মঞ্চ

ইলেকট্রনিক মিউজিক ও স্থাপত্যের উত্তরাধুনিক ভাষার অদৃশ্য স্রোত

প্রকল্প পরিচিতি

প্রকল্পের নাম: HATCH: SUBCURRENT (Main Stage)
প্রকল্পের প্রতিষ্ঠাতা: ইছহাক সিকদার, মৈনাক আহমেদ মৃদুল ও রাশাদ ওয়াজাহাত
স্থপতি: প্রতীতি ইকবাল, মো. মাজহারুল হক ও  মৈনাক আহমেদ মৃদুল
লোকেশন: ইনানী রয়্যাল রিসোর্ট লিমিটেড, কক্সবাজার
পৃষ্ঠপোষক: Live the Moment

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের নান্দনিক মঞ্চে ইলেকট্রিক মিউজিকের তালে উদযাপিত এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। ছবি: হ্যাচ

শুরুর গল্প

গেল মাসের প্রথম সপ্তাহে কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত হলো ইলেক্ট্রনিক মিউজিক ইভেন্ট-এর ১১তম আসর। এর মূল আয়োজক হলো, হ্যাচ (Hatch)। আয়োজকদের বসবাস কক্সবাজারেই। মূলত সেকারণেই আয়োজনের লোকেশনও সমুদ্রতটে। যদিও সমুদ্রতীরের উন্মুক্ত পরিবেশ যেন এই ধরনের সঙ্গীত উৎসবকে দেয় এক ভিন্ন মাত্রা। 

এবারের আসরে মূল মঞ্চের (Main Stage) নকশার দায়িত্বে ছিলেন প্রতীতি ও মাজহারুল । সেই নকশার ভাবনা, প্রেক্ষাপট ও নির্মাণপ্রক্রিয়াকে ঘিরেই আজকের এই রচনা।

প্রতীতি ইকবাল ও মো: মাজহারুল হক, দুজনেই ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্যবিদ্যায় পড়াশোনা শেষ করে এখন পুরোদস্তুর স্থাপত্যচর্চা করছেন। একসাথে ঘরও করছেন। এভাবেই তাদের বাসার কামরাগুলো হয়ে উঠছে ডিজাইন নিয়ে আড্ডা-আলোচোনার এক সৃষ্টিশীল চারণভূমি।

পিছন থেকে দেখলে মঞ্চের পুরো সৌন্দর্যের গল্পটা আরও ভালোভাবে বোঝা যায়। ছবি: হ্যাচ

কেন ইলেকট্রনিক মিউজিকের স্টেজ আলাদা?

ইলেকট্রনিক মিউজিক কেবল শোনার বিষয় নয়। এটি অনুভবের পাশাপাশি ও শ্রোতাদেরও প্রকাশের বিষয়। উচ্চক্ষমতার সাউন্ড, আলোকসজ্জা, ডিজিটাল ভিজ্যুয়াল এবং শত শত মানুষের একসঙ্গে নাচ এসব মিলিয়ে এটি একটি immersive অভিজ্ঞতা, মানে সঙ্গীতের মাঝে ডুবে যাওয়ার মতো আবহ তৈরি করে। তাই এই ধরনের আয়োজনের জন্য উন্মুক্ত জায়গা গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রতীর, পাহাড় কিংবা খোলা প্রান্তরের মতো বিস্তৃত পরিবেশ শব্দ, আলো এবং মানুষের চলাচলকে স্বাভাবিকভাবে ধারণ করতে পারে।

এই কারণেই ইলেকট্রনিক মিউজিক উৎসবে স্টেজ শিল্পীদের দাঁড়ানোর স্থানের সাথে সাথে পুরো উৎসবের সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে। একটি সফল স্টেজ দর্শকের মনে স্মৃতি তৈরি করে, স্থানকে নতুনভাবে চেনায় এবং সঙ্গীতের অভিজ্ঞতাকে দৃশ্যমান করে তোলে।

