রঙিন থার্মোকল,থার্মোকল শিট ও থার্মোকল ব্লকস

থার্মোকল

থার্মোকল কী এবং কীভাবে তৈরি হয়

১৯৫১ সালে জার্মানির গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিএএসএফ স্ট্রেচ পলিস্টেরিন নামক উপাদান তৈরি করে। উপাদানটি সিনথেটিক পেট্রোলিয়াম হতে উদ্ভূত। গবেষকরা সিনথেটিক পেট্রোলিয়ামের অণুগুলির রাসায়নিক বন্ধন পরিবর্তন করে নতুন রূপ দেয় যা স্ট্রেচ পলিস্টেরিন নামক একটি নতুন পলিমার তৈরি করে। নব রূপে সৃষ্ট এই পলিমারই থার্মোকল।

বর্তমানে খুব সহজ প্রক্রিয়ায় থার্মোকল অহরহ তৈরি করা হচ্ছে। দানাদার থার্মোপ্লাস্টিককে জলীয় বাষ্প ও বাতাসের সাহায্যে ফুলিয়ে বড় করা হয়। দানাদার থার্মোপ্লাস্টিকগুলির আকার বেশ বড়। কিন্তু ওজনে হালকা। যেহেতু এটি পেট্রোলিয়ামজাত দ্রব্য হতে উৎপন্ন, তাই এটি পেট্রোলিয়ামজাতীয় কোনো দ্রবণে খুব সহজেই গলে যায়। স্ট্রেচ পলিস্টেরিনের বাণিজ্যিক নামই থার্মোকল।

তৈরিতে ব্যবহৃত কাঁচামাল

থার্মোকলের প্রধান কাঁচামাল পলিসটিরিন। এটি মনোমার স্টাইরিন এর পেট্রোকেমিক্যাল নামক তরল উপাদান থেকে তৈরি। পলিসটিরিন সাধারণ তাপমাত্রায় কঠিন অবস্থায় থাকে। ১০০০ সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রার উপরে তরল হতে শুরু করে। আবার কঠিন রূপ ধারন করে যখন আস্তে আস্তে ঠান্ডা হয়। পলিসটিরিনের তাপমাত্রার এই গুণাগুণের জন্য সহজেই সংকোচন ও প্রসার করা যায়। পলিসটিরিন স্বচ্ছ সাদাসহ অন্যান্য রঙের হয়। এটা ধীরে ধীরে মাটিস্থ জৈব পদার্থের সাথে মিশে যেতে পারে।

থার্মোকলের ইতিবৃত্ত 

১৮৩৯ সালে জার্মানির বার্লিনে ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট এডওয়ার্ড সাইমন পলিসটিরিন আবিষ্কার করেন। সুইটগাম গাছের রেজিন স্টেরেসকে পাতন প্রণালীর মাধ্যমে স্টাইরোল রেজিন তৈরি করেন। কিছুদিন পর সাইমন স্টাইরোল রেজিনটি অক্সিডেশন করলে এটি ঘন হয়ে জেলির রূপ ধারণ করে। তিনি এর নাম দেন স্টাইরোল অক্সাইড। ১৮৪৫ সালে ইংরেজ কেমিস্ট জন হফম্যান ব্লিথ এবং জার্মান কেমিস্ট অগাস্ট হুইলহেম ভন হফম্যান প্রমাণ করেন যে একই স্টাইরোল অক্সাইড অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে এক স্থান হতে অন্য স্থানে নেওয়া যায়। তারা স্থানান্তরকৃত এ উপাদানটির নাম রাখেন মেটাস্টাইরোল। পরবর্তীতে বিশ্লেষণে দেখা যায় এটি রাসায়নিক দিক থেকে স্টাইরোল অক্সাইডের কাছাকাছি। ১৯৬৬ সালে মারসেলিন বার্থেলেট পলিমারজেসন পদ্ধতিতে স্টাইরোল থেকে মেটাস্টাইরোল তৈরি করেন। প্রায় ৮০ বছর পর আবিস্কৃত হয় স্টাইরোলকে উত্তপ্ত করলে চেইন রিয়্যাকশন হয়ে ম্যাক্রোমলিকুলস তথা বড় যৌগ তৈরি হয়। এরপর থেকেই এ উপাদানটি এখন পর্যন্ত পলিসটিরিন নামে প্রচলিত।

