Image

বাঁশে গড়া শৈল্পিক স্থাপনা

বাঁশের স্থাপনার চাহিদা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আবাসন চাহিদা মেটাতে একের পর এক গড়ে উঠছে সুবিশাল অট্টালিকা। এসব ভবন তৈরিতে যেসব নির্মাণ উপকরণ ব্যবহৃত হচ্ছে তার অধিকাংশই পরিবেশবান্ধব নয়। অপর দিকে পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি তা বাড়িয়ে তুলছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও। এমনই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে স্থাপত্য ও প্রকৌশল গবেষকগণ আবিষ্কার করেছেন এমন এক নির্মাণ উপকরণ, যা অত্যন্ত পরিবেশবান্ধব ও দীর্ঘস্থায়ী। উদ্ভাবিত এই নির্মাণ উপকরণটিই বাঁশ। যদিও প্রাচীনকাল থেকেই আবাসন তৈরিতে বাঁশ ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে তা বড় পরিসরের বাঁশের স্থাপনা তৈরিতে কখনোই উপযুক্ত বিবেচিত হয়নি। এর অন্যতম কারণ টেকসই স্বল্পতা। অথচ বাঁশকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ট্রিটমেন্ট ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে নির্মাণকাজে ব্যবহার করলে তা হয়ে ওঠে দীর্ঘস্থায়ী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ স্থাপত্য নির্মাণে যেসব প্রাকৃতিক উপাদানকে গুরুত্ব দিচ্ছে তার মধ্যে অন্যতম বাঁশ। বাঁশের স্থাপনার বিশেষত্ব তা প্রচন্ড গরমেও ঘরকে রাখে ঠান্ডা। বিশ্বে র প্রায় সর্বত্রই এই নির্মাণ উপকরণটি পাওয়া যাওয়ায় স্বল্পব্যয়ে আবাসন নির্মাণ সম্ভব। সঠিক নির্মাণকৌশল ও ট্রিটমেন্ট প্রদানের মাধ্যমে এ দেশেও স্থাপনাতে যুক্ত করা যায় সহজলভ্য বাঁশের ব্যবহার। এতে স্বল্পব্যয়ে শৈল্পিক স্থাপত্যের পাশাপাশি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে স্বাস্থ্যকর পরিবেশবান্ধব আবাস।  

চিরহরিৎ কাষ্ঠল উদ্ভিদ বাঁশ অত্যন্ত শক্ত হলেও আসলে তা এক প্রকার বৃহৎ ঘাস। বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল তৃণও বটে। বাঁশ প্রতিদিন গড়ে ৭.৫ থেকে ৪০ সে.মি. হারে বাড়ে। বিশ্বে ১২০০-এর অধিক প্রজাতির বাঁশ পাওয়া যায়। এর অধিকাংশই জন্মে এশিয়া, আফ্রিকা আর লাতিন আমেরিকায়। বাড়ি তৈরিতে ব্যবহৃত সফট উড যেসব গাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়, সেগুলো পরিপক্ব হতে সময় লাগে ১০ বছর। আর হার্ড উডের সময় লাগে দীর্ঘ ৩০ বছর। ফলে বাড়ি তৈরির কারণেও দীর্ঘ সময়ের জন্য ধ্বংস হয় বনাঞ্চল। বাঁশের ক্ষেত্রে তেমনটা ঘটে না। একটি বাঁশ ৩-৪ বছরের মধ্যেই পরিপক্ব হয়। ও বাঁশের গোড়ায় আরও নতুন কিছু বাঁশ জন্মে। দ্রুত বর্ধনশীল ও একই স্থানে অনেক জন্মায় বিধায় প্রকৃতিতে এটি খুবই সহজলভ্য। এ জন্য সুপ্রাচীনকাল থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে বাঁশ। এর প্রমাণও মেলে বিশ্বে র প্রাচীন কিছু বাঁশের স্থাপনা ও অবকাঠামো থেকে। চীনের কিয়ান-জিয়ান প্রদেশে খিষ্ট্রপূর্ব ৯৬০ সালের বাঁশের তৈরি সেতু এখনো বহাল তবিয়তে টিকে আছে, যদিও তা প্রতিনিয়ত মেরামত করা হয়। আবাসন নির্মাণে বাঁশের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি এশিয়াতে। 

