স্থাপত্যশিল্পের জগতে নেদারল্যান্ডস সব সময়ই তার উদ্ভাবনী ভাবনা এবং চমৎকার ডিজাইনের জন্য বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য স্থান দখল করে রেখেছে। সেই ধারাবাহিকতায় ডাচ স্থাপত্যের খাতায় যুক্ত হলো আরও একটি সোনালী অধ্যায়।
নেদারল্যান্ডসের সামাজিক প্রতিষ্ঠান ‘শিফ্ট’ (Shift) এবং আর্ট এজেন্সির যৌথ উদ্যোগে ২১ জুলাই আন্তর্জাতিক স্থাপত্য প্রতিযোগিতায় আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষনা করা হয় বিজয়ী প্রতিষ্ঠানের নাম। বিশ্বসেরা স্থপতিদের পেছনে ফেলে এই মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়েছে নেদারল্যান্ডসের বিখ্যাত স্থাপত্য ফার্ম এমভিআরডিভি (MVRDV)। পরিবেশবান্ধব ভাবনা, দূরদর্শী প্রযুক্তি এবং অসাধারণ স্থাপত্যশৈলীর এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটানোর স্বীকৃতিস্বরূপ তারা এই খেতাব অর্জন করে। আন্তর্জাতিক এ স্থাপত্য প্রতিযোগিতার এবারের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল—‘নতুন বিশ্ব বিস্ময়’।
তাদের এই বিজয়ী প্রজেক্টটি রূপকথা বা কেবল চোখের সৌন্দর্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মূলত জলবায়ু পরিবর্তন ও আধুনিক নগরায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিশ্ব স্থাপত্যের নতুন এক দিশারী হিসেবে কাজ করবে।
১৯৯৩ সালে রটারডামে প্রতিষ্ঠিত এই স্থাপত্য প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করা হয়েছে এর তিন স্থপতি প্রতিষ্ঠাতা—উইনি মাস (Winy Maas), জেকব ভ্যান রেইস (Jacob van Rijs), এবং নাতালি ডি ভ্রিস (Nathalie de Vries)-এর নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে।
সনাতন বা প্রথাগত নকশার বাইরে গিয়ে নগরায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং স্থান সংকটের মতো আধুনিক বৈশ্বিক সমস্যাগুলোর সৃজনশীল সমাধান দেওয়াই এদের মূল উদ্দেশ্য।
এমভিআরডিভি-র বিজয়ী ডিজাইনটির নাম ‘রটারডাম রকস (Rotterdam Rocks!)‘। এটি মূলত রটারডামের মাস (Maas) নদীর তীরে গড়ে ওঠার জন্য পরিকল্পিত প্রায় ২৪০ মিলিয়ন ইউরোর একটি বিশাল প্রকল্প।
এটি কেবল একটি দৃশ্যমান আকর্ষণীয় দালান নয়, বরং এটি নদী বা সাগরের পানি বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির সাথে কীভাবে শহর মানিয়ে নিতে পারে—তার একটি বাস্তব টেকসই দৃষ্টান্ত।

শিফট ২০২৫ সালে সাংস্কৃতিক সংস্থা ডিভিডিএল-এর সাথে যৌথভাবে এই প্রতিযোগিতার ঘোষণা দেয়। এই প্রতিযোগিতায় জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্য সংকটের বিরুদ্ধে মানুষকে পদক্ষেপ নিতে অনুপ্রাণিত করা হয়। মানুষকে অনুপ্রাণিত করে এমন একটি ‘নতুন বিশ্ব বিস্ময়’-এর জন্য প্রস্তাব আহ্বান করা হয়েছিল।
জাহা হাদিদ ফাউন্ডেশনের পরিচালক অ্যারিক চেন এবং ইউএনএস-এর প্রতিষ্ঠাতা বেন ভ্যান বার্কেল-সহ জুরি এমভিআরডিভি-র ধারণাটিকে অসাধারণ সাহসী বলে বর্ণনা করেছেন।
অ্যারিক চেন এবং বেন ভ্যান প্রত্যাশা করেন, এই ভবন এবং এর কার্যক্রম মানুষকে তাদের দৈনন্দিন আচরণ পুনর্বিবেচনা করতে উদ্বুদ্ধ করবে। একইসাথে টেকসইভাবে বসবাসের নতুন উপায় খুঁজে পেতেও উৎসাহিত করবে।

৩০,০০০ বর্গমিটারের এই ভবনের জন্য এমভিআরডিভি-এর প্রস্তাবে ইমারসিভ প্রদর্শনী, একটি হোটেল, একটি সম্মেলন কেন্দ্র এবং একটি ফুড কোর্ট অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এটি মাস নদীর দক্ষিণ তীরে আসন্ন ওয়াটারক্যান্ট জেলার অংশ হবে। এখানে ৩,৫০০-এর বেশি বাড়ি, সেইসাথে স্কুল, একটি ট্রেন স্টেশন, অফিস এবং সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক স্থানও তৈরি করা হবে। এর সাতটি স্তূপীকৃত পাথর দুটি চলাচলের পথ এবং একাধিক “গুহার” চারপাশে সাজানো থাকবে, যেখানে প্রদর্শনীর স্থান এবং অন্যান্য আতিথেয়তার ব্যবস্থাও থাকবে।
একটি তৃতীয় পথ ভবনটির বাইরের অংশ ঘিরে থাকবে। যেখানে ‘দ্য এলিসিয়াম’ নামে আরেকটি প্রদর্শনীর স্থান এবং শহরকে দেখার জন্য একটি ভিউ পয়েন্ট থাকবে।
এর নির্মাণ সামগ্রী সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে আশা করা হচ্ছে এটি “স্বল্প-কার্বন নির্মাণে সর্বশেষ উদ্ভাবন প্রদর্শনের” জন্য ব্যবহৃত হবে। এর বাইরের অংশে মাটি, পানি, গাছপালা ও প্রাণীদের জন্য পকেট থাকবে।

এই নকশাটি তৈরির ক্ষেত্রে তাদের প্রথম পদক্ষেপ ছিল প্রকল্পের পরিধিকে বিস্তৃত করা। বিশ্বকে বাসযোগ্য করতে কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন কমাতে হবে এবং মানুষ, গাছপালা, জল, বাতাস ও প্রাণীদের আবাসস্থলের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক স্থান তৈরি করতে হবে। এর জন্য পরিবেশগত প্রভাব পূরণের লক্ষ্যে নতুন নির্মিত স্থানের প্রয়োজনীয়তার সাথে নতুন ভূদৃশ্যের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে বলে জানিয়েছেন এমভিআরডিভির প্রতিষ্ঠাতা অংশীদার উইনি মাস।
স্থাপত্য সংস্থা এমভিআরডিভি ১৯৯৩ সালে রটারডামে মাস, জ্যাকব ভ্যান রিজ এবং নাথালি ডি ভ্রিস মিলে প্রতিষ্ঠা করেন।
এর অন্যান্য সাম্প্রতিক প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে বোর্দোর একটি আবাসন কমপ্লেক্স, যা গাছের টব ও মানুষের আকৃতির প্রবেশপথ দিয়ে প্রাণবন্ত করা হয়েছে। চেংডুতে কাঠ দিয়ে নির্মিত একটি পাহাড়-আকৃতির ভিউপয়েন্টও রয়েছে এই প্রকল্পে।
সূত্র: ডিজেইন

















