• Home
  • মুখোমুখি
  • স্থপতি এম এ মুক্তাদির
    বড় বড় জলাধার ও ঢাকার আশপাশের নদীতে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ভাসমান আবাসন প্রকল্প চালু করা দরকার।
অধ্যাপক ও স্থপতি এম এ মুক্তাদির

স্থপতি এম এ মুক্তাদির
বড় বড় জলাধার ও ঢাকার আশপাশের নদীতে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ভাসমান আবাসন প্রকল্প চালু করা দরকার।

ঢাকাকেন্দ্রিক পরিকল্পিত নগরায়ণের কাজ চলছে বিভিন্নভাবে। ঢাকাকে পরিকল্পিত নগরায়ণের একটি অংশ করতে অনেক দিন থেকে কাজ করছে সরকারের নানা প্রতিষ্ঠান। যারা কাজটি করছে, তারা কতটা সফল বা ব্যর্থ সে কথা আমি বলব না। তবে উল্লেখ করার মতো কোনো ভালো কাজ আমি দেখছি না। একটি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি আজও। আপনাকে বাস উপযোগী ঢাকা শহর গড়তে হলে ভিন্ন আঙ্গিকে ভাবতে হবে। এভাবে চললে থমকে যাবে ঢাকা। বন্ধ হবে অর্থনীতির চাকা। আর একটি কথা পরিকল্পিত নগরায়ণের জন্য কাজ করবে দেশের যে প্রতিষ্ঠান, তারা পরিকল্পনা করবে এবং তা বাস্তবায়ন করা প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করবে। কিন্তু বাস্তবে এর কোনোটি দেখছি না।

স্থপতি বা প্রকৌশলীরা দেশের পরিকল্পিত নগরায়ণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। বাকি কাজ করছেন অন্যরা। স্থপতিরা ক্ষুদ্র পরিসরে কাজ করেন। রাজনীতিবিদ, নগরপরিকল্পনাবিদ, রাজউক বা এ সংক্রান্ত আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের কাজ শেষ হলে আসে স্থপতির কাজ। তবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার সুযোগ রয়েছে স্থপতিদের। আমি মনে করি, বাংলাদেশের স্থপতিরা দেশের নগরায়ণের জন্য ভালো কিছু করছেন। আজ সারা দেশে যাঁরা স্থপতি হিসেবে কাজ করছেন, তাঁদের অনেকেই আমার ছাত্র আর না-হয় আমার ছাত্রের ছাত্র। সে হিসেবে আমি গর্ব করে বলতে পারি, স্থপতিদের মধ্যে যে সম্ভাবনা আমি দেখেছি তা আশা জাগানিয়া। 

বাঁশের তৈরি ভাসমান বাড়ি

এর ফলে যেটা হয়, নগরের মূল বা প্রধান সেবাগুলোকে নগরবাসীর কাছে সঠিকভাবে পৌঁছায় না। পানির মান ঠিক থাকে না। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হয়। কোনো সেবাই সঠিকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায় না। নগরবাসী কিন্তু আমাদের সরকারকে কর বা সেবার মূল্য ঠিকই দিচ্ছে। বাস্তবতা যেটি বলছে সেটি হলো, সরকার বা এসব সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিমশিম খাচ্ছে মেগাসিটির বাসিন্দাদের কাছে তাদের সেবাগুলো পৌঁছে দিতে। আমাদের অর্থনৈতিক শক্তি, কাজের সামর্থ্য আর শহরের আয়তন এই বিষয়গুলোর সঙ্গে শহরে বসবাসকারীর গড় হিসাবের কোনো মিল নেই। কোটি লোকের বাস এই শহরে। অতিরিক্ত জনসংখ্যা এই শহরের জন্য বোঝা হয়ে গেছে। জনসংখ্যাকে বোঝা মনে করে কোনো পরিকল্পিত উন্নয়নকাজ হচ্ছে না।