বাঁশের বিশেষত্ব

প্রকৃতিতে বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশ পাওয়া যায়। তবে নির্মাণ উপযোগী বাঁশের কিছু বিশেষত্ব রয়েছে। যেমন-

  • সহজপ্রাপ্য
  • স্বল্পব্যয়ী
  • পরিবেশবান্ধব
  • হালকা
  • মজবুত
  • টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী
  • পুনর্ব্যবহারযোগ্য
  • সহজে পরিবহনযোগ্য
  • পছন্দ অনুযায়ী কাটা ও আকার প্রদান করা যায় 
  • নমনীয় ও ফাইবার সমৃৃদ্ধ হওয়ায় সহজে বাঁকানো যায়। ফলে ভূমিকম্পেও টিকে থাকতে পারে।
  • প্রাকৃতিকভাবেই মসৃণ, পরিষ্কার এবং চমৎকার রঙের হওয়ায় একে অতিরিক্ত পলিশ বা পেইন্ট করার প্রয়োজন হয় না।

বাঁশের স্থাপনা নির্মাণে বাঁশের ব্যবহার

বাঁশের স্থাপনা নির্মাণের নানা ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় বাঁশ। গ্রামের দোচালা ঘরের খুঁটি, চালের কাঠামো, দরজা, জানালায় হরহামেশাই বাঁশের ব্যবহার লক্ষণীয়। তবে আধুনিক স্থাপত্যে ইন্টেরিয়রের নানা কাজে বাড়ছে বাঁশের ব্যবহার। এ ছাড়া ভবনের স্কাফোল্ডিং কাজে বিশ^ব্যাপী ব্যাপক হারে ব্যবহৃত হয় এই নির্মাণ উপকরণটি। ইন্টেরিয়র ও এক্সটেরিয়রে বাঁশের যেসব ব্যবহার দেখা যায় এর মধ্যে অন্যতম- 

  • দেয়াল
  • কলাম
  • বিম
  • ছাদ
  • মেঝে
  • পার্টিশন ওয়াল
  • সীমানাপ্রাচীর বা বেড়া
  • সেতু
  • ইন্টেরিয়রের নানা কাজে।

বাঁশের ত্রুটি

আগে গ্রামবাংলার প্রায় সব ঘরবাড়ি মাটি, বাঁশ ও খড়ে নির্মিত হলেও বর্তমানে ইট ও টিনে তৈরি ঘরের চাহিদা বেড়েছে। কারণ, বাঁশ ও মাটির তৈরি ঘর দীর্ঘস্থায়ী নয়। প্রায়ই মেরামত করতে হয়। তা ছাড়া বাঁশের স্থাপনা সহজেই কীট-পতঙ্গ (উইপোকা, বিটল, ঘুণপোকা) ও ছত্রাকে আক্রান্ত হয়। এ ছাড়া প্রাকৃতিক নানা কারণে ক্ষতিগ্রস্তও হয়। এতে ব্যাহত হয় টেকসই ক্ষমতা। বাঁশের অন্যান্য ক্রটির মধ্যে রয়েছে- 

  • মাটি ও পানির সংস্পর্শে দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় বা পচে যায়।
  • বৃষ্টিতে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। 
  • শুষ্ক বাঁশে আগুন লাগলে তা সহজেই পুড়ে যায়।
  • ইন্টেরিয়রের ক্ষেত্রে একই আকারের বাঁশ পেতে বেগ পেতে হয়।
  • প্রিজারভেশন ছাড়া স্থায়িত্ব বাড়ানো সম্ভব হয় না।
  • কাটা বাঁশে জয়েন্ট দেওয়া বেশ ঝামেলাপূর্ণ।
  • বাঁশে সিলিসিক অ্যাসিড থাকায় স্থায়িত্ব কমায়।

