নিত্যব্যবহার্য বস্তু হিসেবে পৃথিবীর সর্বত্রই ব্যবহৃত হয় পলিথিন। দামে সাশ্রয়ী, ওজনে হালকা, পানিরোধী ও সহজপ্রাপ্য হওয়ায় এটি বেশ জনপ্রিয়ও। তবে পলিথিন পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। প্রশ্ন হতে পারে ক্ষতিটা কীভাবে? পলিথিন তৈরি হয় পলিমার যৌগ দিয়ে। অত্যন্ত বিষাক্ত প্রপাইলিনের সঙ্গে পেট্রোলিয়াম হাইড্রোকার্বনের কয়েকটি যৌগের সমন্বয়ে তৈরি হয় পলিথিন। এই রাসায়নিক সহজে পচে না কিংবা ঘটে না এর কেনো রূপান্তর। পচে না বলেই তা সহজে মাটির সঙ্গে না মেশায় নষ্ট হয় পারিপার্শি¦ক পরিবেশ-প্রতিবেশ। আর তাই বিশ্বব্যাপী চেষ্টা চলছে বিকল্প পরিবেশবান্ধব উপকরণ উদ্ভাবন ও ব্যবহারের।
প্লাস্টিক মাটিতে মিশে যেতে সময় লাগে প্রায় এক হাজার বছর। এর পরিবেশগত হুমকিও মারাত্মক। অনেক সময় সামুদ্রিক মাছ ভুলবশত প্লাস্টিক খাওয়ায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। অন্যান্য প্রাণী অথবা পাখি প্লাস্টিক ব্যাগে আটকে নিজ ভারের কারণে গভীর পানিতে পড়ে অথবা বাঁচার জন্য উড়তে না পারায় মৃত্যু হয় পাখিগুলোর। সমুদ্র বা নদীতে বিচরণকারী এক মিলিয়নের বেশি পাখির প্রতিবছর মৃত্যু হয় প্লাস্টিকদূষণের কারণে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশবিদদের মতে, সাগরের পানিতে প্রতি বর্গমাইল এলাকাজুড়ে প্রায় ৪৬ হাজার টুকরো প্লাস্টিকের কনটেইনার ভেসে থাকে। পরিবেশবাদী সংগঠন ‘গ্রিন পিস’ বলছে, কমপক্ষে ২৬৭ ধরনের সামুদ্রিক জলজ প্রাণী সব সময় অসুস্থতায় ভোগে জলচর প্রাণীর ধ্বংসাবশেষ খাওয়ার পর হজম না করতে পারায়। কারণ, সেই ধ্বংসাবশেষে থাকে প্রায় ৯০ শতাংশ প্লাস্টিক উপাদান।
প্লাস্টিক ব্যাগে যেসব খাবার সংরক্ষণ করা হয়, তা মোটেও নিরাপদ নয়। পলিথিনে মোড়ানো মাছ এবং মাংসতে তৈরি হয় একধরনের উত্তাপ, যা তেজস্ক্রিয়তা তৈরি করে। যার সর্বশেষ পরিণতি খাদ্যে বিষক্রিয়া। এ ছাড়া পলিথিনে মোড়ানো মাছ, মাংস এবং শাকসবজিতে সংক্রমিত হয় Anaeraobic Bacteria। এই জীবাণু মূলত চর্মরোগ ও ক্যানসারের জন্য দায়ী। পলিথিনে যেসব রং ব্যবহার করা হয় সেটাও স্বাস্থ্যের জন্য ভীতিকর। গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে পলিকাপে চা পানে পেটে আলসার ও ক্যানসার হয়। আর তাই প্লাস্টিকের বিরূপ এ প্রভাব যেন আরও দীর্ঘায়িত না হয় সে জন্য কাগজ, কাপড়, পাটজাত দ্রব্যাদি, কাচ হতে পারে প্লাস্টিকের চমৎকার বিকল্প, যা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে এখনই। যদিও প্লাস্টিকের উৎপাদন এখনো চলছে। প্লাস্টিক পুড়িয়ে ফেলা উচিত নয়, এটা থেকে নিষ্কৃতি পেতে। প্লাস্টিক পোড়ানোর পর যে ধোঁয়া সৃষ্টি হয়, তা কিন্তু পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে দূষিত করে তোলে। যে কারণে মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণে অসুবিধা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, পলিথিন ব্যাগ এবং অন্যান্য প্লাস্টিকের তৈরি জিনিসপত্র যদি ৭০০০০ সেন্টিগ্রেডের নিচে আগুনে পোড়ানো যায়, তবে ডায়াকিন (Diakin) নামক বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়, যাতে সৃষ্টি করতে পারে ক্যানসার ও চর্মরোগ। প্লাস্টিক মাটিতে না পুঁতে বরং রিসাইকেলিং করে ব্যবহার করা যায় বিভিন্নভাবে, বহনকারী ব্যাগ হিসেবে, প্লাস্টিকে তৈরি কোষে জিনিসপত্র রাখার মতো কাজে।
