আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে, সমাজতত্ত্বের নিয়মে তা নিয়েই আমাদের পরিবেশ। এই পরিবেশের একটি অংশ স্থাপত্য। একইভাবে স্থাপত্যের একটি অংশ পরিবেশ। স্থাপত্য তাই পরিবেশকে প্রভাবিত করে আবার একই সঙ্গে পরিবেশ কর্তৃক প্রভাবিত হয়। স্থপতি তার চর্চাকল্পে পরিবেশকে মাথায় রাখেন প্রভাবক হিসেবে, একই সঙ্গে প্রভাবিত প্রতিবেশ হিসেবে।
স্থাপত্যের সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্ককে কয়েকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। যেমন খুব সাধারণভাবে স্থাপত্যের বহিঃপ্রকাশ যদি ধরা হয় একটি ছোট্ট থাকার ঘর বা বাসস্থান, তাহলে সে বাড়িতে একটি চলাচলের পথ করে নিতে হয়। একটি বহির্দেয়াল করতে হয়। বাড়ির আশপাশে গাছপালা থাকে, পাখি থাকে, থাকে পানির আধার। বাড়িতে এক বা একাধিক মানুষ বাস করে। স্থাপত্য চর্চার ধরন এই সম্পর্ককে নিবিড় করতে পারে আবার বিরক্তিকর করে তুলতে পারে। এর পাশাপাশি স্থাপত্য ও পরিবেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি একটি পরোক্ষ সম্পর্ক আছে। এই সম্পর্কটি মানবিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, এমনকি অর্থনৈতিকও হতে পারে। যেমন শত বছরের বিবর্তনে আর সময়ের পরিক্রমায় একটি গ্রামীণ জনপদ গড়ে ওঠে, যার সূচনা বিন্দু হয়তো একটি পুল কিংবা একটি স্কুলঘর। অথবা এর বিপরীতমুখী উদাহরণ হতে পারে এমন যে একটি মার্কেট ভবন বা অফিস ভবন তৈরির প্রভাবে আস্তে আস্তে মরে গেল রাস্তার পাশে একটি প্রাচীন গাছ এবং সেই সঙ্গে ছায়া ঢাকা একটি সাংস্কৃতিক আড্ডার স্থান ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়ে গেল। অথবা দুই ভবনের আড়ালে পড়ে গিয়ে ওটি হয়ে উঠল অসামাজিক কাজের কেন্দ্রস্থল। পরিবেশের সঙ্গে স্থাপত্যের পারস্পরিক সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং এই দ্বিবিধ সম্পর্কের দায়বদ্ধতা থেকে ‘পরিবেশবান্ধব’ শব্দের জন্ম হয়। গ্রিন, সাসটেইনেবল কিংবা ইকোলজির চেয়েও এটি আক্ষরিক অর্থে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। যার সুফল অথবা কুফল আমরা সরাসরি অনুভব করি আমাদের জীবনকালেই।
স্থাপত্যের পরিবেশবান্ধবতা ব্যাখ্যা করতে সোজা কথায় বলা যায়, স্থাপত্য হবে এমন যে পরিবেশের সরাসরি কোনো ক্ষতি করবে না, পরিবেশের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করবে না এবং চূড়ান্তভাবে পরিবেশের সব ধরনের সুবিধাকে সর্বোচ্চ মাত্রায় ব্যবহার করতে সুযোগ তৈরি করবে। প্রতিটি স্থাপনা তৈরির সময় পরিবেশের ওপর একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়। যেমন এর জন্য কিছু গাছপালা কাটা হতে পারে, মাটির ক্ষয় হতে পারে। পাখি, সরীসৃপ এবং পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন অণুজীবের স্বাভাবিক বাসস্থানের ক্ষতি হতে পারে, বিভিন্ন নির্মাণ উপকরণ অথবা এদের নষ্ট অংশের কারণে পরিবেশদূষণ হতে পারে। নির্মাণকাজের কারণে শব্দদূষণ, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ইত্যাদি সমস্যার উদ্ভব হতে পারে। বহুদূর থেকে নির্মাণ উপকরণ আনতে গিয়ে যে গাড়ি ব্যবহার হচ্ছে, তাতে যেমন জ্বালানি খরচ হচ্ছে তেমনি কার্বন নিঃসরণ বেড়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থের আনাগোনা বাড়ছে। পরিবেশবান্ধব স্থাপত্য এ ধরনের নেতিবাচক প্রভাব তৈরির কারণগুলো সর্বনিম্ন মাত্রায় কমিয়ে আনবে। পরিবেশবান্ধব স্থাপনা একই সঙ্গে অনেক বেশি সামাজিক প্রয়োজন পূরণ করবে। সংস্কৃতি, অর্থনীতি, মানুষের জীবনধারার সঙ্গে স্থাপত্যের যে নিবিড় সম্পর্ক আছে, তাকে ধরে রাখাও পরিবেশবান্ধব নীতির একটি অংশ।
আমরা প্রকৃতি ও পরিবেশ থেকে অনেক কিছু গ্রহণ করছি। আমাদের এই প্রাকৃতিক সম্পদের উৎস ঠিক রাখতে হবে যেন পৃথিবী বেশি দিন বাসযোগ্য এবং সুষম থাকে। কিন্তু নির্মাণ ও উন্নয়নের পরিকল্পনা করতে গিয়ে আমরা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস ডেকে না আনি। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য সবুজ দরকার কিন্তু আমরা অকাতরে সবুজ হারাচ্ছি। বিশুদ্ধ বায়ু, নির্মল পরিবেশ আমাদের বেঁচে থাকার শর্ত। কিন্তু আমরা ক্রমেই এগুলোকে নষ্ট করছি।
পরিবেশবান্ধব হওয়ার জন্য কী করতে হবে! না, তেমন বাড়তি কিছু করার নেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সচেতনভাবে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কাজ এবং উপাদান পরিহার। যেমন বিশ্বব্যাপী এবং আমাদের দেশেও একসময় ছাউনি তৈরিতে অ্যাসবেস্টস (প্রাকৃতিক ছয়টি সিলিকেট খনিজ সেট) ব্যবহার হতো। অ্যাসবেস্টস পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এটা থেকে সূক্ষ্ম একধরনের আঁশ বাতাসে ভেসে বেড়ায়, যা ব্যবহারকারীর অ্যাজমা তৈরি করে এবং তা মাটিতে পুরোপুরি নিঃশেষ হতে প্রায় শতবর্ষ সময় নেয়। অ্যাসবেস্টসের পরিবর্তে তাপ নিরোধক ছাদ করার জন্য আরও অনেক বস্তু আছে, যা পরিবেশবান্ধব। আবার যেমন কংক্রিট একটি অপরিহার্য উপাদান, যা আপাত দৃষ্টিতে নিরাপদ কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এটিকে পরিবেশবান্ধব উপকরণ বলা যায় না। তৈরি, ব্যবহার কিংবা ক্ষয় কোনো ক্ষেত্রেই নয়। একে ব্যবহার করতে প্রচুর পানি এবং এনার্জি প্রয়োজন হয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবছর সাত হাজার ঘনমিটার কংক্রিট ব্যবহার হয় এবং কার্বন নিঃসরণের মাধ্যমে বিশ্বে তাপমাত্রা ৫ শতাংশ বৃদ্ধিতে কংক্রিট ভূমিকা রাখে। এখন কংক্রিটকে আরও পরিবেশবান্ধব করার জন্য বিজ্ঞানীরা বিভিন্নভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। জৈব কংক্রিটের একটি পরীক্ষামূলক ফলাফল। এভাবে প্রতিটি নির্মাণ উপকরণ পছন্দের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব উপকরণকে প্রাধান্য দিতে পারলে পুরো স্থাপনা এবং নির্মাণকর্মটি পরিবেশবান্ধব হওয়ার সুযোগ থাকবে।