বাঁশের শক্তিমাত্রা ও নির্মাণ উপযোগিতা

বাঁশের নানা ত্রুটি রয়েছে সত্য, তবে তা স্টিল ও কংক্রিটের বিকল্পও বলা চলে। হিসাবটা গোলমেলে মনে হলেও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত বাঁশের শক্তিমাত্রা স্টিলের কাছাকাছি। কতিপয় ত্রুটি দূর করা গেলে বাঁশ থেকে অনেক বেশি উপযোগিতা পাওয়া সম্ভব। তা ছাড়া বাঁশের স্থাপনাযর কিছু কার্যকরী আধুনিক কৌশলও রয়েছে। যেগুলো মেনে বাঁশের স্থাপনা নির্মাণ করলে তা হবে টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী। বড় নির্মাণ সংস্থাগুলো, প্রকৌশলী ও স্থপতিরা সাধারণত নির্মাণশিল্পে বাঁশের ব্যবহারে উৎসাহী নন। অথচ দামে সস্তা, দ্রুত জন্মায় ও বাড়ে, অরণ্য ধ্বংস হয় না, এসব কারণে নির্মাণসংশ্লিষ্ট গবেষকদের কাছে ক্রমেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে বাঁশ। বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে বাঁশের নির্মাণ উপযোগিতা বাড়াতে নিরন্তর গবেষণা চলছে। অনেক প্রকৌশলী ও স্থপতি বাড়িয়েছেন বাঁশের ব্যবহার। বড় বড় বিল্ডিং তৈরিতে বাঁশ ব্যবহার করা যায় কি না সে নিয়ে গবেষণা করছে আমেরিকার পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে। গবেষকদের নজরে এসেছে তিনটি বিশেষ ধরনের বাঁশ ইস্পাতের মতোই শক্ত। গবেষকদলের প্রধান অধ্যাপক কেন্ট হ্যারিসের বক্তব্য, ‘বাঁশ গরিবের বাড়ি তৈরির উপকরণ, এই ধারণা থেকে এবার সরে দাঁড়ানোর সময় এসেছে। আগামী দিনে হাইরাইজ ভবন তৈরিতেও বাঁশ ব্যবহার শুরু হবে কি না তা অবশ্য নির্ভর করবে বিজ্ঞানীদের গবেষণার ওপর।’ তাঁর ধারণা অমূলক নয়। ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে হাইরাইজ বিল্ডিং নির্মাণে বাঁশ ব্যবহারের কথা বিবেচনাধীন। ইন্টেরিয়র ও এক্সটেরিয়রের পাশাপাশি বহুতল ভবনও নির্মিত হচ্ছে বাঁশে।   

বাঁশের পক্ষে ইতিবাচক স্বীকৃতির পেছনে গবেষণায় মিলেছে এর শক্তিমাত্রার প্রমাণ। এর সেলুলোজসমৃদ্ধ দীর্ঘ ফাইবার অত্যন্ত শক্তিশালী। গাডুয়া বাঁশের ফাইবার (Gandua Bamboo) ১ সে.মি.রও বেশি লম্বা যেখানে কাঠে পাওয়া যায় সর্বোচ্চ ২ মি.মি.। ২০ মিটারের বেশি লম্বা শক্তপোক্ত বাঁশ অনেক বেশি ভার বইতে পারে। বাঁশের সিলিকেটযুক্ত বাহ্যিকভাগ ও ভেতরে দারুণ ইলাস্টিক ক্ষমতাসম্পন্ন ফাইবার যার টেনসাইল স্ট্রেন্থ ৪০০ এন/এমএম২ বা ৪০ কেএন/সিএম২ (kN/CM2) এর বেশি, যেখানে টিম্বার ৫ ও মাইল্ড স্টিল যথাক্রমে ৩৬ কেএন/সিএম২। বাঁশে ৪০ শতাংশ ফাইবার, ৫১ শতাংশ প্যারেনছিমা এবং ৯ শতাংশ কনডাক্টিভ টিস্যু থাকে, যা একে দেয় অনন্য শক্তি ও নমনীয় ক্ষমতা। এই টেনসাইল স্ট্রেন্থই বাঁশকে দেয় অনন্য সেসমিক রোধী বেন্ডিং স্ট্রেন্থ, যা ভূমিকম্পেও থাকে অটুট। এ ছাড়া উচ্চমাত্রায় সিলিকেট অ্যাসিড থাকায় এটা বেশ আগুনরোধী। ভেজা বাঁশ ৪০০০ সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত তাপ সহ্য করতে পারে। ঘুণে ধরা ও আর্দ্রতা বাঁশের প্রধান শত্রু হলেও সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করার পর এর মেয়াদ শত বছর করা সম্ভব। বাঁশের ওপর সিমেন্ট বা লাইম কোটিং দিয়েও বাড়ানো যায় এর স্থায়িত্ব। 

