• Home
  • বিশেষ রচনা
  • এআই ভবনের ছবি আঁকতে পারে, কিন্তু কল্পনা করতে পারে কি?
Image

এআই ভবনের ছবি আঁকতে পারে, কিন্তু কল্পনা করতে পারে কি?

স্থাপত্য এক এমন পেশা, যেখানে কল্পনা আর কারিগরি জ্ঞান পাশাপাশি চলে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্রুতগতিতে ডিজাইন তৈরির জগতে ঢুকে পড়ায় এখন প্রশ্ন উঠছে, ভবিষ্যতে স্থপতির ভূমিকা আসলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। 

চীনা স্থপতি পিটার গুওহুয়া ফু তার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে এই প্রশ্নের একটি উত্তর খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন। চলতি মাসের ১৭তারিখ সিক্সথ টোন-এ প্রকাশিত এক ফিচারে তিনি তার অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন। তার মতামতের উপর ভিত্তি করেই বন্ধনের এই বিশেষ রচনা। 

এক পিয়ানোবাদকের এআই-নকশা যেভাবে প্রশ্ন তুলল

প্রায় ছয় মাস আগে ফু-এর বন্ধু, কানাডিয়ান পিয়ানোবাদক, সুরকার ও ইউনিসেফের সরকারি সঙ্গীত “লালাবাই”-এর রচয়িতা স্টিভ বারাকাত তাকে এআই দিয়ে তৈরি একটি ভবনের ছবি দেখান। কোনো স্থাপত্যবিদ্যার প্রশিক্ষণ ছাড়াই বারাকাত এআই ব্যবহার করে একটি “পিয়ানো ক্যাফে”-র ডিজাইন করেছিলেন, যার ছাদের গঠন ছিল গ্র্যান্ড পিয়ানোর খোলা ঢাকনার মতো।

ছবিটি এতটাই বিশ্বাসযোগ্য ছিল যে ফু-এর মনে প্রশ্ন জাগে, যিনি কখনো ডিজাইন করেননি তিনিও যদি এমন আকর্ষণীয় ডিজাইন তৈরি করতে পারেন, তাহলে ভবিষ্যতে স্থাপত্য পড়ার প্রয়োজন থাকবে কি না।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্রুতগতিতে ডিজাইন তৈরির জগতে ঢুকে পড়ায় প্রশ্ন উঠছে, ভবিষ্যতে এটি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। ছবি: সিক্সথটোন
নিজের গল্প থেকে চলচ্চিত্র, আর এআই নিয়ে প্রথম অভিজ্ঞতা

২০২৪ সালের শেষদিকে চীনের তিয়ানমু নদীর তীরে গড়ে ওঠে ফু-এর ক্যারিয়ারের ১০০তম ভবন “মিউজিক অন দ্য রিভার”। এরপর এক বছর ধরে তিনি তার ডিজাইনগুলো নিয়ে একটি বই লেখেন যার নাম, “দ্য স্টোরিজ বিহাইন্ড ১০০ বিল্ডিংস”। বন্ধুদের উৎসাহে বইটিকে চলচ্চিত্রে রূপদানের উদ্যোগ নেন স্থপতি।

এআই মডেলের নির্দেশনায় দুই মাসেরও কম সময়ে আনুমানিক ২৯ হাজার ৬৫০ ডলার কম খরচে তৈরি হয় দুই ঘণ্টার চলচ্চিত্র “দ্য আর্কিটেক্ট উইথ থ্রি শেডস অব ব্লু”, যার সুর করেছিলেন খোদ স্টিভ বারাকাত। এই অভিজ্ঞতা থেকে ফু উপলব্ধি করেন, এআই বাস্তবায়নে অসাধারণ দক্ষ, কিন্তু সৃষ্টি করতে পারে না।

স্থাপত্যের কোন ধাপে এআই সবচেয়ে কার্যকর

স্থাপত্য নকশা সাধারণত কয়েকটি ধাপে এগোয়। কনসেপ্ট ডিজাইন, স্কিমাটিক ডিজাইন, ডিজাইন ডেভেলপমেন্ট, নির্মাণ-সংক্রান্ত নথিপত্র তৈরি এবং নির্মাণ তদারকি। এর মধ্যে পরের ধাপগুলো বিস্তারিত নকশা তৈরি ও কারিগরি অঙ্কন প্রস্তুত করা। সেখানেই এআই সবচেয়ে বেশি কাজে লাগে। 