বায়োডিগ্রেডেবেল
বায়োডিগ্রেডেবেল (Biodegradable) শব্দের অর্থ জীবাণু দ্বারা ক্ষত হতে পারে এমন বস্তুর উপস্থিতি। বায়োডিগ্রেডেবেল সামগ্রী প্রাকৃতিক নিয়মে মাটিতে পচনশীল। অর্থাৎ মাটিতে পুঁতে ফেললে তা প্রাকৃতিকভাবেই মাইক্রো-অর্গানিজম দ্বারা এবং বায়োলজিক্যাল প্রসেসের মাধ্যমেই মাটিতে মিশে যায়। বায়োডিগ্রেডেবল বর্জ্য দিয়ে প্রস্তুত কোনো সামগ্রীকে গ্রিনওয়েস্ট, ফুডওয়েস্ট অথবা অর্গানিক ওয়েস্ট নামে ডাকা হয়। যখন বায়োডিগ্রেডেবল উপকরণে কোনো কিছু তৈরি করে প্রকৃতির খোলা আকাশের নিচে রাখা হয়, তখন তা অক্সিজেন ও জলীয় বাষ্পের সংস্পর্শে ভেঙে যায় খুব ধীরে ধীরে। যার কয়েকটি দৃষ্টান্ত হলো-
প্লাস্টিক ব্যাগের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে কাগজের তৈরি ব্যাগ, কাপড়ের ব্যাগ (পুনর্ব্যবহার করে কাগজ অথবা সংবাদপত্রের কাগজ), পাটের তৈরি ব্যাগকে।
প্লাস্টিকের যত বিকল্প ব্যবহার
কাগজের ব্যাগ
কাগজ একটি পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান, যা তৈরি হয় গাছ ও বাঁশ থেকে। কাগজের ব্যাগ তৈরি করা একই সঙ্গে সহজ, সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য। পুরোনো খবরের কাগজ বা পুনর্ব্যবহৃত কাগজ দিয়েও কাগজের মন্ড তৈরি করা যায়। যদিও কাগজ উৎপাদনে গাছ কাটতে হয়। এতে জ্বালানি, পানি ও শক্তির প্রয়োজন হয়, তবে তা প্লাস্টিক ব্যাগ তৈরির চেয়ে তিন গুণ কম।
পাটের ব্যাগ
পাটের ব্যাগ শতভাগ পরিবেশবান্ধব। মাটিতে সহজেই মিশে যায় বলে এটি একটি পচনশীল উপাদান। এক হেক্টর জমিতে পাটগাছ ১৫ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করতে পারে এবং বের করে দেয় ১১ টন অক্সিজেন। পাটের দামও অনেক কম, তাই দামের দিক থেকে যথেষ্ট সাশ্রয়ী। পাটের ব্যাগ পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করে ব্যবহার করা যায় বহুবার। পাট চাষে মূলত বৃষ্টির পানি ব্যবহৃত হয়। যে কারণে ক্ষতিকর জীবাণুনাশক বা কীটনাশক মাটিতে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না; প্রয়োজন হয় না খুব বেশি সারেরও।
কাপড়ের ব্যাগ
কাপড়ের তৈরি ব্যাগ পরিবেশবান্ধব এবং পলিথিন ও কাগজের তৈরি ব্যাগের উত্তম বিকল্প। আয়ারল্যান্ডের মতো দেশ কাপড়ের ব্যাগ তৈরিতে বিরাট অগ্রগতি সাধন করেছে, যা পরিবেশবান্ধবও। কাপড়ের ব্যাগ তৈরির মাধ্যমে পরিত্যক্ত বস্তুর পরিমাণ কমিয়ে ফেলা যায় সহজেই। এ ছাড়া কাপড়ের তৈরি ব্যাগ প্রস্তুত করতে বৈদ্যুতিক শক্তির প্রয়োজন হয় কম। যার জন্য গ্রিনহাউস গ্যাস তৈরি করা সম্ভব এবং পরিমাণে কম বহনযোগ্য পানি ব্যবহার করা যায়। কাপড়ের তৈরি ব্যাগ নিঃসন্দেহে পরিবেশবান্ধব। এটি বেশ শক্ত ও দীর্ঘমেয়াদি। কাপড়ের ব্যাগ সচরাচর সব স্থানেই পাওয়া যায়, যার দামও অনেক কম।
কাপড়ের ব্যাগের সুতা গাছ থেকে উপজাত দ্রব্য হিসেবে পাওয়া যায়। তাই এটা মাটিতে সহজেই মিশে যেতে পারে। কাপড়ের তৈরি ব্যাগের সেলাই খুব সূক্ষ্ম হওয়ায় এটি হয় শক্ত ও মজবুত। যে কারণে বারবার ব্যবহার করা যায়। কাপড়ের তৈরি ব্যাগ দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়। সাধারণত কাপড়ের তৈরি ব্যাগ বড় আকারের বস্তু ধারণে সক্ষম। কাপড়ের তৈরি ব্যাগ কাগজ বা প্লাস্টিকের তৈরি ব্যাগের তুলনায় দীর্ঘস্থায়ী। এ ধরনের ব্যাগ তার বিশেষত্ব হারায় না যদি না ভিজে যায়।
