Image

বিশেষায়িত কংক্রিটের রকমফের

পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট, কোর্স এগ্রিগেট, ফাইন এগ্রিগেট এবং পানির সমন্বয়ে প্রচলিত কংক্রিট প্রস্তুত করা হয়, যা গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ সামগ্রী হিসেবে সারা বিশ্বে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও ব্যবহৃত হবে। নির্মাণ প্রযুক্তি বিদ্যা এবং নির্মাণসামগ্রীর অবিরাম পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে কংক্রিট সম্পর্কে এক নতুন ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। এই নতুন ধারণার উপর ভিত্তি করে উন্নত কংক্রিটের নামকরণ করা হয়েছে ‘বিশেষ ধরনের কংক্রিট’। এটাকে নিম্নোক্তভাবে বিভক্ত করা যায়-

  • ১. পলিমার কংক্রিট
  • ২. সুপারপ্লাস্টিসাইজড্ কংক্রিট
  • ৩. ফাইবার রিইনফোর্সড কংক্রিট
  • ৪. সালফার-ইমপ্রেগনেটেড কংক্রিট
  • ৫. আলট্র্রা হাই স্ট্রেংথ কংক্রিট

পলিমার কংক্রিট

কংক্রিট প্রযুক্তিবিদরা অবিরাম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এর গুণাগুণকে বৃদ্ধি এবং উন্নত করতে এক নতুন ধরনের কংক্রিট তৈরি করেছেন, যা পলিমার কংক্রিট নামে পরিচিত।

আমরা জানি, সিমেন্ট কংক্রিট এক ধরনের ছিদ্রযুক্ত নির্মাণ সামগ্রী। অর্থাৎ এর মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র রয়েছে। এই ছিদ্রের উপস্থিতির জন্য কংক্রিটের সামর্থ্য এবং স্থায়িত্ব হ্র্রাস পায়। এই ছিদ্রময়তার পরিমাণ কমাতে পারলে কংক্রিটের চাপ শক্তি এবং স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পাবে। ভাইব্রেশন, চাপ প্রয়োগ, বিলম্বিতকরণ ইত্যাদির মাধ্যমে ছিদ্রময়তার পরিমাণ প্রায় ২৮% কমানো যায়। মনোমার ব্যবহার এবং পর্যায়ক্রমিক পলিমারাইজেশনের ফলে ছিদ্রময়তার পরিমাণ আরও হ্রাস করা সম্ভব এবং কংক্রিটের শক্তি ও অন্য গুণাগুণ বৃদ্ধি করা যায়।

পলিমার কংক্রিটে যে সকল মনোমার ব্যবহার করা হয়, তা হলো-

  • ১. মিথাইল মেথাক্রাইলেট
  • ২. স্টাইরিন
  • ৩. অ্যাক্রাইলোনিট্রিল
  • ৪. পলিস্টার স্টাইরিন
  • ৫. এপোক্সি স্টাইরিন
  • ৬. ভিনাইলিডিনি ক্লোরাইড

পলিমার কংক্রিটের ব্যবহার

  • ১. প্রিফেব্রিকেটেড স্ট্রাকচারাল এলিমেন্টে
  • ২. প্রি-পস্ট্রসড কংক্রিটে
  • ৩. মেরিন কাজে 
  • ৪. লবণযুক্ত প্ল্যান্টে 
  • ৫. নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টে
  • ৬. সিউয়ারেজ কাজে-পাইপ এবং নিষ্কাশন কাজে
  • ৭. ফেরো-সিমেন্ট উৎপাদনে
  • ৮. পানিরোধী কাঠামোতে
  • ৯. শিল্প কারখানায়।

পলিমার কংক্রিটের প্রকারভেদ 

  • ১. পলিমার ইম্প্রেগনেটেড কংক্রিট
  • ২. পলিমার সিমেন্ট কংক্রিট
  • ৩. পলিমার কংক্রিট

