• Home
  • নগরায়ন
  • সবুজ আবাসন এবং আমাদের করণীয় (পর্ব-১)
Image

সবুজ আবাসন এবং আমাদের করণীয় (পর্ব-১)

বর্তমানে পরিবেশ বিপর্যয় একটি বহুল আলোচিত বিষয়। পৃথিবীপৃষ্ঠের তাপমাত্রা যে হারে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা অব্যাহত থাকলে অচিরেই পৃথিবী নামক গ্রহটি দ্রুতই হুমকির সম্মুখীন হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই এ ধরণীকে রক্ষার জন্য চলছে নানা আয়োজন। অনুষ্ঠিত হচ্ছে পরিবেশ সম্মেলন এবং গঠিত হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন ফান্ড। জলবায়ু পরিবর্তন কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর নির্ভর করে না। ভৌগোলিক সাম্যাবস্থা, প্রাকৃতিক সম্পদের সুষম বণ্টন এবং মানুষের কর্মকান্ডের উপর জলবায়ু পরিবর্তন অনেকাংশে নির্ভরশীল। সে ক্ষেত্রে প্রকৌশলী এবং স্থপতিগণ গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করতে পারে। কেননা দিন দিন বিভিন্ন চাহিদাকে মাথায় রেখে ভ‚পৃষ্ঠে যে হারে স্থাপনা গড়ে উঠছে সেই একই হারে কমছে সবুজ বনভ‚মি, অগভীর জলাশয়, কাটা হচ্ছে পাহাড়, পরিবর্তন করা হচ্ছে নদনদীর গতিপথ। তাই প্রকৌশলী এবং স্থপতিদের হতে হবে আরো দায়িত্ববান। পরিবেশ রক্ষার্থে তাদেরই এগিয়ে আসতে হবে সবার আগে।

পরিবেশ বিপর্যয় যখন চরমে, তখন পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত দেশসমূহ স্থাপনার ক্ষেত্রে যে বিষয়টিতে একমত সেটি হলো গ্রীন বিল্ডিং কনসেপ্ট তথা সবুজ আবাসন প্রকল্প। অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ এই গ্রীন বিল্ডিং কনসেপ্ট নিয়ে কাজ করছে, সেই সাথে করছে গবেষণাও। তবে এখানে উল্লেখ্য, অনেক স্থপতি এবং প্রকৌশলীর মধ্যে বিষয়টি নিয়ে কিছুটা ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন গ্রীন বিল্ডিং কনসেপ্ট মানে নতুন স্থাপনা কিংবা যে কোনো স্থাপনাতে গাছ লাগানো। তাই অনেকেই তাদের নকশা করা স্থাপনাগুলোতে গাছ লাগিয়ে সবার সামনে সেটাকে গ্রীন বিল্ডিং বলে আখ্যায়িত করে। ইট, মাটি, সিমেন্ট, বালি, লোহা, কাঠ ইত্যাদি উপকরণের মাধ্যমেই তৈরি হয় একটা স্থাপনা। কেউ যদি শুধু কাঠ, বাঁশ দিয়ে ঘর বানিয়ে সেটাকে গ্রীন বিল্ডিংয়ের সাথে তুলনা করে সেটি হবে প্রকৃতি ধ্বংসের অন্যতম হাতিয়ার। কারণ এর ফলে বনের পর বন কেটে চলবে মরুকরণ। নির্মাতাকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, স্থাপনার জন্য যে সকল উপকরণ ব্যবহৃত হচ্ছে সেটা তার নির্মাণ এলাকা (Construction site) থেকে পাঁচ কিলোমিটার রেডিয়ামের/ রেডিয়াসের/ব্যাসার্ধের মধ্যে আছে কিনা? কারণ যতদূর থেকে উপকরণ সংগ্রহ করা হবে সেগুলো আনতে যে পরিমাণ জ্বালানি পোড়ানো হবে সেটি হবে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। খেয়াল রাখতে হবে, উপকরণগুলো দেশীয় প্রযুক্তি ও জলবায়ুর কথা বিবেচনা করে প্রস্তুত করা হয়েছে কিনা।

