ল্যুভর পিরামিড, ফ্রান্স

ল্যুভর মিউজিয়ামের পিরামিড

পিরামিডের পরিচিতি বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসে সুবিদিত। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে আজও সমান বিস্ময় ধরে রেখেছে পিরামিড। পিরামিডের অদ্ভুত আকার নিয়ে অনেকেই নানাভাবে ডিজাইন আইডিয়া তৈরি করেছেন। ডিজাইন আইডিয়ায় এর মধ্যে সেরা ল্যুভর পিরামিড।

ল্যুভর পিরামিড ফ্রান্সের ঐতিহ্যবাহী ল্যুভর মিউজিয়ামের অনন্য সংযোজন। বর্তমানের ল্যুভর মিউজিয়াম আসলে ওল্ড ল্যুভর, নিউ ল্যুভর ও ল্যুভর পিরামিড এই তিনটি পর্যায়ের সমন্বিত রূপ। একদম শুরুর দিকে ল্যুভর প্যালেস এবং সেইন নদীর তীর ধরে ষষ্ঠদশ শতাব্দীতে গড়ে ওঠে একাধিক গ্যালারি ও প্যাভিলিয়নসমৃদ্ধ ওল্ড ল্যুভর অংশটি। নিউ ল্যুভর এর উল্টো দিকের লম্বা ব্লকে এর অবস্থান। ওল্ড ল্যুভর এবং নিউ ল্যুভরের মধ্যখানে বিশাল খোলা চত্বরটি নেপোলিয়ন কোর্ট। এই নেপোলিয়ন কোর্টের ঠিক কেন্দ্রীয় অবস্থানেই অবস্থান ল্যুভর পিরামিডের।

চাইনিজ বংশোদ্ভূত আমেরকিান স্থপতি আইয়ে মিং পির (Ieoh Ming Pei) ১৯৮৯ সালে করা ল্যুভর পিরামিড ঐতিহাসিক ল্যুভর মিউজিয়ামকে ফ্রান্সের জন্য স্থাপত্য আইকনে পরিণত করেছে। মিউজিয়ামটি যেখানে ফেলে আসা পুরোনো ঐতিহ্য এবং ইতিহাসের সাক্ষী হবে, সেখানে এটি ভবিষ্যৎমুখী চরিত্রই ফুটিয়ে তুলছে। এর স্বচ্ছ কাচের মধ্য দিয়ে ইতিহাস মূর্ত হয়ে উঠেছে প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে। এর লবির উজ্জ্বল আলোক ঝরনা ভবিষ্যতের উজ্জ্বল সম্ভাবনাকে নির্দেশ করছে। একই সঙ্গে লবিতে ঝুলে থাকা উল্টো পিরামিডে ‘দ্য ভিঞ্চি কোড’ অনুসরণ করা হয়েছে। তবে সত্যি বলতে শুধু পিরামিডই সপ্তাহের বেশি সময় নেবে ভালোভাবে দেখতে ও বুঝতে।

ভূগর্ভস্থ লবিতে ঝুলন্ত উল্টো পিরামিড

ল্যুভর পিরামিড ধাতব ফ্রেম ও স্বচ্ছ গ্লাসের তৈরি বৃহদাকৃতির পিরামিড, যার আশপাশে আরও তিনটি বিভিন্ন সাইজের ছোট পিরামিড রয়েছে। বড় পিরামিডের নিচেই ল্যুভর মিউজিয়ামের মূল প্রবেশ লবি। এই পিরামিড ল্যুভরে সংযোজন করেছে অনবদ্য সৌন্দর্য। ১৯৮৪ সালে ফ্রান্সের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ফ্রাঁসোয়া মিতেরার নির্দেশে এর ডিজাইন কাজ শুরু হয়। মিং পি এর আগেও জাপানের মিহো মিউজিয়াম, ক্লিভল্যান্ডের রক অ্যান্ড রোল, হল অব ফেম মিউজিয়াম, ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল গ্যালারি আব আর্টের মতো বিভিন্ন ডিজাইনের জন্য পরিচিত ছিলেন। ল্যুভরের স¤প্রসারণের দায়িত্বও এসে পড়ে তার কাঁধে। মিং পিই এখানে কাচের তৈরি পিরামিড আনেন।

কাচের এ স্থাপনার উচ্চতা ভূমি থেকে প্রায় ৭১ ফুট এবং মাটির নিচের তলায় পিরামিডের চতুষ্কোণ ভিত্তির এক বাহুর দৈর্ঘ্য প্রায় ১১৫ ফুট। চোখে গুনলে এতে রম্বস আকৃতির ৬০৩টি এবং ত্রিভুজ আকৃতির ৭০টি কাচের টুকরো পাওয়া যাবে। এর প্রকৌশল নকশা করেছে কানাডার মন্ট্রিলের নিকোলেট চার্ট্রান্ড নোল লি. নামক নির্মাণ প্রতিষ্ঠান।