থার্মোকল স্ল্যাব, থার্মোকল বক্স ও থার্মোকল বেইডস (উপরে বাম থেকে নিচে)

১৯৩১ সালে আই জি ফারবেন নামক কোম্পানি পলিসটিরিন তৈরি করা শুরু করে। এটি ছিল ডাই-কাস্ট-জিঙ্কের প্রতিস্থাপনযোগ্য। যা অনেক কিছুতে ব্যবহার করা যায়। এটা সম্ভব পলিসটিরিনকে উত্তপ্ত অবস্থায় সম্প্রসারণ পদ্ধতিতে টিউবের মাধ্যমে প্রবেশ করিয়ে পলিসটিরিন পলিমারকে নরম ভেজা কাগজের দলার মতো তৈরি করার মাধ্যমে।

১৯৪৯ সালে জার্মান কোম্পানি বিএএসএফ মোল্ডিং প্রসেসকে আরো উন্নত করে নতুন পেটেন্ট তৈরি করে। সেটির কার্যপ্রণালী প্রদর্শনের পর এর নামকরণ করা হয় স্টাইরোপর। ১৯৫৪ সালে পিটাসবার্গের কোপার কোম্পানি পলিসটিরিন ফোমকে আরো উন্নত রূপ দেয়।

থার্মোকলের গুণাগুণ

প্লাস্টিকের যে পলিমার থেকে থার্মোকল তৈরি তার রাসায়নিক নাম এক্সপান্ডেড পলিসটিরিন। পলিসটিরিন গন্ধহীন, অপরিবর্তনীয় এবং বদ্ধ কোষে আবদ্ধ থাকে। এটির আয়তনের প্রায় ৮০% বাতাস। যে কারণে এটির রয়েছে অনন্য সংযোগ গুণাগুণ। যেহেতু এটি বদ্ধ কোষে তৈরি হয়, তাই এটির প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। বিশেষ করে তাপ, ঠান্ডা এবং ধূলিকণা সহজে প্রবেশ করতে পারে না। এটি গঠনতন্ত্রের দিক থেকে অনমনীয়, তাই অনেক বেশি ওজনের বস্তু এবং কম্পনের ভার সহনীয়। এটি ক্ষয় হয় না। তাই সময়ের সাথে স্থায়ীভাবে দীর্ঘ সময়ের জন্য ইনসুলেশন হিসেবে ব্যবহার করা যায় কোনো ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই। যে কোনো তলে এটি ব্যবহারযোগ্য। এটি হালকা বলে বিশেষ করে ফলস রুফিং কাজে সহজেই বহন করা যায়। চতুষ্কোণ স্ল্যাব হতে শুরু করে গোলাকার সব ধরনের পুরুত্বের পাইপে ইনসুলেশন করার জন্য এটি ব্যবহার করা হয়।

সাধারণত যে সব গুণাগুণ থার্মোকলে থাকে

  • ঘনত্বের মাত্রা- ১৫ থেকে ৩০ কেজি/মিটার
  • ১০০ গড় তাপমাত্রায় থার্মাল কনডাকটিভিটি- ০.০২৮ থেকে ০.০৩১ kcalm/hrmc
  • কম্প্রেসিভ শক্তি- ০.৮ থেকে ১.৬ কেজি/সেন্টিমিটার
  • ক্রস ব্লেকিং শক্তি- ১.৪ থেকে ২.০০ কেজি/সেন্টিমিটার
  • টেনসাইল শক্তি- ৩ থেকে ৬ কেজি/সেন্টিমিটার
  • কত তাপে ব্যবহারযোগ্য- ২০০০ থেকে ৮০০ সেন্টিগ্রেড
  • ৭ দিন পানিতে অবস্থানকালে পানি গ্রহণের হার- ০.৫%
  • যে তাপমাত্রায় নিজ থেকে আগুন ধরে- ৩০০০ সেন্টিগ্রেড
  • গলনাঙ্কের সীমা- ১০০০ থেকে ২০০০ সেন্টিগ্রেড