টেকসই ব্যবহার ও নির্মাণকৌশল

বাঁশের এমন শক্তিমাত্রা বিদ্যমান থাকায় পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণে একে পছন্দের তালিকায় রাখাই যায়। বাঁশ হালকা বিধায় অবকাঠামোও হবে হালকাধর্মী। তবে তা এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যেন তা মাটির স্পর্শ না পায় এবং ঝড়ে যাতে উড়ে না যায়। এ জন্য প্রয়োজন কংক্রিট, ইট, আরসিসি পিলার, লোহার তৈরি এল টাইপ ফিটিং, নাট ও বোল্ট। বাঁশের স্থাপনা ফাউন্ডেশন বা ভিত ইট বা কংক্রিটের হওয়া উচিত। এরপর কংক্রিটের ওপর বাঁশের পিলার বা কলাম স্থাপনে লোহা বা স্টিলে তৈরি এল টাইপ ফিটিং ব্যবহার করতে হবে। এতে নাট-বোল্ট টাইট করে লাগিয়ে দিতে হবে। তাতে বাঁশ সরাসরি কংক্রিটের সংস্পর্শ পাবে না। বিম স্থাপনের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। কারণ, বাঁশের টেনসাইল স্ট্রেন্থ বেশি হলেও জয়েন্টের ক্ষেত্রে তা স্টিলের মতো লোড ট্রান্সফার করতে পারে না। বাঁশ একসঙ্গে বাঁধাও জটিল। বাঁধন আলগা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কলাম বাঁশের বদলে আরসিসি পিলারও ব্যবহার করা যায়। আজকাল বাজারে রেডিমেইড ১২ ফুট লম্বা আরসিসি মাপের পিলার পাওয়া যায়। নতুবা সহজেই এটি তৈরি করে নেওয়া যায়। পার্টিশন ওয়ালের জন্য সিঙ্গেল লেয়ারের বাঁশ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে হরাইজন্টাল থেকে ভার্টিকাল ওয়াল অধিক স্থায়ী হয়। এ ছাড়া বাঁশে তৈরি রিড বোর্ড দিয়ে ফ্লোর, ওয়াল, সিলিং, পার্টিশন ওয়াল, দরজা-জানালা প্রভৃতি তৈরি করা সম্ভব। 

বাঁশের আয়ুষ্কাল বাড়ানোর উপায়

বাঁশ সেলুলোস, হেমিসেলুলোস ও লিগনিন উপাদানে গঠিত হওয়াই মাটি-পানির সংস্পর্শে তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া কীট-পতঙ্গ (উইপোকা, বিটল, ঘুণপোকা) ও ছত্রাক আক্রমণ করে বাঁশের আয়ু কমিয়ে দেয়। এসব সমস্যা থেকে রক্ষা করে বাঁশ-কাঠকে দীর্ঘস্থায়ী করা সম্ভব। এ জন্য নির্মাণসামগ্রী ও আসবাব তৈরির আগে বাঁশে কিছু রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে সংরক্ষণ বা প্রক্রিয়াজাত করতে হবে। যেসব বাঁশসামগ্রী মাটি, পানির সংস্পর্শ কম পায় অর্থাৎ গৃহস্থালির আসবাব, সেগুলো সংরক্ষণে রাসায়নিক হিসেবে প্রয়োজন বোরাক্স-বরিক অ্যাসিডের (বিবি) দ্রবণ। আর যেগুলো মাটি-পানির সংস্পর্শে থাকবে সেসবের জন্য কপার-ক্রোম-বোরনের (সিসিবি) মিলিত দ্রবণ ব্যবহৃত হয়।

রাসায়নিক মিশ্রণ প্রস্তুত ও প্রয়োগ পদ্ধতি

আসবাব ও ঘরের ভেতরের ব্যবহার্য জিনিসপত্রের জন্য বোরাক্স-বরিক অ্যাসিড (বিবি) দ্রবণের প্রস্তুতে এক ভাগ বোরাক্স ও এক ভাগ বরিক অ্যাসিড সমভাবে নিতে হবে (অনুপাত ১ঃ১)। বাইরে ব্যবহৃত সামগ্রীর জন্য কপার-ক্রোম-বোরনের (সিসিবি) দ্রবণ তৈরিতে সালফেট (তুঁতে)-সোডিয়াম ডাইক্রোমেট-বরিক অ্যাসিডের দ্রবণ প্রস্তুতের জন্য দুই ভাগ কপার সালফেট, দুই ভাগ সোডিয়াম ডাইক্রোমেট এবং এক ভাগ বোরিক অ্যাসিড নিতে হবে (অনুপাত ২ঃ২ঃ১)।