পরিবেশবান্ধব নির্মাণের মূল নীতি হচ্ছে দুটি। প্রথমত, নির্মাণকালে পরিবেশ সংরক্ষণ করবে। আমরা যদি কোথাও বাড়ি নির্মাণের সময় বালু উন্মুক্ত অবস্থায় রেখে দিই, তাহলে এই বালু উড়ে গিয়ে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়বে এবং অপরের ক্ষতি করবে। অথবা বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে কোনো মুক্ত জলাশয়ে পড়ে জলাশয় ভরাট করে দেবে। আবার যদি কোনো বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থসংবলিত রং ব্যবহার করি, তাহলে রং করার সময় রংমিস্ত্রিরা সেই বিষাক্ত গ্যাসে অসুস্থ হয়ে যেতে পারে। সরাসরি অসুস্থ না হলেও বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে সেই গ্যাস পরিবেশ বিনষ্টের কারণ হতে পারে। দ্বিতীয়ত, পরিবেশবান্ধব নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার। যেসব উপাদান সহজে মাটির সঙ্গে মিশে যেতে পারে, তার ব্যবহার। যেমন প্লাস্টিক সহজে মাটির সঙ্গে মিশে যায় না কিন্তু কাঠ সহজে মাটিতে মিশে যায়। সুতরাং একটি স্থাপত্যের শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য বা ব্যবহারিক আনন্দ বিবেচনা করলেই এর শেষ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কিংবা এর জীবনচক্রের যেকোনো একটা সময়ে এটি কোনোভাবেই পরিবেশের ক্ষতি করতে পারবে না, এটি মাথায় রাখতে হবে।
স্থাপত্যের পরিবেশবান্ধবতা নির্ভর করে স্থপতির সচেতনতা এবং দায়িত্বশীলতার ওপর। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অনেক ছোট ছোট সিদ্ধান্ত পরিবেশবান্ধব হওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। যেমন একদম শুরুতেই এমনভাবে জায়গা নির্বাচন করতে হবে, উত্তর-দক্ষিণের বায়ু চলাচল-সুবিধা নেওয়া যায়। পশ্চিমের সূর্যের আলো থেকে যতটা সম্ভব ছায়া তৈরি করা যায়। মাস্টারপ্ল্যান করার সময় বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান যেমন গাছপালা, জলাশয়, মাটির বিভিন্ন স্তর, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন। ডিজাইন এবং আন্তনকশা এমন হবে যেন আলো এবং বাতাসের আধিক্য থাকে। চতুর্দিকের খোলা জায়গাগুলো হবে পরিচ্ছন্ন এবং সবুজে আবৃত। যথাযথ এবং পর্যাপ্ত স্যুয়ারেজ এবং ড্রেনেজ সিস্টেম পুরো প্রকল্প ঘিরে থাকবে। সহজলভ্য প্রাকৃতিক উপায়, উপকরণ এবং সুবিধাগুলো যত বেশি সম্ভব ব্যবহার করবে, যাতে কৃত্রিম উপায় উপকরণের ওপর কম নির্ভর করতে হয়। যেমন আমাদের দিনের কাজের জন্য প্রচুর আলোর দরকার হয়। দিনের বেলা প্রাকৃতিক আলো দিয়ে সহজেই চাহিদা পূরণ করতে পারি। কিন্তু আমাদের অসচেতনতায়, কিংবা ডিজাইন ত্রুটির কারণে অথবা কিছু নিয়মনীতি না মেনে চলার কারণে যদি বাতি জ্বালিয়ে সে আলোর ব্যবস্থা করতে হয়, তাহলে আমরা প্রকৃতির সহজলভ্য সুবিধা গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছি।
