দূষণ আর প্রাকৃতিক বিপর্যয় বর্তমান বিশ্বে র এক নৈমিত্তিক ব্যাপার। পৃথিবী আমাদের একমাত্র বাসযোগ্য স্থান। আমাদের অসচেতনতায় প্রতিনিয়ত এই পৃথিবী হয়ে পড়ছে বাস অযোগ্য। প্রতিদিনের বর্জ্য অব্যবস্থাপনার কারণে পরিবেশ দূষণের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্লাস্টিক বর্জ্য যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তবে আশার কথা হলো বর্জ্য রিসাইক্লিং পুন:ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন নতুন উদ্ভাবন ও পণ্য উৎপাদন শুরু হয়েছে অনেক আগে থেকে। তবে শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় ঝুঁকি থাকছে সবসময়।
আমাদের নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্রের আবর্জনা, খাদ্য-দ্রব্যের আবর্জনা ইত্যাদি সবকিছুকে রিসাইক্লিং করে উৎপাদন করা নতুন পণ্যের দাম কম ও মান উন্নত হওয়ায় দিন দিন এর চাহিদাও বাড়ছে বিশ্ব জুড়ে। বিকল্প ব্যবহারযোগ্য যে সকল পণ্যের বর্জ্য থেকে নতুন পণ্য উৎপাদন করা হয় সে সব পণ্যের বর্জ্যকে বিশেষ পদ্ধতিতে রিসাইক্লিং করে নতুন সব পণ্য উৎপাদন করা হয়। বিভিন্ন পদ্ধতি ও ধাপে রিসাইক্লিংয়ের পর একটি নতুন পণ্য প্রস্তুত করা হয়। এতে বর্জ্যরে দূষণ থেকে পরিবেশ যেমন বাঁচে একইসাথে মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও কম থাকে।
রিসাইক্লিং প্রসেস কি?
রিসাইক্লিং হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে বিভিন্ন উপকরণ যেমন, ফেলে দেয়া কাচ ও প্লাস্টিকজাত পণ্য, পুরনো কাগজ ইত্যাদি সংগ্রহ করে সেগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন প্রক্রিয়ায় প্রথমে কাঁচামাল ও পরে নতুন পণ্য প্রস্তুত করা হয়। এই বিশেষ পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ায় রিসাইক্লিং প্রসেস হিসেবে পরিচিত। রিসাইক্লিং পক্রিয়ায় নতুন পণ্য উৎপাদনের ফলে পরিবেশ দূষণ রোধ হয় এবং নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়।
উপকরণ রিসাইক্লিং ও বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়া
যেসব দেশ বর্জ্য রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে নতুন পণ্য তৈরি করে কিংবা উদ্ভাবন করে তারা এই সামগ্রিক প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন করে থাকে। এই ধাপগুলো হচ্ছে-
প্রথম ধাপ
বর্জ্য রিসাইক্লিং প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপে বিভিন্ন মাধ্যম ও পদ্ধতিতে বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। পৃথিবীর প্রায় সব শহর ও নগরীতে বর্জ্য সংগ্রহের পদ্ধতি প্রায় একই রকম। প্রধানত তিনটি পদ্ধতিতে বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়।
১। কার্বসাইড সংগ্রহ: এই পদ্ধতিতে বাসা-বাড়ি থেকে নগর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বর্জ্য ল্যান্ডফিল কিংবা রিসাইক্লিং প্লান্টে স্থানান্তরের দায়িত্ব পালন করে। এই প্রক্রিয়াটি নগর কর্তৃপক্ষ বা পৌরসভা নিজেদের দায়িত্বে কিংবা কোন সংস্থার সাথে চুক্তির মাধ্যমেও বাস্তবায়ন করতে পারে। কর্তৃপক্ষের একটি দাপ্তরিক শাখা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত থাকে।
