রমনা উদ্যান!
কীভাবে আজকের এই অবস্থায়!!

রাজধানীতে বুকভরে যদি নিশ্বাস নেওয়ার কথা বলা হয়, তাহলে চট করেই যেই জায়গাটির নাম সবার আগে মনে আসবে, তা হলো রমনা পার্ক, সোহ্্রাওয়ার্দী উদ্যান আর হাতিরঝিল লেক এলাকা। এর মধ্যে হাতিরঝিল লেকটি সম্প্রতি উন্নয়নকৃত আর রমনা উদ্যান বহু আগের। রমনার রূপ ও সৌন্দর্য সময়ের ব্যবধানে একেকজনের কাছে একেক রকমভাবে ধরা দিয়েছে। কারও কাছে দুই-তিন শ বছর আগেকার, অনেকের কাছে সত্তর-আশি বছর আগের রমনা ছিল মোহনীয়, আবার কারও কাছে ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগেকার ইট-পাথরে ঘেরা নির্মল এক বায়ু শোধনাগার হিসেবেও ধরা দিয়েছে এই এলাকাটি। একসময় গুলিস্তানের উত্তর-পশ্চিম প্রান্ত থেকে সমুদয় জায়গাজুড়ে ওসমানী উদ্যান, সচিবালয়, কার্জন হল প্রাঙ্গণ, হাইকোর্ট এলাকা, রমনা পার্ক, রমনা পার্ক থেকে মিন্টো রোড, রেসকোর্স-শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পুরো নীলক্ষেত এলাকা, কার্জন হল থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ-বুয়েট এবং উত্তরে ইস্কাটন এলাকা পর্যন্ত পুরো এলাকাকেই ‘রমনা উদ্যান’ হিসেবে বোঝানো হতো

মুঘল আমলের শুরু থেকে (সেই ১৬১০ সাল থেকে) রমনা ঢাকা মহানগরীর বিশেষ এলাকা হিসেবে পরিচিতি পেয়ে আসছে। ঢাকার             প্রতিষ্ঠাতা সুবাদার ইসলাম খাঁ চিশতির বংশের কিছু কিছু পরিবার সেই আমলে এই এলাকায় বসবাস করতেন। অর্থাৎ রমনার প্রতিষ্ঠা ও নামকরণ করা হয়েছিল সেই মুঘল আমলেই। তখন রমনার আশপাশে দুটি পরিকল্পিত আবাসিক এলাকাও গড়ে উঠেছিল বলে প্রকাশ। বস্তুতপক্ষে সেই সময়ে পুরান ঢাকার ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান থেকে উত্তর-পশ্চিমে নীলক্ষেত-পলাশী-আজিমপুর আর উত্তরে শাহবাগ-ইস্কাটন- তেজগাঁও পর্যন্ত মুঘলরা তৈরি করেছিল একটি বৃহদাকার বাগান হিসেবে, যার নাম ছিল ‘বাগ-ই-বাদশাহী’ বা ‘বাদশাহী বাগান’। ইসলাম খাঁর ছেলে মুসার নামে ‘মুসাবাগ’ নামেও আরেকটি বাগান প্রতিষ্ঠার কথা শোনা যায়। তেজগাঁওয়ের পশ্চিমেও ছিল বিশাল খামার এলাকা (Farm Area). ধানমন্ডির বিশাল খোলা জায়গায় মুঘল শাসকেরা করেছিলেন সাতগম্বুজ মসজিদটি। যুগে যুগে এসব স্থাপনা ও সবুজখেত-বাগানের আশপাশে গড়ে ওঠে বিভিন্ন ধরনের আরও অনেক স্থাপনা ও মহল্লা।

রমনা উদ্যানের মাঝখানের জায়গাটি জুড়ে ছিল বন আর সবুজ ঘাসে ঢাকা ‘ঢাকা চত্বর’ হিসেবে, যা পরে তৈরি হয়েছিল রমনা পার্ক ও রেসকোর্স ময়দান হিসেবে। তখন এই রমনা এলাকার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল দু-তিনটি খালও, যার মধ্যে রমনা পার্কের ভেতর এখন মাত্র একটি খালের অংশবিশেষ লেক হিসেবে বিদ্যমান। প্রকাশ, এসব খাল তথা ক্যানেলে তৎকালীন ঢাকার অভিজাত নাগরিকগণ বিশেষ করে নবাব পরিবারের সদস্য এবং পরবর্তী সময়ে ইংরেজরা বিকেলে বিশেষ নৌ-বিহারে বেরিয়ে পড়তেন।

