চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় হুবেই প্রদেশের শিয়ানিং শহরের ‘ঘন মসো’ বাঁশবনের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে এক অস্থায়ী স্থাপনা যার নাম, ‘ভেইল টাওয়ার’ (Veil Tower)। এটি প্রকৃতি, আলো, মানবদেহের গতি এবং স্থানিক অভিজ্ঞতার সম্পর্ককে নতুনভাবে অনুধাবনের একটি পরীক্ষামূলক স্থাপনা।
চীনা স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান গেংজিন আর্কিটেকচার অফিস-এর (gèngjin Architecture Office) নকশায় নির্মিত এই প্যাভিলিয়নটি কাঁচা বাঁশের কাঠামো এবং ঝুলন্ত কালো কাপড়ের সমন্বয়ে তৈরি। যা একই সঙ্গে আদি নির্মাণ পদ্ধতি, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ এবং পরিবেশ-সংবেদনশীল নকশার একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ।
বাঁশবনের সঙ্গে স্থাপত্যের সংলাপ
ভেইল টাওয়ার নির্মিত হয়েছে ‘অ্যানসো হিল রিসোর্ট’ (ANNSO Hill Resort) সংলগ্ন বিস্তীর্ণ বাঁশবনের মধ্যে। পাহাড়ি ঢাল, ঘন সবুজ এবং আকাশমুখী বাঁশের প্রাকৃতিক বিন্যাসকে অক্ষুণ্ণ রেখেই এই পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রকৃতির মধ্যে একটি স্বতন্ত্র বস্তু স্থাপন করার পরিবর্তে, নকশাটি বিদ্যমান ভূদৃশ্যের সঙ্গে যেন সংলাপ রচনা করেছে।
স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা অপরিশোধিত বাঁশকে প্রধান নির্মাণ উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। সীমিত বাজেটের মধ্যে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীদের সহযোগিতায় নির্মিত এই প্যাভিলিয়ন দেখিয়েছে যে সহজ ও প্রত্যাবর্তনযোগ্য নির্মাণ কৌশল ব্যবহার করেও পরিবেশ ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত স্থাপত্য সৃষ্টি করা সম্ভব।

পনেরো ফ্রেমের জ্যামিতিক বিন্যাস
প্যাভিলিয়নের মূল কাঠামো গঠিত হয়েছে পনেরোটি বাঁশের ফ্রেমকে কেন্দ্র করে। যা একটি পনেরো ভুজাকার বিন্যাস তৈরি করেছে। নকশার ধারণা এসেছে বাঁশের ‘অভ্যন্তরীণ চামড়া’ উন্মোচনের কল্পনা থেকে। এর ফলে একটি কঠিন কাঠামোর মধ্যে নরম ও ঝুলন্ত পর্দার আবরণ যুক্ত হয়েছে। যা স্থাপনাটিকে একই সঙ্গে দৃঢ় এবং কোমল চরিত্র দিয়েছে।
প্রতিটি বাঁশের খুঁটির ব্যাস প্রায় ৬০ মিলিমিটার। এগুলোকে ত্রিভুজাকার স্থিতিশীলতা দেওয়ার জন্য তির্যক ব্রেস ও বোল্ট-সংযুক্ত জোড় ব্যবহার করা হয়েছে। বিমের সংযোগস্থলে ঐতিহ্যবাহী হেম্প দড়ির ক্রস-ল্যাশিং পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে। যা বাঁশের স্বাভাবিক অনিয়মিত আকৃতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম। পুরো কাঠামো এমনভাবে নির্মিত যাতে করে প্রতিটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা যায়, এবং সম্পূর্ণ স্থাপনাটি পুনরায় খুলে নেওয়া যায়।

ঝুলন্ত কালো আবরণের স্থানিক অভিজ্ঞতা
বাঁশের কাঠামো থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে পনেরোটি কালো কটন-লিনেন কাপড়ের প্যানেল। এগুলো একত্রে একটি ধারাবাহিক আবরণ সৃষ্টি করেছে। যা স্থাপনার অভ্যন্তরকে সংজ্ঞায়িত করে। কাপড়টির প্রায় ৬০ শতাংশ আলোক পরিবাহিতা রয়েছে। ফলে দিনের আলো এর মধ্য দিয়ে প্রবেশ করে নরম, ছায়াময় এবং কালি-জলরঙের মতো এক আবহ।
মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে কাপড়ের ঊর্ধ্বমুখী ভাঁজগুলো একটি গতিশীল দৃশ্যমানতা তৈরি করে। যা বাঁশের শক্ত কাঠামোর সঙ্গে বৈসাদৃশ্যের সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে কাপড় ও বাঁশের মধ্যবর্তী ফাঁকগুলো দিয়ে বাতাস চলাচল করতে পারে। যা কাঠামোর ওপর বায়ুচাপ কমানোর পাশাপাশি পর্দাকে বাতাসে দোলার সুযোগ দেয়।

