Image

শৈলকুপার ঐতিহ্য শাহী মসজিদ

কালের বিবর্তনে হারায় কত না স্থাপনা; ঐতিহ্য আর জীবনাচরণ। কিন্তু কিছু স্থাপনা বা ঐতিহ্য মানুষের স্মৃতি থেকে মুছতে চায় না। আঁকড়ে থাকে আজীবন। এমনই এক স্মৃতিধন্য স্থাপনা ঝিনাইদহের শৈলকুপার ঐতিহ্যবাহী শাহি মসজিদ। অপূর্ব নির্মাণশৈলীর এ মসজিদটি দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারক আর বাহক হয়ে। মসজিদটি বাংলার সুলতানি আমলের স্থাপত্যকীর্তির অনন্য নিদর্শন। স্থাপনাটি বেশ প্রাচীন হলেও স্থানীয়রা নিজেদের মতো সংস্কার করে এর অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। কিন্তু সঠিক তত্ত্বাবধানের অভাবে নান্দনিক ও ঐতিহ্যমণ্ডিত মসজিদটি হারাতে বসেছে তার নিজস্ব রূপ। মসজিদটি বেশ কয়েকবার সংস্কার করা হলেও উপলব্ধি করা যায় এর জৌলুশ এখন অতীত।

জেলা শহর ঝিনাইদহ থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে শৈলকুপার দরগাপাড়া নামক স্থানে অবস্থান মসজিদটির। এর নির্মাণশৈলী ঘিরে এখানকার মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। অনেক পুরোনো হওয়ায় স্থানীয় ও আশপাশ এলাকার মানুষ এই মসজিদটির তাৎপর্য ভিন্ন বলেই বিশ্বাস করে। ফলে স্থানীয় ব্যক্তিরা ছাড়াও দূর-দূরান্তের ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা নামাজ আদায়ের পাশাপাশি দেখতে আসে চমৎকার এ মসজিদটি। মসজিদটি দেখলেই বোঝা যায় এটি প্রাচীন আমলে নির্মিত। উত্তর-দক্ষিণে লম্বা এ মসজিদের আয়তন ভেতরের দিকে ৯ দশমিক ৫৪ মিটার x ৫ দশমিক ৩৬ মিটার। দেয়াল প্রায় ১ দশমিক ৬৫ মিটার প্রশস্ত।

মসজিদের চার কোণে আছে চারটি মিনার বা টারেট। এগুলো গোলাকার এবং বলয় আকারের স্ফীত রেখায় (ব্যান্ড) অলংকৃত। মিনারগুলো মসজিদের অনেক ওপরে উঠে গেছে। মিনারের এই উঁচু রূপটি কি পরের না মসজিদ তৈরির সময়ের তা সঠিকভাবে বলা যায় না। তবে এ ধরনের অতি উঁচু কর্নার টারেট সাধারণত সুলতানি আমলের মসজিদে দেখা যায়। মসজিদের পূর্ব দেয়ালে দুটি করে প্রবেশপথ আছে। পূর্ব দেয়ালে আছে তিনটি প্রবেশপথ এবং উত্তর-দক্ষিণ দেয়ালে দুটি করে প্রবেশপথ আছে। পূর্ব দেয়ালের কেন্দ্রীয় প্রবেশপথের উভয় পাশে আছে একটি করে সরু মিনার এবং এগুলো অন্য মিনারের চেয়ে কিছুটা নিচে। মসজিদের কার্নিশগুলো ঈষৎ বাঁকানো।

ভেতরে পশ্চিম দেয়ালে আছে তিনটি করে মিহরাব। কেন্দ্রীয় মিহরাব পাশের দুটি থেকে আকারে বড় মসজিদের ভেতরে আছে দুটি প্রস্তরস্তম্ভ। স্তম্ভ দুটি ১ দশমিক ৫১ মিটার উঁচু। এর পরে এগুলোর ওপরে আছে ইটের তৈরি খিলান। এ দুটি স্তম্ভ ও চারপাশের দেয়ালে ওপর নির্মিত হয়েছে পাঁচটি গম্বুজ, যা আকারে বেশ ছোট। ‘শৈলকুপ শাহি মসজিদ’ নামে খ্যাত এ মসজিদটি প্রধানত ইট দিয়ে তৈরি। মসজিদের ইট বাইরে থেকে তেমন দেখা যায় না, তবে মসজিদের ভেতর থেকে দেখে বোঝা যায় ইটগুলো বেশ বড় বড়। মসজিদের এত বেশি সংস্কার করা হয়েছে যে এর আদিরূপ কী ছিল তা সঠিকভাবে নিরূপণ করা মোটেই সহজ নয়।

