতিষ্ঠানগুলোর নানা রং বাজারে রয়েছে। বাড়ি বা ফ্ল্যাটটি কোন এলাকায় তৈরি হচ্ছে তার ওপর কোটের বিষয়টি নির্ভর করে। একটি বাড়িকে যেন দূর থেকেই চিহ্নিত করা যায়, সে জন্যও অনেক সময় রঙের ধরন পরিবর্তন করতে হয়। রঙের প্রকারের দিক থেকে ভেতরের ও বাইরের দেয়াল ফারাক তৈরি করে। বাড়ির ভেতরের দেয়ালে দেওয়া হয় একধরনের রং আর বাইরের দেয়াল রাঙানো হয় ভিন্ন ধরনের রঙে। বাইরের রংগুলো রোদ-বৃষ্টিবান্ধব রং এবং সহজে পরিষ্কারও করা যায়। প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোও সে অনুযায়ী পণ্য তৈরি করে।

বাইরের দেয়ালের ক্ষেত্রে রোদ-বৃষ্টিবান্ধব রং বাছাই আর পরিবেশবান্ধব রং ব্যবহার করা সবচেয়ে ভালো। সাধারণত দেয়াল রং করতে অনেক সময় প্রয়োজন হয়। রং ভালো না হলে এর গন্ধ থেকে যায় অনেক দিন। তাই রং বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। রং তৈরির ক্ষেত্রে একটি অঞ্চলের আবহাওয়াগত বৈশিষ্ট্য ভাবনায় রাখা হয়। যেহেতু বাংলাদেশে বৃষ্টি বেশি হয়, তাই সেই ধরনের রং বাছাই করা উচিত, যা এমন পরিবেশে টিকতে পারবে। এতে বাড়ির রঙের স্থায়িত্বও হবে বেশি।

শৌখিনতা নয়, প্রয়োজনের তাড়নায় বাড়িতে রং করতে হয়, তবে দীর্ঘস্থায়ী ও সৌন্দর্য রক্ষার ক্ষেত্রে চাই সঠিক নিয়ম মেনে ও সুন্দর পরিকল্পনা করে ওয়েদার কোট লাগাতে হবে।

প্রয়োজনীয় কিছু টিপস

রং করার উপযুক্ত সময়

যেহেতু বর্ষাকালে বাড়ির বাইরের অংশে রং করা যায় না সেহেতু গ্রীষ্মকালেই বাড়ির বাইরের অংশে রং করার উপযুক্ত সময়, তবে শীতকালেও করা সম্ভব। বাড়ির ভেতরের অংশে যেকোনো ঋতুতে রং করা যায়, তবে বর্ষাকালে না করাই শ্রেয়।