দৃষ্টি ও শরীরের নিয়ন্ত্রিত অভিজ্ঞতা
স্থাপনাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো সাদা মেডিকেল কটন টেপ দিয়ে তৈরি একটি ধারাবাহিক অনুভূমিক রেখা। যা সমান উচ্চতায় প্রতিটি বাঁশে পেঁচিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঢালু ভূমির ওপর দিয়ে এগিয়ে চলা এই রেখা ভূমির উঁচু-নিচু দিকটাকে দৃশ্যমান করে তোলে।
কালো পর্দার নিচের প্রান্তও এই অনুভূমিক রেখার সঙ্গে সমন্বিত। মাটি থেকে প্রায় ১.৬ মিটার উচ্চতায় ঝুলন্ত এই আবরণ অধিকাংশ দর্শনার্থীর স্বাভাবিক দৃষ্টিসীমাকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে স্থাপনাটিতে প্রবেশ করতে হলে সামান্য ঝুঁকে নিচ দিয়ে যেতে হয়- এমন একটি শারীরিক অঙ্গভঙ্গি, যা দর্শনার্থীকে নতুন এক স্থানিক অভিজ্ঞতার জন্য প্রস্তুত করে।
ভেতরে প্রবেশের পর চারপাশের বাঁশবনের জটিল দৃশ্য প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায় এবং দর্শকের দৃষ্টি উপরের দিকে পরিচালিত হয়। পনেরো ভুজাকৃতির খোলা অংশ দিয়ে দেখা যায় আকাশ, ভাসমান মেঘ এবং দুলতে থাকা বাঁশের শীর্ষভাগ। এভাবে স্থাপনাটি মাটি ও আকাশের মধ্যে এক ধরনের ঊর্ধ্বমুখী সংযোগ সৃষ্টি করে।

সম্পূর্ণ পুনর্ব্যবহারযোগ্য একটি স্থাপত্য
ভেইল টাওয়ারের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো এর অস্থায়ী এবং সম্পূর্ণ পুনর্ব্যবহারযোগ্য চরিত্র। নির্মাণের কোনো উপাদানই স্থায়ীভাবে ভূমির সঙ্গে যুক্ত নয়। সব বাঁশ, কাপড়, দড়ি এবং সংযোগ উপকরণ খুলে নিয়ে পুনরায় ব্যবহার বা পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব।
এই প্রকল্প স্থায়ী স্থাপত্যের উপস্থিতি তৈরির পরিবর্তে দেখিয়েছে যে হালকা নির্মাণ, স্থানীয় উপকরণ এবং প্রত্যাবর্তনযোগ্য নির্মাণ পদ্ধতি ব্যবহার করে এমন একটি স্থাপত্যিক অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করা যায়, যা প্রকৃতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক বজায় রাখে।

ভেইল টাওয়ার- কেবল একটি অস্থায়ী প্যাভিলিয়ন নয়। এটি প্রকৃতি, উপকরণ এবং মানুষের ইন্দ্রিয়গত অভিজ্ঞতার মধ্যে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার একটি স্থাপত্যিক অনুসন্ধান। কাঁচা বাঁশ, কালো কাপড় এবং আলো-ছায়ার সূক্ষ্ম ব্যবহারের মাধ্যমেগেংজিন আর্কিটেকচার অফিস এমন একটি স্থাপনা নির্মাণ করেছে, যা দর্শককে সাময়িকভাবে দৈনন্দিন বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে আকাশ, আলো এবং ভূদৃশ্যের সঙ্গে নতুনভাবে সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ দেয়।
- চিত্রগ্রাহক: দা চেন, পেংইউ ঝৌ, গেংজিন আর্কিটেকচার অফিস।
তথ্যসূত্র
ডিজাইনবুম। প্রকাশকাল: ৭ জুলাই ২০২৬।
















