ম্যাগলিভ ট্রেনে

যোগাযোগের উৎকর্ষে এক ধাপ এগিয়ে

চীনের দক্ষিণ-পূর্বে প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত জনবিরল সমতল এলাকা। এখানেই রয়েছে উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন কংক্রিট নির্মিত সেতু। সেতুটি প্রথমে হয়তো অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করবে না। কারণ, সাধারণ সেতুর মতো নয় এটি। এটি আসলে সেতু নয়, এলিভেটেট ডুয়েল ট্র্যাক গাইডওয়ে। বিশ্বের প্রথম উচ্চগতিসম্পন্ন যোগাযোগব্যবস্থার জন্য ম্যাগনেটিক লেভিটেশন বা ম্যাগলিভ সিস্টেমে চলাচলরত দ্রুতযানের পথ, যা সংযোগ ঘটিয়েছে সাংহাই নগরের সঙ্গে পুডোং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যোগাযোগব্যবস্থার। এতে ঘটেছে প্রযুক্তি আর সময়ের চমৎকার মেলবন্ধন। জ্বালানি সাশ্রয়ী, কম রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ও উচ্চগতিবেগ সম্পন্ন হওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থায় সমতল ভূমির ওপর সহজেই এটি স্থাপনযোগ্য।

উচ্চ গতিবেগসম্পন্ন ম্যাগনেটিক লেভিটেশন রেললাইনটির সার্বিক দায়িত্বে ছিল সাংহাইয়ের ম্যাগলিভ ট্রান্সপোর্টেশন ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লি., বার্লিনের ট্রান্সরেপিড ইন্টারন্যাশনালের প্রকৌশলী, বকহামের পরামর্শক ম্যাক্সবোগল নিউম্যাক, মিউনিকের সিস্টেম এজি এবং ডুসেলড্রপের থাইসেন ক্রোফএজি। আন্তর্জাতিক প্রকৌশলীদের সহযোগিতায় তৈরি হয়েছিল এর অবকাঠামো ও সব ধরনের যন্ত্রাংশ। ২০০৩ সালের প্রথম দিকে সাংহাই ম্যাগলিভ ট্রান্সপোর্টেশন ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি (SMTDC) তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এটির বাণিজ্যিক পরিচালন শুরু করে। যানটি ৪৩০ কিলোমিটার বেগে প্রতি ঘণ্টায় নগরের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে লং ইয়ং রোড থেকে পুডোং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অবধি যাতায়াত করে। ৪৬৪ আসনসংবলিত ম্যাগলিভ ট্রেনটি প্রতি ১০ মিনিট পর পর যাতায়াত করে পিক আওয়ারে আর বিমানবন্দরে পৌঁছে আট মিনিটেরও কম সময়ে। সাংহাই ম্যাগলিভ ট্রান্সপোর্টেশন ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির কম্পিউটারভিত্তিক তথ্যমতে, গত বছরের জুলাই মাসে স্টেশনে আগমন ও নির্গমনে সঠিক সময় হার ছিল ৯৯ দশমিক ৭ শতাংশ, যা যোগাযোগব্যবস্থায় সময় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে উজ্জ্বল এক দৃষ্টান্ত। বর্তমানে সকাল আটটা থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত নিয়মিত যাতায়াত করছে ট্রেনটি। অদূর ভবিষ্যতে এটি প্রতিদিন ১৮ ঘণ্টা সার্ভিস দেবে, এমনটাই আশা কর্তৃপক্ষের।

ট্রেনের বিলাশবহুল যাত্রী আসন

এই ট্রেনের যাত্রীদের কাছে নিরবচ্ছিন্ন ভ্রমণটা এতটাই আরামদায়ক ও নিরাপদ যে ট্রেনের ভেতর বসে টেরই পাওয়া যায় না যে তারা ম্যাগলিভ ট্রেনে বসে আছে। তা ছাড়া কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছাড়া যাত্রীরা ট্রেনের ভেতর অবাধে যাতায়াত করতে পারে। ট্রেন যাত্রা করার আগে মাত্র চার মিনিট সময় নেয়। এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশনে যেতে স্থানভেদে সময় লাগে ৫২ সেকেন্ড থেকে তিন মিনিট। গাড়ির গতিবেগ উচ্চমাত্রায় থাকায় নিরবচ্ছিন্নভাবে যাত্রা করা সহজেই সম্ভব।

