• Home
  • নগরায়ন
  • চীন ও নেপালের সাম্প্রতিক বন্যা এবং আমাদের যা করণীয়
Image

চীন ও নেপালের সাম্প্রতিক বন্যা এবং আমাদের যা করণীয়

কাঠমান্ডু শহর পাহাড়ে ঘেরা এক উপত্যকায় বসানো। চারদিকে পাহাড়, মাঝখানে নদী আর সমতল জমি। এই জায়গাটাই একসময় মানুষকে বসতি গড়তে সাহায্য করেছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই একই জায়গা বারবার বিপদ ডেকে আনছে। ২০২১, ২০২৪, ২০২৫ সালের পর ২০২৬ সালের আগস্টেও নেপালে বড় বন্যা হলো। প্রশ্ন হলো, এই বারবার বন্যা হওয়ার পেছনে কি শুধু আবহাওয়া দায়ী, নাকি শহরের ভুল পরিকল্পনাও এর কারণ?

একইসাথে পাহাড় কেটে চীনের উন্নয়ন প্রকল্পগুলিও এই একই প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে।

দুই রকমের বিপদ

২০২৬ সালের ২৬ আগস্ট রাসুয়া ও নুওয়াকোট জেলায় যে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। তার কারণ ছিল একটি হিমবাহ ধসে পড়া। ল্যাংটাং জাতীয় উদ্যানে হিমবাহ ভেঙে পড়ার ফলে কাদা ও পানির স্রোত ত্রিশূলী নদী ধরে প্রায় ৭২ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বহু গ্রামে আঘাত হানে।

এমনকি চীন-নেপাল সীমান্তের গিরং বন্দরও পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। বহু বছর ধরে চালু থাকা বন্যা সতর্কতা ব্যবস্থাও এই বিপদ আগে থেকে ধরতে পারেনি। কারণ সেই যন্ত্রগুলো তৈরি হয়েছিল সাধারণ বর্ষার বন্যার জন্য, হিমবাহ ধসে পড়ার জন্য নয়।

এই ঘটনাকে সরাসরি “খারাপ পরিকল্পনা”র দোষ দেওয়া কঠিন। এটি একটি বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায়। তবে এটি একটি প্রশ্ন তুলে দেয়, এত সরু নদী উপত্যকায় রাস্তা, বিদ্যুৎ প্রকল্প আর বসতি এত কাছাকাছি বানানো ঠিক ছিল কিনা।

কিন্তু কাঠমান্ডু শহরের ভেতরের বন্যার গল্পটা একেবারে আলাদা। এখানে শহরের পরিকল্পনার দোষ স্পষ্ট দেখা যায়।

নেপালের সাম্প্রতিক বন্যার এই মর্মান্তিক ছবিতে ভেসে উঠছে কীভাবে নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে উঠেছিল নগর সভ্যতা। ছবি: সংগৃহীত
নদীর জায়গা দখল করে বাড়িঘর

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে কাঠমান্ডুতে ভয়াবহ বন্যা হয়। এক গবেষণায় দেখা যায়, সেই সময় নদীর পানি স্বাভাবিক সীমার প্রায় আড়াই গুণ জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এতে বাড়িঘর, রাস্তা আর জরুরি অবকাঠামোর অনেক ক্ষতি হয়, হাজার হাজার মানুষ ঘরছাড়া হয়।

গবেষকরা বলছেন, পরিকল্পনাহীন শহর গড়ে ওঠার কারণে অনেক শহর এখন ভারী বৃষ্টিতে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে। বিশেষ করে যেখানে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা দুর্বল আর মানুষ নদীর প্লাবনভূমিতেই বাড়ি বানাচ্ছে।

কাঠমান্ডু শহর নিয়ে আরেকটি গবেষণায় বলা হয়েছে, শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা প্রায় ২০০ বছর আগে তৈরি। এই পুরনো ব্যবস্থা এখনকার বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে পারে না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দ্রুত শহর বাড়া। বিশেষ করে নদীর প্লাবনভূমিতে অবৈধ বসতি গড়ে ওঠা, যা বর্ষার সময় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে দেয়।

শহরের বেশিরভাগ জমি এখন রাস্তা আর বাড়ির কংক্রিটে ঢাকা। তাই পানি মাটির নিচে না গিয়ে সঙ্গে সঙ্গে উপচে পড়ে, আর সামান্য বৃষ্টিও বড় বন্যায় বদলে যায়।

নদীর মোহোনায় গড়ে ওঠা চীনের ইমিগ্রেশন অফিস ঢেউয়ের তোড়ে হয়েছে নিশ্চিহ্ন। ছবি: সংগৃহীত
প্রশাসনই যখন নদীর জমিতে বাড়ি বানানোর অনুমতি দেয়

সবচেয়ে অবাক করা তথ্যটি এসেছে কাঠমান্ডু পোস্টের একটি লেখা থেকে। সেই লেখায় বলা হয়েছে, শহরের প্রশাসন নিজেই নদীর প্লাবনভূমির কিছু অংশকে বাড়ি বানানোর জমি হিসেবে ঘোষণা করে দিয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অবৈধ দখল। মানুষ অনুমতি ছাড়াই নদীর ধারে বাড়ি বানাচ্ছে। ফলে যে নদী আগে স্বাধীনভাবে বাঁকে বাঁকে বইত, তা এখন আটকে গেছে।

কাঠমান্ডুর বন্যা শুধু বেশি বৃষ্টির কারণে হচ্ছে না, বরং এটা প্রশাসনের ব্যর্থতা, খারাপ পরিকল্পনা আর নদীকে বছরের পর বছর অবহেলা করার ফল।

দরিদ্র মানুষ কেন ঝুঁকির জমিতে বাড়ি বানায়

তবে এই সমস্যার একটি সামাজিক দিকও আছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কাঠমান্ডুতে মানুষ বাড়ছে আর গ্রাম থেকে অনেকে শহরে চলে আসছে। এতে বাড়ির চাহিদা বেড়েছে, বাড়ি ভাড়া আর দামও বেড়েছে। গরিব মানুষের পক্ষে ভালো জায়গায় বাড়ি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

সরকারও গরিবদের জন্য সস্তা বাড়ির ব্যবস্থা করেনি। তাই অনেক গরিব মানুষ বাধ্য হয়ে সরকারি জমিতে, নদীর ধারে অবৈধভাবে ঘর বানায়। কারণ ওটাই তাদের কাছে একমাত্র সহজলভ্য জায়গা। তার মানে, নদীর ধারে বাড়ি বানানো শুধু একটা প্রযুক্তিগত ভুল নয়, এটা গরিব-বড়লোকের বৈষম্যেরও একটা স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।

লোকালয়গুলো নদীর অববাহিকায় গড়ে উঠেছে যা বিপদসীমার মাঝে পড়ে। ছবি: সংগৃহীত
সমাধান কী হতে পারে

নেপালের গবেষকরা কিছু পরিষ্কার সমাধানের কথা বলেছেন। একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে দরকার — বন্যা আগেভাগে বোঝার ভালো ব্যবস্থা, প্লাবনভূমি ঠিকমতো রক্ষা করা, ঝুঁকি বুঝে জমি ব্যবহারের পরিকল্পনা করা, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো বানানো, আর শহরে সবুজ জায়গা ও ছোট জলাশয় রাখা, যা বন্যার পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে।

আরেকটি গবেষণায় বলা হয়েছে, শহরের নিচু অংশে বন্যার পানি চলাচলের জন্য যথেষ্ট জায়গা রাখতে হবে আর প্লাবনভূমিতে নতুন নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। নদীর পাশে কতটুকু জায়গা খালি রাখতে হবে, সে নিয়ম নতুন করে ঠিক করা দরকার।

বিশ্বব্যাংকও কাঠমান্ডুর জন্য একটি প্রকল্প নিচ্ছে, যেখানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলোর জন্য প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান আর নতুন নগর নকশা তৈরির কথা বলা হয়েছে।

ভয়াবহ বন্যার কবলে ছিন্নভিন্ন মানুষের বসবাসস্থল। ছবি: সংগৃহীত
স্থপতি ও পরিকল্পনাবিদদের জন্য শিক্ষা

