• Home
  • স্পটলাইট
  • সিউলের হাইওয়ে ভেঙে নদী ফিরিয়ে আনতেই কমল যানজট
Image

সিউলের হাইওয়ে ভেঙে নদী ফিরিয়ে আনতেই কমল যানজট

দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি ছোট নদীর নাম চেওংগিয়েচন। এক সময় নগরায়নের কারণে এই নদীটিকে সম্পূর্ণ ঢেকে দিয়ে তার উপর রাস্তা ও উড়ালসেতু তৈরি করা হয়। প্রায় ত্রিশ বছর নদীটি মানুষের চোখের আড়ালেই থেকে যায়।

২০০৩ সালে সিউল সিটি সরকার এই নদী ফিরিয়ে আনার একটি বড় প্রকল্প হাতে নেয়। উদ্দেশ্য ছিল – নদীটিকে আবার শহরের সঙ্গে যুক্ত করা, ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা করা এবং এলাকার পুরনো ইতিহাস-সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা।

২০০৫ সালে প্রকল্পটি শেষ হয়। খুব দ্রুতই এটি সিউলের অন্যতম জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়। এরপর থেকে এই প্রকল্পের শহর, অর্থনীতি ও পরিবেশের উপর প্রভাব নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে।

খুব দ্রুতই এটি সিউলের অন্যতম জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়। ছবি: আর্কডেইলি

স্রোতের ইতিহাস: তিনটি ধাপ

চেওংগিয়ে স্ট্রিমের ইতিহাসকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়।

প্রথম ধাপ ছিল ১৪ শতকের জোসন রাজবংশের আমলে। তখন সিউল কোরিয়ার রাজধানী হয়, আর এই স্রোত ছিল মানুষের পানির উৎস ও পয়ঃনিষ্কাশনের মাধ্যম।

দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয় কোরীয় যুদ্ধের পর, ১৯৬০-এর দশকে। তখন স্রোতের দুই পাশে বস্তি গড়ে ওঠে, আর পয়ঃনিষ্কাশনের কাজে ব্যবহারের ফলে পানি প্রচণ্ড দূষিত হয়ে পড়ে।

এই দূষণ থেকেই তৃতীয় ধাপের শুরু। স্রোতটিকে কংক্রিট দিয়ে ঢেকে তার উপর প্রায় ৬ কিলোমিটার লম্বা ও ৫০ মিটার চওড়া একটি রাস্তা বানানো হয়। পরে ১৯৭৬ সালে, যানজট কমাতে সেই রাস্তার উপর একটি উড়ালসেতুও তৈরি করা হয়।

এই স্রোত ছিল মানুষের পানির উৎস ও পয়ঃনিষ্কাশনের মাধ্যম। ছবি: আর্কডেইলি

নদী ঢেকে দেওয়ার চড়া মূল্য: পরিবেশগত সংকট

এই অর্থনৈতিক উন্নতির একটা বড় মূল্য দিতে হয়েছিল পরিবেশকে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সিউলের নগর পরিকল্পনায় শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকেই নজর দেওয়া হয়েছিল, নদী ঢেকে দেওয়ার পরিবেশগত প্রভাবের কথা তেমন ভাবাই হয়নি।

শতাব্দীর শেষের দিকে চেওংগিয়ে স্ট্রিম হয়ে ওঠে সিউলের পরিবেশ সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৮০-এর দশকে বেশ কিছু উদ্বেগ দেখা দেয় – রাস্তার নিচে জমে থাকা দূষিত পানি থেকে স্বাস্থ্যঝুঁকি, গাড়ির কারণে বায়ুদূষণ, আর উড়ালসড়কের কাঠামো ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়া।

কংক্রিটের এই আচ্ছাদন শুধু শহরের পুরনো ঐতিহ্যকেই আড়াল করেনি, বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মানও কমিয়ে দিয়েছিল। খোলা জায়গার অভাব, খারাপ বাতাস আর যানজট – এসব মিলিয়ে এলাকাটি মানুষ ও ব্যবসা, দুইয়ের কাছেই অনাকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল।

চেওংগিয়ে স্ট্রিম হয়ে ওঠে সিউলের পরিবেশ সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু। ছবি: আর্কডেইলি

পুনরুদ্ধার প্রকল্প: ২০০৩ সালের সিদ্ধান্ত

২০০০-এর দশকের শুরুতে সিউল সিটি কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারে, চাপা পড়ে থাকা স্রোতের পরিবেশগত সমস্যাগুলো নিয়ে এখনই কিছু করা দরকার। প্রশ্ন ছিল – কংক্রিট আর গাড়িতে ভরা একটা শহরে কীভাবে এই নদীকে আবার জীবিত করা যায়?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ২০০৩ সালে সিউল বড় এক নগর পুনর্গঠন কর্মসূচির অংশ হিসেবে চেওংগিয়ে স্ট্রিম পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু করে। লক্ষ্য শুধু স্রোতটা খুলে দেওয়া নয় – একে প্রাকৃতিক রূপ দেওয়া, শহরকে তার পুরনো ঐতিহ্যের সঙ্গে ফের যুক্ত করা এবং টেকসই উন্নয়নে উৎসাহ দেওয়াও ছিল উদ্দেশ্য।