সংরক্ষণী প্রয়োগের নিয়ম

  • বাঁশ ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হবে।
  • প্রয়োজন অনুযায়ী বাঁশ সাইজমতো কেটে টুকরো করে রানদা, ছিদ্র করা ইত্যাদি কাজ সম্পন্ন করতে হবে।
  • সংরক্ষণী প্রয়োগের পর কাটা-ছেঁড়া না করাই ভালো।
  • সাইজ করা বাঁশ উল্লেখিত রাসায়নিকে চুবানোর জন্য একটি ট্যাংক লাগবে।
  • ট্যাংকটি পাকা, টিন (প্লেইন শিট), কিংবা কাটা ড্রাম দিয়েও তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া সাময়িকভাবে মাটিতে গর্ত করে তাতে পলিথিন শিট বিছিয়েও ট্যাংক তৈরি করা যেতে পারে।
  • প্রথমে সাইজ করা কাঠ বা বাঁশ ট্যাংকে স্থাপন করে ওপরে ভারী বস্তা চাপা দিতে হবে।
  • এরপর ট্যাংকে দ্রবণ এমনভাবে ঢালতে হবে যেন তা বাঁশ থেকে অন্তত তিন ইঞ্চি ওপরে থাকে।
  • আসবাবের বেলায় সাময়িকভাবে সংরক্ষণের জন্য বোরাক্স-বরিক অ্যাসিড দ্রবণ দ্বারা স্প্রে পদ্ধতির মাধ্যমে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
  • বিবি ও সিসিবি উভয় দ্রবণের ক্ষেত্রে এক ইঞ্চি পুরু তক্তা বা কঠি কমপক্ষে ছয়-সাত দিন দ্রবণে চুবিয়ে রাখতে হবে। আর দুই বা তিন ইঞ্চি কাঠের বেলায় সাত থেকে দশ দিন চুবিয়ে রাখতে হবে।
  • সংরক্ষণী প্রয়োগের সময় হাতে রাবারের দস্তানা ব্যবহার বাঞ্ছনীয়।
  • সংরক্ষণী দ্রবণ গবাদিপশু ও শিশুদের নাগালের বাইরে রাখতে হবে।

বাঁশের খুঁটি সংরক্ষণ পদ্ধতি

৮-১০ ফুট লম্বা খুঁটি সহজেই রস অপসারণ বা স্যাপ ডিসপ্লেসমেন্ট পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা যায়। এ জন্য দরকার ২০ শতাংশ ঘনত্বের সিসিবি দ্রবণ। ২০ শতাংশ ঘনত্বের ১০০ লিটার সংরক্ষণী দ্রবণ প্রস্তুতে যা লাগবে-

বাঁশের বৈশ্বিক ব্যবহার

চীন, জাপান ও  ভারতে বাঁশের ব্যবহার হয় সবচেয়ে বেশি। জাপানের স্থাপত্যশিল্পে বাঁশ অনন্য এক উপাদান। বর্তমানে চীন ও জাপানে লেমিনেটেড ব্যাম্বো ফ্লোরিং বেশ জনপ্রিয়। বাঁশে তৈরি বিশেষ ধরনের বাড়ি ‘নিপা হাট’ ফিলিপাইনের অত্যন্ত জনপ্রিয় একধরনের বাড়ি। ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপসহ বিভিন্ন স্থানের অধিকাংশ স্থাপনাই নির্মিত হয় বাঁশে। দেশটির দক্ষিণ বালিদ্বীপে স্থপতি জন ও সিনথিয়া হার্ডি নির্মাণ করেছেন এক বিস্ময়কর স্কুল। ‘গ্রিন স্কুল’ নামের এই বিদ্যালয়টিকে ২০১২ সালে বিশ্বের সবুজতম স্কুলের অ্যাওয়ার্ডে সম্মানিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল। বিদ্যালয়টির নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে সম্পূর্ণ স্থানীয় উপাদান, যার প্রায় ৯৯ শতাংশই প্রাকৃতিক। প্রধান কাঠামোগত উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বাঁশ। বাঁশের স্থাপনায় মোটা একগুচ্ছ বাঁশ কলাম হিসেবে বেশ শক্ত-পোক্তভাবে ধরে রেখেছে এক নয়, দুই নয়, ছয়টি তলাকে। ওপরে খড়ের চালা ছাড়া সব উপকরণই তৈরি বাঁশে। চেয়ার-টেবিল এমনকি তাঁদের শোবার খাটও বাঁশের। প্রতিটি ক্ষেত্রে বাঁশের মজবুত বুনন শৈল্পিকতা ছড়িয়ে অনন্য রূপে অলংকৃত হয়েছে।

