সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগ বৃত্তান্ত

স্থাপত্য এমন একটা ক্ষেত্র, যেখানে প্রতিনিয়তই নতুন কিছু করা সম্ভব। অনেকেই স্থাপত্যকে চারুকলার সঙ্গে তুলনা করলেও বাস্তবতা ভিন্ন। চারুকলার সৃষ্টিশীল কাজগুলো স্বাধীন প্রকৃতির হয়ে থাকে। কোনো বাধাধরা নিয়ম নেই চারুকলার কাজের ক্ষেত্রে। অন্যদিকে স্থাপত্যশিল্পের ক্ষেত্রে এগোতে হয় নিয়মতান্ত্রিক পন্থায়। স্থাপত্য আসলে বিজ্ঞান, নকশা ও গণিতের সমন্বয়। স্থাপত্যের দুটি প্রধান ভাগ রয়েছে। তা হচ্ছে একাডেমিক ফিল্ড ও প্রফেশনাল ফিল্ড। দুটি ক্ষেত্রের ভিন্নতা দুই রকমের। পুঁথিগত জ্ঞান, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণই হচ্ছে একাডেমিক ফিল্ডের মূল ভিত্তি। একজন সুদক্ষ স্থপতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সুদৃঢ় একাডেমিক শিক্ষার বিকল্প নেই। আর একাডেমিক শিক্ষার সুনিপুণ এই কাজটিই করছে সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগ।

সুদক্ষ ও যোগ্য স্থাপত্যের কারিগর গড়ার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টির স্থাপত্য বিভাগের যাত্রা শুরু ২০১৪ সালে। বর্তমানে বিভাগটির উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন শামীম আরা হাসান, সহযোগী অধ্যাপক, বুয়েট এবং বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বে মোহাম্মদ ইউসুফ ইকবাল চৌধুরী, সহকারী অধ্যাপক। বর্তমানে স্থাপত্য বিভাগটি সাফল্যের সঙ্গে একাডেমিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেলেও শুরুর পথটা ছিল যথেষ্ট বন্ধুর। শিক্ষকসংখ্যা ছিল মাত্র ৩। অন্যান্য ডিপার্টমেন্টের তুলনায় স্থাপত্য বিভাগের জন্য প্রয়োজন কিছুটা বাড়তি পরিসরের। শিক্ষা উপকরণও লাগে বেশি। অথচ এ বিভাগটির ক্ষেত্রে উভয় বিষয়ই ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তাই প্রথম দিকে যথেষ্ট সমস্যায় পড়তে হয়েছিল শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। একই স্টুডিওর মধ্যে দুই ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থীদের ভাগ হয়ে ক্লাস করতে হয়েছে। ক্লাস নিতে গিয়ে শিক্ষকদেরও কম ভোগান্তিতে পড়তে হয়নি। বলাই বাহুল্য, তখনকার শিক্ষার্থীদের সহজ-সরল মন-মানসিকতা এবং পরিস্থিতি মেনে নিয়ে ক্লাস করার বিষয়টি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তবে প্রতিকূলতা থাকলেও লেখাপড়ার মানের ক্ষেত্রে কোনো রকম ছাড় দেওয়া হয়নি। এমন ঘটনাও ঘটেছে যখন এক ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থীরা কাজ করছিল, ওই সময় অন্য ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থীরা চলে এসেছে। জায়গাস্বল্পতার কারণে তড়িঘড়ি করে শিফট হতে গিয়ে জুড়ির আগে একটা ফাইনাল মডেল ভেঙে ফেলেছে কোনো শিক্ষার্থী। পরবর্তী কিছুদিনের মধ্যে সমস্যাগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করায় দ্রুতই সমাধান করা হয়েছে।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের চাহিদা ও ভোগান্তির বিষয়টি বিবেচনায় রেখে এবং জায়গার অপর্যাপ্ততা কমাতে বিশ্ববিদ্যালয়টির মহাখালী ক্যাম্পাসের দুটি ফ্লোর ১১টি স্টুডিও স্বতন্ত্র জুড়ি স্পেস বরাদ্দ করা হয় স্থাপত্য বিভাগের জন্য। এর ফলে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির অবসান হয়। স্বস্তি ও মনোযোগের সঙ্গে ক্লাস ও প্রজেক্ট ওয়ার্ক করতে পারছে তারা। বর্তমানে পাঁচটি ডিসিপ্লিনে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী ১৪০ জন। নিয়মিত শিক্ষক হিসেবে ৮ জন এবং অতিথি শিক্ষক হিসেবে ৫ জন কর্মরত বিভাগটিতে। লেখাপড়ার পাশাপাশি আরও রয়েছে ফটোগ্রাফি ক্লাব, ডিবেটিং ক্লাব, স্পোর্টস ক্লাব, যা স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থীরাই পরিচালনা করে। সপ্তাহের নির্ধারিত একটি দিনে শিক্ষক-শিক্ষিকা ও বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থীদের নিয়ে উইকলি ওপেন ডিসকাসন বা সাপ্তাহিক মুক্ত আলোচনার আয়োজন করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্মাণ সম্পর্কিত বিষয় বা যেকোনো সামাজিক বিষয় হয়ে থাকে ওই আলোচনার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। অনেক সময় কোনো সম্ভাব্য প্রজেক্ট নিয়েও আলোচনা করা হয়। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক অভিজ্ঞতার আদান-প্রদান বাড়ে।