সে ক্ষেত্রে কাঠ-কয়লা পুড়িয়ে যে ইটগুলো প্রস্তুত করা হয় সেগুলোকে পরিহার করতে হবে। দেশে বর্তমানে অনেকগুলো সিমেন্ট এবং স্টিল কোম্পানি রয়েছে। অনেকেই দাবি করে থাকেন, তাদের প্রযুক্তি পরিবেশবান্ধব। সে ক্ষেত্রে প্রয়োজনবোধে পরীক্ষা করে নেওয়া যেতে পারে, যেন তাদের বিজ্ঞাপন শুধু লোক দেখানো (Green Eye Wash) না হয়। আমরা যদি স্থাপনাগুলোতে পর্যাপ্ত আলো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করে দিতে পারি তা হলে এসির চাহিদা কমবে এবং বিদ্যুৎ অপচয় কম হবে, যা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করবে। তবে এ ক্ষেত্রে সঠিক যে, বর্তমানে একটি আবাসন প্রকল্পের জন্য কর্তৃপক্ষ শুধু ফাঁকা জায়গার পরিমাণ করে থাকেন। যেমন ধরা যাক, ৫ কাঠার একটি প্লটের জন্য ব্যবহারযোগ্য জমির পরিমাণ ৬০-৬৫% এবং ফাঁকা জায়গার পরিমাণ ৩৫-৪০%। সে ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ শুধুমাত্র ফাঁকা এবং ব্যবহারযোগ্য জায়গার অনুপাত না দেখে যদি ঐ স্থাপনার সারা বছরের শক্তির সক্ষমতা পরীক্ষা (Energy Monitoring) করত তা হলে স্থাপনাটি পরিবেশবান্ধব কিনা সহজেই অনুমেয় হতো। এ ক্ষেত্রে সরকারকে অবশ্যই একটি Building Energy Monitoring Cell-এর ব্যবস্থা করতে হবে, সেখানে থাকবে উক্ত বিষয়ের গবেষক ও বিশেষজ্ঞ যারা প্ল্যান পাস করার সময় বিষয়টা অনুধাবন করে একটা রিপোর্ট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রদান করবেন।

বর্তমানে এ ধরনের Energy Analysis উন্নত দেশগুলোতে হয়ে আসছে। তা ছাড়া আবাসন প্রকল্পগুলোতে নিত্যব্যবহারযোগ্য যে সকল ফিকশ্চার ব্যবহার করা হয়, সেগুলো পরিবেশবান্ধব কিনা খেয়াল রাখতে হবে। যেমন ধরা যাক, টয়লেটের কমোড সেন্সরযুক্ত হলে পানির অপচয় কম হবে, কিংবা ইলেকট্রিক্যাল নাইটিংয়ের ক্ষেত্রে Switching Controlling এবং sensor থাকলে artificial lighting-এর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিদ্যুতের চাহিদা কমবে। আবাসন এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল খাতে যে পরিমাণ পানি প্রতিদিন খরচ করা হয় তার ৪০% যদি রিসাইক্লিলিংয়ের মাধ্যমে পুনরায় ব্যবহার করা যায় তাতে পানির অপচয় রোধ হবে। কারণ পানির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিতকরণ বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। অন্যদিকে বৃষ্টিপ্রধান বাংলাদেশে যদি প্রতিটি স্থাপনায় বৃষ্টির পানিকে ধরে রাখার সুব্যবস্থা করা হয় তা হলে পরিবেশের দিক থেকে সেটা হবে অনেক উল্লেখযোগ্য/গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। যাতে সুন্দর দেখায় সেজন্য অনেকেই আমরা ঘরের ভেতরে বা বাইরে বিভিন্ন রঙ ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণভাবে দেখা উচিত। কারণ রঙ আমাদের অনুভ‚তিকে জাগ্রত করে এবং ঠান্ডা-গরমের পার্থক্য বোঝায়।