কেন্দ্রীয় প্রবেশপথ ও কোণের মিনারগুলো বহুলাংশেই যে পরে সৃষ্ট, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এটি যে সুলতানি আমলের মসজিদ তা সহজে ধরা পড়ে মসজিদের পূর্বদিকে অন্তত প্রাচীরবেষ্টিত আনুমানিক ১৩ দশমিক ৩৬ মিটার  ৯ দশমিক ৫০ মিটার আয়তনের একটি উন্মুক্ত স্থানে প্রাচীন আমলের একটি মাজার থাকায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এটি শাহ মোহাম্মদ আরিফ-ই-রব্বানী ওরফে আরিফ শাহর মাজার। তিনি ছিলেন সূতি নামক স্থানে। এই মাজারের কাছে আরও রয়েছে পাঁচজন আউলিয়ার মাজার।

মসজিদ বা মাজারে কোনো শিলালিপি নেই। জনশ্রুতিতে জানা যায় এবং মসজিদের নির্মাণকৌশল দেখেও অনুমান করা যায় যে এটি সুলতানি আমলে নির্মিত। স্থানীয়ভাবে শাহি মসজিদ সম্পর্কে কিছু তথ্য প্রচলিত আছে। দরবেশের ডাকনাম আরব শাহি ছিল বলে বেশির ভাগেরই মত। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দারা সবাই এক বাক্যে বলে, তার নাম ছিল আরিফ শাহ্্ বা আরিফ শাহ; সুলতান নসরাত শাহ তাকে ১০ হাজার স্বর্ণ মুদ্রা দিয়েছিলেন বলে অধিকাংশের অভিমত। তাঁর অসংখ্য নির্মাণকাজের কথাও অত্র অঞ্চলে সুবিদিত। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, যথাযথ প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত সুলতানি আমলের শাহি এ মসজিদটিকে রক্ষণাবেক্ষণ করা। যার মধ্য দিয়ে ইতিহাসকে ধরে রাখা সম্ভব, যাতে নতুন প্রজন্ম ভালোভাবে জানতে পারবে ঐহিত্যবাহী এ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সম্পর্কে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৫তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৫

Related Posts

দরাসবাড়ি মসজিদ: বাংলার সুলতানি স্থাপত্যের হারিয়ে যাওয়া গৌরব

বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন দরাসবাড়ি মসজিদ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার গৌড় অঞ্চলে অবস্থিত এই প্রাচীন মসজিদ…

ByBySarwar Alam Oct 9, 2026

কুসুম্বা মসজিদ: বাংলার মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন

বাংলাদেশের প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শনগুলোর মধ্যে কুসুম্বা মসজিদ একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার কুসুম্বা গ্রামে অবস্থিত…

সুসং দুর্গাপুরের জমিদার বাড়ি: ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনন্য স্মারক

বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের মাটিতে ছড়িয়ে আছে ইতিহাসের নানা নিদর্শন। কোথাও প্রাচীন মসজিদ, কোথাও মন্দির, আবার কোথাও জমিদার বাড়ি…

হারানো মসজিদ: ইতিহাসের এক রহস্যময় অধ্যায়

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য প্রাচীন স্থাপনা। এগুলোর কিছু আজও মানুষের চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আবার কিছু…

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

বায়তুর রউফ জামে মসজিদ স্থপতি মেরিনার অনন্য স্থাপত্যকর্ম
করিডোর
house
01
হাসপাতালে রোগী-কক্ষে ঘরোয়া আবহ দিচ্ছে কোয়ালুর নতুন ফার্নিচার
10
09
ফর্ম ফলোজ ফিকশন: ফাংশনের বাইরে ছয়টি ডিজাইনের অনুসন্ধান
প্রকৃতির দামও হিসাব করছে ভুটান: জিডিপির পাশে জিইপি