প্রকৃতিকে ঘরে আনার চেষ্টা মানুষের অনাদিকালের। প্রকৃতির বন্যপ্রাণী আর পাখিকে বশ মানিয়ে মানুষ তাদের করেছে বসবাস, বিনোদন ও প্রয়োজনের নিত্যসঙ্গী। নদী-সমুুদ্রের বৈচিত্র্যময় মাছও বাদ যায়নি শখের এমন সংগ্রহ থেকে। অন্দরের সৌন্দর্য বাড়াতে অ্যাকুরিয়ামের প্রচলন অনেক আগে থেকেই। গৃহকোণে বাহারি রঙের বিচিত্র সব মাছের চঞ্চল ছোটাছুটি ঘরের সৌন্দর্যের পাশাপাশি ভালো লাগা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ; নিষ্প্রাণ ঘরকে করে তোলে প্রাণবন্ত। বাড়ির সদস্যদের পাশাপাশি আগত অতিথিদের জোগায় প্রশান্তি, আর ছোটদের কাছে যা রীতিমতো খেলার সঙ্গী।
অ্যাকুরিয়াম পানিভর্তি একধরনের বিশেষ কাচের জার বা পাত্র, যেখানে ছোট প্রজাতির মাছ সহজেই বিচরণ করতে পারে। চারকোনা, গোলাকার ও ছোট গোল জারের অ্যাকুরিয়ামের প্রচলনই এখানে বেশি। বাহারি রঙের মাছের পাশাপাশি অ্যাকুরিয়ামের সৌন্দর্য বাড়াতে নানা রকম ডেকোরেশনেরও ব্যবস্থা রয়েছে। প্রাকৃতিক পরিবেশের আদল এতে যুক্ত করা হয়েছে নজরকাড়া সব কৃত্রিম সবুজ শেওলা কিংবা মিশ্র রঙের প্লান্ট। এ ছাড়া প্রয়োজনবোধে চীনামাটির তৈরি কুমির, হাঁস, বড় প্রবাল আকৃতির পাহাড়ও সংযোজন করা হয় প্রয়োজনবোধে।
অ্যাকুরিয়ামের রঙিন যত মাছ
অ্যাকুরিয়ামে পোষা বর্ণিল সব প্রজাতির মাছের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় গোল্ডফিশ। সাদা-কালোর মিশ্রণের অ্যাঞ্জেল ফিশের চাহিদাও তুঙ্গে। আরও রয়েছে এলবিনো শার্ক, চকচকে রুপালি রঙের সিলভার শার্ক, লম্বাটে গড়নের টাইগার শার্ক ও বিচিত্র রঙের দৃষ্টিনন্দন ডিসকাস ফিশ। লাল পাখনা ও ধূসর শরীরের রেম্বু শার্ক ও কালো শরীরের গুচ্ছ লেজওয়ালা ব্ল্যাকমুর ফিশ, ব্লু ও গোল্ডেন গোরামি, কই কাপ বা কমেড ফিশও কম যায় না। লাল, নীল, ধূসর, আকাশি ও ক্রস রঙের ফাইটার ফিশও সৌন্দর্য বাড়িয়ে তোলে। কমেট, মলি, ফলি, গপ্পি, সিলভার ডলার, অস্কার, ব্লু-আকারা, টেলিচো, কৈ কার্প, টাইগার কৈ কার্প, সোটটেল, প্লাটি, এরোনা, ফ্লাওয়ার হর্ন, হাইফিন নোজ, ব্ল্যাক গোস্ট, সিসকাসসহ বিভিন্ন জাতের মাছের পাশাপাশি স্থান করে নিয়েছে ছোট আকারের কচ্ছপও।
অন্দরের সৌন্দর্যে অ্যাকুরিয়াম
অ্যাকুরিয়াম ঘরের পরিবেশে ভিন্ন লুক আনে। ঘরের কোণের অ্যাকুরিয়ামে জীবন্ত বাহারি রঙের মাছগুলো যখন সাঁতার কাটে তখন দেখতে অসাধারণ লাগে। বসার ঘরে বড় ধরনের চারকোনা অ্যাকুরিয়াম আর যেকোনো রুমে ছোট্ট একটা গোল জারে একটা বা দুইটা মাছ দেখতে দারুণ লাগে। শোবার ঘরের যেকোনো খোলামেলা একটি কোণে রাখতে পারেন সুবিধা আকৃতির অ্যাকুরিয়াম। ডাইনিং রুমে চারকোনা একটু বড় আকারের অ্যাকুরিয়াম বেশি মানায়। অনেকের ঘরে ঢোকার আগে বেশ ফাঁকা জায়গা বা অতিরিক্ত ডেকোরেশনের জন্য বারান্দা বা রুম দুটির বাইরে একরকম জায়গা রাখেন। আর সেখান থেকেই অতিথির চোখ পড়ে অ্যাকুরিয়ামের দিকে। অ্যাকুরিয়াম কেনার আগে ঘরের আয়তন মাথায় রাখতে হবে। কারণ, বেশি বড় বা ছোট অ্যাকুরিয়াম ঘরে বেমানান লাগতে পারে।
