Image

বহদ্দারহাট বাস টার্মিনালের ল্যান্ডস্কেপিং

বাস টার্মিনাল হিসেবে চট্টগ্রাম বহদ্দারহাট বাস টার্মিনালের বেহাল দশা। হৃৎপিণ্ড যেমন রক্তজালকের মাধ্যমে প্রাণশক্তিকে ছড়িয়ে দেয় সমস্ত দেহে, তেমনি একটি নগরের রক্তজালক সড়ক-মহাসড়ক আর রেলপথ। এগুলোর মাধ্যমে নগরে প্রাণশক্তির মতো বিচরণ করে নগরবাসী। নগরের পাবলিক প্লেসগুলোর ভূমিকা একেকটা হৃৎপিণ্ডের মতো। স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নগরের এই হৃৎপিণ্ড তথা রক্তজালকের কার্যকারিতাকে অটুট রাখতে পরিকল্পনা করা। স্থাপত্য কার্যক্রমে সঙ্গে যুক্ত ল্যান্ডস্কেপ স্টুডিও, যার অংশ হিসেবে সুযোগ হয়েছিল চট্টগ্রামের পাবলিক প্লেসগুলোর কার্যকারিতা উপলব্ধি করা। উপযুক্ত আরবান ল্যান্ডস্কেপিংয়ের মাধ্যমে সমস্যার শিকড়ে গিয়ে তার সমাধানের পথ বাতলে দেওয়া। পাবলিক প্লেস হিসেবে আমাদের গবেষণাস্থল ছিল চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল

বহদ্দারহাট বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। বহদ্দারহাট মোড় থেকে আরাকান রোড ধরে একটু এগোলেই চোখে পড়বে চট্টগ্রামের সর্ববৃহৎ বাস টার্মিনাল, বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল। এই বাস টার্মিনালটির আশপাশে গুরুত্বপূর্ণ স্থান বলতে রয়েছে স্বাধীনতা স্মৃতি কমপ্লেক্স (অধুনালুপ্ত জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স), যেখানে রয়েছে দেশের একমাত্র ঘূর্ণায়মান রেস্তোরাঁ। এ ছাড়া চাঁদগাঁও আবাসিক এলাকা, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মহিলা ক্যাম্পাসের অবস্থান এখানে।

এই টার্মিনালটি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) তত্ত্বাবধানে নির্মিত। এটি উদ্বোধন করা হয় ১৯৯৩ সালে। যদিও একটি সুস্পষ্ট মাস্টারপ্ল্যানের গাইডলাইন অনুযায়ী এর কাজ শুরু হয়েছিল, কিন্তু এ কাজের অগ্রগতি খুব সামান্যই।

বাস টার্মিনাল

মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী এই টার্মিনালটির দুটি অংশ, যার উভয়টাতেই ভিন্নভিন্ন রুটের বাস চলাচল করে। দুই পাশে রয়েছে দুটি স্থাপনা। স্থাপনা দুটিতে টার্মিনালে যাতায়াতকারী বাসগুলোর কাউন্টার রয়েছে। কাউন্টারের পাশাপাশি রয়েছে বেশ কিছু খাবারের দোকান ও গাড়ির যন্ত্রাংশ বিক্রির দোকানও। এই টার্মিনালে প্রায় ২০০-২৫০টি বাস একত্রে থাকতে পারে। তবে দিনের বিশেষ কিছু সময় বাসের সংখ্যা ধারণক্ষমতাকে ছাপিয়ে যায়। টার্মিনালের দুটি অংশ থেকে বাস ছেড়ে যায় বিভিন্ন গন্তব্যে। টার্মিনালের বাঁপাশের অংশ থেকে কাপ্তাই, চন্দ্রঘোনা, চুয়েট আর লিচুবাগানের উদ্দেশে বাস ছেড়ে যায়। ডানপাশের অংশ থেকে ছেড়ে যায় কক্সবাজার, বান্দরবান, আনোয়ারা, বাঁশখালি ও উত্তর রাঙ্গুনিয়ার উদ্দেশে।

সার্ভে রিপোর্টের অংশ হিসেবে আমরা টার্মিনালটির ওপর গবেষণা করি। সেখানকার কর্মজীবী মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের আশা-আকাঙ্খা ও সমস্যা-দুর্দশা জানার চেষ্টা করি। কারণ, এই অনুসন্ধানের মাধ্যমেই আমরা সমস্যার গভীরে পৌঁছাতে পারব। পরবর্তী সময়ে প্রস্তাব করতে পারব উপযুক্ত নকশা এবং ল্যান্ডস্কেপিংয়ের মাধ্যমে সেই সমস্যার সমাধানেরও। 

