ইতালির টাস্কানি অঞ্চলের ক্যারারা শহর হাজার বছর ধরে পরিচিত তার বিখ্যাত সাদা মার্বেলের জন্য। সেই মার্বেল খনন করে সমুদ্রবন্দরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য উনিশ শতকে তৈরি হয়েছিল এক বিশেষ রেলপথ যার নাম, ফেরোভিয়া মারমিফেরা দি ক্যারারা (Ferrovia Marmifera di Carrara)।
ঠিক সেই ঐতিহ্য থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে ফ্লোরেন্সভিত্তিক নকশা প্রতিষ্ঠান স্টুডিও লিয়েভিতো (Studio Lievito) তৈরি করেছে “মারমিফেরে” (Marmifere) নামের একটি মডিউলার নগর-আসবাব সংগ্রহ। যা বর্জ্য মার্বেলকে রূপান্তরিত করেছে ভাস্কর্যধর্মী, ব্যবহারযোগ্য পাবলিক-স্পেস উপাদানে।

ক্যারারার ঐতিহ্য ও প্রতীকী সেতুবন্ধন
মারমিফেরে সংগ্রহটির নামকরণ ও ধারণাগত ভিত্তি এসেছে ঐতিহাসিক ফেরোভিয়া মারমিফেরা রেলপথ থেকে। যেটি উনিশ শতকে নির্মিত হয়েছিল অ্যাপুয়ান আল্পস (Apuan Alps) পর্বতমালার খনি থেকে ক্যারারা বন্দর পর্যন্ত মার্বেল পরিবহনের জন্য। স্টুডিও লিয়েভিতোর নকশাকৃত এই মডিউলার নগর-আসবাব সংগ্রহটি খনি ও শহরের মধ্যে একটি প্রতীকী সেতু হিসেবে কাজ করে।
জনসাধারণের চত্বর, পার্ক ও পথচারী-এলাকায় বসানোর জন্য নকশা করা এই ভাস্কর্যধর্মী পাথর-উপাদানগুলো প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক স্মৃতিকে রূপান্তরিত করে ইন্টারঅ্যাকটিভ নগর-দৃশ্যে, যা মানুষকে বিশ্রাম, খেলাধুলা ও চিন্তাভাবনার জন্য আমন্ত্রণ জানায়।

প্রথম মডিউল: র্যাভানেতির প্রতিধ্বনি
মারমিফেরের প্রথম মডিউলের নাম “র্যাভানেতি” মার্বেল খননের ফলে জমে থাকা বর্জ্যের স্তূপ, যা ক্যারারা খনি-এলাকার একটি পরিচিত দৃশ্য। মডিউলের একপাশে খোদাই করা গর্তাকার আকৃতি পাহাড়ের ক্ষয়ের মতো দেখতে, আর এটাই হয়ে ওঠে একটি বসার জায়গা।
অন্যপাশের পৃষ্ঠ অক্ষত রেখে দেওয়া হয়েছে, যা কাজ করে হেলানো ক্লাইম্বিং ওয়াল হিসেবে। পুরনো প্লাস্টিক দিয়ে বানানো হাতল ধরে শিশুরা এতে উঠতে পারে। মাঝখান দিয়ে গেছে একটি ফাঁপা সুড়ঙ্গ, যা পুরনো রেলপথের সুড়ঙ্গের কথা মনে করিয়ে দেয়। কয়েকটি মডিউল পাশাপাশি বসালে এই সুড়ঙ্গগুলো জোড়া লেগে ছোট টানেল তৈরি করে। যার মধ্য দিয়ে শিশুরা হামাগুড়ি দিয়ে খেলতে পারে।

দ্বিতীয় মডিউল: খনির টেরেসের জ্যামিতি
দ্বিতীয় মডিউলের অনুপ্রেরণা খনির টেরেস বা ধাপ থেকে। যা পাথরে খোদাই করা তাক ও সিঁড়ির জ্যামিতিক গঠন তুলে ধরে। এর ফলে তৈরি হয় ধাপে ধাপে সাজানো স্তর, যেখানে বিভিন্ন কোণ থেকে বসা যায়। প্রথম মডিউলের মতো এর পেছনের দেয়ালও কাজ করে ক্লাইম্বিং কাঠামো হিসেবে। আর সংযুক্ত সুড়ঙ্গটিও খেলা ও অন্বেষণের সুযোগ দেয়।

র্যাডিক্যাল ডিজাইনের প্রতি শ্রদ্ধা
কাঁচামালের পাশাপাশি মারমিফেরের ধারণার মূলেও আছে ইতালীয় র্যাডিক্যাল ডিজাইন আন্দোলনের প্রতি একধরনের শ্রদ্ধা। প্রকল্পটি উৎসর্গ করা হয়েছে উগো লা পিয়েত্রা ও আরকিজুমের পরীক্ষামূলক ও অগ্রণী কাজের প্রতি। শিল্প-ইতিহাসের বাস্তবতাকে স্পর্শযোগ্য, ইন্টারঅ্যাকটিভ অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে স্টুডিও লিয়েভিতো তুলে ধরেছে ক্যারারার পাহাড়ি প্রকৃতির এক ঘনিষ্ঠ চিত্র, যা মানুষকে ইতালীয় মার্বেলের আসল ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন করে পরিচিত করায়।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি
মারমিফেরে প্রকল্পটি হোয়াইট ক্যারারা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড (White Carrara International Award)-এর প্রথম সংস্করণে বিজয়ী হয়েছে, যা এই মডিউলার আসবাব-ভাস্কর্য সংগ্রহের নকশাগত ও ধারণাগত গুরুত্বকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

মারমিফেরে প্রকল্প দেখিয়ে দেয়, শিল্প-বর্জ্য ও ঐতিহাসিক স্মৃতিকে কীভাবে আধুনিক নগর-নকশায় রূপ দেওয়া যায়। ক্যারারার খনি-এলাকার রুক্ষ বাস্তবতাকে বিশ্রাম, খেলা ও অন্বেষণের অভিজ্ঞতায় বদলে স্টুডিও লিয়েভিতো দেখিয়েছে, কীভাবে একটি অঞ্চলের শিল্প-ঐতিহ্য শুধু স্মারক না থেকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠতে পারে। এই পাথর-উপাদানগুলো আসবাব, ভাস্কর্য ও ক্ষুদ্র-স্থাপত্যের মাঝামাঝি এক নতুন রূপ তৈরি করে, যা পাথরের পুরনো গল্পকে নতুন ভাষায় ফিরিয়ে আনে নাগরিক জীবনে।
তথ্যসূত্র:
ডিজাইনবুম




