মুঘল আমলে তৎকালীন রমনা প্রাঙ্গণের দক্ষিণ প্রান্তে প্রতিষ্ঠা করা হয় মসজিদ ও মুঘলশাসিত পরিবারিক কবরস্থান বা মাজারের। ১৬৭৯ সালে সুবাদার মুহাম্মদ আজমের আমলে রমনার দক্ষিণে মাজারের পাশেই নির্মিত হয়েছিল হাজি শাহবাজের মসজিদ, পরবর্তী সময়ে যা হাইকোর্ট মাজার মসজিদ নামে পরিচিতি লাভ করে। অতঃপর এর পশ্চিম দিকেও তৎকালীন কিছু বুজুর্গকে কবরস্থ করা হয়। আবার এই জায়গায় সতেরো শতকের প্রথমভাগে রমনা কালীমন্দিরটিও নির্মিত হয়েছিল।

বস্তুতপক্ষে অবহেলা ও অযত্নে মুঘল আমলের শেষ দিকেই রমনার ক্ষয় শুরু হয়। নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ বাংলার সিংহাসনে আসীন হওয়ার পর ঢাকা থেকে রাজধানী ভারতের মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত করেন। অতঃপর ঢাকা রাজধানীর মর্যাদা হারানোর পর রমনা এলাকা বিরাণভূমিতে পরিণত হতে থাকে। ঢাকা শহরের বাগানগুলো অযত্নে-অবহেলায় তখন জঙ্গলে রূপ নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় পুরো রমনা এলাকাও হয়ে পড়েছিল জঙ্গলাকীর্ণ। মহামারি ও অভাবে পড়ে ঢাকার লোকসংখ্যাও কমে গিয়েছিল অনেক। আর এসব জঙ্গলের ভেতর ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল পুরোনো ঘরবাড়ি ও স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ। পর্যায়ক্রমে তখন থেকেই শহরের খালগুলোও ভরাট হতে থাকে একে একে।

ইংরেজ আমলে, ১৮২৫ সালে রমনা উদ্যানের পুনরুদ্ধারের কাজে হাত দিয়েছিলেন ঢাকার তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট চালর্স ড’স। তখন ঢাকা শহর উন্নয়নের জন্য স্থানীয় মহল্লার সর্দার-মুরুব্বিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। জঙ্গল পরিষ্কার করে রমনাকে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনার জন্য দরকার ছিল প্রচুর জনবলের। কিন্তু তখন অর্থ খরচ করে এত জনবল নিয়োগ করার মতো বাজেট ছিল না। তাই চালর্স ড’স সে সময় ঢাকা জেলখানার কয়েদিদের নিয়ে রমনার জঙ্গল পরিষ্কারের কাজে নেমে পড়েছিলেন। কালীমন্দির ব্যতীত সমগ্র এলাকাটি টানা তিন মাস ধরে পরিষ্কারের পর বের করা হয় ডিম্বাকৃতি একটি অংশ, যেই ডিম্বাকৃতি অংশটিকে তখন কাঠের রেলিং দিয়ে ঘিরে তৈরি করা হয়েছিল ঘোড়দৌড়ের জন্য রেসকোর্স, অতঃপর যা পরিচিতি লাভ করে রমনা রেসকোর্স হিসেবে।

আর এই অংশের পূর্ব দিকের অংশে গড়ে তোলা হয় ‘রমনা গ্রিন’, যা অতঃপর ‘রমনা পার্ক’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। মূল শহরের সঙ্গে রেসকোর্সকে যুক্ত করার জন্য ড’স রেসকোর্সের উত্তর-পশ্চিম দিকে তৈরি করেছিলেন একটি রাস্তা, যা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ থেকে বাংলা একাডেমি হয়ে দোয়েল চত্বর হয়ে দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম দিকে দিকে চলে গেছে। এই রাস্তার দুই ধারে লাগিয়েছিলেন দুষ্প্রাপ্য মিমোসা বা ক্যাসুরিনা গাছ, যার বেশির ভাগ সংগ্রহ করা হয়েছিল নেপাল থেকে।