পানির স্রোত
পানির স্রোত থেকে শব্দের স্রোত, আর সেই অনুভূতিরই শেষ প্রকাশ ডিজাইনে। ছবি: হ্যাচ

ডিজাইনের অন্তঃস্রোত

এবারের থিম ছিল HATCH: SUBCURRENT। Subcurrent অর্থ, সমুদ্রের দৃশ্যমান ঢেউয়ের নিচে প্রবাহিত অদৃশ্য স্রোত। ঢেউকে আমরা দেখি, কিন্তু তাকে চালিত করা শক্তিকে দেখতে পাই না। আয়োজকদেরও মনে হয়েছে এই ধারণাটিই ইলেকট্রনিক মিউজিকের সঙ্গে মিলে যায়। কারণ, শ্রোতা হয়তো প্রথমে বিট শুনতে পান, কিন্তু সেই বিটের নিচে নিরন্তর প্রবাহিত হতে থাকে বেস, কম্পন ও অদৃশ্য সাউন্ড লেয়ার।

এই ধারণাকেই দৃশ্যমান রূপ দিতে চেয়েছেন প্রতীতি ও মাজহারুল। তাদের ভাষায়, এমন একটি কাঠামো তৈরি করার চেষ্টা ছিল, যা নিজেই নিজেকে ভেতরের দিকে টেনে নিচ্ছে… একটি টর্নেডোর মতো। আবার একই সঙ্গে যা দেখতে একটি বিশাল সাউন্ড সিস্টেমের কম্পনের দৃশ্যমান চেহারার মতোও বটে।

সাবকারেন্টের গতিময়তা, ট্রাসের কাঠামো আর মশারির আবরণ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক সুরিয়াল অভিজ্ঞতা। ছবি: হ্যাচ

ডিজাইন সিদ্ধান্ত

ডিজাইনে শুরুর দিকে ভাবা হয়েছিল ছিল ফ্লুইড কার্ভ ব্যবহার করে সমুদ্রের নিচের গুহার (underwater cave) মতো লেয়ারড একটা রূপ তৈরি করা। যার কেন্দ্রে ছিল একাধিক বৃত্তাকার রিং। পুরো কম্পোজিশনটি বাইরে থেকে ভেতরের দিকে ধাবিত হওয়ার অনুভূতি তৈরি করছিল। কিন্তু ডিজাইন এগোতে থাকলে সেই জ্যামিতিক রূপ বদলে যায়। শেষ পর্যন্ত এটি এমন এক তরল, প্রবাহমান আকারে রূপ নেয়, যা কখনো সমুদ্রের ঢেউ, কখনো আবার পুরোনো গ্রামোফোনের কথা মনে করিয়ে দেয়।

পুরো ডিজাইনে প্রাধান্য পেয়েছে চিকন স্টিলের রড-এর প্রয়োগ। আগের আয়োজনের উপকরণ নতুন আকারে ফিরে এসেছে এই স্টেজে। সীমিত বাজেটের মধ্যেও নতুন নান্দনিকতা তৈরির এই চর্চা তাদের ডিজাইন দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

প্রায় ২৫ ফুট উঁচু এই মঞ্চ নির্মাণের নেপথ্যের নানা ধাপ। ছবি: হ্যাচ

নির্মাণের গল্প

প্রায় ২৫ ফিট উচ্চতা ও ২৩ফিট প্রশস্ত এই মঞ্চ মাত্র তিন দিনে নির্মাণ করা হয়েছে। আগে থেকে প্রিন্ট করা জোড়া লাগানো একাধিক কাগজের উপর রেখে হাতে হাতে বাঁকানো হয়েছে প্রতিটি রড। পরে ট্রাস স্ট্রাকচারের সাহায্যে সেগুলোকে বহুস্তরে একত্র করে দাঁড় করানো হয়েছে। 

