সমুদ্রবাণিজ্যের বর্জ্য থেকে অনন্যা এক স্থাপত্য

পরিত্যক্ত শিপিং কনটেইনার ও মাটির মতো সহজ উপাদানকে ব্যবহার করে ভারতের তামিলনাড়ুতে তৈরি হয়েছে এক জলবায়ু-সংবেদনশীল স্থাপত্য। নাম পেট্টি রেস্তোরাঁ, স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান ওয়ালমেকার্স-এর একটি ব্যতিক্রমধর্মী কাজ। পেট্টি শব্দটা এসেছে যার অর্থ কন্টেইনার। 

বর্জ্য উপাদানের পুনর্ব্যবহার

তামিলনাড়ুর টুটিকোরিন অঞ্চলে দীর্ঘদিনের সামুদ্রিক বাণিজ্যের ফলে বিপুল পরিমাণ পরিত্যক্ত শিপিং কনটেইনার জমে ছিল। এই ‘অতিরিক্ত’ উপাদানকেই স্থপতিরা মূল নির্মাণ উপাদান হিসেবে গ্রহণ করেন। পেট্টি রেস্তোরাঁতে ১২টি কনটেইনার ব্যবহার করে প্রায় ২০০ জনের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। 

কনটেইনারের ঊর্ধ্বমুখী বিন্যাসে বেড়েছে ভেতরের উচ্চতা। ছবি: ডিজাইনবুম
সংকীর্ণ জমিতে নতুন সম্ভাবনা

প্রচলিত ভঙ্গিতে কনটেইনারগুলো অনুভূমিকভাবে ব্যবহার করা হলেও, এই প্রকল্পে সেগুলোকে ঊর্ধ্বমুখী করে স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে ভেতরের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং একটি সংকীর্ণ জমিতে অধিক ব্যবহারযোগ্য জায়গা তৈরি হয়েছে। 

মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে ক্রেনের সাহায্যে এই ১২টি কনটেইনার স্থাপন করে ওয়েল্ডিংয়ের মাধ্যমে একটি একক কাঠামো নির্মাণ করা হয়। এই দ্রুত নির্মাণ পদ্ধতি ভবিষ্যতের মডুলার স্থাপত্যের সম্ভাবনাকেও সামনে নিয়ে আসে। 

মাটির আবরণ: তাপ নিয়ন্ত্রণের প্রাকৃতিক কৌশল

উষ্ণ আবহাওয়ায় ভবনের তাপ নিয়ন্ত্রণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই সমস্যার সমাধানে কনটেইনারের বাইরের অংশে ঢালাই করা মাটির একটি স্তর ব্যবহার করা হয়েছে। এই ঢালাইকৃত মাটির আবরণ তাপ শোষণ কমায় এবং ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। 

এ ছাড়াও, এই মাটির স্তরটি এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যাতে এতে ফাঁক ও খাঁজ তৈরি হয় যা বাতাস চলাচল সহজ করে এবং একই সঙ্গে সূর্যের তাপ থেকে ইস্পাত কাঠামোকে রক্ষা করে। ফলে যান্ত্রিক শীতলীকরণের উপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। 

কনটেইনারের বাইরের দেয়ালে মাটির ঢালাইকৃত আবরণ ভেতরে আনে শীতল আবহ। ছবি: ডিজাইনবুম

প্রাকৃতিক বায়ুপ্রবাহ ও ছায়া: প্যাসিভ ডিজাইনের প্রয়োগ

কনটেইনারগুলোর স্তরবিন্যাস একটু এলোমেলোভাবে করা হয়েছে যাতে ভবনের ভেতরে স্বাভাবিক বায়ুপ্রবাহ সৃষ্টি হয়। কিছু অংশ সম্পূর্ণ বন্ধ রেখে এবং কিছু অংশ খোলা রেখে একটি ভারসাম্য তৈরি করা হয়েছে যা সরাসরি সূর্যালোক কমিয়ে শীতল পরিবেশ বজায় রাখে। 

এই নকশায় ছায়া, বায়ু ও ভর এই তিনটি উপাদানই তাপ নিয়ন্ত্রণের প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে, যা একটি সম্পূর্ণ প্যাসিভ কৌশল। 

রেস্তোরাঁর ভিতরে তৈরি হয়েছে ছোট ছোট ব্যক্তিগত খাওয়ার কর্ণার। ছবি: ডিজাইনবুম
অভ্যন্তরীণ বিন্যাস: ছোট ছোট নিজস্ব অভিজ্ঞতা

অভ্যন্তরে কনটেইনারের কাঁচা গঠনকে দৃশ্যমান রাখা হয়েছে। ইস্পাত কাঠামো, কাঠের ব্যবহার এবং অক্সাইড ফিনিশ মেঝে মিলিয়ে একটি প্রাকৃতিক ও উষ্ণ পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। 

ডিজাইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রতিটি বসার জায়গাকে আলাদা ছোট ব্যক্তিগত স্পেস হিসেবে গড়ে তোলা। সংকীর্ণ প্লট হওয়া সত্ত্বেও এই বিন্যাস ব্যবহারকারীদের জন্য এক ধরনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তৈরি করে। 

দিনে স্কাইলাইট দিয়ে প্রাকৃতিক আলো প্রবেশ করে, আর রাতে পুনর্ব্যবহৃত উপকরণ দিয়ে তৈরি আলোকসজ্জা একটি উষ্ণ আবহ তৈরি করে। 

উপাদান ও দর্শন: ইউটোপিয়া একটি পদ্ধতি হিসেবে

এই প্রকল্পে পুনর্ব্যবহারকে নির্মাণ-দর্শন হিসেবে দেখা হয়েছে। ইস্পাত ও মাটি দুটি ভিন্ন উপাদানকে একত্রে ব্যবহার করে একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, যেখানে একটির সীমাবদ্ধতা অন্যটি পূরণ করে। 

ইস্পাত ও মাটির সমন্বয়ে তৈরি কাঠামো, যেখানে একটির সীমাবদ্ধতা অন্যটি পূরণ করে। ছবি: ডিজাইনবুম

স্থাপত্যের ভবিষ্যৎ নতুন উপকরণে নয়, বরং বিদ্যমান উপকরণের নতুন ব্যাখ্যায় নিহিত। পরিত্যক্ত কনটেইনার, সাধারণ মাটি, আর জলবায়ু-সংবেদনশীল নকশা এই তিনের সংমিশ্রণে তৈরি হয়েছে এমন এক স্থাপত্য, যা একই সঙ্গে বাস্তব, টেকসই এবং কল্পনাপ্রসূত। পেট্টি রেস্তরাঁ আমাদের সেটাই শেখায়।

তথ্যসূত্র:

ডিজাইনবুম

স্থপতি সুপ্রভা জুঁই
+ posts