এই রাস্তার প্রবেশমুখে তৈরি করা হয়েছিল দুটি স্তম্ভ, যাকে আমরা অনেকেই ‘মীর জুমলা’ ফটক নামে জানি। অনেকে এটাকে ‘নতুন ঢাকা’র প্রবেশদ্বার হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য মীর জুমলার সময়ে তৈরি হয়েছিল বলে ধারণা করেন! কিন্তু পরে তা ভুল প্রমাণিত হয়। এই গেটের স্তম্ভ দুটো লক্ষ করলে দেখা যায়, এগুলো ইউরোপীয় ও মুঘল স্থাপত্য নকশার সংমিশ্রণে তৈরি। কারণ, মুঘল আমলে ইউরোপীয় নকশা এ দেশে আমদানির কোনো সুযোগই ছিল না। তাতেই প্রমাণিত হয়, এই গেটটি ইংরেজ আমলেই তৈরি। রমনা উদ্যানের ঠিক উত্তরে ইংরেজরা একটি ক্লাব গড়ে তোলেন, যা ‘ঢাকা ক্লাব’ হিসেবে গড়ে ওঠে। এভাবেই তখন রমনা প্রাঙ্গণটি হয়ে ওঠে ইউরোপীয় ধাঁচের ‘’City Garden’ হিসেবে।

১৮৪৪-৪৫ সালে ঢাকার নবাব আব্দুল গণি রমনার বিস্তীর্ণ এলাকা অর্থাৎ ফুলবাড়িয়া রেললাইনের উত্তর-পশ্চিম দিকের সমুদয় জায়গা যেমন সচিবালয়-কার্জন হল এলাকাসহ বাংলা একাডেমি থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, শাহবাগ, পরীবাগ ও ইস্কাটনের অংশবিশেষ পর্যন্ত কিনে নিয়েছিলেন। এসব এলাকা ক্রয় করার পর নবাব আব্দুল গণি শাহবাগ এলাকায় তাঁর বাগানবাড়ি নির্মাণ করেন, যেখানে পরবর্তী সময়ে ‘শাহবাগ হোটেল’ অতঃপর ‘পি জি হাসপাতাল’ (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাসপাতাল) প্রতিষ্ঠা করা হয়।

পরবর্তী সময়ে নবাব আহসানউল্লাহর আমলে (১৮৫১ সাল থেকে) সমগ্র রমনা এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়। তিনি রমনার মধ্যে একটি চিড়িয়াখানাও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই চিড়িয়াখানায় তখন রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ভাল্লুক, হাতিসহ প্রচুর চিত্রাহরিণ সংরক্ষণ করা হতো। অর্থাৎ তখন রমনা প্রাঙ্গণ আবার হয়ে উঠেছিল একটি পরিচ্ছন্ন এলাকা হিসেবে অর্থাৎ ‘Royal Garden’ হিসেবে। পাকিস্তান আমলে এই চিড়িয়াখানার জীব-জন্তুগুলোকে মিরপুর চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠাত্তোর সেখানে অপসারণ করা হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর সত্যিকারভাবে আবার গড়ে উঠতে থাকে পুরো রমনা এলাকা। ওই সময়েই সরকার রমনার দক্ষিণ-পূর্বের অনেকটা অংশ নিয়ে নিয়েছিল তৎকালীন আসাম ও পূর্ব বাংলা মিলিয়ে গঠিত পূর্ববঙ্গের নতুন রাজধানীর সদর দপ্তর নির্মাণের জন্য। যেখানে গড়ে ওঠে লাট ভবন (পরে হাইকোর্ট কমপ্লেক্স), কার্জন হল (আগেকার ঢাকা কলেজ), সচিবালয় (পরে যেখান স্থাপিত হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ), সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসিক এলাকার জন্য মিন্টো রোড, হেয়ার রোড ইত্যাদি। আর পশ্চিম প্রান্তে নির্মাণ করা হয় পূর্ব বাংলার গভর্নরের বাসভবন (বর্ধমান হাউস), যা পরবর্তী সময়ে বাংলা একাডেমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বলা যায়, সেই থেকে সমগ্র রমনা এলাকাটি মোটামুটি কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। যথা, রমনা আবাসিক এলাকা, রমনা পার্ক, রমনা রেসকোর্স ও পশ্চিমে শিক্ষা প্রাঙ্গণ।