শক্ত সিমেন্ট কংক্রিটে মনোমার সম্পৃক্ত করে তাপের সাহায্যে পলিমারাইজেশনের পর পলিমার ইমপ্রিগনেট কংক্রিটে পরিণত হয়। পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট কংক্রিটে পলিমার বা মনোমার একত্রীভূত করে যে কংক্রিট তৈরি করা হয় তাকে পলিমার সিমেন্ট কংক্রিট বলে। আর সিমেন্টের পরিবর্তে পলিমার বা মনোমার বাইন্ডার ব্যবহারে যে কংক্রিট হয় তাহাকে পলিমার কংক্রিট বলে। 

সুপার প্লাস্টিসাইজড্ কংক্রিট

অধিক প্লাস্টিক গুণসম্পন্ন কংক্রিটকে সুপার প্লাস্টিক সাইজ কংক্রিট বলে। প্লাস্টিক গুণসম্পন্ন পদার্থকে অ্যাডমিক্সার রূপে ব্যবহার করে কংক্রিটের প্রবাহ সৃষ্টি করা হয়, যাতে প্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে দৃঢ়াবদ্ধ হতে পারে। কংক্রিটে সুপার প্লাস্টিসাইজড যোগ করলে কংক্রিটের কার্যোপযোগিতা বৃদ্ধি পায়, পানির পরিমাণ কম রাখা যায় এবং সিমেন্টের পরিমাণ বৃদ্ধি ছাড়াই উচ্চ শক্তিসম্পন্ন কংক্রিট পাওয়া যায়। নিম্নলিখিত অবস্থায় সুপার প্লাস্টিসাইজড্ কংক্রিট প্রয়োগ করা যায়-

সিমেন্টের পরিমাণ বৃদ্ধি ছাড়াই কংক্রিটের পর্যাপ্ত শক্তি অর্জন 

আমরা জানি, কংক্রিটের প্রয়োজনীয় শক্তি অর্জন করতে দরকার নির্দিষ্ট পানি ও সিমেন্ট অনুপাত। যদি কোনো কারণে কংক্রিটে সিমেন্টের পরিমাণ হ্রাস করা হয়। তবে পানি সিমেন্টের অনুপাতও হ্রাস পাবে। ফলে মিশ্রণ তুলনামূলকভাবে শুষ্ক থাকবে, স্থানান্তরে অসুবিধা হবে। যদি সুপার প্লাস্টিসাইজড্ প্রয়োজনীয় মাত্রায় সংযুক্ত করা যায়, তবে উক্ত অসুবিধা দূর হয়।

কম পানি-সিমেন্ট অনুপাতে অধিক শক্তিশালী কংক্রিট প্রস্তুতিতে

কংক্রিটের শক্তি বৃদ্ধি করতে হলে সাধারণত আনুপাতিক হারে পানি-সিমেন্টের অনুপাত হ্রাস করতে হয়। সুপার প্লাাস্টিসাইজড্ মিশ্রণে এটা সম্ভব। এতে পানির পরিমাণ ৩০% পর্যন্ত কমানো যায় এবং পানি সিমেন্টের অনুপাত ০.২-এর মতোই হয়ে থাকে।

 কংক্রিট স্বয়ংক্রিয়ভাবে দৃঢ়বদ্ধ এবং সমতল হয়

কংক্রিটের শক্তি হ্রাস, সেগ্রিগেশন এবং ব্লিডিং ব্যতীত অধিক কার্যোপযোগিতা বৃদ্ধি করতে সুপার প্লাস্টি সাইজারের অ্যাডমিক্সার ব্যবহার করে কংক্রিটের প্রবাহ সৃষ্টি করা সম্ভব। যার ফলে কংক্রিট স্বয়ংক্রিয়ভাবে দৃঢ়বদ্ধ এবং সমতল হয়ে থাকে। ভারী রিইনফোর্সড কাঠামোর মধ্যে কংক্রিট ঢালাই করতে সুপার প্লাস্টিসাইজড্ ব্যবহার করে কংক্রিটকে তরল করা হয়। তবে সিমেন্ট অথবা পানির পরিমাণ হ্রাস করা হয় না। কিন্তু স্নাম্পের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এই পদ্ধতিতে স্নাম্পের পরিমাণ ৭৫ মিলিমিটার হতে ২০০ মিলিমিটারের মধ্যে আয়ান/ আনয়ন করা যায়। এতে কংক্রিটের সামর্থ্যরে উপর কোনো প্রভাব পড়ে না। 