এ ছাড়া প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বানানো বিভিন্ন প্রজেক্ট নিয়ে এক্সিবিশনের আয়োজন করে থাকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ক্লাস প্রজেক্টওয়ার্ক ও পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত থাকা শিক্ষার্থীদের মানসিক অবসাদ দূর করার তথা অবকাশ যাপনের জন্য শিক্ষাসফরের আয়োজন করে থাকে কর্তৃপক্ষ। ফলে শিক্ষার্থীদের পুঁথিগত জ্ঞানের পাশাপাশি বাহ্যিক জ্ঞানেরও প্রসার ঘটে। এ ছাড়া শিক্ষাসফরের মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এবং সহপাঠীদের সঙ্গে সম্পর্ক, সিনিয়র-জুনিয়র শিক্ষার্থীদের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক আরও স্বচ্ছ ও দৃঢ় হয়।

সোনারগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়

বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ২০ থেকে ৫০ শতাংশ ওয়েবার-সুবিধা প্রদান করা হয়ে থাকে। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তানদের বিশেষ আর্থিক সুবিধা প্রদান করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। মেধাবী-দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও বিশেষ আর্থিক ছাড় দেওয়া হয়। পরীক্ষার ভালো ফলের ওপর নির্ভর করেও বিভিন্ন পার্সেন্টেন্সে ওয়েবার-সুবিধা প্রদান করা হয়।

ভর্তির যোগ্যতা

বিজ্ঞান বিভাগ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে ন্যূনতম জিপিএ ২.৫ থাকতে হবে। এ ছাড়া ডিপ্লোমাধারী, ও লেভেল এবং এ লেভেল সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীরাও ভর্তি হতে পারবে প্রতিষ্ঠানটিতে।

শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতার বয়ান

আহমেদ নিজাম, লেভেল-১

আমি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা করেছি। সেখান থেকেই স্থপতিদের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হয়। তাঁদের কর্মকাণ্ডে অনুপ্রাণিত হয়ে স্থাপত্য বিষয়ে ভর্তি হয়েছি। শুরু থেকেই নতুন নতুন উপকরণ দিয়ে কাজ করতে হয়েছে। এ অভিজ্ঞতাটি ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথম যখন ‘সুইচ বোর্ড’ শব্দটি শুনেছি তখন জানতামই না এটা কাগজের একটা উপকরণ। স্যারেরা প্রতিনিয়তই আমাদের বলে দেন কোন উপকরণ কোথায় কিনতে পাওয়া যাবে। তা না হলে আমি সুইচ বোর্ড কিনতে নিঃসন্দেহে ইলেকট্রিক্যাল দোকানেই যেতাম। এ ছাড়া এখানে মাটি, পিভিসি বোর্ড, ককশিট ইত্যাদি নিয়েও কাজ করতে হয় আমাদের। শিক্ষকেরা বরাবরই সাহায্য করে এসেছেন মডেল তৈরিসহ অন্যান্য কাজের ক্ষেত্রে। এখানে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, কোনো সমস্যা নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো শিক্ষকের কাছেই যেতে হবে। আমি যেকোনো সমস্যা নিয়ে যেকোনো শিক্ষকের কাছে গিয়েছি, সব সময়ই সাহায্য পেয়েছি।

যখন এখানে ভর্তি হয়েছি, প্রথম দিকে স্বাভাবিকভাবেই নিজ থেকে অন্য কারও সঙ্গে কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করতাম। কেননা কে আবার কী মনে করে! আমার মনে আছে প্রথম দিন ক্লাসে আসার পরে সিনিয়র আপু-ভাইয়ারা নিজ থেকেই ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং কথা বলেছিলেন। ফলে সংকোচটা দূর হয়েছিল অনেকটাই। তাঁরা শিখিয়েছেন কীভাবে অন্যদের সঙ্গে মেশার পাশাপাশি সম্পর্কোন্নয়ন করতে হয়। এমনকি শিক্ষক-শিক্ষিকারাও বড় ভাইয়া ও আপুদের কাছ থেকে কাজ শেখা বা সাহায্য নেওয়ার বিষয়েও উৎসাহিত করে থাকেন। এতে পারস্পরিক সম্পর্ক আরও স্বচ্ছ ও সুদৃঢ় হয়। লেখাপড়ার পাশাপাশি শিক্ষাসফর, আনন্দ ভ্রমণ ও ঐতিহ্যবাহী স্থান পরিদর্শন আমাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে ভবিষ্যতে একজন সফল স্থপতি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে।

আয়েশা খাতুন আশা, লেভেল-২

আমি দিনাজপুরের মেয়ে। মাধ্যমিকের পর পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউশনে ডিপ্লোমা (আর্কিটেকচার) করি। প্রথমে কোনো স্বচ্ছ ধারণা ছিল না বিষয়টি সম্পর্কে। যখন চার বছরের ডিপ্লোমা শেষ করি, তখন বিষয়টির প্রতি অন্য রকম ভালো লাগা এসে যায়। কেননা তখন বুঝতে পারি স্থাপত্য নিয়ে প্রতিনিয়ত নতুন কিছু করা সম্ভব। আর সে কারণেই স্থাপত্য বিভাগে আমার ভর্তি হওয়া। এখানকার অধিকাংশ শিক্ষার্থী লেখাপড়ার পাশাপাশি চাকরি করে। সারা দিন অফিস করে যথেষ্ট ক্লান্ত হওয়ার কথা তাদের। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এত ক্লান্তির পরও ক্লাস না করার কোনো রকম প্রবণতা শিক্ষার্থীদের মাঝে দেখা যায় না। সকালে ঘুম ভাঙার পর প্রথমেই আমার মনে হয় ভার্সিটিতে যাওয়ার ব্যাপারটি। কারণ, আমরা যথেষ্ট মজা করি ক্লাসে এসে। ফলে নিমেষেই সারা দিনের ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।