সবচেয়ে অভিনব সিদ্ধান্ত ছিল কাঠামো ঢাকতে কাপড়ের পরিবর্তে মশারির ব্যবহার। সমুদ্রতীরের তীব্র বাতাস কাপড়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করত। তাতে করে চিকন রডের হাল্কা এই কাঠামোটি দাঁড়াতে পারত না। মশারির সূক্ষ্ম জালের মধ্য দিয়ে বাতাস সহজেই চলাচল করতে পারে। ফলে কাঠামোও নিরাপদ থাকে। একই সঙ্গে আলো, ছায়া ও আকাশের দৃশ্য মিলে তৈরি হয়েছে এক ভিন্নধর্মী ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতা।

নির্মাণের সময় কিছু অংশে স্থপতি মাজহারুল নিজেই উঁচুতে উঠে কাপড় লাগানোর কাজ করেছেন। শুরুতে অচেনা এই ডিজাইন নিয়ে সংশয়ে থাকলেও, কাজ শেষ হওয়ার পর নির্মাণ শ্রমিকেরাও এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন।

মশারির জালির ভেতর দিয়ে দিন আর রাতের আলো একসঙ্গে ধরা দিয়েছে। ছবি: হ্যাচ

শেষ কথা

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, সীমিত বাজেট, পুনর্ব্যবহৃত উপকরণ এবং অপ্রচলিত নির্মাণ পদ্ধতিকে কাজে লাগিয়ে স্থপতিরা দেখিয়েছেন সৃজনশীল ধারণাই একটি প্রকল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি। এই স্টেজ তাই সমসাময়িক বাংলাদেশের তরুণ স্থপতিদের চিন্তা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং নতুন স্থাপত্যভাষা নির্মাণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

বাদিকে স্থপতি প্রতীতি ইকবাল ও স্থপতি মো. মাজহারুল হক। ডানদিকে হ্যাচ-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও স্থপতি মৈনাক আহমেদ মৃদুল।

Related Posts

ওডিসি’র ম্যাট ডেমনের ৩৪ মিলিয়ন ডলারের আবাসন সাম্রাজ্য

হলিউডের শীর্ষ তারকাদের পছন্দের রিয়েল এস্টেট বলতেই সাধারণত চোখে ভেসে ওঠে বেভারলি হিলসের চোখ-ধাঁধানো বিশাল ম্যানশন বা ম্যানহাটনের…

নদীই যখন পথ: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পানিপথ-নির্ভর নগর স্থাপত্য

বিংশ শতাব্দী জুড়ে আধুনিক স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনা মূলত রাস্তাকেন্দ্রিক চিন্তাধারায় গড়ে উঠেছে—সড়কের বিন্যাস, মোড় ও ফুটপাতমুখী দালানকোঠাই…

ফ্র্যাঙ্ক গেহরির শেষ সুর ‘দার আল ফুনুন’ 

স্থাপত্যের জগতে যার নাম মানেই বাঁকানো ধাতব দেয়াল, ঢেউয়ের মতো কাঠামো আর প্রথাগত নিয়ম ভাঙার সাহস – সেই…

ছোট বাড়িও দেখতে কেন বড় দেখায়?

পাহাড়ের চূড়ায় প্রতিবেশী বাড়িগুলো ছাড়িয়ে কিছুটা এগিয়ে থাকা নর্থ ক্যারোলাইনের একটি আধুনিক বাড়ি। এই বাড়িটি ব্লু রিজ পর্বতমালা…

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

solar
12
ব্রাজিলের বেলেম শহরে খাল ঘিরে গড়ে উঠল এক নতুন সবুজ করিডোর
Ghost City
গ্রিসের ক্রিটে পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা এক তীরাকৃতি বাড়ি
চীনের যে স্থাপত্য নকশা বৈশ্বিক পরিচয়কে একসূত্রে বেধেঁছে
ওডিসি’র ম্যাট ডেমনের ৩৪ মিলিয়ন ডলারের আবাসন সাম্রাজ্য
নদীই যখন পথ: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পানিপথ-নির্ভর নগর স্থাপত্য
আলোড়ন তুলেছে আবুধাবির প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘরের নতুন ছবিগুলো