এশিয়ার যত আকাশচুম্বী ভবন (পর্ব ২)

…..পূর্ব প্রকাশের পর

৭. পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার, মালয়েশিয়া

পেট্রোনাস টুইন টাওয়ারের ডিজাইনার উত্তর আমেরিকার স্থপতি সিজার পেলি। স্থাপত্য ভাবনায় ছিল ভিন্ন ধরনের পোস্ট মর্ডান স্টাইল, যা একবিংশ শতাব্দীর একটি আইকনিক বিল্ডিং হিসেবে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে শোভা পাবে। পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার তৈরির পরিকল্পনা করা হয় ১৯৯২ সালের জানুয়ারিতে। এই সুপার স্ট্রাকচারের নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৯৪ সালে ১ এপ্রিল। অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার কাজ শেষ হয় ১৯৯৬ সালে ১ জানুয়ারি। ১৯৯৯ সালের ১ আগস্ট সুউচ্চ এ অট্টালিকাটি আনুষ্ঠানিকভাবে উšে§াচন করেন আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার মাহাথির মোহাম্মদ। টুইন টাওয়ারটির অবস্থান কুয়ালালামপুরের রেইস ট্রাকে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ কংক্রিট পাইলিংয়ের ব্যবস্থাপনায় স্থাপনাটির ভিত্তি সম্পন্ন করতে সময় লেগেছে ১২ মাস বা এক বছর। পেট্রোনাস টুইন টাওয়ারের অবকাঠামোগত ডিজাইনটি ছিল অনেকটা টিউবের ভেতর টিউব আদলের। এটির আবিষ্কারক প্রকৌশলী ফাজিউর রহমান খান। উঁচু অট্টালিকা তৈরিতে টিউব স্ট্রাকচার এখন একটি সাধারণ ব্যাপার। আমদানি করা স্টিলের অত্যধিক মূল্যের জন্য টাওয়ারটি নির্মাণ করা হয় অপেক্ষাকৃত কম মূল্যের সুপার হাই-স্ট্রেন্থ রি-ইনফোর্স কংক্রিট দিয়ে। ২৩২৩ মিটারবিশিষ্ট কংক্রিটের কোর ও অন্যান্য রিং দিয়ে সমান দূরত্বে অবস্থান করে সুপার কলাম তৈরি করা হয়। যার জন্য ৫,৬০,০০০ বর্গমিটার কলামে অফিসের জন্য অনেক পরিসর সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছে।

৮৮ তলাবিশিষ্ট টাওয়ারটি বেশির ভাগই নির্মাণ করা হয়েছে রি-ইনফোর্স কংক্রিটের সঙ্গে স্টিল ও গ্লাসের সমন্বয়ে। অট্টালিকাটির সম্মুখভাগে শিল্পের বিশেষত্ব হিসেবে ইসলামিক আর্ট দেখতে পাওয়া যায়, যাতে মালয়েশিয়ার মুসলিম ক্যালিওগ্রাফির ছাপ স্পষ্ট।

পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার, মালয়েশিয়া, ছবিঃ উইকিপিডিয়া

৮. জি ফ্যাং টাওয়ার, চীন

জি ফ্যাং টাওয়ার আগে নানজিং গ্রিনল্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সেন্টার নামে পরিচিত ছিল। ৬৫ তলার এ ভবনটি একটি মিশ্র কমপ্লেক্স, যাতে রয়েছে অফিস ও রেস্তোরাঁ। অট্টালিকাটির অবস্থান পূর্ব-পশ্চিমে। এর প্রবেশদ্বার পূর্ব বেইজিংয়ের রাস্তার দিকে, যে কারণে সরাসরি দেখা যায় কাছের ঐতিহাসিক ড্রাম ও বেল টাওয়ারটিকে। এখান থেকে জনসাধারণের খোলা আকাশের নিচে চলাফেরার দৃশ্য সর্বক্ষণ দেখা যায়। প্রকৃতির মৃদু-মন্দ বাতাসের ছোঁয়া সর্বক্ষণ এই অট্টালিকাকে ছুঁয়ে যায়। নির্মাণাধীন সুউচ্চ এ অট্টালিকার নির্মাণকাজ শেষ হলে এটি হবে বিশ্বের ষষ্ঠ উঁচু অবকাঠামো। ভূ-কম্পন জোনের মধ্যে পড়ায় এটি এমনভাবে নির্মিত, যা ভূকম্পন শক্তিসহনীয়।

