শহর মানেই চার দেয়ালে বন্দী, শহর মানে ইট, কংক্রিটের জঙ্গল, যেখানে প্রকৃতি সুদূরপরাহত। অবশ্য আমরা প্রকৃতিরই অংশ, তাই প্রকৃতি থেকে দূরে গেলেই ঘটে বিপর্যয়, শুরু হয় নানান সমস্যার। আর তাই প্রয়োজন যত বেশি গাছ লাগানোর, এতে শুধু নিজেই উপকৃত হবেন না, এর সুফল পাবে আপনার আগামী প্রজš§ও। বাড়ির ছাদে সবুজে ঘেরা বাগান সঙ্গে ফুলের মিষ্টি সুবাস বদলে দেবে আপনার অন্দরের সৌন্দর্যই।
আপনার চারপাশের সৌন্দর্য ঝলমলিয়ে ওঠার অন্যতম অনুষঙ্গ সবুজ গাছ, সেটিকে যেখানেই রাখুন না কেন। আপনার অন্দর মহলে যেকোনো শূন্যতা ভরিয়ে দিতে পারে গাছ। বিভিন্ন আকৃতির, বিভিন্ন আকারের গাছ দিয়ে তৈরি করুন অন্দরে স্বপ্নময় পরিবেশ। এ নগরে যারা একটু সচেতন, তারা কিন্তু অনেক আগ থেকেই প্রকৃতির ছোঁয়ার অন্দর সাজাচ্ছেন।
ছাদে টব বসিয়ে বাগান করা নতুন কিছু নয়। একটু বিস্তত চিন্তা করলে এতে কিন্তু ছাদের সৌন্দর্যও বাড়ে কয়েকগুণ। ছাদে মাটি ফেলে তৈরি করতে পারেন মনোরম বাগান কিংবা লন। তবে ছাদে পুরো বাগানের আদল আনতে চাইলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শে বাগান করুন। এতে খরচ বাঁচার পাশাপাশি রেহাই পাবেন ছাদের কোনো ধরনের ক্ষতি হওয়া থেকে। আজকাল ইন্টেরিয়র ডিজাইনাররা সুন্দর ল্যান্ডস্কেপিংয়ের মাধ্যমেও ছাদে বাগান করছেন। ঘাস বিছানোর পাশাপাশি ছোট-বড় নানা আকারের পাতাবাহার ফুলগাছ ব্যবহার করে সাজিয়ে নিন শখের বাগান। যদি কেউ চান তবে বড় টব বা ড্রামে লাগিয়ে নিতে পারেন নানান ফলজ বৃক্ষ। কোন জায়গায় কী ধরনের গাছ লাগাবেন তা ভালো করে জেনে নিন নিকটস্থ নার্সারি থেকে। কারণ, গাছ নির্বাচনে আলো-ছায়ায় বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। গাছ নির্বাচনের সময় গাছের ধরন ও সাইজ অনুযায়ী বানাতে পারেন ঝাড়। ছাদের বাগানে বিভিন্ন ধরনের গাছ লাগাতে পারেন কিন্তু লক্ষ রাখবেন বেশি ভালো লাগছে কোনটি। কারণ, ছোট জায়গায় বড় গাছ ভালো নাও লাগতে পারে। আবার খুব বড় জায়গা হলে ছোট ছোট গাছ বেমানান লাগতে পারে। যদি ছাদের কোনো অংশে ডিভাইডার করতে চান, তাহলে লম্বা গাছ বেছে নিন।
বাড়তি সৌন্দর্যের জন্য গাছের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের পাথরের সংযোগ ঘটান। দেখুন না কী মনোমুগ্ধকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়! যদি সম্ভব হয় এক কর্নারে সাজিয়ে নিন ছোট ঝরনায়। এতে ছাদেই পাবেন অরণ্যের স্বাদ। টেরাকোটা বা চিনামাটির পাত্রে লাগানো গাছ হতে পারে ছাদ বাগানের সৌন্দর্যের পরিপূরক। জায়গা বেশি থাকলে রড আয়নের আসবাব অথবা একটি দোলনা, সঙ্গে রঙিন ছাতা বদলে দেবে আপনার আটপৌড়ে জীবনধারনের ধারণাটাই। যদি সম্ভব হয় কিছু পাখিও যুক্ত করতে পারেন বাগানে বনের আমেজ আনতে।
আপনার অন্দরমহলে গাছ শুধু রাখলেই চলবে না বরং লক্ষ রাখতে হবে আপনার রুমের জন্য কোন গাছটি বেশি মানানসই ও উপযুক্ত। এটা নির্ভর করবে জায়গা আর বাড়ির সাজসজ্জার ওপর। ইনডোর প্লান্ট রাখার চিন্তা মাথায় থাকলে ঘরের রূপ হালকা হওয়াই ভালো। কারণ গাঢ় রং আলো শোষণ করে। ঘরের আলোর ওপর নির্ভর করে গাছ নির্বাচন করুন। ঘরের ইন্টেরিয়র বৈচিত্র্য আনতে আপনি থিম অনুযায়ী গাছ পছন্দ করতে পারেন। হতে পারে সেটা ফুলভিত্তিক, আর্কিটেকচারাল অথবা রং-বেরংয়ের পাতা। বাজারে বিভিন্ন ধরনের পাত্র বা টব পাওয়া যায় গাছ লাগানোর জন্য। সে জন্য ঘরের সাইজ ও ফার্নিচারের ধরন মিলিয়ে নির্বাচন করুন আপনার পছন্দসই পাত্র।
ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনের মূল একটি অংশ হতে পারে ইনডোর প্লান্টস। বিভিন্ন ধরনের ইনডোর প্লান্টস থাকতে পারে আপনার পছন্দের তালিকায়, যেমন- ডেসিনা প্লান্টের মধ্যে আছে গোল্ডেন ডেসিনা, রিবগ ডেসিনা, বাঁশপাতা, অগ্নিসর, কনকি ইত্যাদি। এ ছাড়া ক্রিটাল বাঁশ, ফার্ন, গাবপাতা, মেরেন্ডা উল্লেখযোগ্য। আর হ্যাক্সিং ইনডোর প্লান্টসের মধ্যে আছে বিভিন্ন ধরনের আর্কিড যেমন- ডেন্ডোরিয়াম, মোন্দারা, অনসিডিয়াম, ক্যাটালগ অর্কিড। এ ছাড়া লিপস্টিক, গ্রিল লিফ, ক্যাকটাস, আইল্যান্ড স্টার, মানিপ্লান্ট অন্দরমহলের জন্য দারুন।
তবে অনেকেই হয়তো ভাবছেন থাকেন ছোট ফ্ল্যাটে, যেখানে সবুজের প্রাণবন্ত উপস্থিতি কিংবা ছাদবাগানের বিলাসিতা মানাবে কি! তা অবশ্য ঠিক, তবে ছোট একটি বাগান করতে পারেন ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতেও। আয়তনে হয়তো কিছুটা ছোট হবে কিন্তু তাতে সৌন্দর্যের কমতি হবে না এতটুকু। আর প্রকৃতির এ ছোঁয়া ও গাছের বিভিন্ন শেডের সবুজ রং যদি বারান্দার গন্ডি পেরিয়ে আপনার বসার ঘরের কোণে, শোয়ার ঘরের জানালার পাশে অথবা বাথরুমে উপস্থিত হয়, তাহলে তো কথাই নেই। অন্দরের বিভিন্ন অংশে তৈরি করে ফেলুন গ্রিন কর্নার। বলতে পারেন আপনার এই গ্রিন কর্নার কিংবা রুমাল বাগান আপনাকে দেবে নয়ন-সুখের আশ্বাস।
ইনডোর প্লান্টসের যত্মআত্তি
- সপ্তাহে অন্তত এক দিন সব গাছ রোদে দিন। কারণ, একটা গাছের ঠিকমতো বেড়ে ওঠা এবং বেঁচে থাকার জন্য সূর্যের আলো খুবই দরকার। তবে দুপুরের কড়া রোদে গাছ রাখবেন না। সকালের হালকা রোদে গাছ কিছুক্ষণ বাইরে রাখার চেষ্টা করুন।
- চারাগাছ ভালো রাখার জন্য বাঁশ ও কাঠের ফ্রেম তৈরি করুন। টবের গাছগুলো এই ফ্রেম দিয়ে ঘিরে রাখুন। প্লাস্টিকের শিট দিয়ে ওপরের খোলা জায়গাটা ঢেকে রাখুন। তবে খেয়াল রাখুন যাতে গাছের ওপর প্লাস্টিকের শিট লেগে না যায়। বাতাস চলাচলের জন্য যেন জায়গা থাকে। চারাগাছ একটু বড় হলে অন্য জায়গায় সরিয়ে নিতে পারেন।
- পচা পাতা, হলুদ বা খয়েরি কান্ড গাছের কাছে না জমিয়ে রেখে ফেলে দিন। গাছের টব বদলানোর সময় লক্ষ রাখবেন যাতে শিকড় নষ্ট না হয়। নিয়ম করে পুরোনো পাতা কিংবা একটু নষ্ট হয়ে যাওয়া পাতা পরিষ্কার করে ফেলুন।
- গাছে ঘন ঘন পানি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। অতিরিক্ত পানি দিলে গাছ পচে যেতে পারে। কিন্তু তাই বলে একেবারে পানি দেওয়া বন্ধ করবেন না। তাহলে গাছ দুর্বল হয়ে পড়বে। সকাল-বিকেল অল্প করে পানি দিন।
- গাছের ফুল বা পাতার রং হালকা হতে থাকলে ঠান্ডা ও আলো কম পৌঁছায় এমন জায়গায় রাখুন। কারণ, অতিরিক্ত আলো ও তাপের সংস্পর্শে এসে গাছের পাতা ও ফুলের রং হালকা হয়ে যায়। বাগানে শেডের ব্যবস্থা করতে পারেন এবং বাড়ির বারান্দায় রাখতে পারেন।
- ইনডোর প্লান্টসের বৃদ্ধি অন্যান্য গাছের তুলনায় কম।
- রাতে গাছ কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়ে বলে যতটা সম্ভব গাছ থেকে দূরে থাকুন। সম্ভব হলে রাতে ঘরের বাইরে গাছগুলো রেখে দিন এবং সকালে আবার ঘরে নিয়ে আসুন। আর যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে জানালা খোলা রাখুন।
- গাছের পাতায় বেশি ধুলো জমলে জোরে ঘষবেন না, নরম কাপড়ে অল্প পানি দিয়ে পরিষ্কার করুন। অথবা স্প্রে করে শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে নিন। পাতার নিচের অংশও পরিষ্কার করুন। কারণ ধুলো-ময়লার সঙ্গে জমে থাকে পোকামাকড়।
ফারজানা গাজী
সিওও (চিফ অপারেটিং অফিসার), ইকো ইনোভেটরস
farzanagazi¦yahoo.com
প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৩ তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৪