আমরা অনেক প্রজেক্টই দলীয়ভাবে করি ফলে পারস্পরিক সুসম্পর্ক বজায় থাকে এবং জ্ঞানের আদান-প্রদান হয়। এখানে সহপাঠীরা প্রত্যেকেই যথেষ্ট দায়িত্বশীল। ধরা যাক, আমরা যদি একটি আবাসনের ইন্টেরিয়র নিয়ে কাজ করি, তাহলে প্রজেক্টটির কেউ বেডরুম, কেউ ড্রয়িংরুম আবার কেউ কিচেন নিয়ে কাজ করি। এ ক্ষেত্রে সবাই সবাইকে সাহায্য করে বলেই কাজটা সহজ হয়। আমরা পরস্পরের সঙ্গে সমস্যা শেয়ার করে তা সমাধানের চেষ্টাও করে থাকি। এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে যাওয়ারও যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে, যা আমারও ইচ্ছে।

মার্জিয়া ইসলাম, লেভেল-৩

ছোটবেলা থেকেই আঁকতে ভালোবাসতাম। ভালো লাগার সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় স্থাপত্য বিষয়ে পড়ার ইচ্ছেটা অনেক আগে থেকেই। আব্বুরও ইচ্ছে আমাকে স্থপতি হিসেবে দেখার। আমি যখন পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে ভর্তি হতে যাই, তখন দেখেছিলাম কিছু মেয়ে দল বেঁধে মাঠের একপাশে বসে ড্রয়িংশিট নিয়ে আঁকাআঁকি করছে। দৃশ্যটা ভীষণ অনুপ্রাণিত করেছিল আমাকে। ডিপ্লোমা শেষ করে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্যে ভর্তি হই। ওরিয়েন্টেশন ক্লাসে বিভাগীয় প্রধান বলেছিলেন, এ প্রতিষ্ঠানে সিনিয়র-জুনিয়র শিক্ষার্থী রয়েছে। তাই প্রত্যেককেই সম্পর্কে মেনে চলতে হবে। সিনিয়ররা জুনিয়রদের সাহায্য করবে। আবার জুনিয়ররাও সিনিয়রদের সম্মান এবং সাহায্য করবে। স্যারের এ বক্তব্যটাই পরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক সুসম্পর্ক তৈরি করতে ভীষণভাবে সাহায্য করেছিল।

শিক্ষকেরা প্রতিনিয়তই আমাদের সাহায্য করেন। কাজসংক্রান্ত যেকোনো সমস্যার কথা শিক্ষকদের জানানো, ক্লাস না থাকলেও আমাদের সমস্যার সমাধান করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। প্রয়োজনে ক্লাসের নির্ধারিত সময়ের বাইরেও আমাদের সময় দেন। একটি ঘটনা শেয়ার করি, ২ : ২-এ থাকাকালীন একবার জুড়ির আগে আমরা কাজটা শেষ করতে পারিনি। তখন বাধ্য হয়েই স্যারের কাছ থেকে এক ঘণ্টা সময় চেয়ে নিয়েছিলাম। বুঝতে পারছিলাম স্যারও চাইছিলেন আমরা যেন কাজটি সম্পন্ন করেই জমা দেই। ওই দিন কাজ শেষ করে জুড়ি করতে আমাদের রাত এগারোটা বেজে গিয়েছিল। আমরা ছাড়া ক্যাম্পাসে আর কেউ ছিল না। আমাদের বিভাগীয় প্রধান মোহাম্মদ ইউসুফ ইকবাল চৌধুরী ওরফে ডিউক স্যার যদি ওই দিন এই ছাড়টুকু না দিতেন, তাহলে হয়তো কাজটা সম্পূর্ণ করাই সম্ভব হতো না। এভাবেই সবার সহযোগিতা নিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি আমাদের কাঙ্খিত গন্তব্যে।

মো. খায়রুল ইসলাম, লেভেল-৪

আমার মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল দুর্ভাগ্যবশত কিছুটা খারাপ হয়। ইচ্ছে ছিল উচ্চমাধ্যমিকের পর প্রকৌশল বিষয়ে পড়ব। কম্পিউটারের প্রতি নেশা ছিল। তাই অনেকেই বলত কম্পিউটার বা সফটওয়্যার নিয়ে পড়ার জন্য। যেহেতু মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে আমি। তাই সার্বিক দিক বিবেচনা করে, বাবার ইচ্ছাতেই ডিপ্লোমাতে ভর্তি হই। তা ছাড়া আঁকাআঁকি করতে ভালোবাসতাম বিধায় স্থাপত্য বিষয়ে ডিপ্লোমাতে ভর্তি হওয়া।

