সবারই স্বপ্ন নিজের একটা বাড়ির। ছোট হোক আর বড় হোক একান্তই নিজস্ব একটি আবাস। আর এই চাহিদার কারণেই ক্রমেই বাড়ছে নতুন নতুন অবকাঠামো নির্মাণ। এর ব্যতিক্রম নয় মানিকগঞ্জ জেলাও। জেলা শহরটির অনেকেই থাকেন প্রবাসে। প্রবাসজীবনের অর্জিত আয় থেকে নির্মিত হচ্ছে নিজের বাড়ি। এর পাশাপাশি গড়ে উঠছে নিত্যনতুন শিল্প-কারখানা। ফলে নির্মাণসংশ্লিষ্ট পণ্যের চাহিদাও বাড়ছে দিনকে দিন। ব্যবসাটির উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত জেনেই ব্যবসায়ী এ কে এম জামান শুরু করেন নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসা। মানিকগঞ্জের বেউথা রোডের বিজয় মেলা মাঠসংলগ্ন মেসার্স জামান ট্রেডাসের্র্র স্বত্বাধিকারী তিনি। বন্ধন-এর নিয়মিত আয়োজন ‘সফল যারা কেমন তারা’ এবারের পর্বের সফল ব্যবসায়ী তিনি।
ব্যবসায়ী এ কে এম জামানের জন্ম ১৯৬০ সালের ১১ অক্টোবর ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার মটরা গ্রামে। পিতা মৃত আব্দুল গণি ও মা মৃত রহিমুন্নেছা। পিতা ছিলেন একজন সম্ভ্রান্ত গৃহস্থ। ছয় ভাই তিন বোনের মধ্যে জামানই সবার ছোট। দীর্ঘদিন ধরে মানিকগঞ্জে বাস করলেও শৈশব-কৈশোর কেটেছে ফরিদপুরেই। স্থানীয় কাউলিবেড়া বিদ্যালয় থেকেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে লেখাপড়া করেছেন। এখান থেকেই ১৯৭৬ সালে এসএসসি পাস করেন। এরপর ১৯৮০ সালে ফরিদপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা করেন। ডিপ্লোমা শেষে চাকরির প্রত্যাশায় না থেকে স্বাধীনভাবে ব্যবসা করার সিদ্ধান্ত নেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ফরিদপুর ছেড়ে চলে আসেন মানিকগঞ্জে। এ সময় সরকার মানিকগঞ্জসহ ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলাসমূহে শিল্প-কারখানা স্থাপন ও সম্প্রসারণে উদ্যোগ নেয়। সরকারের পাশাপাশি বিদেশি অনেক সংস্থাও সহযোগী হিসেবে এগিয়ে আসে। সুযোগটি কাজে লাগান তিনি। সিদ্ধান্ত নেন বিস্কুট ফ্যাক্টরি গড়ে তোলার। জাপানি একটি কারিগরি সংস্থার সহযোগিতাও পেয়ে যান। খুব কম সময়ের মধ্যেই ব্যবসাটি দাঁড়িয়ে যায়। সেখান থেকে উল্লেখযোগ্য মুনাফাও পেতে থাকেন। এভাবেই কেটে যায় অনেকটা বছর। কিন্তু ধীরে ধীরে বদলে যায় ব্যবসার দৃশ্যপট। মন্দা দেখা দেয় ব্যবসায়। হঠাৎ করেই চিনি, তেল, ময়দাসহ সব কাঁচামালের দাম বাড়ায় বিক্রয়মূল্যের চেয়েও পণ্যের উৎপাদন খরচ ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়। শ্রমিকদের মজুরি দিতে তিনি হিমশিম খাচ্ছিলেন। ব্যবসা যখন ক্রমেই লোকসানের দিকে যাচ্ছিল, তখন বিস্কুট ফ্যাক্টরিটি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
২০০৬ সালে একরকম বাধ্য হয়ে ফ্যাক্টরিটি বিক্রি করে দেন। বিক্রয়কৃত অর্থ দিয়ে শহরে বাড়ি তৈরি করেন এবং বাকি অর্থ ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন। শুরু করেন নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসা। প্রথমে ছোট পরিসরে একটি দোকান ভাড়া নেন। সেখানে রড বিক্রি করতেন। এর পরপরই ব্যবসায় যুক্ত হয় সিমেন্ট। এ ব্যবসার তেমন কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না তাঁর; ছিলেন একেবারেই নতুন। এ জন্য শুরুতে কিছুটা সমস্যায় পড়েন। যেহেতু ডিপ্লোমা পড়েছেন, তাই দ্রুতই সমস্যাগুলোর সমাধান করে ফেলেন। তা ছাড়া ফ্যাক্টরি পরিচালনার নানা অভিজ্ঞতা কাজে লাগান। তিনি তাঁর নিজস্ব কৌশল, মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে ব্যবসার আদল বদলে দেন। খুচরা ও পাইকারি উভয় ক্ষেত্রেই সীমিত লাভে পণ্য সরবরাহ করতে