মাছের খাদ্য অ্যাকুরিয়ামে
অ্যাকুরিয়ামের মাছকে নিয়মিত খাওয়ানো দরকার। যেহেতু কোনো প্রাকৃতিক খাবার (প্লাঙ্কটন বা জুপ্লাঙ্কটন) অ্যাকুরিয়ামে তৈরির কোনো সুযোগ নেই, তাই মাছকে খাবার সরবরাহ করতে হয়। খাবার দেওয়ার ১০ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে মাছেরা খাবার খেয়ে ফেলে। খাবার দিনের নির্দিষ্ট সময়ে দেওয়া ভালো। এবং যতটা এরা খেতে পারে ততটাই দেওয়া উচিত। বেশি দিলে পানি দূষিত হবে, কম দিলে মাছ অভুক্ত বা অর্ধভুক্ত থাকবে। মূলত দুই ধরনের খাবার দেওয়া হয়। জীবন্ত খাবার ও তৈরি করা বা নকল খাবার। জীবন্ত খাবার আবার দুই ধরনের-
১. উদ্ভিদ জাতীয় প্লাঙ্কটন বা সূক্ষ্ম জলজ উদ্ভিদকণা
২. জুপ্লাঙ্কটন বা সূক্ষ্ম জলজ প্রাণী।
খাবার তৈরি করা হয় ছোট ছোট দানার আকারে। প্রথমে মন্ড তৈরি করা হয়। এই মন্ডে চাল ও গমের গুঁড়ো, ছাতু, মাছের গুঁড়ো, চিংড়ির গুঁড়ো, শুকনো রক্ত, মাংসের গুঁড়ো, ঝোলা গুড়, খনিজ পদার্থ, ভিটামিন, ইস্ট পাউডার থাকে। এরপর এই মন্ডকে দানা খাদ্যে পরিণত করা হয়।
মাছের স্বাস্থ্য রক্ষা
আমাদের দেশের আবহাওয়ায় মাছেদের সাধারণত লেজ পচা বা ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন, মাছের গায়ে সাদা দাগ বা আইচ, অ্যাংকর, কষা বা মাছের পেট ফোলা রোগ হতে পারে। কোনো মাছ রোগাক্রান্ত হলে সেটাকে তুলে অন্য জারে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়াই ভালো। তা না হলে অন্য মাছও আক্রান্ত হতে পারে। এসব রোগ একেবারে নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়াই ভালো। সুস্থ মাছের জন্য সুস্থ অ্যাকুরিয়ামের বিকল্প নেই। এ জন্য প্রয়োজন নিয়মিত যত্ন।
অ্যাকুরিয়ামের যত্ন ও সতর্কতা
- অ্যাকুরিয়ামের পানি সপ্তাহে অন্তত একবার বদলে পরিষ্কার করতে হবে।
- পানি পরিবর্তন করার আগে মাছগুলো অন্য একটি পানি দেওয়া পাত্র/জারে রাখতে হবে।
- হাত দিয়ে মাছ না ধরে মাছ বের করার জন্য নেট ব্যবহার করা উত্তম।
- নতুন পানিতে পরিমাণমতো অ্যাকুরিয়াম সল্ট দিতে হবে।
- পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা ঠিক রাখতে, অ্যাকুরিয়ামের সঙ্গে অবশ্যই অক্সিজেন পাম্পার ব্যবহার করতে হবে।
- অ্যাকুরিয়ামের ভেতরে ছোট নুড়িপাথর রাখলে তা দেখতে আরও আকর্ষণীয় লাগে।
- অ্যাকুরিয়ামে আলো জ্বালাতে এনার্জি সেভিং বাল্ব বা হ্যালোজেন বাল্ব ব্যবহার করতে পারেন।
- কচ্ছপ পালার ক্ষেত্রে অ্যাকুরিয়ামে পাথরের স্তূপ করে পানি থেকে উঁচু একটি জায়গা তৈরি করতে হবে। কারণ, কচ্ছপ সব সময় পানির নিচে থাকে না।
- মাছ সর্বদাই পানির যে তাপমাত্রায় থাকতে পছন্দ করে পানির নিচে একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় থাকে। আমাদের দেশে গরমকালে পানির এই তাপমাত্রার তারতম্য হয়। তাই পানির তাপমাত্রা বজায় রাখতে সব সময় একটি থার্মোমিটার রাখুন। এতে মাছ সহজে মরবে না।