এই প্রবণতা ইতিমধ্যে পেশাদার মহলে স্পষ্ট। রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্টস-এর ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এআই ব্যবহারকারী স্থাপত্য সংস্থার হার ২০২৪ সালের ৪১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ৫৯ শতাংশে। ফু-এর নিজের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মূলত চীন ও কানাডায়, এই গ্রহণের হার এখনো বাড়ছে। বড় সংস্থাগুলোতে তা ইতিমধ্যে ৮০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এআই-এর সীমাবদ্ধতা: মৌলিক ধারণার জায়গা

তবে এআই-এর ক্ষমতার একটি সীমা আছে। আর সেটি ঠিক সেখানেই যেখান থেকে স্থাপত্যের প্রকৃত শুরু অর্থাৎ কনসেপচুয়াল জায়গায়। এআই কেবল আগে থেকে বিদ্যমান জিনিসের মধ্যেই সমাধান খুঁজতে পারে। এটি অসংখ্য ভবন বিশ্লেষণ করে পুরোনো ধারণাগুলো নতুনভাবে সাজিয়ে এমন কিছু তৈরি করতে পারে যা দেখতে নতুন মনে হয়, কিন্তু সম্পূর্ণ অভূতপূর্ব কোনো ধারণা তৈরি করতে পারে না।

ফু-এর ক্যারিয়ারের ১০০তম ভবন “মিউজিক অন দ্য রিভার”। ছবি: সিক্সথটোন
পেশার দুই প্রান্তে বিভাজন

ফু মনে করেন, এই বাস্তবতা স্থাপত্যকে দুটি চরম প্রান্তের দিকে ঠেলে দেবে। পেশার কারিগরি ও পুনরাবৃত্তিমূলক অংশগুলো ক্রমশ এআই গ্রহণ করে নেবে। যা অবশিষ্ট থাকবে তা হলো দুই ধরনের সক্ষমতা। সম্পূর্ণ নতুন ধারণা তৈরির বিরল দক্ষতা, আর প্রায় যেকোনো মানুষের নিজস্ব ধারণাকে চাক্ষুষভাবে প্রকাশ করার নতুন সুযোগ।

ফু মনে করেন, প্রকৃত সৃষ্টিশীল স্থপতির সংখ্যা ক্রমেই কমে আসতে পারে। কারণ একজন স্থপতির গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া, বছরের পর বছর কঠোর অধ্যয়ন, নিরন্তর অনুশীলন, বারবার ব্যর্থতা ও সংশোধন, এবং ধীরে ধীরে অন্তর্দৃষ্টি ও অভিজ্ঞতা সঞ্চয় এআই-এর কারণে অনেকটাই সংক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছে। 

তোংজি বিশ্ববিদ্যালয় ও ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব আর্কিটেকচারে পড়ানোর সময় তিনি এমন শিক্ষার্থীদের দেখেছেন, যাদের আগের কাজ ছিল সাদামাটা, কিন্তু হঠাৎ তারা অসাধারণ মানের প্রকল্প জমা দিয়েছে। তারা এআই ব্যবহার করেছে কি না, তা তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারেন না, তবে তাদের দক্ষতা বিকাশ নিয়ে তার উদ্বেগ থেকে যায়। 

জলের নিচে থিয়েটার ও এক অসমাপ্ত স্বপ্ন

অবশ্য সাধারণ মানুষের এআই-নির্মিত অধিকাংশ ভবন কখনো বাস্তবে রূপ পাবে না। কিন্তু স্থপতিরাও তাদের কল্পনার সব কিছু নির্মাণ করতে পারেন না। “মিউজিক অন দ্য রিভার” প্রকল্পে কাজ করার সময় ফু একটি জলের নিচের থিয়েটার ডিজাইন করেছিলেন। খরচ ও কারিগরি জটিলতার কারণে ধারণাটি বাদ দিতে হয়েছিল, যা তার জীবনের অন্যতম বড় আক্ষেপ হয়ে থেকে গেছে।