২। ড্রপ-অফ সিস্টেম: ড্রপ-অফ সিস্টেম হলো এক বিশেষ ধরণের বর্জ্য সংগ্রহ পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে বাসা বাড়ি থেকে বর্জ্যের ধরণ অনুযায়ী আলাদাভাবে বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। কোন ক্ষেত্রে বাসা বাড়ির কাছাকাছি বর্জ্যের জন্য আলাদা কন্টেইনার রাখা হয়। আবার কোন ক্ষেত্রে সমস্ত বর্জ্য একসাথে সংগ্রহ করে আঞ্চলিক ডাম্পিং স্টেশনে নিয়ে বর্জ্যরে ধরণ অনুযায়ী পৃথক করা হয় এবং পরে রিসাইক্লিং করা হয়।
৩। ডিপোজিট রিটার্ণ প্রোগ্রাম: ডিপোজিট রিটার্ণ প্রোগ্রাম শুনেই বুঝা যায় এ পদ্ধতির কথা। এই পদ্ধতিতে প্রথমেই ভোক্তাকে পণ্য মূল্যের অতিরিক্ত টাকা দিয়ে পণ্য কিনতে হয়। পরে এই প্রোডাক্টের বর্জ্য ফেরত দিলে অতিরিক্ত টাকা আবার ফেরত দেয়া হয়। ফলে রিসাইক্লিং এর জন্য ঐ বর্জ্য যথাযথভাবে ফেরত পাওয়া যাবে। এতে পরিবেশ দূষণ রোধে সহায়তা করে।
দ্বিতীয় ধাপ
দ্বিতীয় ধাপের কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা হয়। এ ধাপে সংগৃহীত বর্জ্য বাছাই, শ্রেণিভুক্ত করণ, পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন কাজগুলো করা হয়। এরপর তা মূল রিসাইক্লিং প্রক্রিয়ায় নেয়া হয়। শ্রেণিভুক্ত বর্জ্য যেমন কাগজ, কাচ, প্লাস্টিক ইত্যাদি আলাদা আলাদাভাবে রিসাইক্লিং করা হয়। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত রিসাইক্লিং প্রক্রিয়া তিন রকম। সেগুলো হচ্ছে-
মেকানিক্যাল রিসাইক্লিং
মেকানিক্যাল রিসাইক্লিং হলো এমন পদ্ধতি যেখানে প্লাস্টিক বা যে কোন বর্জ্যকে রাসায়নিক পরিবর্তন না ঘটিয়ে তা পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করে তোলা। এছাড়াও বর্জ্য থেকে এসব পণ্যের কাঁচামালও উৎপাদন করা হয়। সাধারণত প্লাস্টিক মাটিতে পড়ে থাকে এবং নোংরা হয়ে থাকে। প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সময় সেগুলো আলাদা করা হয়। যে প্লাস্টিকগুলো পরিস্কার এবং এক রংয়ের থার্মোপ্লাস্টিক হয়ে থাকে সেগুলোকে গলিয়ে প্লাস্টিকের দানা তৈরি করা হয় এবং যেগুলো মাল্টিকালার কিংবা নোংরা সেগুলো প্রথমে ধুয়ে পরিস্কার করা হয়। শেষে এগুলো দিয়ে অন্যান্য পণ্য উৎপাদন করা হয়।
এনার্জি রিসাইক্লিং
এনার্জি রিসাইক্লিং বলতে জ¦ালানি শক্তির পুন:ব্যবহার অথবা কোন কিছুকে রিসাইক্লিং করে জ্বালানি শক্তিতে রূপান্তর করা। প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে এমন পণ্য উৎপাদন করা যায়। তবে এ বর্জ্য অবশ্যই প্লাস্টিক এবং রাবার জাতীয় বর্জ্য হতে হবে। আমরা প্রায়শই দেখে থাকি রাস্তা নির্মাণ বা সংস্কারের সময় পিচ ব্যবহার করা হয়। গাড়ির টায়ার এবং প্লাস্টিক জাতীয় বর্জ্যরে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটিয়ে তাকে জ্বালানিতে রূপান্তর করা যায়। এছাড়াও প্লাস্টিককে অতি উচ্চ তাপমাত্রায় চালনা করা হলে তা থেকে পেট্রোলিয়াম (পেট্রোল, ডিজেল) জাতীয় আলাদা উপজাত পাওয়া যায়। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই প্লাস্টিক বর্জ্যকে উচ্চ তাপমাত্রায় গলাতে হয়। ৭০ ও ৮০’র দশকে এ প্রক্রিয়াটি পরিবেশের জন্য খুবই ক্ষতিকারক ছিলো। বর্তমানে আধুনিক পদ্ধতিতে রাবার ও প্লাস্টিক বর্জ্যকে পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়ায় রিসাইক্লিং করা হয়।
রাসায়নিক রিসাইক্লিং
