বই আর তাকে ভরা পুরোনো ধাঁচের গ্রন্থাগারের ধারণাটা এখন বদলে যাচ্ছে। ডাচ তিনটি স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান ম্যাটার মেকার্স, এডব্লিউআর এবং বিএজেড স্টুডিও—একসাথে মিলে আমস্টারডাম-জুইডঅস্ট এলাকার একটা ফাঁকা পড়ে থাকা জায়গায় বানিয়েছে ওবিএ নেক্সট ল্যাব নামের একটি কাঠের ভবন।
এটি বানানো হয়েছে দ্য পাবলিক লাইব্রেরি অফ আমস্টারডাম বা ওবিএ-র জন্য। ভবনটির আয়তন প্রায় ১,১৭৫ বর্গমিটার, আর এর ভেতরে একইসঙ্গে আছে গ্রন্থাগার, সিনেমা হল, ক্যাফে এবং অনুষ্ঠান করার জায়গা।
স্থপতিরা বলছেন, জ্ঞান আদান-প্রদানের ধরন এখন যেভাবে বদলে যাচ্ছে, এই ভবনটি সেই পরিবর্তনেরই একটা প্রতিফলন।

গোলাপি “পাহাড়”: ভবনের প্রাণকেন্দ্র
ভবনের একদম মাঝখানে আছে বিশাল কাচে ঘেরা একটি খোলা জায়গা। উপরে দুই তলা সমান উঁচু। এটি তৈরি হয়েছে খোলা কাঠের বিম দিয়ে, যা বাইরে থেকে দেখা যায়। এই জায়গাতেই বানানো হয়েছে ধাপে ধাপে সাজানো হালকা গোলাপি রঙের একটি “বসার পাহাড়”। এর পাশে রাখা হয়েছে গাছের টব। এই পাহাড়টি শুধু ভবনের ভেতরেই থেমে নেই, এটি বাইরের খোলা চত্বর পর্যন্ত চলে গেছে।
ম্যাটার মেকার্সের প্রতিষ্ঠাতা আঁতোয়ান ফন এর্প বলেছেন, এই বসার পাহাড় শুধু বসার জায়গাই নয়, এটি জায়গাটাকে বিশেষ করে তোলারও কাজ করে। মানুষ এখানে খেলতে পারে, গাছের আড়ালে লুকিয়ে বই পড়তে পারে, আবার সিনেমা দেখা, বক্তৃতা শোনা বা ওয়ার্কশপের সময় বসতেও পারে।

নকশার মূল দর্শন: নমনীয়তা ও পুনর্বিন্যাসযোগ্যতা
ফন এর্প বলেন, তারা আজকের ডিজিটাল যুগের প্রজন্মের কথা মাথায় রেখে গ্রন্থাগারের ধারণাটা নতুন করে সাজিয়েছেন। এটা বইয়ের তাকের পাশাপাশি একটা প্রাণবন্ত কমিউনিটি হাব, যেখানে মানুষ নানাভাবে জ্ঞান শেয়ার করতে পারে।
এই কারণেই ভবনে এমন দেয়াল রাখা হয়েছে যা সরিয়ে ফেলা যায়, পর্দা দিয়ে জায়গা ভাগ করা যায়, আর আসবাবপত্রও সহজে এদিক-ওদিক সরানো যায়। এভাবে পুরো জায়গাটাকে দরকার মতো নতুন করে সাজিয়ে নেওয়া যায়। মাঝখানের অ্যাট্রিয়ামের চারপাশে বিভিন্ন ধরনের শেখার জায়গা রাখা হয়েছে, যেগুলো একসাথে প্রতিবেশীদের জন্য যেন একটা “লিভিং রুম”, এমনটাই বলেন ফন এর্প।

গঠন ও নির্মাণ পদ্ধতি
ওবিএ নেক্সট ল্যাব তৈরি হয়েছে ২৪টি প্রি-ফ্যাব্রিকেটেড, খুলে ফেলার উপযোগী (ডিমাউন্টেবল) ইউনিট দিয়ে, যেগুলো ড্রাই-ফিট প্যানেল, কলাম আর বিম দিয়ে গঠিত। ঢালাই কংক্রিটের ব্যবহার এড়াতে ভবনটি বসানো হয়েছে প্রি-কাস্ট স্ল্যাবের ফাউন্ডেশনের ওপর।
এই প্রকল্পটি স্লুইসবুর্টে পরিচালিত একটি পাইলট স্কিমের পরবর্তী ধাপ, যা “নেক্সট ল্যাব” নামের একটি বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ। পরিকল্পিত সাত বছরের আয়ুষ্কাল শেষে, এই মডুলার কাঠামোর সুবাদে ভবনটি খুলে ফেলে অন্যত্র স্থানান্তর করা সম্ভব হবে।
অভ্যন্তরীণ বিন্যাস ও বহিরাবরণ
একটি এল-আকৃতির ব্লকে রাখা হয়েছে গ্রন্থাগার, কর্মক্ষেত্র এবং মেকার স্পেস, যা কাচের অভ্যন্তরীণ দেয়াল দিয়ে কেন্দ্রীয় অ্যাট্রিয়ামের দিকে খোলা। পর্দার মাধ্যমে দিনের আলো ও দৃশ্যমান সংযোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
বাইরের দিক থেকে, বেশিরভাগ কাচে মোড়া নিচতলার ওপরে রয়েছে সরু কাঠের ব্যাটেন ও উল্লম্ব লুভারের একটি স্তর, যা উপরের তলাকে ছায়া দিতে সাহায্য করে। ছাদের অংশটি পুনর্ব্যবহৃত ফটোভোলটাইক সেল দিয়ে আচ্ছাদিত।

ওবিএ নেক্সট ল্যাব প্রমাণ করে যে সাময়িক বা অস্থায়ী স্থাপনাও হতে পারে স্থাপত্যগতভাবে সমৃদ্ধ এবং কমিউনিটি-কেন্দ্রিক। কাঠের মডুলার কাঠামো, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ এবং নমনীয় অভ্যন্তরীণ বিন্যাসের মাধ্যমে এটি দেখিয়ে দেয়, কীভাবে একটি সাময়িক গ্রন্থাগার একইসঙ্গে প্রতিবেশীদের মিলনস্থল, শেখার জায়গা এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
তথ্যসূত্র:
ডিজেইন
















