বিশ শতকের ষাটের দশকের শেষভাগে ফিনল্যান্ডের স্থপতি মাত্তি সুরোনেন যে উড়ন্ত সসারসদৃশ বাড়িটি ডিজাইন করেছিলেন, তা স্থাপত্যের ইতিহাসে “স্পেস-এজ” ধারার অন্যতম আইকনিক নিদর্শন হয়ে আছে।
দীর্ঘ কয়েক দশক পর সেই ফুটুরো হাউসের একটি নতুন সংস্করণ তৈরি হয়েছে। যা সম্প্রতি হেলসিঙ্কি ডিজাইন উইকে ফিনিশ ডিজাইন ব্র্যান্ড মারিমেক্কোর ইন্টেরিয়র সজ্জায় প্রদর্শিত হয়। আকর্ষণীয় বিষয় হলো, এই পুনর্জন্মের সূত্রপাত ঘটেছিল একটি সাধারণ ফেসবুক পোস্ট থেকে।

নকশার মূল ধারণা
মূলত একটি বহনযোগ্য স্কি-কেবিন হিসেবে ১৯৬৮ সালে ফুটুরো হাউসের নকশা করেন সুরোনেন। ফাইবারগ্লাস দিয়ে তৈরি প্লাস্টিকের এই বাড়িটিকে একসময় ব্রিটিশ সমালোচক জাস্টিন ম্যাকগুয়ার্ক বলেছিলেন, এটাই আবাসনের সবচেয়ে কাছাকাছি চলে আসা প্রোডাক্ট ডিজাইনের উদাহরণ।
প্রচুর সংখ্যায় তৈরির পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সারা বিশ্বে মাত্র একশোরও কম ফুটুরো হাউস বানানো হয়েছিল। ১৯৭৩ সালে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার পর প্লাস্টিকের দামও অনেক বেড়ে যায়, ফলে এই বাড়ি তৈরি বন্ধ হয়ে যায়। এখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৬০টি ফুটুরো হাউস বিভিন্ন অবস্থায় টিকে আছে বলে ধারণা করা হয়।

একটি ফেসবুক পোস্ট থেকে শুরু হওয়া যাত্রা
এই পুনরুজ্জীবন প্রকল্পের শুরু ২০২৪ সালে, যখন পুরনো বাড়ি সংরক্ষণে অভিজ্ঞ স্থপতি ইয়ান ভান ডাইক এক বন্ধুর মাধ্যমে ফেসবুকে একটি অদ্ভুত পোস্টের খোঁজ পান। ফিনিশ প্রতিষ্ঠান এক্সেল কম্পোজিটসের এক কর্মকর্তা তখন ফুটুরো হাউসের আসল ছাঁচ বিক্রি করছিলেন। প্রথমে ফুটুরো সম্পর্কে তেমন ধারণা না থাকলেও ইতিহাস জেনে ভান ডাইক আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
ফিনল্যান্ডের পলিকেম প্রতিষ্ঠান মূলত কুড়িটি ফুটুরো হাউস তৈরি করেছিল। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে পলিকেম দেউলিয়া হলে এক্সেল তাদের সম্পদসহ ফুটুরোর ছাঁচ কিনে নেয়। এই সময় সুরোনেনের জন্য কঠিন ছিল। শোনা যায় তিনি নিজের বাড়িও হারিয়েছিলেন। এরপর বহু বছর ছাঁচগুলো এক গুদাম থেকে আরেক গুদামে ঘুরে বেড়ায়, কোনো কাজে লাগেনি।
সুরোনেন মারা যান ২০১৩ সালে। প্রকল্প এগোতে ভান ডাইক কয়েক মাস ধরে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন, কারণ অনুমতি ছাড়া কাজ সম্ভব ছিল না। আগে দুর্বল প্রস্তাব পাওয়ায় পরিবার প্রথমে রাজি হয়নি, তবে এক্সেলের কর্মকর্তা ইউর্কি আহোর সাহায্যে শেষে তারা সম্মত হন। দুর্ভাগ্যবশত এর কিছুদিন পরই আহো মারা যান।

ছাঁচ পুনরুদ্ধার ও নির্মাণ প্রক্রিয়া
২০২৫ সালের মে মাসে ভান ডাইক সরাসরি ছাঁচগুলো দেখতে যান। তখন প্রায় ষাট বছরের পুরনো এই ছাঁচ একটি খোলা মাঠে অযত্নে পড়ে ছিল। ঘাস-শ্যাওলায় ঢাকা, দেখতে বেশ জীর্ণ। তবু পুনরুদ্ধারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফিনিশ প্লাস্টিক প্রতিষ্ঠান একিন মুওভির সহায়তায় ছাঁচ মেরামত করে সুরোনেনের মূল নকশা অনুযায়ী প্যানেল নতুন করে ঢালাই করা হয়। এবং পুরনো রং-এর নমুনা মিলিয়ে একই রং ব্যবহার করা হয়েছে।
কাজটা ভাবনার চেয়ে জটিল প্রমাণিত হয়। আধুনিক মোল্ডিংয়ে দুই অংশের ছাঁচ দিয়ে সহজে বাতাস বের করা যায়। কিন্তু সুরোনেনের ছাঁচ ছিল এক অংশের, তাই বাতাসের বুদবুদ হাতে দূর করতে হতো। একটি প্যানেল ঢালাই করতেই লাগত কয়েক দিন। ভান ডাইকের ধারণা, এই শ্রমসাধ্য কাজই সম্ভবত ১৯৭০-এর দশকে ফুটুরোর ব্যর্থতার বড় কারণ ছিল।
তবে সুখবরও ছিল, এক্সেলের ছাঁচের মধ্যে সুরোনেনের নকশা করা কিছু আসবাব, যেমন বিল্ট-ইন লাউঞ্জ চেয়ার, ডাইনিং টেবিল ও অরবিট চেয়ারও পাওয়া যায়, যেগুলোও নতুন করে তৈরি করা হয়েছে। পুরো কাজ শেষ হতে সময় লেগেছে পাঁচ মাস, আর মোট খরচ পড়েছে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার ইউরো। ভান ডাইক আশা করছেন, পরের বার খরচ ৩ লাখ ইউরোর মধ্যে নামিয়ে আনা যাবে।