- অ্যাকুরিয়ামের অক্সিজেন পাম্পার বিদ্যুতের সাহায্যে চলে। তাই ভেজা হাতে পাম্পার ধরা ঠিক নয়।
- অনেক সময় আর্থিংয়ের কারণে পানিতে বিদ্যুৎ চলে যায়, তাই সুইচ অফ না করে পানিতে হাত দেওয়া যাবে না।
- অ্যাকুরিয়ামে অনেক পানি ধরে রাখতে হয় এ জন্য পুরু কাচের ও শক্ত-মজবুত অ্যাকুরিয়াম কেনাই উত্তম।
মাছ ও মাছের খাদ্যমূল্য
সাধারণত প্রতিজোড়া মাছ ৫০ থেকে ৭০০ টাকায় কেনা যায়। কিছু মাছের দাম বেশি। তবে দাম অনেকটা নির্ভর করে ছোট-বড় ও প্রজাতিভেদে। যেমন-জোড়া ১০০ থেকে ৬০০ টাকা। সিলভার শার্ক ৮০ থেকে ১৫০ টাকা। টাইগার শার্ক ৭০ থেকে ১০০ টাকা। এলবিনো শার্ক ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। অ্যাঞ্জেল ফিশ ১৫০ থেকে ৬৫০ টাকা। ডিসকাস ৩০০ থেকে ১২০০ টাকা। ব্লু ও গোল্ডেন গোরামি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। বেলুনমলি ১০০ থেকে ১৩০ টাকা। কমেড ১২০ থেকে ১৫০ টাকা। রেম্বু শার্ক ১৫০ থেকে ২২০ টাকা। মুনটেলমলি প্রতি পিস ১০০ থেকে ১৩০ টাকা। ক্যাট ফিশ ৭০ থেকে ১০০ টাকা। বাংলালিংক ৮০ থেকে ১২০ টাকা। প্লাটি ৬০ থেকে ৮০ টাকা। ফাইটার ফিশ ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। কাছিম ২০০ থেকে ৫০০ টাকা।
মাছের খাবারের দাম পড়বে ২৫ থেকে ১০০ টাকা। অ্যাকুরিয়ামের যে মাছ এখন আমাদের দেশে পাওয়া যায়, একটা সময় তার প্রায় সবই থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হতো। কিন্তু এখন প্রায় ৯০ শতাংশ মাছই আমাদের দেশের বরিশাল, নোয়াখালীর বিভিন্ন স্থানে চাষ হচ্ছে এবং সেসব মাছই এখন বাংলাদেশের বিভিন্ন অ্যাকুরিয়ামে করে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। তাই কেবল শখ কিংবা সৌন্দর্যবর্ধন নয়, চাইলে অ্যাকুরিয়ামে মাছের চাষ ও ব্যবসা করে যেমন স্বাবলম্বী হওয়া যায়, তেমনি বিদেশে রঙিন মাছ রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রাও আয় করা যায়।
দরদাম ও প্রাপ্তিস্থান
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অ্যাকুরিয়ামের কেশ কটি দোকান রয়েছে। তবে এর সবচেয়ে বড় বাজার কাঁটাবনে। এ ছাড়া নিউমার্কেট, মিরপুর, বনানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে অ্যাকুরিয়াম-সামগ্রীর দোকান। স্ট্যান্ডসহ অ্যাকুরিয়ামের দাম পড়বে ১ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে। এ ছাড়া এতে পাথর কুচি, ফিল্টার, এয়ার মোটর, রাবারের ফ্লেক্সিবল পাইপ, এয়ার এক্সিকিউটর সংযোজন করতে হবে। প্রতি কেজি পাথর কুচির দাম ১৫-৪০ টাকা। এয়ার মোটরের দাম (সাধারণ মানের) প্রায় ২৫০-১০০০ টাকা, ফ্লেক্সিবল পাইপ ১০ টাকা (প্রতি গজ), এয়ার এক্সিকিউটর ১০০-৪০০ টাকা, ফিল্টার ১০০-২০০ টাকায় পাওয়া যায়। ওয়াটার হিটার ১০০-৫০০ টাকায় কিনতে পাওয়া যায়।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৫তম সংখ্যা, মে ২০১৭।