ম্যাগলিভ ট্রেনটিতে মোট আটটি কম্পার্টমেন্ট রয়েছে, যার ধারণক্ষমতা কয়েক গুণ বেশি, সাধারণ যাত্রীদের তুলনায় যাঁরা হাইওয়েতে গণপরিবহনে যাতায়াত করে। ম্যাগলিভ রুট চালু পর থেকে কোনো অ্যাটগ্রেড (At-grade) ক্রসিংয়ের প্রয়োজন হয়নি, যে কারণে ট্রাফিকজট কমে বেড়েছে নাগরিকদের নিরাপদে যাতায়াত-সুবিধা। সাংহাই থেকে পুডং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মোট ছয়টি হাইওয়ে রাস্তা ছিল ম্যাগলিভ লাইন হওয়ার আগে। এটা চালুর শুরুতে চিন্তা ছিল অন্যান্য বিকল্প ব্যবস্থা থেকে কম পরিমাণ জ্বালানি শক্তির প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি সবচেয়ে সাশ্রয়ী মূল্যে যাত্রীসেবা দেওয়ার বিষয়টিও।

২০০১ সালের মার্চ মাসে গাইডওয়ে তৈরির স্থান চিহ্নিত করা হয় পুরো লাইনটির মধ্যবর্তী কোনো স্থানে। ঠিকাদারেরা বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে পাইল ফাউন্ডেশনের কাজ শুরু করে ২৫ মিটার দূরত্ব বজায় রেখে। পুরোপুরি নয় মাসেরও কম সময়ে ৩০ কিলোমিটার দূরত্বের কাজ সম্পন্ন হয়। পাইল ক্যাপগুলো বসানো হয় প্রতিটি পাইলের মুখে। জার্মান ও চীনা প্রকৌশলীদের যে দলটি মূলত স্থাপনার সব মালামাল সরবরাহ করে এবং সারিবদ্ধভাবে দুই হাজার ৭৭৭টি গাইডওয়ের নির্মাণকাজ ১৮ মাসেরও কম সময়ে শেষ করে। বেশির ভাগ গার্ডারই ছিল (দুই হাজার ৪৯৭টি) বড়, যা ম্যাগলিভ রুটের দুই পাশেই স্থাপন করা হয়েছিল ক্রেনের সাহায্যে। এর সঙ্গে আরও ছিল ৭০টি বিম এবং ২১০টি গার্ডারের সংরক্ষণ-সুবিধা।

সিমেন্স পাওয়ার ইলেকট্রনিক্সের ডিজাইন তৈরি ও সরবরাহ করেছিল। এটার ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনব্যবস্থার মধ্যে ছিল দুটি প্রপালসার সাব-স্টেশন, নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র, বিশেষভাবে প্রস্তুতকৃত পাওয়ার কেব্ল, যা অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত এবং ৬২টি মাইক্রোওয়ের টাওয়ার ডাটা। এতে কমপক্ষে একটি বা দুটি টাওয়ার সব সময় ম্যাগলিভ ট্রেনের সঙ্গে চলাকালীন অবস্থায় সংযোগ রাখতে পারত। একটি সার্বক্ষণিক  ডাটা ম্যাগলিভ ট্রেন ও কন্ট্রোল সেন্টারে থাকত, যাতে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন অপারেশন নিশ্চিত করা যায়। সে জন্য বেশি অপারেটরের প্রয়োজন ছিল না। যখন স্বাভাবিক অপারেশন থাকবে গতিপথের সঙ্গে সংগতি রেখে, তখন যেসব ডেটা থাকবে তার মধ্যে গাইডওয়ের কতখানি বিচ্যুতি ঘটেছে তা নিরূপণ করবে ম্যাগলিভ ভেহেকেল।

যেহেতু পুরো প্রক্রিয়াটি কম্পিউটার দ্বারা পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত, সে জন্য পরিচালনা কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন ছিল খুব অল্পসংখ্যক জনবলের। তদুপরি, ম্যাগলিভ লাইন দীর্ঘদিন সার্ভিসে দিতে হয় না। যখন প্রয়োজন হয় তখন তা দ্রুতগতিতে সঠিক সংরক্ষণের মাধ্যমে মেরামত করে দ্রুতই চলমান করা হয়।

ম্যাগলিভ ট্রেন কাজ করে দুইটি পদ্ধতিতে। যদিও দুইটি পদ্ধতির ভিত্তিই একই ধরনের চিন্তাধারার। জার্মান প্রকৌশলীরা প্রযুক্তি দুটির উন্নয়ন ঘটান ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক সাসপেনশন ব্যবহারের মাধ্যমে। ম্যাগলিভ ট্রেনের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী ম্যাগনেটিক ফিল্ড বা বৈদ্যুতিক আবেশ। দ্রুত চার্জিং আবেশ, মেটালের পুরুত্ব বেশি হলেও রেজিসটিভিটি থাকবে কম, যা পাওয়া যায় কপার, সিলভার, অ্যালুমিনিয়াম ধাতুতে। ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক সাসপেনশন মূলত বৈদ্যুতিক আকর্ষণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এটা খুব জটিল এবং অনেক সময়ই স্থিতিশীল নয়।