মনে রাখতে হবে, শতভাগ পরিবেশবান্ধব হওয়া অতটা সহজ নয় এবং দরকারও নেই। কিছু পরিবর্তন সয়ে নেওয়ার ক্ষমতা পরিবেশের আছে। তবে ন্যূনতম করণীয় কিছু কাজ আমাদের অবশ্যই করতে হবে।
পরিবেশবান্ধব করার জন্য নিত্যনতুন গবেষণা এবং উদ্ভাবনের দরকার আছে। স্থপতি, প্রকৌশলী ও নির্মাতারা এখন সর্বত্রই পরিবেশবান্ধব নির্মাণ উপকরণ ব্যবহারে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। সামান্য একটু আইডিয়ার পরিবর্তন এনে অথবা বাহ্যিক সৌন্দর্যে একটু ছাড় দিয়ে হলেও স্থপতি গুরুত্বারোপ করতে পারেন পরিবেশবান্ধব হওয়ার জন্য। যেমন আমাদের দেশে মাটি একটি সাধারণ এবং সহজলভ্য উপাদান। স্থাপত্য চর্চায় এই মাটির সহজাত সৌন্দর্যকে মাথায় নিয়ে ইট বা কংক্রিটের বদলে প্রক্রিয়াজাত মাটি দিয়ে ডিজাইন করা যায়। বাড়ির সামনে থাকা এক চিলতে উঠোনকে চকচকে টাইলস দিয়ে ঢেকে না দিয়ে সবুজ উদ্যান করা যায় কিংবা প্রয়োজন হলে পানি শোষক উপাদান দিয়ে ঢেকে দেওয়া যায়। তাতে সৌন্দর্যের কোনো কমতি হলো কি না তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে এই চিন্তার ফলে অহেতুক উত্তপ্ত হওয়া থেকে আঙিনা রক্ষা পাবে। ভবনের রং করার সময় পরিবেশ-সহায়ক বিবেচনা করে রঙের সিলেকশন করা যেতে পারে।
স্থপতির এবং নির্মাতাÑ উভয়ের দায়বদ্ধতা হচ্ছে বিষয়গুলো মাথায় রেখে নির্মাণকাজ ও ডিজাইন আইডিয়া নির্বাচন করা। নির্মিত স্থাপনা কিংবা নির্মিতব্য স্থাপত্যকর্ম পরিবেশের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তার একটি সমীক্ষা থাকা উচিত। এই প্রভাব হয়ে থাকে দীর্ঘমেয়াদি। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, ইত্যাদি ক্ষতিগুলো দৃশ্যমান নয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে অনেক বেশি ভয়ংকর। যেমন একজন স্থপতি বা নগর পরিকল্পনাবিদের বিবেচনায় দুর্বলতা বা অসম্পূর্ণতা থাকার কারণে একটি জনবহুল স্পট আস্তে আস্তে নীরব হয়ে গেল, একসময় ওটা অপরাধীদের কেন্দ্রস্থল হয়ে গেল। তাহলে এই সিদ্ধান্ত প্রকৃত অর্থে পরিবেশের একটি বড় ধরনের ক্ষতি করে দিল। স্থপতি চাইলে কয়েকটি গাছকে বাঁচিয়ে তার ডিজাইন সাজাতে পারেন। রোদের তাপ থেকে বাঁচার জন্য গাছকেই ব্যবহার করতে পারেন। একটুখানি পতিত জায়গাকে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু বানিয়ে দিতে পারেন। স্থানীয় পরিত্যক্ত কোনো জিনিসকে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহার করে পরিবেশরক্ষার পাশাপাশি মানুষের জন্য বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্য উপহার দিতে পারেন। আর তাই পরিবেশ সংরক্ষণকে সত্যিকার অর্থে নতুন প্রজন্মের অতি জরুরি স্লোগান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬২তম সংখ্যা, জুন ২০১৫