মুক্তিযুদ্ধের অনন্য নিদর্শন স্বাধীনতা স্তম্ভ

স্বাধীনতা স্তম্ভ বাংলাদেশের জাতীয়তার একটি স্মারক। দৃষ্টির সীমানা যেখানে শেষ আলোর মিছিলের শুরু সেখান থেকেই। ভিত্তিটির পাদদেশের তিন পাশে কৃত্রিম জলরাশি, বর্ণিল আলোচ্ছটায় সৃষ্টি হয় দৃষ্টিনন্দন এক মায়াবী পরিবেশ। ইট-কাঠের এই শহরে বিরামহীন যান্ত্রিক জীবনে একটু সুযোগ পেলেই মানুষ ছুটে আসে এ পরিবেশ উপভোগ করতে। কেউ বন্ধুদের নিয়ে কেউ সন্তানদের হাত ধরে। আবার অনেকেই আসে পুরো পরিবার নিয়ে। এ থেকে বাদ যায় না বিদেশি পর্যটকেরাও। প্রতিদিন সহস্রাধিক দর্শনার্থী আসেন চমৎকার এ স্থাপনাটি দেখতে। এ মিলন মোহনীয় স্থাপনার নাম ‘স্বাধীনতা স্তম্ভ’।

স্বাধীনতা স্তম্ভের অন্যতম আকর্ষণ গ্লাস টাওয়ার। এটি বিশ্বের সর্বোচ্চ গ্লাস টাওয়ার। বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসের আলোকবর্তিকা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে এ টাওয়ার। এটির অবস্থান ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান)। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে সমুন্নত রাখতে স্বাধীনতা স্তম্ভের সঙ্গে স্থাপন করা হয় জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাসের স্বজনহারা মানুষের কান্নার প্রতীক হিসেবে স্থাপিত হয়েছে একটি ঝরনা। এ প্রকল্পে আরও যুক্ত আছে মুর‌্যাল ও শিখা চিরন্তন। ’৫২ থেকে ’৭১ বাঙালি জাতির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। এ ইতিহাসকে স্মরণীয় করে রাখতে স্বাধীনতাস্তম্ভের বিভিন্ন অংশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, পটভূমি, ’৫২-র ভাষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ’৬৬-র ছয় দফা আন্দোলন, ’৭১-এর ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, ২৫ মার্চের গণহত্যা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানসহ সাত বীরশ্রেষ্ঠের প্রতিকৃতিসহ যুদ্ধকালীন বিভিন্ন দলিল ও আলোকচিত্র স্থান পেয়েছে এখানে।

স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণের গল্প

স্বাধীনতা স্তম্ভটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৭৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে অন্যতম নান্দনিক ও শৈল্পিক স্থাপত্য গ্লাস টাওয়ার তৈরিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা। স্থপতি কাশেফ মাহমুদ চৌধুরী ও মেরিনা তাবাসসুম ঐতিহাসিক এ স্থাপনাটির নকশা করেছেন। নির্মাণে ব্যবহৃত কাঁচামাল; যেমন- গ্লাস, স্টিল, ফ্রেম সবকিছুই চীন থেকে আমদানিকৃত। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান অডিই নোভাম কনসোর্টিয়ামের সার্বিক তত্ত্ববধানে প্রকল্পটির কাজ বাস্তবায়িত হয়েছে। ইস্পাতের কাঠামোর ওপর নির্মিত হয়েছে এর টাওয়ারটি। এর দুই দিকে ১৬/১৬ ফুট বেজ সাইজের উপরিভাগে রয়েছে স্বচ্ছ কাচ। এতে সূর্যের আলো প্রতিসরিত ও প্রতিফলিত হয় সহজেই। রাতে আলোকচ্ছটা তৈরির জন্য রয়েছে বৈদ্যুতিক আলোর সুব্যবস্থা।

ঐতিহাসিক নানা গুরুত্বের কথা বিবেচনা করেই স্বাধীনতাস্তম্ভ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৯৮ সালে শুরু হয় প্রথম পর্যায়ের নির্মাণকাজ। গঠন করা হয় বিশেষজ্ঞ কমিটি। এরপর ২০০১ সালে তৎকালীন সরকার এর নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিয়ে কাচের টাওয়ারের পরিবর্তে কংক্রিটের টাওয়ার নির্মাণে উদ্যোগী হয়। কিন্তু নানান জটিলতায় তা আর সম্ভব হয়নি। ২০১১ সালের নভেম্বরে ‘দ্বিতীয় ফেজ’-এর নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু হয়।

স্বাধীনতার গৌরবময় ইতিহাসকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ছড়িয়ে দিতে স্বাধীনতাস্তম্ভ জীবন্ত এক সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকবে। সংগ্রামী ইতিহাস এক নজরে দেখার এবং জানার অনন্য মাধ্যম এ স্বাধীনতা স্তম্ভ। যে জাতি তার অতীতকে মূল্যায়ন করে না সে জাতি একটি সুন্দর ভবিষ্যত নির্মাণ করতে পারে না। এটাই ইতিহাসের নির্মোহ সত্যি। তাই এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার ইতিহাসকে প্রতিনিয়ত নতুন প্রজন্মকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে গ্লাস টাওয়ার ইতিহাসের আলোকবর্তিকা হিসেবে ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি এ টাওয়ারটি শৈল্পিক এবং নান্দনিক উপস্থাপনায় বিশ্বের সর্বোচ্চ গ্লাস টাওয়ারের সম্মাননা পাওয়ায় এটি স্থান করে নিয়েছে বিশ্ব ইতিহাসেও।

প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৬তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৪

মো. মোস্তফা
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top