Image

একরঙা শহর: স্থাপত্য থেকে রঙের হারিয়ে যাওয়া

আজকাল যেকোনো বড় শহরে হাঁটতে গেলে একটা বিষয় চোখ এড়ানো কঠিন। সেগুলো হলো- খোলা কংক্রিট, সাদাটে দেয়াল, জানালার কালো ফ্রেম, ফ্যাকাশে পাথর, বেইজ রঙের ইন্টেরিওর, আর রাস্তাঘাট ধূসর করে পেভিং। নতুন আবাসিক ভবনগুলো তৈরি হচ্ছে কাচ, ইস্পাত, কংক্রিট আর নিরপেক্ষ-রঙা প্যানেল দিয়ে। অফিস, গ্যালারি, হোটেল, ক্যাফে কিংবা বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট প্রায় সবখানেই একই সংযত রঙের ভাষা।

প্রতিটি ভবন আলাদাভাবে দেখলে হয়তো বোঝা যাবে অত্যন্ত সূক্ষ্ম আর যত্ন করে ডিজাইন করা হয়েছে। কিন্তু সবগুলো একসাথে দেখলে মনে হয় স্থাপত্য-সংস্কৃতিতে একটা বড় বদল ঘটছে। একরঙা পরিবেশ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।

বহুরঙা ঐতিহ্য থেকে স্থাপত্যিক নিরপেক্ষতা

স্থাপত্যের ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় জুড়ে রঙ ছিল স্থান-অভিজ্ঞতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। রঙ জড়িয়ে ছিল বস্তুগত সংস্কৃতি, কারুশিল্প, অলংকরণ, জলবায়ু, ধর্ম আর দৈনন্দিন জীবনের সাথে। সিরামিক টাইলস, রং করা পলেস্তরা, ইট, পাথর, কাঠ, বস্ত্র, রঙিন কাচ, গাছপালা আর ছায়া মিলে তৈরি হতো এক রঙিন পরিবেশ।

এই পরিবেশগুলোতে স্থাপত্য নিরপেক্ষতা চায়নি, চেয়েছে নির্দিষ্টতা। একটি ভবন জানিয়ে দিত সে কোথাকার। এটা একটা এলাকাকে চিহ্নিত করতে পারত, সাংস্কৃতিক স্মৃতি ধরে রাখতে পারত, অথবা কেবল চোখের আনন্দ দিতে পারত। আধুনিক স্থাপত্য এই সম্পর্ককে মূল থেকে বদলে দিল।

মেলবোর্নের স্পেকট্রাম অ্যাপার্টমেন্টস। ছবি: প্যারামেট্রিক আর্কিটেকচার

আধুনিকতাবাদ ও সংক্ষেপণের নীতি

শিল্পভিত্তিক সমাজের উপযোগী নতুন স্থাপত্য-ভাষা তৈরির আকাঙ্ক্ষা থেকেই আধুনিকতাবাদের জন্ম। ঐতিহাসিক অলংকরণ প্রত্যাখ্যান করাটা ছিল যুক্তিসংগতকরণ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, কার্যকারিতাবাদ, কাঠামোগত প্রকাশ আর নতুন নির্মাণ-পদ্ধতির এক বৃহত্তর বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকল্পের অংশ।

আয়তন, বিমূর্ততা, কাঠামোগত স্বচ্ছতা আর ন্যূনতম অলংকরণের প্রতি আধুনিকতাবাদী পছন্দ শেষ পর্যন্ত নিরপেক্ষ রঙের সাথে দৃঢ়ভাবে যুক্ত হয়ে যায়। রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্টস (রিবা) আধুনিকতাবাদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে ন্যূনতম অলংকরণ, রিইনফোর্সড কংক্রিট, ইস্পাত, কার্টেন ওয়াল, খোলা পরিকল্পনা আর সাদা বা নিরপেক্ষ রঙের প্রবণতাকে চিহ্নিত করে।