প্রায় ২৭ মাস ধরে চলা এই প্রকল্পে কংক্রিটের রাস্তা আর তার উপরের উড়ালসেতু ভেঙে ফেলে স্রোতটিকে আবার সূর্যের আলোয় আনা হয়। এরপর প্রায় ৫.৮৪ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে পানির মান, প্রবাহ আর আশপাশের প্রতিবেশ পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হয়।

প্রায় ২৭ মাস ধরে চলা এই প্রকল্পে উপরের উড়ালসেতু ভেঙে ফেলে স্রোতটিকে আবার সূর্যের আলোয় আনা হয়। ছবি: আর্কডেইলি

পানি সরবরাহের নকশা

মূল চেওংগিয়ে স্ট্রিম ছিল একটি মৌসুমি স্রোত – মাটি খুব বেশি পানি শুষে নেওয়ায় এটি শুধু বৃষ্টির সময়েই প্রবাহিত হতো। তাই সারা বছর পানির প্রবাহ ধরে রাখা প্রকল্পের সবচেয়ে কঠিন অংশগুলোর একটি হয়ে দাঁড়ায়।

মাটির নিচে পানি চুইয়ে যাওয়া ঠেকাতে স্রোতের দুই পাশ বিশেষ উপকরণ দিয়ে আবৃত করা হয়। ঠিক করা হয়, প্রতিদিন প্রায় ১২,০০০ ঘনমিটার পানি দেওয়া হবে, যাতে গড়ে প্রায় ৪০ সেন্টিমিটার গভীরতা থাকে।

এই পানির কিছুটা আসে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের হান নদী থেকে, নতুন একটি পরিশোধন ব্যবস্থার মাধ্যমে। বাকিটা আসে পাতাল রেল সুড়ঙ্গ থেকে পাম্প করে তোলা ভূগর্ভস্থ পানি থেকে।

মাটির নিচে পানি চুইয়ে যাওয়া ঠেকাতে স্রোতের দুই পাশ বিশেষ উপকরণ দিয়ে আবৃত করা হয়। ছবি: আর্কডেইলি

উদ্ভিদ ও নদীতীরবর্তী বাস্তুতন্ত্র পুনর্গঠন

নকশার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল স্রোতের নদীতীরবর্তী এলাকা পুনরুদ্ধার করা – অর্থাৎ নদীর কিনারের সেই জমি, যেখানে নানা জীবজগৎ বসবাস করে এবং যা প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে।

এজন্য নগর কর্তৃপক্ষকে চেওংগিয়ের মতো ভূপ্রকৃতি ও উদ্ভিদবৈচিত্র্য আছে এমন জায়গা খুঁজতে হয়। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়ায় শিল্পায়ন এত বেশি যে, অক্ষত প্রাকৃতিক জায়গা পাওয়াই ছিল কঠিন।

শেষে নকশাকারীরা চেওংগিয়ে থেকে ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরের ইয়ংসু ও ইয়োদং স্ট্রিমকে রেফারেন্স হিসেবে বেছে নেন। এই দুই স্রোতের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করেই স্থানীয় প্রজাতির গাছ লাগানোর পরিকল্পনা তৈরি করা হয়।

১৯৭৬ সালে, যানজট কমাতে সেই রাস্তার উপর একটি উড়ালসেতুও তৈরি করা হয়। ছবি: আর্কডেইলি

স্থাপত্য ও নকশা

জলপ্রবাহ ঠিক রাখা আর স্থানীয় গাছপালা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি এই প্রকল্পে যুক্ত হয় স্থাপত্য নকশাও – আঁকাবাঁকা পথ আর চওড়া হাঁটার রাস্তা, যা মানুষকে হাঁটতে উৎসাহ দেয় এবং একইসঙ্গে প্রদর্শনীর স্থান হিসেবেও কাজ করে।

তবে এত ইতিবাচক প্রভাব সত্ত্বেও সবাই এই প্রকল্পকে ভালোভাবে নেয়নি। অনেকে এখনও এই স্রোতকে “পুনঃপ্রাকৃতিক” বলতে দ্বিধায় ভোগেন – তাদের মতে, এটা আসলে বাস্তুতান্ত্রিকভাবে পুনরুদ্ধার করা কোনো নদী নয়, বরং একটি কৃত্রিমভাবে বানানো নগর জলাশয় মাত্র।

জীববৈচিত্র্যের ফিরে আসা

এই বিতর্ক সত্ত্বেও, ২০২০ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে পুনরুদ্ধারমূলক পদক্ষেপের পর এলাকার প্রজাতিবৈচিত্র্য সার্বিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। 

সেই সময় স্রোতটি এলাকায় নতুন করে ২৬০ প্রজাতির উদ্ভিদ, ২০ প্রজাতির মাছ, ১০ প্রজাতির উভচর ও সরীসৃপ এবং ৩৩ প্রজাতির পাখির আবাসস্থলে পরিণত হয়েছিল। 