ডিপ্লোমা করার পর বিএসসি করার সিদ্ধান্ত নিই। ইন্টারনেট ঘেঁটে ‘জুয়েট’-এর নাম খুঁজে পাই। এটাই একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান, যেখানে পলিটেকনিক্যালের শিক্ষার্থীরা পড়ার সুযোগ পায়। তবে আসনসংখ্যা খুব সীমিত হওয়ায় মনের মধ্যে একটা আশঙ্কা দেখা দেয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াটাও যথেষ্ট ব্যয়বহুল বিষয়। তা ছাড়া অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীদের পড়ার সুযোগ নেই।

ডিপ্লোমা শেষে ঢাকায় একটি চাকরি শুরু করি। তখন পত্রিকায় সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য বিভাগে ভর্তির বিজ্ঞাপনটি চোখে পড়ে। এ বিশ্ববিদ্যালয়টিতে পলিটেকনিক্যাল শিক্ষার্থীদের সান্ধ্যকালীন ব্যাচে পড়ার সুযোগ রয়েছে জেনে কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলি। কেননা খুব কম বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য বিষয়ে সান্ধ্যকালীন ব্যাচে পড়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে চাকরি ও লেখাপড়া দুটোই চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। ভর্তির সময় মাধ্যমিক ও ডিপ্লোমার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে ওয়েবার বা ছাড় সুবিধা পাই।

যখন ক্লাস শুরু হয়েছিল তখন শিক্ষকেরা বলেছিলেন, তোমরা অনেকেই পলিটেকনিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছ। তাই কমবেশি ধারণা রয়েছে স্থাপত্য বিষয়টি সম্পর্কে। তবে মনে রাখতে হবে তোমরা এখন শূন্য থেকে শুরু করতে যাচ্ছো। অর্থাৎ এখান থেকে যা কিছুই শিখবে তা হবে পুরোপুরি মৌলিক। যখন এখানে কম্পোজিশন করা শুরু করি একটা আত্মবিশ্বাস ছিল শুরু থেকেই। যেহেতু বিষয়টি সম্পর্কে কমবেশি ধারণা ছিল। তবে, আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে, যা কিছুই করতাম না কেন, তার কিছুই হতো না। কাজগুলো শিক্ষকদের দেখাতাম। মন্তব্যগুলো এমন পেতামÑ হচ্ছে, তবে কোথাও যেন হারিয়ে যাচ্ছে। আরেকটু চেষ্টা করো। আমিও শিক্ষকদের দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী বারবার চেষ্টা করতাম। অবশেষে আমার চেষ্টা ও শিক্ষকদের থেকে পাওয়া নির্দেশনার সমন্বয়ে কাজটি এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াত, আমি নিজেই অবাক হয়ে যেতাম নিজের কাজ দেখে। শিক্ষকদের পুনঃ পুনঃ নির্দেশনা না পেলে হয়তো কাজটি এতটা ভালো হতো না। পরিশেষে শিক্ষকদের ধন্যবাদ জানাতাম। কাজসংক্রান্ত যেকোনো সমস্যায় শিক্ষকেরা হাতে-কলমে সমাধান করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক, সহপাঠীদের সঙ্গে সম্পর্ক ও সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক এখানে এতটাই নিবিড় যেন একটি অদৃশ্য পরিবার গড়ে উঠেছে এখানে।