আমাদের সরকারের মনোভাব পরিবর্তনের সময় এসেছে। দ্রুতই শহরে মানুষ আসছে। অবৈধভাবে যত্রতত্র বাড়িঘর নির্মিত হচ্ছে। এখন মূল কাজ গ্রাম ও শহর থেকে লোকজন আসার প্রবণতা কমাতে হবে। যদি গ্রামই একজন নাগরিকের খাদ্য, চিকিৎসা আর শিক্ষার নিরাপত্তা দিতে পারে, তবে সে গ্রামেই থাকতে চাইবে। আর এ কাজে যদি সরকার বা সংশ্লিষ্ট মহল ব্যর্থ হয় তাহলে ঢাকার ওপর চাপ বাড়বে। এ ছাড়া আর কোনো উপায় দেখছি না এ শহরের সমস্যা সমাধানে। সহজ কথা গ্রাম থেকে ঢাকায় মানুষের আসার প্রবণতা কমাতে হবে।

দ্রুত নগরায়ন ঘটেছে ঢাকার

নিশ্চয় আছে। কিন্তু সেটা সেভাবে কাজ করছে না। সরকার ইতিমধ্যে গ্রাম পর্যায়ে ইউনিয়ন তথ্যসেবাকেন্দ্র স্থাপন করেছে। প্রযুক্তিগত দিকে থেকে গ্রামের মানুষ ভালো সুযোগ পাচ্ছে। সব দিক থেকে এভাবে উন্নয়ন করতে হবে। সরকার সাধ্যের মধ্যে থেকে যতটা সম্ভব সব সেবা জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে। সবকিছু ব্যাহত হচ্ছে অতিরিক্ত জনসংখ্যার কারণে। তবে একটি বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কিছু সিদ্ধান্ত রাজনীতিবিদদের নিতে হবে। সেটি বেশ শক্ত সিদ্ধান্ত। মানুষের শহরমুখিতা রোধে সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই শহরের জন্যও তাই। আর এটি করা গেলে দেশের জন্য অনেক বড় একটি কাজ হবে বলে আশা করছি। বড় করে যে পরিকল্পনা নেওয়া দরকার, সেটা নেই। পরিকল্পনা এখনো পাস হয়নি। আগে তো হোক তারপর দেখা যাবে। এখন সব বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। স্থবির হয়ে যাচ্ছে।

যারা বস্তিতে বা রাস্তায় থাকে, তাদের আপনি যেভাবেই একটি ছোট্ট ফ্ল্যাট করে দেন না কেন, সেই ফ্ল্যাটের টাকা যত কমই হোক না কেন, বস্তিতে থাকা মানুষের পক্ষে তা দেওয়া সম্ভব নয়। তাদের আয়ের সব অংশ চলে যায় খাবার এবং থাকার জন্য। কোনো অবশিষ্ট থাকে না। যা থাকে তা দিয়ে আবাসনের জন্য কিছু করা সম্ভব না। এর আগেও এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে অন্য মানুষ বাস করছে। বস্তিবাসী মধ্যবিত্তের কাছে বাড়ি বিক্রি করেছে।

এ জন্য আমি বলব, যারা বস্তিতে আছে, তাদের সেখানে রেখে সেবার মান বাড়ানো। পানি দেওয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে খোঁজ নেওয়া। শিশুদের শিক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া। চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সেবা দেওয়া। এগুলো ব্যবহারের একটি নীতিমালা করে দেওয়া। এই সেবা যদি বস্তিতে থাকা একজন মানুষ পায়, তাহলে সে সেখানে তার ওই কম জায়গাই ভালো থাকতে পারবে। এককথায়, তার সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একজন বস্তিবাসীর জন্য একটি ফ্ল্যাট কম টাকায় করে দেওয়া হতে পারে তাদের সহায়তায়। সরকারের পক্ষ থেকে বস্তিবাসীর জন্য এটি উপহারস্বরূপ কাজ করবে। এভাবে ভিন্ন আঙ্গিকে ভেবে কাজ করতে হবে।