একই সময়ে এলাকায় পতঙ্গের প্রজাতিসংখ্যা বেড়েছিল প্রায় ৩৫ শতাংশ।

পুনরুদ্ধারমূলক পদক্ষেপের পর এলাকার প্রজাতিবৈচিত্র্য সার্বিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।  ছবি: আর্কডেইলি

অর্থনৈতিক প্রভাব

নির্মাণ ও ভূমি ব্যবহারের দিক থেকেও প্রকল্প-পরবর্তী সময়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়। গবেষণা অনুযায়ী, প্রকল্প সম্পন্ন হওয়ার মাত্র এক বছর পর, অর্থাৎ ২০০৬ সালের মধ্যে, স্রোতের কাছাকাছি অফিস ভাড়া ১৩ শতাংশ বেড়ে যায়, আর পুনর্উন্নয়নাধীন এলাকায় জমির দাম বৃদ্ধি পায় ৩৫ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত। 

এই পরিবর্তনের পাশাপাশি, প্রকল্প চালুর পাঁচ বছরের মধ্যেই এলাকার ভূমি ব্যবহারের ধরন মূলত শিল্প থেকে সরে গিয়ে অফিস, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, হোটেল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকে সরে যায়।

সামাজিক প্রভাব

সামাজিক দিক থেকেও পুনরুজ্জীবিত স্রোতটি বাসিন্দা ও পর্যটক উভয়ের কাছেই একটি জনপ্রিয় গণপরিসরে পরিণত হয়। স্রোতের রৈখিক পার্কের নকশা হাঁটাচলা, বিনোদন ও প্রশান্তির জন্য একটি নির্মল পরিবেশ প্রদান করে, যা ব্যস্ত মহানগরীর মাঝে এক প্রাকৃতিক আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। 

এছাড়া সবুজ পরিসরের প্রবেশগম্যতা বাড়িয়ে এবং বহিরাঙ্গন কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করে এই প্রকল্প বাসিন্দাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতার ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

ব্যস্ত মহানগরীর মাঝে এক প্রাকৃতিক আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে এই উদ্যোগ।  ছবি: আর্কডেইলি

প্রকল্পের উচ্চ ব্যয় এবং প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের উচ্ছেদ নিয়ে সমালোচনা থাকলেও চেওংগিয়ে স্ট্রিম দীর্ঘমেয়াদে উল্লেখযোগ্য সুফল প্রমাণ করেছে। নগর উন্নয়ন ও পরিবেশগত লক্ষ্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার জটিলতাকে তুলে ধরে এই প্রকল্প টেকসই নগর পুনরুজ্জীবনের একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। 

তথ্যসূত্র:

আর্কডেইলি

Related Posts

হোমালি যেনো রেস্তোরাঁ নয় ধান গাছের জীবন গল্প

নিউইয়র্কের পশ্চিম গ্রামের থাই রেস্তোরাঁর ইন্টেরিয়র ডিজাইন যেনো শুধু খাবারের পরিবেশই নয়। এটি একটি সাংস্কৃতিক গল্প বলার মাধ্যমও…

স্থাপত্যে বাংলাদেশের ঝুলিতে এলো আরও দুটি অর্জন

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আবারও উজ্জ্বল হলো বাংলাদেশের স্থাপত্যশৈলী। কমনওয়েলথ অ্যাসোসিয়েশন অব আর্কিটেক্টসের (সিএএ) ২০২৬ সালের পুরস্কার তালিকায় জায়গা করে…

আজকাল স্থপতিরা কেন ভবনের বাইরেও বেশি কিছু ডিজাইন করছেন?

স্থাপত্য বলতে এতদিন আমরা বুঝেছি ইট, কংক্রিট আর কাঁচের কাঠামো তৈরির শিল্প। কিন্তু বর্তমান সময়ে এই ধারণা বদলে…

স্থাপত্যে প্রায়েমিয়াম ইম্পেরিয়াল পুরস্কার জিতলেন লিবেসকিন্দ

জাপান আর্ট অ্যাসোসিয়েশন এ বছরের প্রায়েমিয়াম ইম্পেরিয়াল স্থাপত্য পুরস্কার দিয়েছে পোলিশ-আমেরিকান স্থপতি ড্যানিয়েল লিবেসকিন্দকে। নিউইয়র্কভিত্তিক স্টুডিও লিবেসকিন্দের প্রধান…

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

অভিনেতার নিউ ইয়র্কের বাড়িতে এক অবাক করা পল্লীসুলভ ছোঁয়া
হোমরালি রেস্তোরাঁ
স্থাপত্যে বাংলাদেশের ঝুলিতে এলো আরও দুটি অর্জন
আজকাল স্থপতিরা কেন ভবনের বাইরেও বেশি কিছু ডিজাইন করছেন?
স্থাপত্যে প্রায়েমিয়াম ইম্পেরিয়াল পুরস্কার জিতলেন লিবেসকিন্দ
Arch De Trump
কেন স্বেচ্ছায় নিজের “স্থপতি” উপাধি মুছে ফেললেন RIBA সভাপতি?
construction
দেয়ালের স্যাঁতসেঁতে দাগ: কারণ কী, সমাধান কী