সম্প্রতি তিনি তার ছেলেকে নিজের আঁকা ডিজাইন থেকে সেই থিয়েটারটি একটি ভিডিও গেমের ভেতরে পুনর্নির্মাণ করতে বলেছেন। খেলোয়াড়েরা এখন সেই ভার্চুয়াল জগতে ঘুরে বেড়িয়ে এমন এক স্থাপনার অভিজ্ঞতা নিতে পারবে, যা তিনি কখনো বাস্তব জগতে গড়ে তুলতে পারেননি। আর এতেই তিনি এক ধরনের প্রকৃত পরিতৃপ্তি খুঁজে পান।

ফু-এর বই “দ্য স্টোরিজ বিহাইন্ড ১০০ বিল্ডিংস” অবলম্বনে এআই এর সাহায্যে নির্মিত চলচ্চিত্র। ছবি: সিক্সথটোন

ছয় মাস আগে বন্ধু স্টিভ বারাকাতের পিয়ানো ক্যাফে দেখে ফু-এর মনে প্রশ্ন জেগেছিল, এআই কি স্থপতিদের অপ্রয়োজনীয় করে তুলবে। নিজের অভিজ্ঞতার পর এখন তিনি বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখেন। এআই হয়তো নকশা তৈরির প্রক্রিয়া বদলে দেবে, কিন্তু স্থাপত্য চিরকালই শুরু হবে মানুষের সেই আকাঙ্ক্ষা থেকে।

স্থপতির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

ড. পিটার গুও-হুয়া ফু একজন স্থপতি ও ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। তিনি টংজি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্যে ব্যাচেলর, মাস্টার্স ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯১ সালে স্থাপত্যে ডিপ্লোমা লাভ করেন। তিনি KFS Architects Inc.-এর প্রতিষ্ঠাতা অংশীদার।

তার প্রতিষ্ঠান পরিবেশবান্ধব স্থাপত্য ও নির্মাণে কাজ করে এবং কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে উল্লেখযোগ্য প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। ২০২২ সালে ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডক্টর অব সায়েন্স ডিগ্রি প্রদান করে।

তথ্যসূত্র:

সিক্সথটোন

Related Posts

আধুনিক বাড়ির নকশায় গৃহস্থালি কাজ ও করিডরের বিবর্তন

একটি বাড়ির নকশায় করিডর বা চলাচলের পথকে সাধারণত খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় না। বসার ঘর, শোবার ঘর,…

আধুনিক বাড়ির স্বপ্ন: মানুষকে স্বাধীন করার প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার সংকট

আধুনিক স্থাপত্যের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ, আরামদায়ক ও স্বাধীন করে তোলা। বিংশ শতাব্দীতে স্থপতি…

পরিবেশগত নৈতিকতার আলোকে স্থাপত্যের ১০টি প্রধান চ্যালেঞ্জ

স্থাপত্য কেবল ভবন নির্মাণ কিংবা নান্দনিক নকশা তৈরির শিল্প নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রা, প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর…

হাসপাতালে রোগী-কক্ষে ঘরোয়া আবহ দিচ্ছে কোয়ালুর নতুন ফার্নিচার

হাসপাতালের রোগী-কক্ষ বলতে আমাদের চোখে সাধারণত ভেসে ওঠে সাদা দেয়াল, ঠান্ডা আলো আর যান্ত্রিক পরিবেশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে…

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

বায়তুর রউফ জামে মসজিদ স্থপতি মেরিনার অনন্য স্থাপত্যকর্ম
করিডোর
house
01
হাসপাতালে রোগী-কক্ষে ঘরোয়া আবহ দিচ্ছে কোয়ালুর নতুন ফার্নিচার
10
09
ফর্ম ফলোজ ফিকশন: ফাংশনের বাইরে ছয়টি ডিজাইনের অনুসন্ধান
প্রকৃতির দামও হিসাব করছে ভুটান: জিডিপির পাশে জিইপি