হেলসিঙ্কিতে নতুন প্রদর্শনী
চলতি বছরের জুনের শেষে ফিনল্যান্ডে তৈরি ২১তম ফুটুরো হাউসটি সম্পূর্ণ হয়। যা কয়েক ভাগে ভেঙে কাইসানিয়েমি বোটানিক্যাল গার্ডেনে হেলসিঙ্কি ডিজাইন উইকের প্রদর্শনস্থলে নিয়ে গিয়ে পুনরায় জোড়া লাগানো হয়। এর অভ্যন্তরীণ সজ্জার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয় মারিমেক্কোকে।
প্রতিষ্ঠানটি খোলা জায়গাটিকে তিন ভাগে ভাগ করে: বিশ্রাম-ঘুমের জায়গা, খাওয়া-কাজের জায়গা এবং একটি ছোট কিচেনেট। ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর রেবেকা বে জানান, তারা মূলত ভবিষ্যতের জীবনযাত্রার একটি প্রস্তাবনা তৈরি করতে চেয়েছিলেন আজকের দিনে কেউ ফুটুরো হাউসে কীভাবে থাকবে, সেটাই ছিল আগ্রহের বিষয়। তার মতে, ছোট পরিসরে জীবনযাপনের প্রবণতার সঙ্গে এই ধারণা সংগতিপূর্ণ।
ইন্টেরিয়রে মারিমেক্কোর পণ্য সাজানো হয় স্বচ্ছ পারস্পেক্স শেলফে, যা একইসঙ্গে ঘর বিভাজক হিসেবেও কাজ করে। ডেনিশ টেক্সটাইল শিল্পী ভিবেকে রোহল্যান্ডের করা ডোরাকাটা প্রিন্ট ব্যবহৃত হয়েছে আসবাবের আপহোলস্ট্রিতে। বে জানান, ১৯৬৮ সালের পুরনো আর্কাইভে ফিরে না গিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে হাল আমলের নতুন টেক্সটাইল নকশা বেছে নেওয়া হয়েছে, যাতে প্রস্তাবনাটি স্পর্শযোগ্য ও বসবাসযোগ্য মনে হয়।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও সীমাবদ্ধতা
ডিজাইন উইক শেষ হওয়ার পর এখন কাঠামোটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা চলছে। ভান ডাইক চান এটি ফিনল্যান্ডেই জনসাধারণের জন্য প্রদর্শিত থাকুক, আর বে চান এটি গ্রামাঞ্চলে কারও গ্রীষ্মকালীন কটেজ হিসেবে ব্যবহৃত হোক। ভান ডাইক ভবিষ্যতেও অর্ডার অনুযায়ী নতুন ফুটুরো তৈরির পরিকল্পনা করছেন, তবে সংখ্যায় সীমিত থাকবে। তার হিসাবে, পুনরুদ্ধার করা ছাঁচ দিয়ে আর মাত্র চার থেকে ছয়টি ফুটুরো তৈরি সম্ভব, এরপর ছাঁচ ধ্বংস করে দেওয়া হবে. আর সেখানেই শেষ হবে মূল ফুটুরোর অধ্যায়।
নকশার দিক থেকে সুরোনেন ফুটুরো হাউসকে দ্রুত সংযোজনযোগ্য, দ্রুত গরম করা যায় এবং দুর্গম ভূখণ্ডের উপযোগী করে তৈরি করেছিলেন। তবে জায়গার সংকীর্ণতা, পরিবহনের জটিলতা ও দুর্বল তাপ নিরোধনের কারণে ২০২৬ সালে এসে এর সুস্পষ্ট কোনো ব্যবহারিক প্রয়োগ নেই। তবু ভান ডাইকের মতে, ফুটুরো নিছক খেয়ালিপনা নয়। এটি যুদ্ধোত্তর সময়ের আশাবাদ ও সৃজনশীলতার প্রতীক, যে চেতনা থেকে ১৯৫১ সালে মারিমেক্কোরও জন্ম। তিনি মনে করেন, ফুটুরোকে ফিনিশ ডিজাইনের আইকন হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, যদিও উৎপাদনের সময়ে তা হয়নি।

একটি সাধারণ ফেসবুক পোস্ট কীভাবে প্রায় বিস্মৃত এক স্থাপত্য-আইকনকে নতুন জীবন দিতে পারে, ফুটুরো হাউসের পুনর্জন্ম তারই বাস্তব দৃষ্টান্ত। জীর্ণ ছাঁচ, পারিবারিক সংশয় ও শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়া পেরিয়ে হেলসিঙ্কির বোটানিক্যাল গার্ডেনে দাঁড়ানো এই সসার-আকৃতির বাড়িটি প্রমাণ করে, ষাটের দশকের স্পেস-এজ আশাবাদ আজও সমসাময়িক ডিজাইন-ভাবনার সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যেতে সক্ষম। সীমিত সংখ্যায় হলেও ভবিষ্যতে আরও কিছু ফুটুরো হাউস তৈরির সম্ভাবনা এই ঐতিহাসিক নকশাকে আরও কিছুদিন বাঁচিয়ে রাখবে, যদিও একসময় মূল ছাঁচগুলোর কার্যকাল ফুরিয়ে যাবে।
তথ্যসূত্র:
ডিজেইন
