শুধু নাইট্রিক এসিড (HNO3) এবং সালফিউরিক এসিড (H2SO4) ব্যতীত সব ধরনের এসিড প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন। কিন্তু এলিফেটিক, হাইড্রোকার্বন, কিটোন এবং ক্লোরিনেটেড হাইড্রোকার্বন অপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ও আলট্রা ভায়োলেট রশ্মিতে ক্ষতিকারক। যদি সূর্যের রশ্মিতে দীর্ঘদিন ফেলে রাখা হয়, তাহলে এটি হলুদ বর্ণধারণ করে। অবশেষে ভঙ্গুর পদার্থে পরিণত হয়। 

থার্মোকল ও স্বাস্থ্য

যে সব খাদ্যদ্রব্য প্লাস্টিক কনটেইনারের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয় বা খাবারের যে সব আইটেম আছে প্লাস্টিক কৌটার মাধ্যমে বিভিন্ন কোম্পানি সার্ভিস দিয়ে থাকে সেগুলি বৈজ্ঞানিকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। প্লাস্টিকজাত কৌটায় অবস্থানরত খাদ্যদ্রব্যের কোনো ক্ষতি হয় না।

১৯৯৯ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত স্বাস্থ্য বিষয়ক এক পরীক্ষা করা হয় স্টাইরিন নামক প্লাস্টিক পলিমারের উপর। বিষয়- প্লাস্টিক পলিমার দ্বারা কৌটা তৈরি করে খাদ্য সংরক্ষণ করলে তা স্বাস্থ্যের উপর কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। এ ব্যাপারে হার্ভার্ড সেন্টার ফর রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ১২ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি দ্বারা পরীক্ষা করানো হয়। বিষবিদ্যায় ত্বক এবং ঔষধ সংক্রান্ত পারদর্শী বিশেষজ্ঞ ছিলেন এই প্যানেলে। 

হার্ভার্ড সেন্টারে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর রিপোর্টে বলা হয়েছিল স্টারিন প্রাকৃতিকভাবেই খাদ্য যেমন স্ট্রবেরি, গরুর মাংস, ঝালজাতীয় খাদ্য, মদ এবং মাখনে তৈরি হয়। সাধারণ লোকের কোনো ভীতির কারণ নেই প্লাস্টিক পলিমার দ্বারা কৌটা তৈরি করে খাদ্য সংরক্ষণ করলে। পলিসটিরিন পানীয় বা খাবারের পাত্র হিসেবে ব্যবহার হয় বেশি। এতে ক্যান্সারের খুব কম ঝুঁকি থাকে।

থার্মোকল কন্টেইনার ও থার্মোকল পাইপ

স্টাইরিন খুব তাড়াতাড়ি মানুষের পরিপাকতন্ত্রে পানীয় এবং খাবারের সাথে চলে যায় এবং কিছুদিনের মধ্যে বেশির ভাগ রাসায়নিক মূত্রের সঙ্গে বেরিয়ে যায়। স্টাইরিন মানুষের দেহের মধ্যে সজীব উপাদানের রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটায়। কিন্তু ৯৭% সরিয়ে নেয় দেহের বিপাকীয় প্রক্রিয়ায়।

আগুনের ঝুঁকি

অন্যান্য রাসায়নিক যৌগের মতো পলিসটিরিন একটি দাহ্য পদার্থ। এতে সহজেই আগুন ধরে যেতে পারে। এটি উচ্চ মাত্রায় দাহ্য পদার্থ। আবার খুব কম তাপমাত্রায় এটি ভালো ইনসুলেটর (তাপ নিরোধক)। আবাসন অবকাঠামো তৈরিতে এর রয়েছে বহুল ব্যবহার। এটা সাধারণত দুটি শুষ্ক দেয়ালের মাঝখানে শিট মেটালে অথবা কংক্রিটে লুকানো অবস্থায় ব্যবহার করা উচিত। ফোম পলিসটিরিন প্লাস্টিকে দুর্ঘটনাজনিত কারণে আগুন লেগে যায় এবং ক্ষতি হয় অনেক জিনিসপত্রের। 