এমন রঙ ব্যবহার করা ঠিক নয়, যা সহজেই নষ্ট হয়ে যায় এবং যা থেকে তাপ প্রতিফলিত হয়। গ্রীন বিল্ডিংয়ের অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে, যে উপকরণ দিয়ে প্রকল্প প্রস্তুত হচ্ছে সেগুলো যেন বর্জ্যে পরিণত না হয় বরং সেগুলোকে যেন পরবর্তীতে নতুনভাবে পুনরায় ব্যবহার করা যায় এবং তাপ উৎপন্ন করে এমন উপকরণ ব্যবহার না করাই ভালো, যেমন কাচ। আমরা যথেচ্ছভাবে যেখানে সেখানে কাচ ব্যবহার করে থাকি। সে ক্ষেত্রে স্থাপনার দিক এবং সাইট অ্যানালাইসিস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাচ ব্যবহারের ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে যেন সূর্য থেকে আগত অতিবেগুনি রশ্মি সরাসরি প্রকল্পের অভ্যন্তরে না প্রবেশ করে। সে ক্ষেত্রে Sun Shade কিংবা Louver ব্যবহার করা যেতে পারে। যে ভ‚মিতে প্রকল্পটি হচ্ছে সেটি যদি কোনো আবাদী জমি হয়ে থাকে সেখান প্রকল্পটিকে সরিয়ে আনতে হবে। মডেল প্রকল্পের আশপাশে কোনো জলাশয় থাকলে তাকে ব্যবহারোপযোগী করে তুলতে হবে। কারণ পানির সংস্পর্শে বাতাস যেমন ঠান্ডা হয় এবং সেই বাতাস যদি প্রকল্পের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তা হলে অভ্যন্তরীণ comfort তৈরি হবে এবং Mechanical Ventilation-এর প্রয়োজন কম হবে।

ছাদকে ফেলে না রেখে সেখানে পর্যাপ্ত পরিমাণ সবুজায়ন করা যেতে পারেÑ সে ক্ষেত্রে একদিকে যেমন প্রকল্পটিতে Heat Absorption কম হবে, অন্যদিকে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য বাড়বে। জলছাদ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখতে পারে। আমাদের দৈনন্দিন কর্মকান্ডের জন্য যে পরিমাণ আলো দরকার তার থেকে অনেকগুণ বেশি আলো বাইরে বর্তমান। কিন্তু প্রকল্পের ওপেনিংগুলো যদি সঠিক স্থানে না দেওয়া হয় তাহলে সূর্যালোক বাধাগ্রস্ত হবে এবং উক্ত চাহিদা মেটাতে অধিক পরিমাণ বিদ্যুৎ অপচয় হবে।

এ কথা অনস্বীকার্য যে, সামান্য একটু পদক্ষেপ আবাসন প্রকল্পে প্রায় ৪০% বিদ্যুৎ এবং জ্বালানির অপচয় রোধ করতে পারে। তাই সবার আগে চাই সুষ্ঠু-সুশৃঙ্খল জীবনযাপন প্রণালী (Sustainable Living Pattern)। সব শেষে খেয়াল করে দেখুন, বাইরে যাওয়ার আগে ঘরের সব সুইচ অফ করেছেন তো? এ অভ্যাস এখন থেকেই গড়ে তুলুন।

 লেখক : স্থপতি সজল চৌধুরী

শিক্ষক, স্থাপত্য বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশকাল: বন্ধন ২৭ তম সংখ্যা, জুলাই ২০১২

Related Posts

হাইওয়ের বুকে খাড়া শহর: নগরের নতুন ভাষা

হাইওয়ে একদিকে যেমন চলাচলের জন্য অপরিহার্য, অন্যদিকে এটি শহরের ভেতরের জীবনকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এমনই এক দ্বন্দ্বের মধ্যে…

ByByshuprova Apr 20, 2026

শহর,সেতু আর সুরের টেনেসির আর্টস সেন্টার

বর্তমানে সমসাময়িক স্থাপত্যের একটি বড় দিক হলো ভবনকে শহরের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। এই…

বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট স্থাপত্যের সমসাময়িক ভাষা

বাংলাদেশের নগর জীবনে আবাসন এখন আর কেবল একটি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নয়, এটি ক্রমশ হয়ে উঠছে সামাজিক অবস্থান, জীবনযাত্রার…

লুই কান-এর ছায়ায়: স্থান-কাল-পাত্র প্রদর্শনী চত্বর

প্রকল্পের নাম: উন্মুক্ত স্থাপত্য বিষয়ক প্রদর্শনী ‘স্থান-কাল-পাত্র’ চত্বর স্থান: জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণ আয়োজক: আর্ক-সামিট, ২০২৫; বাংলাদেশ স্থপতি…

01~1
previous arrow
next arrow

CSRM

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

কী কী থাকছে আকাশছোঁয়া শান্তা পিনাকলে
সমুদ্রবাণিজ্যের বর্জ্য থেকে অনন্যা এক স্থাপত্য
Home of Haor
Weather
Youth Park
Tower
শহর,সেতু আর সুরের টেনেসির আর্টস সেন্টার
Al Hamra
Teroshri Mosq