উচ্চ গতিসম্পন্ন ম্যাগলিভ ট্রেনে

বৈদ্যুতিক লাইন ট্রেনের নিম্নাংশে (Undercarriage) থাকে এবং ট্র্যাক লাইন থাকে কয়েল দিয়ে পেঁচানো (চিত্রে ছবি অনুযায়ী গাইডওয়েতে)। বিদ্যুতের মাধ্যমে সর্বক্ষণ চার্জ করায় পরিবর্তন হয় কয়েলের পোলারিটিও। যার ফলে চলমান পদ্ধতিতে ম্যাগনেটিক আবেশ একবার ধাক্কা দিচ্ছে আর একবার ঠেলে দিচ্ছে ট্রেনকে গাইডওয়ের মাধ্যমে। চলন্ত অবস্থায় ট্রেনটি প্রায় এক সেন্টিমিটার গাইডওয়ে থেকে ভাসমান থাকে। এমনকি ট্রেন যখন অগ্রসর না হয় তখনো। এই দূরত্বটি সব সময় মনিটর করা হয়। যদি এই দূরত্বের হেরফের ঘটে, তবে তা তাৎক্ষণিকভাবে কম্পিউটারের মাধ্যমে ঠিক করা হয়, যাতে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে। আন্ডার ক্যারেজের বাম পাশে গাইডেন্স ম্যাগনেট ব্যবহৃত হয়, যাতে সম্পূর্ণ ট্রেন সুস্থির অবস্থায় থাকে, যাতে চলন্ত অবস্থায় পাশ থেকে কোনো আঘাত না লাগে। ট্রেনটির গতিবেগ যাত্রীসহ ঘণ্টায় ৪৩৮ কিলোমিটার।

ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক সাসপেনশন ট্রেনে যদি বিদ্যুৎব্যবস্থা বিকল হয়, তবে জরুরি ভিত্তিতে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে মজুদ রাখা হয় ব্যাটারি। ট্রেনে যদি বিদ্যুৎব্যবস্থা বিকল হয়েও যায়, তখন ব্যাটারির সাহায্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে ট্রেনের গতিকে ধীরে ধীরে কমিয়ে ট্রেন থামিয়ে দেওয়া হয়।

সাংহ্ইা ম্যাগলিভ পদ্ধতি এবং এর প্রযুক্তিবিদ্যার মাধ্যমে এটাই প্রতীয়মান হয় যে যোগাযোগব্যবস্থায় এটাই দ্রুতগতি ও সাশ্রয়ী  যাতায়াতব্যবস্থার কার্যকর মাধ্যম। জার্মান ও চীনা প্রকৌশলীদের সর্বোত্তম সৃষ্টি এটি। যোগাযোগব্যবস্থায় সবচেয়ে আদর্শ স্থানীয় অনুষঙ্গ এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর দ্রুতগতির ম্যাগলিভ ট্রেন।

প্রকৌশলী মহিউদ্দীন আহমেদ

সাবেক অতি. প্রধান প্রকৌশলী

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন

প্রকাশকাল: বন্ধন ৪৯ তম সংখ্যা, মে ২০১৪

Related Posts

হাইওয়ের বুকে খাড়া শহর: নগরের নতুন ভাষা

হাইওয়ে একদিকে যেমন চলাচলের জন্য অপরিহার্য, অন্যদিকে এটি শহরের ভেতরের জীবনকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এমনই এক দ্বন্দ্বের মধ্যে…

ByByshuprova Apr 20, 2026

শহর,সেতু আর সুরের টেনেসির আর্টস সেন্টার

বর্তমানে সমসাময়িক স্থাপত্যের একটি বড় দিক হলো ভবনকে শহরের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। এই…

বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট স্থাপত্যের সমসাময়িক ভাষা

বাংলাদেশের নগর জীবনে আবাসন এখন আর কেবল একটি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নয়, এটি ক্রমশ হয়ে উঠছে সামাজিক অবস্থান, জীবনযাত্রার…

লুই কান-এর ছায়ায়: স্থান-কাল-পাত্র প্রদর্শনী চত্বর

প্রকল্পের নাম: উন্মুক্ত স্থাপত্য বিষয়ক প্রদর্শনী ‘স্থান-কাল-পাত্র’ চত্বর স্থান: জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণ আয়োজক: আর্ক-সামিট, ২০২৫; বাংলাদেশ স্থপতি…

01~1
previous arrow
next arrow

CSRM

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

Belgium
Buet
কী কী থাকছে আকাশছোঁয়া শান্তা পিনাকলে
সমুদ্রবাণিজ্যের বর্জ্য থেকে অনন্যা এক স্থাপত্য
Home of Haor
Weather
Youth Park
Tower
শহর,সেতু আর সুরের টেনেসির আর্টস সেন্টার