প্রতিটি কাজেরই সমালোচনা প্রয়োজন। সিনিয়র ভাইয়া-আপুরা আমাদের কাজগুলোর সমস্যাগুলোকে নির্ধারণ করে দিতেন। আমাদের কাজের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিতেন। আমাদের প্রয়োজনে সিনিয়ররা অনেক সময় সাইটে পর্যন্ত চলে যেতেন। আবার যেকোনো সমস্যায় হাতে ধরে কাজ শিখিয়ে দিচ্ছেন ভাইয়া-আপুরা। শিক্ষক এবং সিনিয়রদের কাছ থেকে পাওয়া গাইডলাইনগুলো আমাদের এগিয়ে চলার প্রেরণা হয়ে কাজ করছে।

বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গ্রান্ড জুড়িতে ভলান্টিয়ার হিসেবে অনেক সময়ই গিয়েছি আমি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাজগুলোর বেশ প্রশংসা করে তারা। এ পর্যন্ত আমার করা প্রজেক্টগুলো হচ্ছে- Ergonomics Control residence for two elderly couple in 300sft. Space, Vacation House, Single Family Residence, Elementary School Cum Cyclone Shelter at Teknaf, Rural Community Center, Art Gallery, Science Museum, Mixed User Highrise Function: Shopping Mall, Commercial Residence ইত্যাদি। এ ছাড়া Spatial Adaptation in Informal Scttlement, Low Cost Housing প্রভৃতি গ্রুপ প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করেছি। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ই. B. ARCH শেষ করার পর স্থপতি বশিরুল হক স্যারের অধীনে কাজ করার ইচ্ছে রয়েছে চতুর্থ বর্ষের এই শিক্ষার্থীর।

নিলুফার ইয়াসমিন নিলা, লেভেল-৫

স্থাপত্যে পড়ার ব্যাপারে আমার পরিবার থেকে কোনো মানসিক সম্মতি ছিল না। অনেকটা ইচ্ছের বিরুদ্ধেই এ বিষয়ে ভর্তি হই। আমি যখন স্কুলে পড়তাম। তখন আমাদের পাশের অ্যাপার্টমেন্টে এক আপু থাকতেন। ওনাকে দেখতাম প্রতিযোগিতার জন্য বিভিন্ন প্রজেক্টস নিয়ে কাজ করতে। বাসায় বসে বিভিন্ন রকম মডেল বানাতেন। খুব ভালো লাগত কাজগুলো দেখে। আমারও ইচ্ছে হতো এমন কিছু করার। উৎসাহটা আসলে ওনার কাজ দেখেই। যদিও বড় ভাইয়ার ইচ্ছে ছিল আমাকে মেডিকেলে পড়ানোর। কিন্তু আমার বরাবরই ইচ্ছে ছিল সৃষ্টিশীল কিছু করার। এ বিষয়ে ভর্তি হওয়ার পর আমার পরিবারের সদস্যরা দুই মাস কথা বলেনি আমার সঙ্গে।

সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের শুরুর দিকের যাত্রাটা সত্যি এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস আমাদের ব্যাচের কাছে। শুরুতে আমাদের ক্লাস হতো একটি মাত্র রুমে। সেখানে দুটো ব্যাচ কাজ করতাম। প্রথম দিকটায় স্থাপত্য বিভাগের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ ছিল না; ছিল শিক্ষকসংকট। ইমামুল রহমান স্যারের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা স্বীকার না করে উপায় নেই। তবে বিভাগটির মূল পরিবর্তনটা সূচিত হয় বর্তমান বিভাগীয় প্রধান ইউসুফ ইকবাল চৌধুরী স্যার যোগদানের মাধ্যমে। স্যার এসেই অভিজ্ঞ কিছু শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করেন। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কাজকে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করে তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করেন। আমাকে যদি বলা হয় নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রজেক্টের সঙ্গে আমার প্রজেক্টকে তুলনা করতে, আমি নির্দ্বিধায় তা করতে পারব।