থাকেন। গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য বিক্রি, ক্রেতা সম্পর্ক, কম মুনাফা সব মিলিয়ে খুব দ্রুতই ব্যবসার প্রসার ঘটতে থাকে। বেড়ে যায় ব্যবসায়িক পরিসরও। কোম্পানির সঙ্গে লেনদেন ভালো করাতে তারাও পণ্য দিতে আগ্রহী হয়। এখন তাঁর দুটি শো-রুম ও একটি গোডাউন। বর্তমানে তিনি আনোয়ার ইস্পাত ও সিমেন্টের একজন পরিবেশক। এ ছাড়া আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের সর্বোচ্চ বিক্রেতা। অন্যান্য সিমেন্টেরও খুচরা বিক্রেতা। অধিক বিক্রির স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কোম্পানি থেকে পেয়েছেন সম্মাননা ও পুরস্কার। পেয়েছেন ওয়াশিং মেশিন, ডিভিডি, মোবাইল, টেলিভিশনসহ প্রভৃতি উপহার। কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে কক্সবাজার, যমুনা রিসোর্টসহ বিভিন্ন স্থানে ঘুরতেও গেছেন। আর তাঁর এই ব্যবসার মাধ্যমে প্রায় আট-দশজন কর্মচারীর কর্মসংস্থান হয়েছে।
বিয়ে করেছেন ১৯৮৬ সালে। স্ত্রী রেহেনা জামান। তাঁদের ছোট সুখের সংসারে দুই ছেলেমেয়ে। বড় মেয়ে জোহানা জামান জেনী মানিকগঞ্জ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজে সম্মান শ্রেণীতে ও ছেলে অনিকুজ্জামান ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে ব্যাচেলর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে (বিবিএ) ষষ্ঠ সেমিস্টারে অধ্যয়নরত। ছেলেমেয়ে ছাড়াও ব্যবসায়ী জামানের রয়েছে এক নাতি। মেয়ের ঘর আলোকিত করে এসেছে ছেলে সন্তান। আদর করে নাম রেখেছেন অরিন আন্দালিব হাসান আরিয়ান। তাকে নিয়েই পরিবারের সবার মাতামাতি। ব্যবসায়িক ব্যস্ততার কারণে তেমন একটা সময় দিতে পারেন না পরিবারকে। তারপরও অবসরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে টিভি দেখেন। মাঝে মাঝে নিজ গ্রামে যান।
একজন সৎ ব্যবসায়ী হিসেবে জামান সাহেবের রয়েছে বেশ খ্যাতি। আকিজ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম সেখ আকিজ উদ্দিনের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল বেশ আন্তরিক। বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে তাঁর সরাসরি যোগাযোগ থাকায় তিনি চান তাঁর ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে। কিছু কোম্পানির পরিবেশক হতে চান তিনি। ভবিষ্যতে চান ব্যবসায় টাইলস ও এসএস সংযোজন করতে। সফল একজন বিক্রেতা হিসেবে তিনি কোম্পানিগুলোর কাছে বাড়তি কিছু সুবিধার দাবি জানান। সেক্ষেত্রে সব কোম্পানির করপোরেট সেল বন্ধ করার আহŸান তাঁর। এ ছাড়া কোম্পানি সুযোগ দিলে জেলার বাইরেও তিনি সিমেন্ট বিক্রি করতে আগ্রহী। এভাবেই অধিকহারে পণ্য বিক্রি করতে পারবেন বলে তাঁর বিশ্বাস।
নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসায় সফলতা পাওয়া সহজ নয়। শুরুতেই বড় অংকের মূলধন প্রয়োজন। এই ব্যবসায় প্রতিষ্ঠা পেতে প্রয়োজন দীর্ঘ সময়ের; তাই ধৈর্যসহকারে ব্যবসা পরিচালনা করা উচিত। সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। অর্থের সংকট দেখা দিলে বা ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যাংকের সহযোগিতা নিতে হবে। তাই লেনদেন ভালো করে ঋণ নেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সব সময় সততার সঙ্গে ব্যবসা করা উচিত। এ ছাড়া নবীন ব্যবসায়ীদের পরিশ্রমী হওয়ার ব্যাপারেও তাগিদ দেন অভিজ্ঞ এই ব্যবসায়ী। গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য বিক্রি করতে হবে। কমিটমেন্ট ঠিক রাখতে হবে; সেটা ক্রেতা ও কোম্পানি উভয়ের ক্ষেত্রেই।
মাহফুজ ফারুক
প্রকাশকাল: বন্ধন ৩৬ তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৩