টাওয়ারটির প্রধান বৈশিষ্ট্য এটি এমনভাবে তৈরি, যাতে বাইরের আলোর প্রতিফলনের ফলে শহরের সব দৃশ্য গ্লাসে দেখা যায়। অট্টালিকার পেছনে রয়েছে ন্যাচারেল ভেন্টিলেশন আর সিগারেটের ধোঁয়া বেরোনোর পথ। এতে যান্ত্রিক ভেন্টিলেশন থাকায় বিদ্যুৎ খরচ হয় কম। ত্রিভুজাকার প্রতিটি ইউনিটে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ইনসুলেটেট লো-ই-গ্লাস প্যানেল লাগানো হয়েছে, যা বাইরের তাপ গ্রহণ করে সম্পূর্ণ অবকাঠামোকে ঠান্ডা রাখে।

প্রতিটি তলায় পর্যাপ্ত বাতাস সরবরাহের ব্যবস্থা আছে। আগুন প্রতিরোধের জন্য টাওয়ারটিতে রয়েছে স্লিংটার পদ্ধতি। এ ছাড়া আছে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা। যদি কখনো ভবনে আগুন লাগে, দ্রুতই তা নিভিয়ে ফেলা যাবে।

টাওয়ারটিতে রয়েছে সাতটি এলিভেটর। এর একটি উঁচু তলার দাপ্তরিক কাজের জন্য। আরও তিনটি সার্ভিস এলিভেটর আছে প্রতি তলার রেস্তোরাঁয়। তিনটি এক্সপ্রেস এলিভেটর আছে নিচতলা থেকে ৩৬ তলা পর্যন্ত চলাচলের জন্য। এখান থেকে অট্টালিকার সর্ব ওপর ৬৫ তলা পর্যন্ত আছে লিফটের ব্যবস্থা।

জি ফ্যাং টাওয়ার, চীন। ছবিঃ উইকিপিডিয়া

৯. কিংকি ১০০, চীন

কিংকি ১০০ অট্টালিকাটি আগে কিংকি ফাইন্যান্স সেন্টার প্লাজা নামে পরিচিত ছিল। অত্যধিক উঁচু গগনচুম্বী অট্টালিকা এটি। অবস্থান চীনের সেনজেন গোয়াং ডং প্রভিন্সে। এটার উচ্চতা ৪৪১.৮ মিটার। এতে আছে অফিসসহ রেস্তোরাঁর সুব্যবস্থা। স্থাপনাটির উদ্বোধন করা হয়েছিল ২০১১ সালে। বর্তমানে এটি সোনজিংয়ের সবচেয়ে উঁচু অট্টালিকা, যা বিশ্বে ১৪তম উঁচু অট্টালিকা। এটি কোনো ব্রিটিশ স্থপতির ডিজাইন করা সবচেয়ে উঁচু স্থাপনা।

কিংকি ১০০, চীন, ছবিঃ উইকিপিডিয়া

১০. গোয়াংজোও ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স সেন্টার, চীন

গোয়াংজোও ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স সেন্টারটি চীনের তৃতীয় শহর গোয়াংজোর একটি উঁচু স্তম্ভ। এই সুউচ্চ অট্টালিকা তৈরির কাজটি শেষে এটিই হবে উচ্চতায় চীনে চতুর্থ অবকাঠামো। বিশ্বের নবমতম গগনচুম্বী অট্টালিকা এটি। নকশা অনুযায়ী তিনটি ত্রিভুজাকারে বাঁকানো তল রয়েছে এতে। যথেষ্ট পরিমাণ পরিসরসহ স্থাপনাটি পরিবেশবান্ধব। টাওয়ারটি তিনটি স্থানের মিশ্রণ। একটি দপ্তরের জন্য, একটি বিলাসবহুল রেস্তোরাঁ আর অন্যটি পর্যবেক্ষণ স্থানের জন্য। গ্রাউন্ড লেবেলকে যুক্ত করা হয়েছে পোডিয়াম কমপ্লেক্সের সঙ্গে, যেখানে রয়েছে খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র, কনফারেন্স সেন্টার ও সার্ভিস অ্যাপার্টমেন্ট। বিশ্বের উচ্চতম অবকাঠামো এটি; অট্টালিকার সম্মুখ ভাগ দেখে যা সহজেই চোখে পড়ে। এটি নির্মিত টিউবের ভেতর টিউব স্ট্রাকচারাল পদ্ধতিতে। উল্লেখ্য, এতে কোনো ড্যাম্পিংয়ের প্রয়োজন হয়নি।

এতে রয়েছে বাতাসের মাধ্যমে শক্তি অর্জন, হিট রিকভারি চিলার, আইস স্টোরেজ সিস্টেম, ডিহিউমিডিফিকেশন, উচ্চ চাপে বাতাস নির্গমন, ফ্রি কুলিং সিস্টেম আর ভেরিয়েবল এয়ার ভলিউম সিস্টেম।

গোয়াংজোও ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স সেন্টার, চীন। ছবিঃ উইকিপিডিয়া

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৬তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৫

প্রকৌশলী মহিউদ্দীন আহমেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top