মানবসভ্যতার শুরু থেকেই পাথরের ব্যবহার লক্ষণীয়। হাজার হাজার বছর আগে নির্মিত পাথরের স্থাপনাসমূহ এখন দাঁড়িয়ে আছে বহাল তবিয়তে। মূলত দীর্ঘস্থায়িত্ব, মজবুত ও সহজ প্রাপ্যতার জন্যই নির্মাণ উপকরণ হিসেবে পাথর অত্যন্ত জনপ্রিয়। ভবন, সড়ক, রেলপথ, বাঁধ, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে পাথরের বিকল্প নেই বললেই চলে। পাথর কংক্রিট ও সিমেন্টের অন্যতম উপাদান। ভাস্কর্য নির্মাণ, ইন্টেরিয়র ও এক্সটেরিয়র ডিজাইনেও পাথর অনন্য এক উপকরণ।
প্রকৃতিতে সাধারণত বেশ কয়েক ধরনের পাথর পাওয়া যায়। যেমন, পাহাড়ি নদীর অববাহিকায়, ভূগর্ভস্থ খনি, পাহাড় বা টিলা কেটে এবং আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ ও সংলগ্ন এলাকা থেকে। এ ছাড়া পাহাড়ি নদীসংলগ্ন জমির তলদেশ থেকেও পাথর সংগ্রহ করা হয়। পাহাড় থেকে স্রোতে ভেসে আসা পাথর উন্মুক্ত পদ্ধতিতে, ভূগর্ভস্থ খনির পাথর আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে উত্তোলন, সমুদ্র তীরবর্তী এলাকা থেকে এবং সমতলভূমির পাথর অনেক সময় অবৈধ বোমা মেশিন ব্যবহার করে সংগ্রহ করা হয়। এরপর বড় আকারের বোল্ডার পাথর ক্র্যাশার মেশিনে কেটে বা ভেঙে বিভিন্ন আকার প্রদান করা হয়।
প্রকৃতিতে প্রাপ্ত পাথর বিভিন্ন ধরনের। এসবের মধ্যে বোল্ডার, গ্রেভেল, সিঙ্গেল, চুনাপাথর ও সারকিন এই পাঁচ ধরনের পাথর আমাদের দেশে বেশি ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে বোল্ডার পাথর, গ্রেভেল পাথর ও চুনাপাথর ভেঙে সাইজভেদে নির্মাণ উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আর টিলা কেটে মাঝেমধ্যে পাওয়া যায় সারকিন পাথর। সাধারণত স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা ছাড়াও বিদেশ থেকেও অনেক পাথর আমদানি করা হয়। বাংলাদেশে সিলেট, পার্বত্য চট্টগ্রাম, দিনাজপুর ও পঞ্চগড়ে বিভিন্ন ধরনের পাথর পাওয়া যায়। সবখানেই পাহাড়ি নদীর অববাহিকায় পাথর মিললেও একমাত্র দিনাজপুরের পার্বতীপুরে রয়েছে পাথরের খনি। পাথররাজ্য হলো সিলেট। দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ পাথর সংগ্রহ করা হয় এ জনপদ থেকে, ১৫ শতাংশ পাথর পাওয়া যায় দিনাজপুর আর ৫ শতাংশ চট্টগ্রাম থেকে আর বাকি পাথরগুলো আসে হিমালয়ের কোলঘেঁষা পঞ্চগড় ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ, গোয়াইনঘাটের জাফলং ও বিছনাকান্দির, হাদারপাড়, লামা, ভেড়িবিল, পীরের বাজারসহ ভারতীয় সীমান্তবর্তী প্রায় প্রতিটি নদীতেই প্রচুর পরিমাণ পাথর উত্তোলন করা হয়। এ ছাড়া কোয়ারি এলাকার আশপাশের জমি খুঁড়েও পাথর তোলা হয়।
স্থানীয় পাথর ছাড়াও আরও অনেক ধরনের পাথর ভারত, পাকিস্তান, তুরস্ক, চীন ও ইতালি থেকে আমদানি করা হয়। এসব পাথরের মধ্যে রয়েছে বোল্ডার, চুনাপাথর, গ্রানাইট পাথর, মার্বেল পাথর, হরিকেল পাথর, টাইলস পাথর, কেরালা পাথর, ব্যাসল্ট, ক্রাশড স্টোন, ফেরো অ্যালয় ও বিলেট।
পাথরের ব্যবহার
- ইমারত নির্মাণ (সেতু, কালভার্ট ও দালান)
- সিমেন্ট তৈরিতে
- কংক্রিট ও রেডিমিক্স তৈরিতে
- সড়ক নির্মাণে
- রাসায়নিক উৎপাদনে
- কাচ তৈরিতে
- সিরামিকস তৈরিতে
- বালু তৈরিতে
- লাইম (চুন) তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
গ্রানাইট
গ্রানাইট পাথর সৌন্দর্যবর্ধন, দালানের কারুকাজ, দেয়ালের কারুকাজে ব্যবহৃত হয়।
