দ্রুত নগরায়ণ, জমির সংকট এবং বাজারকেন্দ্রিক আবাসন উন্নয়নের চাপে সমসাময়িক ভারতীয় শহরগুলোতে আবাসন ক্রমেই একটি পণ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর ফলে বাসস্থান থেকে হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া এবং স্থানিক পরিচয়ের অনুভূতি। এই প্রেক্ষাপটে বেঙ্গালুরুর ‘হোমস অ্যারাউন্ড ট্রিজ’ প্রকল্পটি এক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি সামনে আনে।
২০২৪ সালে সম্পন্ন হওয়া ১,৪১,০০০ বর্গফুট আয়তনের এই প্রকল্পটি ভারতের কর্ণাটকের বেঙ্গালুরুতে অবস্থিত। ১.১ একর ঘন বৃক্ষাবৃত একটি সাইটে নির্মিত প্রকল্পটিতে মোট ৩৮টি আবাসিক ইউনিট রয়েছে, যা নকশা করেছে আর্কিটেকচার রেড (architectureRED)।

প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের নকশা
প্রকল্পটির মূল দর্শন হলো বিদ্যমান প্রাকৃতিক পরিবেশকে সংরক্ষণ করে তার সঙ্গে স্থাপত্যের সম্পর্ক তৈরি করা। সাধারণত বহুতল আবাসন নির্মাণের জন্য সাইটের গাছপালা অপসারণ করা হলেও এখানে উল্টো প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। গাছগুলোকে অক্ষুণ্ণ রেখে তাদের অবস্থানকে নকশার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে ভবনটি যেন প্রকৃতির ভেতর থেকেই জন্ম নিয়েছে।

‘ট্রি-স্কুপ’: স্থাপত্যে শূণ্যতার ব্যবহার
সাইটে থাকা গাছগুলোর অবস্থান বিবেচনা করে একটি আয়তাকার ভবনের নকশা করা হয়েছে। গাছগুলোকে ঘিরে ভবনের বিভিন্ন অংশে বিশেষ ধরনের খোলা বা ফাঁকা স্থান রাখা হয়েছে, যাকে ‘ট্রি-স্কুপ’ বলা হয়। এই শূন্যস্থানগুলো দশতলা ভবনের নকশায় একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য তৈরি করেছে।
এসব ‘ট্রি-স্কুপ’-এর মধ্যে পাঠকক্ষ, লবি এবং ইনডোর স্পোর্টস স্পেস স্থাপন করা হয়েছে, যা ব্যবহারকারীদেরকে সবসময় প্রকৃতির সংস্পর্শে রাখে।

গাছের মধ্য দিয়ে একটি নগর-গলি
প্রকল্পটির অন্যতম আকর্ষণ হলো ভবনের মাঝখান দিয়ে তৈরি একটি তির্যক খোলা পথ। যা সাইটের দুটি বড় গাছ- একটি বটগাছ ও একটি রেইন ট্রিকে বিশেষভাবে তুলে ধরে। এই নকশার কারণে ভবনের ভেতরে চলাচলের সময় একটি ছোট রাস্তা বা গলিপথ দিয়ে হাঁটার অনুভূতি তৈরি হয়।
ভবনের ছাদে সুইমিং পুল এবং অ্যাম্ফিথিয়েটারের মতো বিভিন্ন সামষ্টিক সুবিধা সংযোজন করা হয়েছে। যেখান থেকে বৃক্ষশীর্ষের ওপর দিয়ে বেঙ্গালুরুর শহররেখা দেখা যায়। দিনের পরিবর্তনশীল আলো-ছায়া এসব স্থানকে নতুন অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত করে।

আলো, বাতাস ও সবুজের সঙ্গে আবাসনের সম্পর্ক
মোট ৩৮টি অ্যাপার্টমেন্ট দুটি রৈখিক কোরের বরাবর বিন্যস্ত। প্রতিটি ইউনিট এমনভাবে পরিকল্পিত যে সেগুলো পর্যাপ্ত আলো, প্রাকৃতিক বায়ু চলাচল এবং বাইরের সবুজ পরিবেশের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত থাকে।
শয়নকক্ষ, ডাইনিং ও বসার ঘরের মতো প্রধান আবাসিক স্থানগুলো গাছের উপস্থিতির দ্বারা প্রভাবিত হয়। এর ফলে বাসিন্দাদের মধ্যে স্থান ও প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক এবং এক ধরনের আত্মীয়তার অনুভূতি সৃষ্টি হয়।

সচেতন নগরায়ণের একটি প্রস্তাব
‘হোমস অ্যারাউন্ড ট্রিজ’ কেবল একটি আবাসন প্রকল্প নয়, এটি আরও সচেতন ও পরিবেশ-সংবেদনশীল নগরায়ণের পক্ষে একটি যুক্তি। দ্রুত উন্নয়নের কারণে যখন অনেক শহর তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ হারাচ্ছে, তখন এই প্রকল্প দেখিয়ে দেয় যে উচ্চ ঘনত্বের আবাসনও পরিবেশবান্ধব, মানবিক এবং সবুজ হতে পারে। এটি এমন এক নগর ভবিষ্যতের প্রস্তাব দেয়, যেখানে প্রকৃতি নগরজীবনের কেন্দ্রীয় অংশ।

বেঙ্গালুরুর ‘হোমস অ্যারাউন্ড ট্রিজ’ প্রকল্পটি সমসাময়িক আবাসন নকশায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। এটি প্রমাণ করে যে নগর উন্নয়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণ পরস্পরবিরোধী নয়। বিদ্যমান গাছপালাকে ধ্বংস না করে তাদের সঙ্গে সংলাপ স্থাপন করে কীভাবে মানবিক, টেকসই এবং অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ আবাসিক পরিবেশ তৈরি করা যায়, তার সফল উদাহরণ এই প্রকল্প। ভবিষ্যতের নগর আবাসন পরিকল্পনায় প্রকৃতি-নির্ভর এমন দৃষ্টিভঙ্গি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে।

তথ্যসূত্র
ভলিউম জিরো। প্রকাশকাল: ১৭ জুন ২০২৬
