কংক্রিট কোথায় ব্যবহৃত হবে এবং কংক্রিট মিক্সিংয়ের উপর নির্ভর করে সুপার প্লাস্টিসাইজারের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। সাধারণত কংক্রিটের জন্য ব্যবহৃত সিমেন্টের ওজনের ০.৭০% সুপার প্লাস্টিসাইজার যোগ করা যেতে পারে।

যে সকল উপাদান সুপার প্লাস্টিসাইজার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তা হলো-

  • ১. ফরমালডিহাইড
  • ২. ফেনল
  • ৩. ইউরিয়া
  • ৪. ভিনাইল ফ্লোরাইড
  • ৫. ভিনাইল এসিটেট
  • ৬. স্টাইরিন
  • ৭. প্রোপ্লাইলিন
  • ৮. ইথিলিন
  • ৯. মেলামাইন

ফেরো-সিমেন্ট কংক্রিট

মোটা বালি, উৎকৃষ্টমানের পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট ও পানির মিশ্রণে তারজাল বা সম্প্রসারিত ধাতু রিইনফোর্সমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করে ফেরো-সিমেন্ট কংক্রিট তৈরি করা হয়। ফর্মওয়ার্কে ডিন অন রিত ধাতুকে স্থাপন করে মোটা বালি, সিমেন্ট ও পানির মিশ্রণ দিয়ে ঢালাই করা হয়, স্থানবিশেষে প্রয়োজনীয় লোহার রডও ব্যবহার কারা যেতে পারে। তার পর জমাট বাঁধার জন্য ২৪ ঘণ্টা সময় রেখে দেওয়া হয়। পরে পানিতে ২৪ দিন ঢেলে রাখতে হয় এবং ফর্মওয়ার্ক খুলে নেওয়া হয়। এটার পুরুত্ব ১ থেকে ৪ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। নৌকা, মাছ ধরা ট্রলার, গৃহস্থালি পানির ট্যাঙ্ক, ম্যানহোল কভার ইত্যাদি তৈরিতে এই ফেরো-সিমেন্ট ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। 

প্রি-স্ট্রেসড কংক্রিট

যান্ত্রিক বা অন্য যে কোনো উপায়ে কাঠামোর মূল অংশ প্রাথমিক পীড়নকে বিশেষভাবে প্রবর্তনা করা হয়, একে প্রি-স্ট্রেসিং বলে। অর্থাৎ এলিমেন্টকে কাজে ব্যবহার করলে যে স্ট্রেস আসবে তা পূর্বেই আনয়ন করা। যখন এলিমেন্টকে প্রকৃতপক্ষে ব্যবহারের জন্য স্থাপন করা হয় এবং তার নিজস্ব ও বহিস্থ ভার হতে যে উদ্ভূত পীড়ন সৃষ্টি হয়। আর প্রাথমিক প্রবর্তনা পীড়ন সর্বদা বিপরীত প্রকৃতির হয়ে থাকে। এলিমেন্টের মধ্যে প্রি-স্ট্রেসড প্রবর্তনা করার পদ্ধতিকে প্রি-স্ট্রেসিং বলে। আর যে কংক্রিটে এমন পরিমাণ ও বিস্তৃৃতির অভ্যন্তরীণ পীড়ন প্রবর্তনা করা হয় যে, তা বহিস্থ ভার হতে উদ্ভূত পীড়ন ঈপ্সিত মাত্রায় প্রশমিত করে তাকে প্রি-স্ট্রেসড কংক্রিট বলে।

