Image

ডিজিটাল যাযাবরদের যুগে শহরের নতুন মালিক কারা?

সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে “ডিজিটাল নোম্যাড” বা ঘরে বসে কাজ করা কর্মীর সংখ্যা বাড়ায় শহরের স্থাপত্যও বদলে যাচ্ছে। লিসবন, মেক্সিকো সিটি, এথেন্স ও বালিতে এই প্রবণতা বদলে দিচ্ছে ভবনের ব্যবহার, অ্যাপার্টমেন্ট সংস্কার এবং আবাসনের বাজার।

এসব উচ্চ-আয়ের বিদেশি কর্মীদের আগমনে শহরে বিনিয়োগ বাড়লেও স্থানীয়দের তুলনায় বাড়ির দাম বেড়ে যায়। স্বল্পমেয়াদি ভাড়া বাড়ে, আর স্থাপত্য গড়ে ওঠে এমন মানুষদের জন্য যারা কয়েক মাসের জন্যই থাকেন।

এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে যেখানে বিদেশিদের ক্রয়ক্ষমতা স্থানীয় আয়ের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে দীর্ঘমেয়াদি বাসা হয়ে যায় স্বল্পমেয়াদি ভাড়াঘর। বড় বাড়ি ভাগ হয় ছোট স্টুডিওতে, পুরনো ভবনের সামনের অংশ রেখে ভেতরটা নতুন করে সাজানো হয়, আর পাড়ার দোকান-ক্যাফে জায়গা বদলে ফেলে।

অ্যাক্রোপলিস মিউজিয়াম, পাহাড় ও পার্থেনন— এথেন্সের ড্রোন দৃশ্য। ছবি: ডিজাইনবুম
লিসবন: ঐতিহাসিক আবাসন যখন বিনিয়োগ-সম্পদ

পর্তুগালের গোল্ডেন ভিসা ও নন-হ্যাবিচুয়াল রেসিডেন্ট কর্মসূচির পর এসেছে ডি৮ ডিজিটাল নোম্যাড ভিসা। যা বিদেশি পেশাজীবীদের জন্য দেশটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

এর প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট লিসবনের অ্যাপার্টমেন্ট ভবনগুলোতে। পুরনো ভবনের বাইরের অংশ অক্ষত রেখে ভেতরটা ভেঙে নতুন করে সাজানো হচ্ছে। খোলামেলা নকশার ছোট ইউনিট বানানো হচ্ছে স্বল্পমেয়াদি ও উচ্চমূল্যের ভাড়াটেদের জন্য। একে বলা হয় “ফ্যাসাডিজম।”

আগে এসব ভবনের কক্ষ, সিঁড়ি ও আঙিনায় পরিবারগুলোর একটা নিজস্ব জীবনযাপন ও সম্পর্ক গড়ে উঠত। সেই পুরনো বিন্যাস ভেঙে অস্থায়ী বাসিন্দাদের জন্য নতুন ইউনিট বানানোয় শুধু স্থাপত্য নয়, বদলে যাচ্ছে ভবনের সামাজিক কাঠামোও।

মেক্সিকো সিটির জায়গাগুলো তার নিজস্বতা হারাচ্ছে। ছবি: ডিজাইনবুম
মেক্সিকো সিটি: এক-রকম দেখতে হয়ে ওঠা ঘরবাড়ি

মেক্সিকো সিটির রোমা নর্তে এলাকা এখন দেখতে অনেকটা লিসবন বা বালির মতোই হয়ে উঠছে। এতে ডিজিটাল নোম্যাডদের এক শহর থেকে আরেক শহরে যাওয়া সহজ হলেও, জায়গাগুলো তার নিজস্বতা হারাচ্ছে। একে বলা হয় “এয়ারস্পেস”। মানে জায়গার ভাবটা খুব আপন যে বাইরের মানুষের আরাম হয়, কিন্তু এতে একরকম যে স্থানীয় বৈশিষ্ট্য তা মুছে যায়। 