আমাদের দৃষ্টিতে বাস টার্মিনালটির প্রকট সমস্যাগুলো

  • অপরিকল্পিত বাস পার্কিং, যার জন্য এখানে প্রচুর বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হচ্ছে অহরহ।
  • টার্মিনালের ভেতরে ও বাইরের সংযোগকারী সড়কগুলোর জরাজীর্ণ দশা, যা পথচারী ও শ্রমজীবীদের কষ্টকেই কেবল বাড়াচ্ছে।
  • যাত্রী ছাউনির অভাবে যাত্রীদের নানা রকম সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
  • টর্মিনালে কোথাও কোনো ছায়াদানকারী বৃক্ষ নেই। যার জন্য এই বিশাল এলাকায় প্রচুর তাপের উদ্ভব হয়, যা শুষে নেওয়ার জন্য সবুজের অভাব প্রকট।
  • পরিকল্পিত আবর্জনা ব্যবস্থাপনার অভাব রয়েছে এখানে, যা কমপ্লেক্সটিকে করছে আরও বেশি অস্বাস্থ্যকর।
  • টার্মিনাল অফিসটির বেহাল দশা। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে তা শিগগিরই মেরামতের অযোগ্য হয়ে পড়বে।
  • অফিসের নিচতলায় অবস্থিত যাত্রীদের ওয়েটিংরুমের অবস্থা ভয়াবহ।
  • শব্দদূষণ মাত্রার আধিক্য নানা সমস্যার সৃষ্টি করছে। যেখানে মানুষের সাবলীল শ্রবণমাত্রা ৬০ ডেসিবেল, সেখানে বহদ্দারহাট টার্মিনালের ন্যূনতম শব্দ শ্রবণমাত্রা ৮৫ ডেসিবেল। দীর্ঘ সময়ে যা শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
  • অবৈধ ও অপরিকল্পিত অসংখ্য দোকান গড়ে উঠেছে টার্মিনালকে ঘিরে, যা শুধু সেখানকার সুস্থ পরিবেশেরই বিঘ্ন ঘটাচ্ছে না বরং পরিবেশদূষণের কারণ হচ্ছে।
  • টার্মিনালকে ঘিরে পর্যাপ্ত বাফারের অভাব রয়েছে। বাফার হলো একটি বৃহৎ এলাকার মধ্যবর্তী একটি স্থান, যা পুরো এলাকার প্রাণ হিসেবে কাজ করে, যা স্থানটির জন্য হবে শ্বাস নেওয়ার উপযোগী। স্থানটি শুষে নেবে অধিক তাপ। শব্দদূষণের ব্যাঘাত ঘটিয়ে তৈরি করবে মোহনীয় এক আবরণ। একটি ব্যস্ত মহাসড়কের পাশে অন্তত ৬০ থেকে ১০০ ফুট প্রশস্ত বাফার দিতে হয়। বহদ্দারহাট টার্মিনালে যার কোনো ব্যবস্থা নেই। 

এ ছাড়া অন্যান্য সমস্যার মধ্যে রয়েছে আলোকস্বল্পতা, খাবারের রেস্টুরেন্টগুলোর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, রাতে নিরাপত্তার অভাব। সর্বোপরি নেই সুস্পষ্ট পরিকল্পনার কোনো ছাপ।

একজন স্থপতির কাজ হচ্ছে উপযুক্ত পরিকল্পনা আর প্রস্তাবনার মাধ্যমে এই সমস্যাগুলো সমাধানের প্রস্তাব দেওয়া। আমরা বহাদ্দারহাট টার্মিনালের সমস্যাগুলো সমাধানের লক্ষ্যে কিছু প্রস্তাব দিয়েছিলাম। অনেক সমস্যাই ল্যান্ডস্কেপিংয়ের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। বহাদ্দারহাট টার্মিনালের মাস্টারপ্ল্যানের পূর্ণ বাস্তবায়ন করা গেলে সেখানকার কর্মজীবী ও যাতায়াতকারী মানুষের দুর্দশা অনেকাংশে লাঘব হবে।

সঠিকভাবে ল্যান্ডস্কেপিং আর সংস্কারকাজের মাধ্যমে এই সম্ভাবনাময় ও জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানটিকে আরও কার্যক্ষম করে তোলা সম্ভব। 

প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৫ তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৪

Related Posts

তাপসহনীয় নগর পরিকল্পায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন বুয়েট

তাপ সহনীয় নগর পরিকল্পনায় আন্তর্জাতিক মর্যাদা পেয়েছে বুয়েট ও তার একদল শিক্ষার্থী। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকা…

তারুণ্যের কর্ম-বিনোদনের কেন্দ্রযুব উদ্ভাবন পার্ক

দিন বাড়ছে। মানুষ বাড়ছে। বাড়ছে না বসতি আর খেলার মাঠ। সংকীর্ণ শহুরে নাগরিক জীবনে প্রজম্নের চালচিত্র পাল্টাচ্ছে দিন…

লুই কান-এর ছায়ায়: স্থান-কাল-পাত্র প্রদর্শনী চত্বর

প্রকল্পের নাম: উন্মুক্ত স্থাপত্য বিষয়ক প্রদর্শনী ‘স্থান-কাল-পাত্র’ চত্বর স্থান: জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণ আয়োজক: আর্ক-সামিট, ২০২৫; বাংলাদেশ স্থপতি…

বৈষম্যহীন পাড়ার ক্রীড়াকেন্দ্র: শ্যামলি ক্লাব মাঠ

শিক্ষার্থীর নাম: তাসফিয়া মাশিয়াত সাইট এরিয়া: ১০৬৪৮০ স্কয়ার ফিট প্রকল্প ডিজাইনের সময়: ২০২৩ দ্বিতীয় বর্ষ, দ্বিতীয় সেমিস্টার (স্পোর্টস…

01~1
previous arrow
next arrow

CSRM

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

Buet
কী কী থাকছে আকাশছোঁয়া শান্তা পিনাকলে
সমুদ্রবাণিজ্যের বর্জ্য থেকে অনন্যা এক স্থাপত্য
Home of Haor
Weather
Youth Park
Tower
শহর,সেতু আর সুরের টেনেসির আর্টস সেন্টার
Al Hamra