সিমেন্ট কংক্রিটের টান বল সহ্য ক্ষমতা খুবই কম। যেহেতু সাধারণ সিমেন্ট কংক্রিটের এলিমেন্ট টান বল সহ্য করতে পারে না, সেহেতু এটার দ্বারা আর্থিক সাশ্রয়কারী ডিজাইন সম্ভব নয়। এই অসুবিধা দূর করার জন্য সাধারণ সিমেন্ট কংক্রিটের মধ্যে টেনসাইল জোনে লোহার রড ব্যবহার করা হয়। সিমেন্টে কংক্রিটের মধ্যে এরূপ লোহা ব্যবহার করলে তাকে রিইনফোর্সড সিমেন্ট কংক্রিট বলে। লোহার রড ব্যবহার করে টান পীড়নের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু এই টান পীড়ন সিমেন্ট কংক্রিটের ফাটলকে প্রতিরোধ করতে পারে না। প্রি-স্ট্রেসড কংক্রিট ব্যবহার করে কংক্রিটের এই ফাটলকে সম্পূর্ণরূপে প্রতিরোধ করা যায়। প্রি-স্ট্রেসড কংক্রিটে কাঠামোর কোথাও টান অনুমোদন করা হয় না। সুতরাং কাঠামোর মধ্যে যখন টেনশন থাকে না, তখন ফাটল হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না।

সম্ভবত ১৮৮৬ সালে ফ্রানসিসকোর অধিবাসী জ্যাকসন সর্বপ্রথম প্রি-স্ট্রেসড কংক্রিট সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা প্রদান করেন। পরে বিভিন্ন প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের নিরলস প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিতে প্রি-স্ট্রেসড কংক্রিট আজকের নির্মাণ কাজে বহুলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

প্রি-স্ট্রেসড কংক্রিট ব্যাপকভাবে নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়-লম্বা স্প্যান ব্রিজ, মেরিন স্ট্রাকচার, পারমাণবিক চাপ সহ্যকারী পাত্র, পানি প্রতিরোধী কাঠামো, বিদ্যুৎ সরবরাহকারী খুঁটি, রেলওয়ে স্লিপার এবং অন্যান্য কাঠামোর অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

সুবীর সাহা

প্রকাশকাল: বন্ধন ৩১ তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১২

Related Posts

বর্ষায় সিমেন্ট সংরক্ষণে করণীয়

বিশে^ বহুল ব্যবহৃত নির্মাণ উপকরণ সিমেন্ট। সিমেন্ট, অ্যাগ্রিগেট, বালু ও পানির সমন্বয়ে সৃষ্টি হয় কংক্রিট, যা অত্যন্ত শক্তিশালী…

প্লেট লোড পরীক্ষার সাতসতেরো

মাটি চরম ভারবহন ক্ষমতা এবং সম্ভাব্য বসে যাওয়ার পরিমাণ নির্ণয় করার জন্য মাঠে প্লেট লোড পরীক্ষা করা হয়।…

ইট দেয়ালের ত্রুটি মেরামতে

বিশ্বের সর্বত্রই স্থাপনা নির্মাণে ইট অত্যন্ত জনপ্রিয় নির্মাণ উপকরণ। হাজার বছরের বেশি সময় ধরে এ দেশে ভবন নির্মাণে…

মাটির ভারবহন ক্ষমতা বাড়াতে

অধুনা বিশ্বে নির্মাণযজ্ঞের সিংহভাগ কাজই হয় ভূ-পৃষ্ঠকে ঘিরে। সড়ক, রেললাইন, ভবন ও সব ধরনের অবকাঠামোর নির্মাণকাজ পরিচালিত হয়…

01~1
previous arrow
next arrow

CSRM

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

কী কী থাকছে আকাশছোঁয়া শান্তা পিনাকলে
সমুদ্রবাণিজ্যের বর্জ্য থেকে অনন্যা এক স্থাপত্য
Home of Haor
Weather
Youth Park
Tower
শহর,সেতু আর সুরের টেনেসির আর্টস সেন্টার
Al Hamra
Teroshri Mosq