সঙ্গে বদলাচ্ছে অর্থনীতিও। অ্যাপার্টমেন্ট সংস্কার হচ্ছে ধনী, স্বল্পমেয়াদি ভাড়াটেদের জন্য, আর পাড়ার পুরনো দোকানের জায়গায় আসছে বিদেশিদের জন্য তৈরি ক্যাফে ও ফিটনেস স্টুডিও।

বালি’র পেরেরেনান এলাকায় কৃষক সম্প্রদায়কে জমি ও পানির জন্য লড়তে হয় । ছবি: ডিজাইনবুম
এথেন্স: পলিকাটোইকিয়া যখন স্বল্পমেয়াদি থাকার জায়গা

গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে স্বল্পমেয়াদি ভাড়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে “পলিকাটোইকিয়া”-তে। এলাকাটির যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক, যা শহরের অধিকাংশ পাড়ার চেহারা ঠিক করে দিয়েছে সেসব বদলে যাচ্ছে। এসব ভবনের ওপরের তলায় আগে স্থানীয়রা ভাড়া থাকতেন। এখন বিনিয়োগকারীরা সেগুলো কিনে স্বল্পমেয়াদি ভাড়ায় বদলে দিচ্ছেন। কোথাও কোথাও পুরো ভবনটাই কিনে হোটেল বা ভাড়া-ইউনিটে রূপান্তর করা হচ্ছে, যাতে বদলে যাচ্ছে ভবন ও তার আশেপাশের সম্প্রদায় দুটোই। 

বদলে যাচ্ছে ভবন ও তার আশেপাশের সম্প্রদায় দুটোই। ছবি: ডিজাইনবুম
বালি: কৃষি ও জলব্যবস্থার সঙ্গে সংঘাত

বালিতে সমস্যাটা একটু ভিন্ন, কারণ এখানে উন্নয়ন সরাসরি কৃষিব্যবস্থার সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। বালির ঐতিহ্যবাহী সেচব্যবস্থা “সুবাক” ধানচাষ, পানি, সমাজ ও ধর্মীয় রীতিকে একসঙ্গে জুড়ে রাখে। কোনো উন্নয়ন প্রকল্প কৃষিজমি দখল করলে বা সেচনালীতে হাত দিলে, তার প্রভাব শুধু একটি গ্রামের চেহারাই বদলে দিচ্ছে তা নয়। একইসাথে পানি, চাষ, জমির মালিকানা ও সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা, সবকিছুই তখন এক সংঘাতের অংশ হয়ে যায়।

একটি ব্যক্তিগত ভিলায় হয়তো ভালো ইন্টারনেট, বিকল্প বিদ্যুৎ, বাগান আর সুইমিং পুল থাকে, অথচ তার পাশের কৃষক সম্প্রদায়কে জমি ও পানির জন্য লড়তে হয়। এভাবেই ডিজিটাল নোম্যাডদের জন্য তৈরি এসব জায়গায় এমন এক অসমতা তৈরি হয়, যা আরামদায়ক পরিবেশের ভেতর থেকে সহজে চোখে পড়ে না।

লিসবনে পুরনো বাড়ি পরিণত হচ্ছে বিনিয়োগ ও হোটেল-জাতীয় সম্পদে। ছবি: ডিজাইনবুম
চার শহরের অভিন্ন সূত্র

লিসবন, মেক্সিকো সিটি, এথেন্স ও বালি— এই চারটি জায়গা মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, আসলে একই প্রক্রিয়া বিভিন্নভাবে ঘটছে। লিসবনে পুরনো বাড়ি পরিণত হচ্ছে বিনিয়োগ ও হোটেল-জাতীয় সম্পদে। মেক্সিকো সিটিতে স্থানীয় স্থাপত্য হারিয়ে যাচ্ছে একরকম বিশ্বজনীন নকশার ভিড়ে। এথেন্সে পুরনো অ্যাপার্টমেন্ট বদলে যাচ্ছে স্বল্পমেয়াদি ভাড়াঘরে। আর বালিতে পর্যটন-উন্নয়ন পৌঁছে যাচ্ছে কৃষি ও পানি ব্যবস্থা পর্যন্ত।