মিনিমালিজম যখন বৈশ্বিক শৈলী হয়ে উঠল

মিনিমালিজম বা সংহতভাবের যথেষ্ট স্থাপত্যিক মূল্য আছে। সংক্ষেপণ কাঠামোকে স্পষ্ট করতে পারে, স্থানিক সম্পর্ক জোরালো করতে পারে, আলোর অভিজ্ঞতা তীব্র করতে পারে আর অপ্রয়োজনীয় দৃশ্য-শব্দ দূর করতে পারে। এমন অনেক পরিবেশ আছে যেখানে সংযমই মানসম্পন্ন স্থাপত্যের চাবিকাঠি।

ইরানের শিরাজে নাসির-অল-মোলক মসজিদ (দ্য পিংক মসজিদ)। ছবি: প্যারামেট্রিক আর্কিটেকচার

কিন্তু সমসাময়িক মিনিমালিজম যখন প্রমিত হয়ে যায়, তখনই সমস্যা তৈরি হয়। একই উপকরণ আর একই রঙের প্যালেট এখন স্থাপত্য প্রকাশনা, ডিজাইন প্ল্যাটফর্ম, রিয়েল-এস্টেট বিপণন, আতিথেয়তা ব্র্যান্ড, আসবাব কোম্পানি আর সামাজিক মাধ্যমের মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। ফলাফলটা এক ধরনের নান্দনিক বিশ্বায়ন। 

তখন এটা আর শুধু একটা স্থাপত্য-পদ্ধতি থাকে না, হয়ে ওঠে একটা বিক্রয়যোগ্য চিত্র। নিরপেক্ষ ভবন সহজে ছবি তোলা যায়, সহজে ব্র্যান্ড করা যায়, সহজে পুনরুৎপাদন করা যায় আর সহজেই আন্তর্জাতিক সম্পত্তি বাজারে জায়গা করে নেয়। নিরপেক্ষতা বাণিজ্যিকভাবে সুবিধাজনক হয়ে ওঠে।

“চিরন্তন” ভবনের সমস্যা

নিরপেক্ষ স্থাপত্যের পক্ষে সবচেয়ে জোরালো যুক্তি হলো, এটা চিরন্তন। কিন্তু চিরন্তনতার আসল অর্থ কী? ধূসর পাথরের ভবন সুন্দরভাবে বয়স বাড়াতে পারে, সাদা সম্মুখভাগ দশকের পর দশক প্রাসঙ্গিক থাকতে পারে। নিরপেক্ষ উপকরণ নমনীয়তা দেয় আর নান্দনিক ক্লান্তির ঝুঁকি কমায়।

কিন্তু প্রতিটা ভবন পুরনো দেখানো এড়াতে চাইলে, স্থাপত্য সময়ের সাথে তার সম্পর্কই হারাতে পারে। ঐতিহাসিক স্থাপত্য চেনা যায় ঠিক এই কারণে যে সেটা একটা নির্দিষ্ট সময়ের উপকরণ, রঙ, অনুপাত জানায় সেটা কখন-কোথায় তৈরি। দৃশ্যগত পার্থক্যহীন শহরকে ঐতিহাসিকভাবে পড়া কঠিন হয়ে ওঠে। তখন স্থাপত্য নিরপেক্ষ ভোগ্যপণ্যের মতো আচরণ করে স্মরণীয় হওয়ার বদলে বিক্রয়যোগ্য থাকার জন্য নকশা হয়।

ক্যামব্রিজশায়ারের ক্যামব্রিজে ট্রাম্পিংটন স্ট্রিটে অবস্থিত জাজ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ। ছবি: প্যারামেট্রিক আর্কিটেকচার

প্রেক্ষাপট-নির্ভর রঙিন স্থাপত্যের দিকে

স্থাপত্যকে প্রশ্ন করা উচিত, তার রঙ কোথা থেকে আসছে? অঞ্চলের নিজস্ব উপকরণ কী, স্থানীয় ভূদৃশ্যের রঙ কী? দিনের আলো ও ঋতু পরিবর্তন সম্মুখভাগের উপলব্ধিকে কীভাবে বদলায়? একটা রঙের সাথে কী সাংস্কৃতিক যোগসূত্র জড়িয়ে আছে, আর ভবনটা বিদ্যমান নগর-রঙচিত্রে কীভাবে যোগ দেয়? এই প্রশ্নগুলো রঙকে সাজসজ্জা থেকে স্থাপত্যিক কৌশলে রূপান্তরিত করে।