কাঠমান্ডুর অভিজ্ঞতা থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত বাড়তে থাকা সব শহরের শেখার আছে। নদীকে শুধু একটা সীমানা হিসেবে না দেখে, শহরের একটা জরুরি অংশ হিসেবে দেখতে হবে। এর মানে —

  • নদীর পাশে সবুজ জায়গা রাখা আর কড়া নিয়ম মেনে চলা, যাতে ভারী বৃষ্টিতে নদী নিরাপদে পানি বহন করতে পারে।
  • পুরনো পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নতুন করে বানানো, যা এখনকার বৃষ্টির চাপ সামলাতে পারে।
  • গরিব মানুষের জন্য নিরাপদ ও সস্তা বাড়ির ব্যবস্থা করা, যাতে তাদের বিপজ্জনক জায়গায় বাড়ি বানাতে না হয়।
  • বন্যা সতর্কতা ব্যবস্থাকে শুধু বর্ষার বন্যার জন্য নয়, হিমবাহ ধসের মতো নতুন বিপদের জন্যও তৈরি রাখা।

নেপালের বারবার ফিরে আসা বন্যা আমাদের একটা কথা মনে করিয়ে দেয় শহর নদীর বিরুদ্ধে লড়ে জিততে পারে না। যে শহর নদীর সঙ্গে মানিয়ে চলার পরিকল্পনা করে, সে-ই টিকে থাকে। কাঠমান্ডুসহ নদীমাতৃক সকল দেশকেই এই শিক্ষা নিয়ে তাড়াতাড়ি জরুরি বাস্তবায়ন প্রকল্প নিতে হবে। তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী বর্ষা এবং দুর্যোগে কী হবে।

তথ্যসূত্র 

Kathmandu Post, Springer, sciencedirect, ResearchGate, World Bank, OSTI 

Related Posts

সিউলের হাইওয়ে ভেঙে নদী ফিরিয়ে আনতেই কমল যানজট

দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি ছোট নদীর নাম চেওংগিয়েচন। এক সময় নগরায়নের কারণে এই…

হোমালি যেনো রেস্তোরাঁ নয় ধান গাছের জীবন গল্প

নিউইয়র্কের পশ্চিম গ্রামের থাই রেস্তোরাঁর ইন্টেরিয়র ডিজাইন যেনো শুধু খাবারের পরিবেশই নয়। এটি একটি সাংস্কৃতিক গল্প বলার মাধ্যমও…

স্থাপত্যে বাংলাদেশের ঝুলিতে এলো আরও দুটি অর্জন

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আবারও উজ্জ্বল হলো বাংলাদেশের স্থাপত্যশৈলী। কমনওয়েলথ অ্যাসোসিয়েশন অব আর্কিটেক্টসের (সিএএ) ২০২৬ সালের পুরস্কার তালিকায় জায়গা করে…

আজকাল স্থপতিরা কেন ভবনের বাইরেও বেশি কিছু ডিজাইন করছেন?

স্থাপত্য বলতে এতদিন আমরা বুঝেছি ইট, কংক্রিট আর কাঁচের কাঠামো তৈরির শিল্প। কিন্তু বর্তমান সময়ে এই ধারণা বদলে…

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

অভিনেতার নিউ ইয়র্কের বাড়িতে এক অবাক করা পল্লীসুলভ ছোঁয়া
সিউলের হাইওয়ে ভেঙে নদী ফিরিয়ে আনতেই কমল যানজট
হোমরালি রেস্তোরাঁ
স্থাপত্যে বাংলাদেশের ঝুলিতে এলো আরও দুটি অর্জন
আজকাল স্থপতিরা কেন ভবনের বাইরেও বেশি কিছু ডিজাইন করছেন?
স্থাপত্যে প্রায়েমিয়াম ইম্পেরিয়াল পুরস্কার জিতলেন লিবেসকিন্দ
Arch De Trump
কেন স্বেচ্ছায় নিজের “স্থপতি” উপাধি মুছে ফেললেন RIBA সভাপতি?
construction