সংস্কার করা অ্যাপার্টমেন্ট, কো-ওয়ার্কিং স্পেস, বুটিক ক্যাফে, ভিলা আর হারিয়ে যাওয়া পাড়ার দোকান সবই একই বদলের বিভিন্ন রূপ। এসব দেখিয়ে দেয়, একটি শহরের গঠন কত দ্রুত নতুন এক অর্থনৈতিক শ্রেণির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে।

এথেন্সে পুরনো অ্যাপার্টমেন্ট বদলে যাচ্ছে স্বল্পমেয়াদি ভাড়াঘরে। ছবি: ডিজাইনবুম

ডিজিটাল নোম্যাডদের অর্থনীতি একদিকে শহরে বিনিয়োগ ও প্রাণচাঞ্চল্য আনে, অন্যদিকে আবাসন, পাড়ার ব্যবসা ও কৃষিজমির ওপর চাপ তৈরি করে। লিসবনের ফ্যাসাডিজম, এথেন্সের পলিকাটোইকিয়া-রূপান্তর, মেক্সিকো সিটির একরকম নকশার ছড়াছড়ি আর বালির সুবাক ব্যবস্থার ওপর চাপ সব মিলিয়ে একটাই প্রশ্ন সামনে আসে: শহর যখন ডিজিটাল নোম্যাডদের গন্তব্য হয়ে ওঠে, তখন সেখানে থেকে যাওয়ার সুযোগ শেষ পর্যন্ত কার হাতে থাকে?

তথ্যসূত্র: 

ডিজাইনবুম

Related Posts

সিউলের হাইওয়ে ভেঙে নদী ফিরিয়ে আনতেই কমল যানজট

দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি ছোট নদীর নাম চেওংগিয়েচন। এক সময় নগরায়নের কারণে এই…

হোমালি যেনো রেস্তোরাঁ নয় ধান গাছের জীবন গল্প

নিউইয়র্কের পশ্চিম গ্রামের থাই রেস্তোরাঁর ইন্টেরিয়র ডিজাইন যেনো শুধু খাবারের পরিবেশই নয়। এটি একটি সাংস্কৃতিক গল্প বলার মাধ্যমও…

স্থাপত্যে বাংলাদেশের ঝুলিতে এলো আরও দুটি অর্জন

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আবারও উজ্জ্বল হলো বাংলাদেশের স্থাপত্যশৈলী। কমনওয়েলথ অ্যাসোসিয়েশন অব আর্কিটেক্টসের (সিএএ) ২০২৬ সালের পুরস্কার তালিকায় জায়গা করে…

আজকাল স্থপতিরা কেন ভবনের বাইরেও বেশি কিছু ডিজাইন করছেন?

স্থাপত্য বলতে এতদিন আমরা বুঝেছি ইট, কংক্রিট আর কাঁচের কাঠামো তৈরির শিল্প। কিন্তু বর্তমান সময়ে এই ধারণা বদলে…

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

অভিনেতার নিউ ইয়র্কের বাড়িতে এক অবাক করা পল্লীসুলভ ছোঁয়া
সিউলের হাইওয়ে ভেঙে নদী ফিরিয়ে আনতেই কমল যানজট
হোমরালি রেস্তোরাঁ
স্থাপত্যে বাংলাদেশের ঝুলিতে এলো আরও দুটি অর্জন
আজকাল স্থপতিরা কেন ভবনের বাইরেও বেশি কিছু ডিজাইন করছেন?
স্থাপত্যে প্রায়েমিয়াম ইম্পেরিয়াল পুরস্কার জিতলেন লিবেসকিন্দ
Arch De Trump
কেন স্বেচ্ছায় নিজের “স্থপতি” উপাধি মুছে ফেললেন RIBA সভাপতি?
construction