এ একটিমাত্র উদাহরণ। ইন্দোনেশিয়ায় রয়েছে অসংখ্য বাঁশের স্থাপনা। এমনকি কয়েকটি গ্রামের সব বাড়িঘরও বাঁশে নির্মিত। তার অন্যতম কারণ সমুদ্র উপকূলের জনপদ হওয়ায় সেখানে প্রায়ই হানা দেয় ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্পসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এ ছাড়া পর্যটকদের কাছে তা দারুণ জনপ্রিয়। বাঁশের বাড়ি বলে এই বাড়িগুলোর স্থায়িত্ব নিয়ে ভাবনার কিছু নেই। বালি আর জাভা দ্বীপে জন্মানো পেতাং নামের শক্ত এক প্রকার বাঁশে বানানো এই বাড়িগুলো অনায়াসেই ২৫ বছর টেকে। বাঁশগুলোকে বিশেষভাবে প্রক্রিয়াজাত করে নেওয়ায় এবং রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষায় বিশেষ রাসায়নিকের প্রলেপ দেওয়ায় এই বাড়িগুলোর স্থায়িত্ব আরও অনেক বেশি বলেই দাবি এর স্থপতিদের।

আবহমানকাল ধরে বাংলাদেশেও গৃহনির্মাণসামগ্রী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে বাঁশ। ঘরের বেড়া, চালা, খুঁটি থেকে শুরু করে দালান নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজে বাঁশ ব্যবহৃত হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পাকা বাড়ি নির্মাণে ইস্পাতের ব্যবহার বাড়ায় বাঁশের চাহিদা আগের তুলনায় কমেছে। ১৯৯১ সালে পরিচালিত শুমারির তথ্য অনুযায়ী, সে সময় বাংলাদেশের ৫৬ শতাংশের বেশি ঘরের দেয়াল এবং ৪৭ শতাংশের বেশি ঘরের চালা ছিল বাঁশের। কিন্তু এখন সে চিত্রে অনেকটা পরিবর্তন এসেছে। মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ায় শহরের পাশাপাশি গ্রামেও পাকা বাড়ির সংখ্যা বাড়ছে। তবে দিনাজপুরসহ কিছু কিছু স্থানে বাঁশ-মাটি দিয়ে অল্প খরচে নির্মিত হচ্ছে দ্বিতল বাড়ি। বিভিন্ন স্থাপত্য স্কুল ও প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন বস্তি এলাকায় বস্তিবাসীর সামাজিক উন্নয়নে গড়ে তোলা হচ্ছে বাঁশের সাশ্রয়ী বাড়ি। বাড়িগুলো তৈরিতে খরচ হচ্ছে মডেলভেদে ৩০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। 