থার্ড ইয়ারে আমরা অতিথি শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি কাজী গোলাম নাসির স্যারকে। তিনি একটা এক্সিবিশনের সময় আমাদের কাজ খুব পছন্দ করেছিলেন এবং ইচ্ছে পোষণ করেন গেস্ট টিচার হিসেবে আমাদের ক্লাস নেওয়ার। তিনি আমাদের ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনের ক্লাস নিতেন। একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় তথা নতুন বিভাগের জন্য এটি অনেক বড় পাওয়া, যা বলাই বাহুল্য। উল্লেখ্য, সম্প্রতি আমাদের গ্র্যান্ড জুড়ি অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজউকের চেয়ারম্যান, বুয়েটের অধ্যাপক, অন্যান্য নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা উপস্থিত ছিলেন গ্র্যান্ড জুড়িতে। প্রত্যেকেই আমাদের কাজের অত্যন্ত প্রশংসা করেছেন, যা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়।

এই বিভাগটির অবকাঠামোগত পরিবর্তন তথা শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলের পেছনে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকার কথা স্বীকার করতেই হবে। ৪:১-এ থাকাকালীন একটি ঘটনা শেয়ার করছি। সেবার ডিজাইনিং ক্লাস নিয়েছিলেন আমাদের বিভাগীয় প্রধান ইউসুফ ইকবাল চৌধুরী স্যার। তখন লো-কস্ট হাউসিং নিয়ে কাজ করছিলাম আমরা। কেন জানি ওই সময় কাজগুলো ভালো হচ্ছিল না। কাজ নিয়ে মোটেই সন্তুষ্ট ছিলাম না আমরা। স্যারও বেশ হতাশ হয়েছিলেন আমাদের কাজের ধরন দেখে। তিনি বেশ কড়া কিছু কথাও বলেছিলেন আমাদের। স্যারের এমন কঠোরতায় অনেকে প্রায় কেঁদেই দিয়েছিল। কিন্তু কাজটি সম্পন্ন হওয়ার পর আমরা যে স্বীকৃতি পেয়েছি তা ভোলার মতো নয়। আহ্সানউল্লাহ্ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক কাজটি দেখে বলেছিলেন, লো-কস্ট হাউসিং নিয়ে তাঁর দেখা অন্যতম সেরা প্রকল্প এটি।

ফাইনাল ইয়ারের থিসিস ব্যাচের শিক্ষার্থীদের দক্ষতাকে আরও বাড়ানোর জন্য বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া শুরু হলো। বুয়েটের অধ্যাপক এবং আমাদের বর্তমান উপদেষ্টা শামীম আরা হাসান থিসিস ব্যাচকে আরও ভালো কিছু দেওয়ার উদ্দেশ্যে বুয়েটের সিনিয়র টিচার গোলাম মাওলা স্যারকে বিশেষ দায়িত্বটি দিলেন। যাতে করে গোলাম মাওলা স্যারের অধীনে থেকে আমরা থিসিস কমপ্লিট করতে পারি। ইতিমধ্যে আমার করা প্রজেক্টগুলো হচ্ছে- Creation of Space, Studio Apartment, Single Residence, Elementary School, Resort Design, Nature Interpretation Center, War Museum, Cozy Restaurant, Mixed use Highrise, Monmamati Cultural Center, Research Center and Museum for the Tradional Textiles of Bangladesh প্রভ্যতি। এছাড়া কিছু উল্লেখযোগ্য গ্রুপ প্রজেক্ট হচ্ছে, Urban Leftover Space Design, Development of Settlements in Transition (Bede Community), Master Plan of St. Martions Island, Low Cost Housing and Community Facilities Development at St Island, Luxurious highrise Housing Complex and Comunity Facilities Development ইত্যাদি। এ কথা স্বীকার করতেই হবে, এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা যা পেয়েছি তা শুধু বড় কোনো প্রাপ্তিই না, জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বলা যেতে পারে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৭তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৭।

শ্রাবন্তী সোমা
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top