লাইম স্টোন
সাধারণ চুন তৈরিতে লাইম স্টোন ব্যবহৃত হয়। দেয়ালের চুনকামের কাজে এই পাথর ব্যবহৃত হয়।
মার্বেল পাথর
মার্বেল পাথরের নানামুখী ব্যবহার রয়েছে। টেবিলের কাগজ বাতাসে ওড়া থেকে নিত্যব্যবহার্য স্থাপনায় মার্বেল পাথরের ব্যবহার রয়েছে। নিচে মার্বেল পাথর ব্যবহারের বিষয়বস্তু তুলে ধরা হলো-
- টাইলস তৈরিতে
- ফ্লোর তৈরিতে
- সিরামিক তৈরিতে
- ওয়াশ রুমের ফ্লোরে
- ডাইনিং ফ্লোরে ও
- বাথটাবে
আকার বা সাইজ
নির্মাণসামগ্রী হিসেবে ব্যবহৃত পাথরগুলো বিভিন্ন আকারের বা সাইজের হয়ে থাকে। সাধারণ ৩/৪ ডাউন গ্রেড, ১/২ ইঞ্চি, ১.৫ ইঞ্চি, ৪/৩ ইঞ্চি ও পাই সাইজের পাঁচ ধরনের আকারের পাথর ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন আকারের পাথরের দরদাম-
৩/৪ ডাউন গ্রেড পাথর: বিল্ডিং নির্মাণের ক্ষেত্রে স্লাব ও কলাম তৈরিতে এ আকারের পাথর ব্যবহৃত হয়। এই সাইজের পাথর বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করে বিক্রি করা হয়। বর্গফুট ও বর্গমিটার অনুযায়ী বিক্রি করা হয়। স্থানীয় বাজারে বর্গফুট আর আন্তর্জাতিক বাজারে বর্গমিটারে বিক্রি হয় ৩/৪ ডাউন গ্রেড পাথর।
| গ্রেড বা শ্রেণি | দাম ( প্রতি বর্গফুট) | দাম (প্রতি বর্গমিটার) |
| প্রথম | ৯০-৯৫ | ৯৬০-৯৭০ |
| দ্বিতীয় | ৮০-৮৫ | ৮৫০-৮৬০ |
| তৃতীয় | ৬০-৬৫ | ৬৪০-৬৫০ |
১/২ ইঞ্চি পাথর: সড়ক নির্মাণকাজে ব্যবহৃত হয় এই সাইজের পাথর। আধা ইঞ্চি পাথরও তিন মানের রয়েছে। বিভিন্ন মানের পাথর বিভিন্ন দামে বিক্রি হয়। আধা ইঞ্চি পাথরের শ্রেণি, বর্গফুট ও বর্গমিটারের বর্ণনা-
| গ্রেড বা শ্রেণি | দাম ( প্রতি বর্গফুট) | দাম (প্রতি বর্গমিটার) টাকা |
| প্রথম | ১৫০-২০০ | ১৫০০-১৬০০ |
| দ্বিতীয় | ১৩০-১৫০ | ১৪০০-১৫০০ |
| তৃতীয় | ১০০-১২০ | ১৩০০-১৪০০ |
১.৫ ইঞ্চি পাথর: সড়কের (হাইওয়ের) সাব বেইজে দেড় ইঞ্চি পাথর ব্যবহৃত হয়। এ রকম পাথরেরও তিনটি ধরন রয়েছে। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় এ তিন শ্রেণির পাথর বাজারে বিক্রি হয়। শ্রেণিভেদে পাথরের দাম-
| গ্রেড বা শ্রেণি | দাম ( প্রতি বর্গফুট) | দাম (প্রতি বর্গমিটার) |
| প্রথম | ২০০-২২০ | ২০০০-২১০০ |
| দ্বিতীয় | ১৮০-২০০ | ১৯০০-২০০০ |
| তৃতীয় | ১৬০-১৮০ | ১৮০০-১৯০০ |
৪/৩ ইঞ্চি পাথর: এই সাইজের পাথর রাস্তা নির্মাণের কাজে ব্যবহৃত হয়। বর্গফুট ও বর্গমিটার অনুযায়ী এই পাথর বিক্রি হয় বাজারে। এই পাথরেরও রয়েছে তিনটি শ্রেণি। ৪/৩ আকারের পাথরের দরদাম-
| গ্রেড বা শ্রেণি | দাম ( প্রতি বর্গফুট) | দাম (প্রতি বর্গমিটার) |
| প্রথম | ১০০-১১০ | ৯০০-১০০০ |
| দ্বিতীয় | ৯০-১০০ | ৯০০-৯৫০ |
| তৃতীয় | ৮০-৯০ | ৮৫০-৯০০ |
পাই সাইজ পাথর
সাধারণত সড়কের অ্যাসফল্টে পাই আকারের পাথর ব্যবহৃত হয়। পিচঢালা রাস্তার মূল কাজে পাই আকারের পাথর ব্যবহৃত হয়। এই পাথরের আকার ডানার মতো। পাই পাথরেরও রয়েছে তিনটি শ্রেণি। ছকে বর্গফুট ও বর্গমিটার অনুযায়ী শ্রেণিভেদে পাথরের দাম-
| গ্রেড বা শ্রেণি | দাম (প্রতি বর্গফুট) | দাম (প্রতি বর্গমিটার) |
| প্রথম | ৮০-৮৫ টাকা | ৮০০-৯০০ টাকা |
| দ্বিতীয় | ৭৫-৮০ টাকা | ৭০০-৮০০ টাকা |
| তৃতীয় | ৬০-৭০ টাকা | ৬০০-৭০০ টাকা |
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৫তম সংখ্যা, মে ২০১৭।