নগর-রঙ সম্মিলিত স্মৃতি আর সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সাথেও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত রঙকে শুধু বস্তুনিষ্ঠভাবে নয়, বাসিন্দারা যে বিষয়ীগত ও ঐতিহাসিক অর্থ তাতে জুড়ে দেয়, সেভাবেও বোঝা দরকার। দ্রুত বিশ্বায়িত হওয়া শহরগুলোতে এটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রতিটি নতুন উন্নয়ন একই নিরপেক্ষ স্থাপত্য-ভাষা নিলে শহর ক্রমেই বিনিময়যোগ্য হয়ে যায়। প্রেক্ষাপট-নির্ভর রঙের চর্চা ঐতিহাসিক নকল না করেই এই সমরূপতা প্রতিরোধ করে।

অ্যাডাম কেইন আর্কিটেক্টসের গ্রে হাউজ। ছবি: প্যারামেট্রিক আর্কিটেকচার

সমসাময়িক স্থাপত্যের এখন সুযোগ আছে রঙকে নতুন করে বিবেচনা করার। প্রশ্নটা এই নয় যে পৃথিবী ধূসর হয়ে যাচ্ছে কি না। প্রশ্নটা হলো, স্থাপত্য প্রাণবন্ত হতে ভয় পাচ্ছে কি না। রঙের সচেতন ব্যবহার হয়ে উঠতে পারে স্থাপত্যিক স্বাতন্ত্র্যের প্রকাশ, যা ফিরিয়ে আনতে পারে স্থানীয় পরিচয় ও আবেগীয় গভীরতা।

লক্ষ্য শহরকে সব রঙে রাঙানো নয়, লক্ষ্য স্থাপত্যকে রঙের অনুমতি দেওয়া। কারণ শহর কোনো শোরুম নয়, বাস্তব বসবাসের পরিবেশ। আর সেখানে সাদা-কালো-ধূসরের চেয়ে বেশি কিছু দরকার।

তথ্যসূত্র:

প্যারামেট্রিক আর্কিটেকচার

Related Posts

আধুনিক বাড়ির নকশায় গৃহস্থালি কাজ ও করিডরের বিবর্তন

একটি বাড়ির নকশায় করিডর বা চলাচলের পথকে সাধারণত খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় না। বসার ঘর, শোবার ঘর,…

আধুনিক বাড়ির স্বপ্ন: মানুষকে স্বাধীন করার প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার সংকট

আধুনিক স্থাপত্যের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ, আরামদায়ক ও স্বাধীন করে তোলা। বিংশ শতাব্দীতে স্থপতি…

পরিবেশগত নৈতিকতার আলোকে স্থাপত্যের ১০টি প্রধান চ্যালেঞ্জ

স্থাপত্য কেবল ভবন নির্মাণ কিংবা নান্দনিক নকশা তৈরির শিল্প নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রা, প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর…

হাসপাতালে রোগী-কক্ষে ঘরোয়া আবহ দিচ্ছে কোয়ালুর নতুন ফার্নিচার

হাসপাতালের রোগী-কক্ষ বলতে আমাদের চোখে সাধারণত ভেসে ওঠে সাদা দেয়াল, ঠান্ডা আলো আর যান্ত্রিক পরিবেশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে…

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

বায়তুর রউফ জামে মসজিদ স্থপতি মেরিনার অনন্য স্থাপত্যকর্ম
করিডোর
house
01
হাসপাতালে রোগী-কক্ষে ঘরোয়া আবহ দিচ্ছে কোয়ালুর নতুন ফার্নিচার
10
09
ফর্ম ফলোজ ফিকশন: ফাংশনের বাইরে ছয়টি ডিজাইনের অনুসন্ধান
প্রকৃতির দামও হিসাব করছে ভুটান: জিডিপির পাশে জিইপি