এর মধ্যে পূর্ব বাংলায় রাজধানী স্থাপন নিয়ে পশ্চিম বাংলার লোকজনের ষড়যন্ত্রে আকস্মিক (১৯১১ সাল) ‘বঙ্গভঙ্গ’ রদ হয়ে যায় এবং এতে ঢাকার বুদ্ধিজীবী ও প্রগতিশীল মানুষজন দারুণভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলে তখন সান্ত¦না ও ক্ষতিপূরণস্বরূপ ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তখন নবাব খাজা সলিমুল্লাহ বৃহত্তর রমনার পশ্চিম অংশে তাঁদের বিস্তীর্ণ পারিবারিক সম্পত্তি (৬০০ একর জমি) এই প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য দান করেন, যেখানে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে এর আঙিনায় স্থাপিত হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ইত্যাদি।

সার্বিকভাবে তখন নিসর্গ ঢাকা শহরের পরিকল্পনার কাজও শুরু হয়েছিল। বিশিষ্ট ব্রিটিশ নগর পরিকল্পনাবিদ স্যার প্যাট্রিক গেডেসকে দিয়ে (১৯১৭ সালে) তৈরি করা হয় একটি মহাপরিকল্পনা ও উন্নয়ন প্রতিবেদন। এই পরিকল্পনা বিশেষ করে রমনা উদ্যানের বাস্তবায়নের জন্য লন্ডনের কিউই গার্ডেনের অন্যতম কর্মী মি. আর এল প্রাউডলকে রমনা গার্ডেনের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ঢাকা শহরের ওই মহাপরিকল্পনার অন্যতম অংশ ছিল এই রমনা উদ্যান ও আশপাশের জায়গাগুলোর পরিকল্পিত ও পরিবেশগত উন্নয়ন সাধন, নগরীর সব খাল-বিল-ঝিল সংরক্ষণ ইত্যাদি। সেই অনুসারে তখন রমনা উদ্যানটিকে সাজানোর জন্য ব্যাপক কর্মসূচিও গ্রহণ করা হয়। পার্কের সবুজ প্রান্তরের চারদিকে রাস্তা করে রাস্তার ফুটপাত বরাবর লাগানো হয় কৃষ্ণচূড়াগাছের সারি।

উদ্যানটির পূর্ব পাশে নির্মাণ করা হয় বিচারপতি, সচিব থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ সরকারি অধিকর্তাদের আবাসস্থল। রমনা উদ্যানের ভেতর নানা প্রকার দেশি-বিদেশি ফুল, ফল, ঔষধি গাছ এবং হাঁটার জন্য চারদিকে ওয়াকওয়ে, শিশুদের বিনোদনব্যবস্থাসহ ছোট একটি গলফ কোর্সও নির্মাণ করা হয় যেখানে (পশ্চিম অংশে) আগে ছিল ব্রিটিশ সৈন্যদের Military Station বা জিমখানা। পরে যেই জিমখানা যথাক্রমে পিলখানা ও তেজগাঁওস্থ ক্যান্টনমেন্টে স্থানান্তরিত করা হয়। পাশাপাশি তখন রমনা পার্কের ভেতর দিয়ে প্রবহমান খালটিকে পুনর্গঠিত করে নৌকা ভ্রমণের জন্য বিদ্যমান লেকটি তৈরি করা হয় এবং লেকের প্রান্তে একটি রেস্টুরেন্টেরও ব্যবস্থা করা হয়।