যা যা করণীয়

  • যেহেতু নতুন দেয়ালে সিমেন্টের পানি তিন মাস আগে ঠিকভাবে শুকায় না, সেহেতু নতুন দেয়ালের সিমেন্টের পানি শুকানোর পর এতে সিলার ব্যবহার করতে হবে। এতে দেয়ালের স্থায়িত্ব বজায় থাকে।
  • রং করার আগে পাথর দিয়ে দেয়াল ভালোভাবে ঘষে নিতে হবে।
  • পুরোনো বাইরের দেয়াল তিন বছর পরপর রং করা উচিত আর ভেতরের দেয়াল তিন-পাঁচ বছর পরপর রং করলে দেয়ালের উজ্জ¦লতা বজায় থাকে।
  • পুরোনো বা নতুন দেয়ালে রং করার আগে অবশ্যই উভয় পাশের আর্দ্রতা দেখতে হবে, প্রয়োজনে স্ক্যাবার দিয়ে ভালোভাবে চেঁছে ছত্রাক মুক্ত করে অ্যান্টিফাঙ্গাস সলিউশন যা বাজারে পাওয়া যায় এমন অ্যান্টিফাঙ্গাস কেমিকেল ব্যবহার করতে হবে।
  • বাইরের পুরোনো দেয়াল রং করার আগে ভালোভাবে ধুয়ে-ঘষে পরিষ্কার করে নিতে হবে।
  • বাইরের দেয়ালের মসৃণতা বজায় রাখতে চাইলে সিলার ব্যবহার না করে দুবার পুডিং বা পাট্টির প্রলেপ দিতে হবে।
  • খরচ কমাতে চাইলে পুডিং বা পাট্টি ব্যবহার না করে তিনবার রঙের প্রলেপ ব্যবহার করাই ভালো।
  • প্রাইমারি কোট না শুকানের আগে সেকেন্ডারি কোট ব্যবহার করা যাবে না।
  • সেকেন্ডারি কোট শুকানোর পর টারশিয়ারি বা ফাইনাল কোট দেওয়া উচিত।
  • রং করার সময় অবশ্যই এর পানি বা কেমিকেলের মিশ্রণের রেশিও তথা অনুপাত চেক করে নিতে হবে, এতে অপচয় কম হয়।
  • ফাইনাল কোট ব্যবহারের আগে অবশ্যই দেয়ালের অবাঞ্ছিত দাগ ও হাতের স্পট এবং সঠিকভাবে পুডিং লাগানো হয়েছে কি না তা দেখে নিতে হবে।
  • প্রয়োজনে লাইট মেরে দেখা যেতে পারে, তা না হলে দেয়ালে ঢেউ বা স্পট চোখে পড়বে, যা পুরো কষ্টটাকে মাটি করতে পারে।
  • কোনোমতে তাড়াহুড়ো করে কাজ করা যাবে না, এতে রঙের প্রলেপ ভালো হয় না।
  • অবশ্যই রং করার আগে প্রয়োজনে কোনো অভিজ্ঞ রং মিস্ত্রি বা ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে সমস্যা শেয়ার বা উপদেশ গ্রহণ করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
চেক এ ডেট

দরদাম

বাজারে অনেক ধরনের ওয়েদার কোট পাওয়া যায়। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় এমন কয়েকটি কোম্পানির ওয়েদার কোটের নাম ও মূল্য তালিকা:

এ ছাড়া আরএকে পেইন্টস, পেইলাক পেইন্টস, এলিট পেইন্টস ও রক্সি পেইন্টেসর রয়েছে ওয়েদার গার্ড, ওয়েদার গার্ড সিলার, ওয়ালকেয়ার। এসব ওয়েদার কোট প্রতি ১৮ লিটার গ্যালন বিক্রি হয় ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৬০০ টাকায়। আর প্রতি ৪ লিটার গ্যালন  বিক্রি হয় ৯৫০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায়। তবে কোম্পানিভেদে দামের কিছুটা তারতম্য হতে পারে। আর চাইলে নিজের পছন্দমতো কোটও তৈরি করে নেওয়া যায়। এখন ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী কোম্পানিগুলো তাদের কালার ব্যাংকের মাধ্যমে পছন্দসই ওয়োদর কোট তৈরি করে দেয়। সে ক্ষেত্রে দেয়াল এমন রঙে রাঙানো যায়, যা অন্যের সঙ্গে মেলে না। ফলে বাড়ির দেয়াল আপনার ব্যক্তিত্বকে যেমন দুর্দান্তভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারে, তেমনি রুচির সঙ্গেও মানানসই হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে দাম কিছুটা বেশি পড়বে স্বাভাবিক রঙের তুলনায়।

প্রাপ্তিস্থান

বাংলাদেশের প্রায় সব শহরেই ওয়েদার কোট পাওয়া যায়। রাজধানীর নিউমার্কেট, নবাবপুর, যাত্রাবাড়ী, দয়াগঞ্জ, ফার্মগেটসহ হার্ডওয়্যারের সব দোকানেই কোট পাওয়া যায় কমবেশি ওয়েদার।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯১তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৭।

মোহাম্মদ রবিউল্লাহ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top