ভাসমান বাড়ি

বস্তি এলাকার মানুষের জন্য আমার একটি ভিন্নমত রয়েছে। তাদের নিয়ে গবেষণা করেছি। সেটি জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে অনেক ভূমিকা রাখতে পারত যদি এটার বাস্তবায়ন করা যেত। একটা সময় হাতিরঝিলের বস্তিতে অনেক লোক বসবাস করত। ওই সময় বড় বস্তি ছিল এখানে। ঠিক তখন আমার মাথায় আসে, এই লোকগুলোকে আমরা নৌকায় করে থাকার একটি প্রকল্প হাতে নিতে পারি। আমি এটা দেখেছি থাইল্যান্ডে। সেখানে ভাসমান বাড়ি রয়েছে। আমরা যদি এই ভাসমান বাড়ি করতে পারতাম, তাহলে খুব ভালো হতো। তারা নৌকায় ঘুরবে, বাজার করবে, রাতে সেখানে ঘুমাবে এভাবে জীবনধারণ করবে। এটা অনেক ভালো হতো ওদের জন্য। আমাদের দরকার ছিল একটি নিয়ম করে দেওয়া। তারা এই নিয়মের মধ্যে থাকবে। সরকারের পক্ষ থেকে কিছু সহায়তা দেওয়া হবে। তাহলে হাজার হাজার মানুষ এই শহরের মাঝে নৌকায় করে জীবনধারণ করতে পারত। তাদের জীবন সুন্দর হতো।

এ ছাড়া এখন অনেক বড় জলাধার ও ঢাকার আশপাশের নদীতে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ভাসমান আবাসন প্রকল্প চালু করা যেতে পারে। এতে তাদের আবাসনসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব। দেশের প্রয়োজনে ভৌগোলিক অবস্থা বিবেচনা করে অনেক ইউনিক সিদ্ধান্ত আমাদের নিতে হয়। নৌকায় করে ভাসমান বাড়ি তেমনি একটি সিদ্ধান্ত। এটা আমার প্রস্তাব ছিল। বাস্তবায়নের দায়িত্ব আমার নয়। সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিলে অনেক ভালো হতো। 

কম খরচে যদি ভাসমান বাড়ি করা যেত তাহলে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এই পদ্ধতি অনেক ভালো হতো…

শহরকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে নিম্ন আয়ের মানুষকে রাখতে হবে। তাদের বাদ দিয়ে কোনো পরিকল্পনা সফল হবে না। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য যা করার দরকার তা কিন্তু হচ্ছে না। মধ্যবিত্তের জন্য আদৌ কোনো কিছু করতে পেরেছে কি সরকার। রাজউক বাড়ি করার জন্য জায়গা দিচ্ছে। কিন্তু কজন সে জায়গায় বাড়ি করতে পারছে। কোনো না কোনো হাউজিং প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে দিচ্ছে। তারা বাড়ি করে ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন। যদিও এটি ভালো। কিন্তু আরও মানুষ রয়েছে, তাদের কথা ভাবছে কজন।

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সত্যিকার অর্থে পরিবেশবান্ধব কোনো কাজ করতে পারছি না। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা রয়েছে, তার প্রয়োগ নেই। একদম নেই তা কিন্তু না। আছে কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এই সুন্দর আইনের বাইরে গিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। এ জন্য স্থপতিদের ওপর চাপ দেওয়া হয় নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে। নির্মাতারা ভাবেন, একবার বাড়ি করে ফেললে টিকে যাবে। দেশের কথা ভেবে সরকার ভাঙতে আসবে না। আর কিছু টাকা-পয়সা খরচের প্রবণতা তো আমাদের দেশে প্রতিষ্ঠিত। এভাবে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অনেকটা পাশ কাটিয়েই যত্রতত্র বাড়িঘর আইনবহির্ভূতভাবে নির্মিত হচ্ছে। যে যার মতো যা ইচ্ছা তা-ই করছে।