প্লাস্টিক এমন একটি পণ্য যা মূলত প্রাকৃতিক গ্যাস এবং পেট্রোলিয়াম জাতীয় পদার্থ থেকে তৈরি। রাসায়নবিদেরা প্রাকৃতিক গ্যাস বা পেট্রোলিয়ামকে পরিশোধনের জন্য উচ্চ তাপমাত্রার মধ্য দিয়ে চালনা করে। এ সময় ইথিলিন ও প্রোপিলিন নামে দুটি মৌলিক পদার্থ নির্গত হয়। এগুলো প্লাস্টিকের মূল রাসায়নিক উপাদান। তাই প্লাস্টিক বর্জ্যকে উচ্চ তাপমাত্রায় চালনা করা হলে মূল উপাদানগুলো আবারও ফেরত পাওয়া যায় যা থেকে নতুন প্লাস্টিক উৎপাদন করা হয়। এই সামগ্রিক প্রক্রিয়াটির নামই হলো রাসায়নিক্যাল রিসাইক্লিং।
রিসাইক্লিং প্রক্রিয়ার সুবিধা
- ল্যান্ডফিল (বর্জ্য দিয়ে জমি ভরাট) ও ইনসিনেরেটরে (যে যন্ত্রে শিল্প বর্জ্য পুড়িয়ে ক্ষতিকারক অ্যাশ তৈরি করা হয়) বর্জ্যরে পরিমাণ হ্রাস পায়।
- প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন কাঠ, জল ও খনিজ পদার্থ সংরক্ষণ করে।
- দেশীয় উপকরণ ব্যবহার করায় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি পায়।
- নতুন কাঁচামালের চাহিদায় থাকায় এবং বর্জ্য কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হওয়ায় পরিবেশ দূষণ হ্রাস পায়।
প্লাস্টিক ছাড়াও কাগজ, কাচ, মেটাল, গ্লাস সব ধরণের বর্জ্যই রিসাইক্লিং করে ব্যবহার করা যায়। উৎপাদন করা যায় নতুন নতুন পণ্য কিংবা পণ্যের কাঁচামাল। তবে বিশ্বজুড়ে বহুল ব্যবহৃত প্লাস্টিক বর্জ্যরে রিসাইক্লিং সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ভূমি নিরাপত্তা ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় সুরক্ষায় সব ধরণের রিসাইক্লিং বর্তমানে অত্যন্ত জরুরি।
প্লাস্টিক বর্জ্য রিসাইক্লিং যেসব পণ্য উৎপাদন করা হয়
বর্জ্যরে ধরণ অনুযায়ী পণ্যের ধরণেও রয়েছে ভিন্নতা। প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়ে প্লাস্টিক জাতীয় পণ্যই উৎপাদন হয়। তবে এক্ষেত্রেও রয়েছে বিভিন্নতা। একেক ধরণের প্লাস্টিক দিয়ে একেক ধরণের পণ্য উৎপাদন করা হয়। পৃথিবীতে প্লাস্টিক বর্জ্যরে রিসাইক্লিং পণ্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় আমেরিকায়। ২০১৪ সালের হিসেব অনুযায়ী দেশটিতে ৮৯ টন বর্জ্য রিসাইক্লিং করা হয় যা বিশ্বে র সকল বর্জ্যরে প্রায় ৩৫ শতাংশ। প্লাস্টিকের বোতল থেকে আমেরিকায় টি-শার্ট, সুয়েটার, জ্যাকেট ইত্যাদিও তৈরি করা হয়। একটি টি-শার্ট তৈরিতে ১০টি ও সোয়েটারের জন্য ৬৩টি খালি বোতল প্রয়োজন হয়। এছাড়াও বাসা বাড়িতে নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য যেমন, পাপোস, কার্পেট, শতরঞ্জি ইত্যাদি তৈরি করা হয় প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে। কেমিকেল রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে শপিংমলের বড় বড় কন্টেইনার, পার্কের বেঞ্চি ইত্যাদি প্রস্তুত করা হয়।
আগামী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে আমাদের এখনই সচেতন হওয়া দরকার। এছাড়াও পরিবেশবান্ধব বাসযোগ্য পৃথিবীর জন্য বর্জ্য রিসাইক্লিংয়ের আর কোন বিকল্প নেই। কার্বন নি:সরণ নিয়ে বিশ্বে যখন তোলপাড় ঠিক এ সময় বর্জ্যরে পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া ল্যান্ডফিলে বর্জ্য পরিহার করতে হলে বর্জ্য রিসাইক্লিং করতেই হবে। বর্জ্যরে ল্যান্ডফিলের ফলে সেখানে নির্মিত স্থাপনা সবসময় বাসিন্দাদের মৃত্যুঝুঁকির কারণ হয়ে থাকবে। এছাড়াও বর্জ্য থেকে নির্গত গ্যাস প্রতিনিয়তই পরিবেশকে দূষিত করছে। সর্বোপরি বর্জ্য রিসাইক্লিং এখন সময়ের দাবি।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১৪১তম সংখ্যা, মে ২০২২