কার্যকরী সাবমেরিন ক্যাবল
ভূমিকম্প অত্যন্ত ভয়াবহ এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ। পৃথিবীতে সাতটি বড় মহাদেশীয় টেকটনিক প্লেটের পাশাপাশি রয়েছে ছোট ছোট অসংখ্য টেকটনিক প্লেট। এই প্লেটগুলো সমভাবে একে অপরের দিকে বা বিপরীত দিকে চলতে থাকে, তখন প্লেটগুলোর সংযোগস্থল বরাবর প্রচুর পরিমাণে শক্তি সঞ্চিত হয়ে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। প্রকৃতির রূপ পরিবর্তন, ঋতু পরিবর্তন, কৃত্রিম উপগ্রহের সাহায্য ছাড়াও নানাভাবে অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস পাওয়া সম্ভব। কিন্তু ভূমিকম্পের পূর্বাভাস পাওয়ার উপায় এখনো অনাবিষ্কৃত। যদিও বিজ্ঞানীরা সিসমোগ্রাফ যন্ত্রের মাধ্যমে ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল, মাত্রা ও সময়সীমা নির্ধারণ করে থাকে। পৃথিবীর ভূভাগে অনেক সিসমোগ্রাফ যন্ত্র বসানো রয়েছে। তবে সমুদ্রের নিচে রয়েছে ভূমিকম্প মাপক সেন্সরের ঘাটতি। অথচ পৃথিবীর অধিকাংশ অঞ্চলই পানির নিচে। সমুদ্রে প্রতিনিয়তই ঘটছে ছোট-বড়-মাঝারি আকারের ভূমিকম্প। বিশাল এই জলরাশির নিচে কী হচ্ছে, তা ঠিকমতো পর্যবেক্ষণ করা বেশ কঠিন। তবে কঠিন হলেও যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবরেটরি (এনপিএল) গবেষক জিউসেপ্পি মাররা ও তাঁর গবেষক দল এক অভিনব পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন ভূমিকম্প শনাক্তে। আর তা হচ্ছে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা সাবমেরিন ক্যাবলে সেন্সর স্থাপন।
সাবমেরিন ক্যাবল নেটওয়ার্ক বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট সেবার কাজে ব্যবহৃত হলেও তা ভূমিকম্প শনাক্তে কার্যকর উপায় হতে পারে এ ধারণাটি ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবরেটরির গবেষকরাই প্রথমবারের মতন বিশ্ববাসীর সামনে আনেন। গবেষকদের এ গবেষণা-সংক্রান্ত নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে ‘সায়েন্স’ সাময়িকীতে। ওই নিবন্ধে বলা হয়েছে, সাগরতলে স্থাপিত ১০ লাখ কিলোমিটার ফাইবার-অপটিক ক্যাবল নেটওয়ার্ক ভূমিকম্পবিষয়ক তথ্য পেতে দারুণ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। একে বিশাল সাবমেরিন সেন্সর হিসেবে ব্যবহারের কথা বলছেন তাঁরা।
মূলত ভূমিকম্পের সময় কম্পন পরিমাপ করার যন্ত্রের নাম সিস্মোগ্রাফ, যার রয়েছে তিনটি উপাদান- সেন্সর, রেকর্ডার ও টাইমার। সিস্মোগ্রাফের রেকর্ডকে SEISMOGRAM বলা হয়। সিস্মিক চ্যুতির যে বিন্দু থেকে স্থানচ্যুতি শুরু হয়, তাকে ভূমিকম্পের কেন্দ্র বলে এবং এর ঠিক ওপরে পৃথিবীর পৃষ্ঠের ওপর উলম্বভাবে অবস্থিত বিন্দুকে উপকেন্দ্র বলা হয়। এই উপকেন্দ্র থেকে ভূমিকম্পের কেন্দ্র পর্যন্ত গভীরতাকে ‘কেন্দ্রিক গভীরতা’ বলে, যা ভূমিকম্পের সম্ভাব্য ক্ষতির মাত্রা নির্ণয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বেশির ভাগ ক্ষতিকর ভূমিকম্পেরই কেন্দ্র অগভীর থাকে, যার ‘কেন্দ্রিক গভীরতা’ ৭০ কিলোমিটার বা তারও কম হয়ে থাকে। উপকেন্দ্র থেকে যেকোনো স্থান বা নির্দিষ্ট বিন্দুর দূরত্বকে উপকেন্দ্রিক দূরত্ব বলা হয়। ভূ-অভ্যন্তরে সিসমোগ্রাফ স্থাপনের কারণে ভূমিকম্পের তথ্য পাওয়া গেলেও সমুদ্রের নিচে ভূমিকম্পের তথ্য অনেকটাই অজানা রয়ে যায়। তা ছাড়া মৃদু ভূমিকম্প দূরের ভূপৃষ্ঠে স্থাপিত সেন্সরগুলোতে ধরা পড়ে না। সাবমেরিন ক্যাবলে সেন্সর স্থাপন করা গেলে এ সমস্যাটির সমাধান হবে বলে মত গবেষকদের।
ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবরেটরি (এনপিএল) মূলত পরিমাপ বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করে। এর সঙ্গে ইউরোপের অন্যান্য গবেষণাগার ফাইবার অপটিক ক্যাবলে সংযুক্ত। এটি অ্যাটমিক ঘড়ির সিনক্রোনাইজে ব্যবহৃত হয়। এই কেবলগুলো রাস্তার নিচে বসানো। এতে রাস্তায় যান ও মানুষ চলাচল করার ফলে ওই লাইনে শব্দ তৈরি হয়; যা সঠিক নাদ পরিমাপের ক্ষেত্রে কিছুটা বাধা সৃষ্টি হয় বলে অধিকাংশ সময় তা বাতিল হয়ে যায়। এখন এ শব্দ-গোলযোগের পদ্ধতিটিকেই কাজে লাগাতে চাচ্ছেন গবেষক মাররা ও তাঁর সহকর্মীবৃন্দ।
ভূকম্পন শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ভিন্ন ধরনের নাদ ব্যবহার করার প্রস্তাব করেছেন গবেষক দলের প্রধান জিউসেপ্পি মাররা। তার পরিকল্পনা হলো ক্যাবলের মধ্যে থাকা কোনো অপটিক্যাল ফাইবারে উচ্চমানের লেজার বিম প্রেরণ করা। অন্য প্রান্তে ওই ফাইবার একই ক্যাবলের অন্য আরেকটি ফাইবারের সঙ্গে যুক্ত থাকে, যা ফিরতি যাত্রা করে একটি লুপ বা ফাঁস তৈরি করে। কাছাকাছি ভূকম্পনের ফলে কোথাও সিসমিক তরঙ্গ তৈরি হলে এই লেজারের আলোকে তার দশা থেকে কিছুটা সরিয়ে দেবে। এ অসামঞ্জস্য বা গোলযোগ খুব ক্ষুদ্র। এই সূক্ষ পার্থক্যের বিষয়টি ধরতে ফেমটোসেকেন্ডসের পার্থক্য ধরতে পারে, এমন যন্ত্রপাতি প্রয়োজন পড়বে। এক ফেমটোসেকেন্ড হচ্ছে এক সেকেন্ডের এক বিলিয়ন ভাগের এক মিলিয়নতম অংশ।
গবেষকেরা বলছেন, সমুদ্রের তলায় থাকা ক্যাবল ব্যবহারের সুবিধা হচ্ছে, এতে বহিঃশব্দ বা গোলযোগের মাত্রা কম হয়। সিসিলি-মাল্টার ওই ক্যাবলে ব্যাকগ্রাউন্ড শব্দের মাত্রা নগণ্যই। তবে, গবেষকেরা এখনো তাঁদের পদ্ধতিটি পুরোপুরি সমুদ্রের নিচে থাকা দীর্ঘ ক্যাবলে পরীক্ষা করেনি। তবে তাঁরা আশা করেন, তারা যখন এ-সংক্রান্ত গবেষণা করবেন, আরও গোলযোগহীন সংকেত পাবেন। এতে বর্তমান সময়ে ধরা পড়ে না, এমন অনেক ভূকম্পনের তথ্য শনাক্ত করা সম্ভব। এটি ভূতাত্তি¡কদের কাছে আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে।
গবেষকদের এ ধারণাটি বেশ কাজে এসেছে। যেমন ২০১৬ সালে এনপিএল ৬ মাত্রার একটি ভূমিকম্প শনাক্ত করতে পেরেছিল, যা মধ্য ইতালিতে আঘাত হানে। এটি ফাইবার অপটিক ক্যাবলে ধরা পড়ে। লন্ডনে এনপিএলের কার্যালয় থেকে রিডিংয়ের ডেটা সেন্টারে ৭৯ কিলোমিটারে এটি ধরা পড়ে। ২০১৭ সালে মাল্টা ও সিসিলির মধ্যকার পানির নিচে থাকা ৯৬ কিলোমিটার কেব্লের মধ্যে আরেকটি পরীক্ষা চালানো হয়। এটি ৩ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প ধরতে পারে। ওই কেব্ল থেকে ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ৮৯ কিলোমিটার দূরে।
গবেষকেরা বলছেন, তাঁদের উদ্ভাবিত পদ্ধতির অন্যান্য ব্যবহারও রয়েছে। মূলত এই পদ্ধতিতে যেকোনো শব্দের উৎস ধরা যেতে পারে; বিশেষ করে তেল বা গ্যাসের খোঁজে ব্যবহার করা গ্যাস গানের ফলে ডলফিন বা তিমির জায়গা পরিবর্তনের মতো বিষয়টিও ধরা পড়তে পারে সহজেই।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১০১তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৮।