নির্মাণাধীন অবস্থায় পিরামিড

তবে পিরামিডের এই সংযোজন শুধু সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য নয়, বরং প্রয়োজন থেকে এসেছে। সময়ের ব্যবধানে ল্যুভরের গুরুত্ব ও খ্যাতি বেড়ে যাওয়ায় এর দর্শনার্থী বেড়েছে প্রচুর। সমস্যা রয়ে যায় মূল প্রবেশপথ নিয়ে। বাড়তি দর্শনার্থীদের চাপ সামলাতে গলদঘর্ম অবস্থা ল্যুভরের। স্থপতি পির চ্যলেঞ্জ ছিল এখানেই। ল্যুভর মিউজিয়ামের মূল অবয়বকে ঠিক রেখে প্রবেশপথ তৈরি করা। মিং পি সমস্যা সমাধানের জন্য মাটির নিচে গেলেন। বিশাল লবি তৈরি করলেন। সেই লবি থেকে একাধিক করিডোর দিয়ে মূল ভবনের লবিতে ওঠা যায়। ল্যুভরের তলায় পুরোদস্তুর একটি মেট্রো লাইনের মতো ব্যবস্থা করে ফেললেন। আর বাইরে থেকে এই লবি এবং প্রবেশপথকে দৃশ্যমান করলেন কাচের পিরামিডের মাধ্যমে।

স্থপতি পির পরিকল্পনা নিয়ে বেশ ভালো ধরনের বিতর্ক শুরু হয়। অনেকেরই যুক্তি ছিল স্বছ কাচের তৈরি পিরামিড ল্যুভরের ঐতিহাসিক নান্দনিকতাকে ক্ষুন্ন করবে এবং মূল ভবনের সঙ্গে সম্পূর্ণ বৈপরীত্য সৃষ্টি করবে। তবে পির বক্তব্য ছিল উল্টো। পিরামিড নিজেই একটি অতি পুরোনো স্থাপনা, যা নীলনদের তীরে বিশ্বব্যাপী পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রে। ল্যুভরের পিরামিডে কাচের ব্যবহার হয়েছে সময়ের প্রতিচ্ছবি হিসেবে। সম্পূর্ণ প্রকল্পের প্রেক্ষাপটে পিরামিডের আকৃতি, মাপ, উচ্চতা এবং প্রতিসম অবস্থান এতটা হিসাব করে করা যে এটাকে মোটেই বাড়তি কিংবা জোর করে বসিয়ে দেওয়া বলে মনে হয় না।

পিরামিড সংলগ্ন জলাধার

পির যুক্তির কাছে হার মানেন সমালোচকেরা। তারপরের ইতিহাস বেশ চমকপ্রদ। ১৯৯০ সালে পুরোপুরি চালু হওয়ার পরে ল্যুভর মিউজিয়ামের দর্শনার্থী বেড়েছে কয়েকগুণ। আর যে পিরামিডকে নিয়ে এত সমালোচনা, সেই পিরামিডই হয়েছে ল্যুভরের আসল সৌন্দর্য ও দর্শনীয় বস্তু। কাচের পিরামিড ছাড়া ল্যুভরকে কল্পনাই করা যায় না। আজকের বাস্তবতাও স্বীকার করে নিচ্ছে ল্যুভর পিরামিড ল্যুভর মিউজিয়ামকে সময়ের বাধা পেরিয়ে কালোত্তীর্ণ স্থাপনার মর্যাদা এনে দিয়েছে।

খালিদ মাহমুদ

প্রকাশকাল: বন্ধন ৭৫ তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৬

Related Posts

আর্কিটেকচার অ্যান্ড ডিজাইন বিভাগে ওয়ার্ল্ড ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ড জিতলেন বাংলাদেশের জয় সাহা

‘সনি ওয়ার্ল্ড ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ড’ বিশ্বে অনেক মর্যাদাপূর্ণ একটি আলোকচিত্র প্রতিযোগিতা। ২০২৬ এর প্রতিযোগিতায় আর্কিটেকচার অ্যান্ড ডিজাইন বিভাগে জয়…

শহর,সেতু আর সুরের টেনেসির আর্টস সেন্টার

বর্তমানে সমসাময়িক স্থাপত্যের একটি বড় দিক হলো ভবনকে শহরের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। এই…

জাহা হাদিদের গেটওয়ে সেন্টার হংকংয়ের ভবিষ্যৎ শহর

হংকংয়ের ওয়েস্ট কাউলুন এলাকায় নির্মিত বিশ্বখ্যাত স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান জাহা হাদিদ আর্কিটেক্টস–এর বড় একটি প্রকল্প গেটওয়ে সেন্টার। এটি মূলত…

এক মাইল সবুজ

আর পাঁচটা ফ্লাইওভারের মতোই ছিল মুম্বাই শহরের সেনাপতি বাপাট মার্গ ফ্লাইওভার। কিছু ফ্লাইওভারের স্ট্রাকচারের মূল ভিত্তি থাকে মাঝ…

01~1
previous arrow
next arrow

CSRM

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

Belgium
Buet
কী কী থাকছে আকাশছোঁয়া শান্তা পিনাকলে
সমুদ্রবাণিজ্যের বর্জ্য থেকে অনন্যা এক স্থাপত্য
Home of Haor
Weather
Youth Park
Tower
শহর,সেতু আর সুরের টেনেসির আর্টস সেন্টার