থার্মোকলের পরিবেশ ঝুঁকি

থার্মোকল বাণিজ্যিক নামে প্রচলিত হলেও থার্মোকলের প্রধান রাসায়নিক যৌগ পলিসটিরিন। এটা স্টাইরিন এবং ফিনাইলইথেনের পলিমেরিসেশনের মাধ্যমে তৈরি হয়। পরিবেশের উপর থার্মোকলের ঝুঁকির মূল কারণ এটা সহজে মাটিতে মিশে না। অর্থাৎ এর ব্যাকটেরিয়েল ডিকম্পোজিশন খুব ধীরে ধীরে মাটিতে মেশে। যে কারণে মাটি অনুর্বর হয়। এটা পুড়ে গেলে বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়, এতে মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসে অসুবিধা হয় এবং কখনো কখনো মৃত্যুর কারণও হয়ে থাকে। তাই থার্মোকল পরিবেশের জন্য ভীতিকর।

সাগরে পলিসটিরিন ফোম হচ্ছে প্লাস্টিক ধ্বংসাবশেষের একটি প্রধান উপাদান। এটা জলচর প্রাণীদের জন্য একটি বিষাক্ত বস্তু। জলচর প্রাণীরা প্রথমে না বুঝে খাদ্য মনে করে খেয়ে ফেলে। পলিসটিরিন যেমন বাতাসে ভেসে বেড়াতে পারে তেমনি পানিতেও ভেসে বেড়ায়। তা ছাড়া খোলামেলা পরিবেশে এটা প্রচুর পাওয়া যায়। এটি পাখিদের জন্য বা সমুদ্রের জলচর প্রাণীদের জন্য প্রাণঘাতী খাদ্য হয় যখন তারা না বুঝে এটি গিলে ফেলে।

প্রকৌশলী মহিউদ্দীন আহমেদতথ্য

সূত্র: উইকিপিডিয়া

প্রকাশকাল: বন্ধন ৩৩ তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৩

Related Posts

হেরিটেজ ট্রেইল

স্থপতি মৃধা রাতুল (পর্ব-৩) …..পূর্ব প্রকাশের পর হেরিটেজ ট্রেইল যেভাবে ডিজাইন করা হয় হেরিটেজ ট্রেইল ডিজাইন করতে হলে…

হেরিটেজ ট্রেইল (পর্ব ২)

….পূর্ব প্রকাশের পর ট্রেইলের ইতিহাস হেরিটেজ ট্রেইলের কনসেপ্টের শুরু প্রাণীর মস্তিষ্ক থেকে। পরবর্তী সময়ে প্রাণীদের থেকে মানুষ এই…

 হেরিটেজ ট্রেইল (পর্ব ১)

স্থাপত্যকলার একটি বিমূর্ত অবদান হেরিটেজ ট্রেইল। স্থাপত্যচর্চার আদি অবস্থায় অর্থাৎ, ক্লাসিক্যাল স্থাপত্যে এই ট্রেইলের ব্যাপ্তি ছিল। ট্রেইলের নামকরণ…

সিমেন্ট সংরক্ষণ যেভাবে

সিমেন্ট সৃষ্টির শুরু থেকে সভ্যতার ক্রমবিকাশ ঘটাতে মানুষ নিরন্তরভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আদিকালে মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে প্রকৃতি…

01~1
previous arrow
next arrow

CSRM

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

কী কী থাকছে আকাশছোঁয়া শান্তা পিনাকলে
সমুদ্রবাণিজ্যের বর্জ্য থেকে অনন্যা এক স্থাপত্য
Home of Haor
Weather
Youth Park
Tower
শহর,সেতু আর সুরের টেনেসির আর্টস সেন্টার
Al Hamra
Teroshri Mosq