বেতের তৈরি ব্যাগ
বেত বা কঞ্চির তৈরি শক্ত বুননবিশিষ্ট ব্যাগও সহজেই ব্যবহার করা যায়। বেত সাধারণত একধরনের গাছ থেকে পাওয়া যায়। অর্থাৎ এটি প্রকৃতি-নির্ভর উপাদান। এ ছাড়া অন্যান্য জনপ্রিয় ব্যাগ তৈরির কাঁচামাল হিসেবে নলখাগড়া এবং বাঁশের যথেষ্ট ব্যবহার রয়েছে। সাশ্রয়ী মূল্যে সর্বত্র পাওয়া যায় বিভিন্ন রং এবং মাপে। এটা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় মাটিতে মিশতে পারে সহজেই।
মুরগির পালক
মুরগির পালক থেকে তৈরি করা হয়েছে ওয়াটার রেজিস্ট্যান্স থার্মোপ্লাস্টিক। মুরগির পালকে বেশির ভাগ অংশ কেরাটিন (Keratin), যা একধরনের প্রোটিন ও সহজাতভাবে খুবই শক্ত। তাই এটাকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করা হয়েছে প্লাস্টিক, যার মধ্যে রয়েছে দীর্ঘায়ু ও শক্তির গুণাগুণ। গবেষকদের ধারণা, কেরাটিনের সঙ্গে যদি প্লাস্টিককে যুক্ত করা যায় তবে তা হবে আরও শক্তিশালী। এটা করা হয় মুগরির পালকের সঙ্গে মিথাইল একরেলাইটের (যা নেইল পলিশে পাওয়া যায়) মিশ্রণ। সব শেষে যেটা পাওয়া যায় সেটা হলো কেরাটিনভিত্তিক প্লাস্টিক। পরীক্ষান্তে প্রমাণিত যে এটি দারুণ শক্তিশালী, যা সহজে ভাঙে না অন্যান্য প্লাস্টিকের তুলনায়। আর তাই পরিত্যক্ত মুরগির পালক হচ্ছে পুনর্ব্যবহারযোগ্য একটি উপাদান, যার সাহায্যে সহজেই প্লাস্টিক তৈরি করা যায়। গবেষকেরা মনে করেন এমন প্লাস্টিক সম্পূর্ণই বায়োডিগ্রেডেবেল।
লিকুইড উড
এটি একধরনের বায়োপ্লাস্টিক বা বায়োপলিমার। একে লিকুইড উডও বলা হয়। এটা বায়োপলিমারের নকল। এই উপাদান দেখতে, অনুভব করতে এবং এর ব্যবহারের ধরন ঠিক প্লাস্টিকের মতো, তবে বায়োডিগ্রেডেবেল। এই বিশেষ ধরনের বায়োপলিমার পাল্পভিত্তিক লিগনিন, যা একটি পুনর্ব্যবহৃত উৎস থেকে নেওয়া। জার্মানরা উপাদানটিকে বিভিন্ন খেলনা, গলফ টিস (Golf Tees) এবং হাই ফাই স্পিকার বক্সে ব্যবহার করে। কেননা এটা তৈরি হয় কাঠ থেকে, যা সহজেই রিসাইকেল করা যায়।
পলিকেপ্রোলেকটন পলিস্টার
এটাও বায়োডিগ্রেডেবেল প্লাস্টিক। এটিকে এলিফেটিক পলিস্টারও বলা হয়। এ ধরনের পলিস্টার অ্যারোমেটিক পলিস্টারের মতো বহুমুখী নয়, যা সাধারণত ব্যবহার করা হয় পানির বোতল তৈরিতে। এটা সহজেই তৈরি করা যায় কিন্তু এর ব্যবহার এখনো ব্যাপক নয়।
কাচ
একসময় দুধ বিক্রেতারা কাচের বোতলে দুধ ভরত। এখন যার স্থান নিয়েছে প্লাস্টিক বোতল। কোনোটা পানির, কোনোটা আবার সোডার বা খাদ্য রাখার জন্য প্লাস্টিক কনটেইনার। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে সবকিছু। প্লাস্টিক সাধারণত পাওয়া যায় জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে। গ্লাস তৈরি করা হয় বালু থেকে। এই পুনর্ব্যবহারযোগ্য উৎসে কোনো রাসায়নিক পদার্থ থাকে না, যা খাদ্য এবং মানুষের শরীরে প্রবেশ করে দ্রবণশীল কোনো বস্তুকে তরল পদার্থের সাহায্যে গলিয়ে নিষ্কাশিত করতে পারে। এটা খুব সহজেই পুনর্ব্যবহারযোগ্য। যেটি হতে পারে প্লাস্টিকের যোগ্য উত্তরসূরি।
– প্রকৌশলী মহিউদ্দীন আহমেদ
সাবেক অতি প্রধান প্রকৌশলী, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন ফেলো, আইইবি (এফ-২৫৬৬)
প্রকাশকাল: বন্ধন ৭১ তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৬