দুর্যোগপ্রবণ জনপদে বাঁশের স্থাপনা 

দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিত্যসঙ্গী। চর, দ্বীপচর, নদীসংলগ্ন এলাকা, নি¤œাঞ্চল, উপকূলবর্তী ও হাওর অধ্যুষিত এসব জনপদের বন্যা অন্যতম সমস্যা। প্রতিবছর বর্ষার বন্যায় মানুষ হয়ে পড়ে পানিবন্দী। মানুষ চরের উঁচু ভিটায় কিংবা ঘরের ভেতর মাচা করে আশ্রয় নেয়। হাঁস-মুরগি, গবাদিপশুর আশ্রয় ও খাবার নিয়ে বিপাকে গ্রামবাসী। অধিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলো বাঁশ দিয়ে এমনভাবে ডিজাইন করা সম্ভব, যা যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় খুবই কার্যকর। যা ভাসমান বাড়ি বা লিফট হাউস নামে পরিচিত। এ ধরনের বাড়ির নির্মাণকৌশল অত্যন্ত সাধারণ। স্থানীয় সহজলভ্য নির্মাণ উপকরণ, প্রযুক্তি, কারিগর এমনকি স্বেচ্ছাশ্রমেই নির্মাণ করা যায় এ ধরনের আবাস। বাঁশ, কাঠ, টিন, বোর্ড, পরিত্যক্ত প্লাস্টিক ড্রাম ও বোতলই হবে নির্মাণ উপকরণ। প্রতিটি উপকরণই দামে সস্তা। বাঁশের পাটাতনের নিচে প্লাস্টিক ড্রাম স্থাপন করা হলে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাঠামোটি ওপরে উঠতে থাকে। বাঁশকে রাসায়নিক ট্রিটমেন্ট প্রদান করায় তা সহজে পচে না। আধুনিক প্রযুক্তিতে প্রক্রিয়াজাত করা এসব স্থানীয় বাঁশ সহজেই নির্মাণসামগ্রীর কাঠামোগত এবং দীর্ঘায়ু নিশ্চিত করে। ফলে বাড়ির স্থায়িত্ব হবে ২০ থেকে ৩০ বছর। বাঁশ দিয়ে শুধু থাকার ঘরই নয় স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসাসহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করা গেলে তা যেমন বন্যায় থাকবে নিরাপদ, তেমনি শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায়ও ব্যাঘাত ঘটাবে না। 

বাঁশের স্থাপনার নান্দনিক ও শৈল্পিক ডিজাইন যেমন রুচিবোধ ফুটিয়ে তোলে। শৈল্পিক নির্মাণকৌশল প্রকৃতির সঙ্গে বৈরিতা নয়, বরং বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার বন্ধন সৃষ্টি করে। বাঁশ থেকে ক্ষতিকর রাসায়নিক নির্গত হয় না বিধায় পরিবারের সবার স্বাস্থ্য থাকে সুরক্ষিত। এ জন্য বিশ্বব্যাপী স্থাপনা নির্মাণে বাড়ছে বাঁশের ব্যবহার। বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্রই পাওয়া যায় এই নির্মাণ উপকরণটি। বাঁশের স্থাপনা নির্মাণে পরিবেশ বিপর্যয় রোধ এখন সময়ের দাবি।

তথ্যসূত্র

বিভিন্ন গবেষণা জার্নাল

হাউসিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট

বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট

প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১১০তম সংখ্যা, জুন ২০১৯

Related Posts

রেলিং: নিরাপত্তা, সৌন্দর্য ও স্থায়িত্বের সমন্বয়

রেলিং একটি ভবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না, বরং ভবনের নান্দনিক সৌন্দর্যও বৃদ্ধি করে। বাড়ি,…

টাইলসের রকমফের ও আধুনিক ভবন নির্মাণ

বর্তমান সময়ে একটি ভবনের নান্দনিকতা, স্থায়িত্ব এবং ব্যবহারিক সুবিধা নিশ্চিত করতে টাইলের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একসময় টাইল শুধুমাত্র…

আধুনিক নির্মাণ উপকরণ ও অগ্নিরোধী কাঠ

কাঠ নির্মাণের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। আমাদের জীবনের নানা ক্ষেত্রেই কাঠের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়। সহজলভ্য এবং দামে…

টেকসই নির্মাণ উপকরণ কার্বন ফাইবার রিইনফোর্সড পলিমার

বর্তমান যুগে প্রযুক্তি ও প্রকৌশলের দ্রুত বিকাশের ফলে এমন সব উপকরণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, যা একই সঙ্গে হালকা,…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

Ramna Park
রেলিং: নিরাপত্তা, সৌন্দর্য ও স্থায়িত্বের সমন্বয়
Qatar
Electric
Mondir
Tiles
Indian Homes
গাছকে কেন্দ্র করে নির্মিত আবাসনের নতুন ভাষা: ‘হোমস অ্যারাউন্ড ট্রিজ’
Chandgazi