খেলার মাঠ কোথায় করবেন। আপনার জায়গা কোথায়। জায়গা নেই তাই মাঠ হচ্ছে না। আগে আপনার থাকার জায়গা করতে হবে, তারপরে না খেলার মাঠের কথা চিন্তা করবেন। আমাদের বর্তমানে যে আইন রয়েছে সেখানে প্রতিটি বাড়িতে খোলা জায়গা রাখার কথা বলা আছে। বাচ্চাদের কথা মাথায় রেখে এটা করা হয়েছে। আমার একটি প্রস্তাব হচ্ছে, ঢাকার সব এলাকায় কোথাও হয় মাঠ বা পার্ক দুটির একটি আছেই। এটিকে সমন্বয় করা। বাচ্চাদের কথা চিন্তা করে, একটি সময় ভাগ করা। যেখানে খেলার মাঠ আছে তার চারপাশ দিয়ে হাঁটার জন্য একটি লেন করা। সেটা ছোট হতে পারে। দুজনের হাঁটতে পারার মতো হলেও হবে। তাহলে পার্কের কাজটিও হলো আবার বাচ্চাদের খেলার জায়গাও থাকল। অন্যদিকে, পার্কগুলোতে হাঁটার এবং খেলার জন্য ব্যবস্থা রাখা। বাচ্চাদের জন্য সময় নির্ধারণ করা। সকালে এবং সন্ধ্যায় বড়রা হাঁটবে, দুপুরে এবং বিকেলে বাচ্চারা খেলবে। এভাবে সমন্বয় করার প্রয়োজন।

ভাসমান বাড়ি

মধ্যবিত্তের বিনোদনকেন্দ্রের মান এখন ভালো না। বড়লোকদের জন্য এক রকম, গরিবদের জন্য অন্য রকম। গরিবরা যাওয়ার জায়গা পাচ্ছে না। মধ্যবিত্তের লোকজন বাসায় বসে থাকছে। বড়লোকেরা তাদের মতো করে বিনোদনকেন্দ্র তৈরি করে নিয়েছেন। তাহলে দুটি বড় জনগোষ্ঠী এই সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পার্ক ও সিনেমা হলগুলোকে মধ্যবিত্তের আয়ত্তে আনা এবং তাদের উপযোগী করে গড়ে তোলা সরকারের দায়িত্ব।

  • প্রকাশকাল: বন্ধন ৩৫ তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৩

Related Posts

সড়ক নির্মাণের আদ্যোপান্ত (প্রথম পর্ব)

মুসলমানদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব ঈদ। এই ঈদে আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব একত্রিত হওয়ার জন্য উদগ্র একটি বাসনা নিয়ে সারা বছর…

কংক্রিটের দীর্ঘস্থায়িত্ব (১ম পর্ব)

কংক্রিট সারা বিশ্বে বহুল ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রী। আমাদের জীবনে কংক্রিটের ব্যবহার এতটাই বিস্তৃত যে আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এক…

প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক বৈশ্বিক উষ্ণতায় বাংলাদেশের কোন ঝুঁকি নেই

প্রকৌশলী ম. ইনামুল হকের জন্ম ২৩ জুলাই ১৯৫১ সালে, চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা থানার ধান্যঘরা গ্রামে। পিতা মো. ইব্রাহিম, মাতা…

(রিহ্যাব)-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট লিয়াকত আলী ভূঁইয়া আবাসন শিল্পে রিহ্যাবের গৃহঋণ নাগরিকদের স্বস্তি দেবে

লিয়াকত আলী ভূঁইয়া। রিয়েল এস্টেট হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট। সফল ব্যবসায়ী। ব্রিক ওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের…

01~1
previous arrow
next arrow

CSRM

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

কী কী থাকছে আকাশছোঁয়া শান্তা পিনাকলে
সমুদ্রবাণিজ্যের বর্জ্য থেকে অনন্যা এক স্থাপত্য
Home of Haor
Weather
Youth Park
Tower
শহর,সেতু আর সুরের টেনেসির আর্টস সেন্টার
Al Hamra
Teroshri Mosq