এই প্রক্রিয়ায় একদা বিশাল রমনা উদ্যানের জমি পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে ব্যয় হয়ে কমতে কমতে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান-ভারত বিভক্তির পর ১৯৪৯ সালে মাত্র ৮৯ একর জায়গার ওপর আনুষ্ঠানিকভাবে রমনা পার্কটি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়। তখন থেকে সরকারের গণপূর্ত বিভাগকে পার্কটির উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এভাবে সার্বিক জায়গাটির উন্নয়নকালে বিভিন্ন ঘটনা পরিক্রমায় ভারত-পাকিস্তানের স্বাধীনতার পর ঢাকাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। তখন (১৯৫৯ সালে) ঢাকার পরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য প্রণীত হয় একটি নতুন মহাপরিকল্পনাও।

এই মহাপরিকল্পনায় রমনা এলাকাকে পূর্বের ধারাবাহিকতায় সংরক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য সুপারিশ করা হয়। ১৯৬০ সালে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথকে রমনা প্রাঙ্গণে (লেকের পাড়ে) সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। সেই সময় আশা করা হয়েছিল, পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়নে সচেষ্ট হবে। না, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে উন্নয়ন বৈষম্যের কারণে তখন ঢাকার উন্নয়নে তেমন বাজেট বরাদ্দ ছিল না। অতঃপর স্বাভাবিকভাবে তখন দেশে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয়। এর মধ্যে উদ্যানটির উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে কবরস্থ করা হয় তিন জাতীয় নেতা- যথাক্রমে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক (১৯৬২ সালে), হোসেন শহীদ সোহ্্রাওয়ার্দী (১৯৬৩ সালে) এবং খাজা নাজিম উদ্দিনকে (১৯৬৪)।

১৯৬৯-৭০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এখানে সভা-সমাবেশ করতেন এবং তিনি ১৯৬৯ সালে তাঁর জন্য আয়োজিত এক জনসভায় রমনা রেসকার্স ময়দানকে হোসেন শহীদ সোহ্্রাওয়ার্দীর নামে ‘সোহ্্রাওয়ার্দী উদ্যান’ হিসেবে ঘোষণা করেন। অতঃপর তিনি ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ এখানে তাঁর সেই ঐতিহাসিক ভাষণটি দেন। ২৫-২৬ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী এখান থেকে তাদের Operation Searchlight শুরু করে এবং স্বাধীনতাযুদ্ধকালে পাকিস্তানি সৈন্যরা রমনা প্রাঙ্গণে প্রচুর ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। তারা সেখানে বিদ্যমান কালীমন্দিরসহ আনন্দ আশ্রমটি গুঁড়িয়ে দেয় ও অনেক মানুষজনকে হত্যা করে। আবার স্বাধীনতার পর পাকিস্তানি বাহিনীর অস্ত্র সমর্পণও এই ঐতিহাসিক স্থানে হয়। অতঃপর ১৯৭২ সালে এখানে নির্মিত হয় ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর স্মরণে ‘ইন্দিরা মঞ্চ’ এবং তিনি ১৭ মার্চ এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেন।

এর মধ্যে আবার বিভিন্ন সময়ে এই উদ্যানের দক্ষিণ প্রান্তে (হাইকোর্টসংলগ্ন জায়গায়) প্রতিষ্ঠিত হয় ইঞ্জিনিয়ারর্স ইনস্টিটিউশন (IEB HQ), সড়ক ও জনপথ বিভাগের সদর দপ্তর ইত্যাদি। অন্যদিকে রমনা পার্কের দক্ষিণ-পূর্বে আরও বিতর্কিতভাবে স্থাপিত হয় তাবলিগ জামায়াতের সদর দপ্তর এবং কাকরাইল মসজিদটি। অনুরূপ ঢাকা ক্লাবের পূর্বে নির্মিত হয় টেনিস ফেডারেশনের অফিস ও টেনিস গ্রাউন্ড, আর ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সোহ্্রাওয়ার্দী উদ্যানের উত্তর-পশ্চিম কোনায় স্থাপিত হয় প্রথমে পুলিশ কন্ট্রোল রুম এবং পরবর্তী সময়ে সেখানে নির্মিত হয় শাহবাগ থানা কমপ্লেক্স। এভাবে রমনা উদ্যানের জায়গা কমতে কমতে ও সংকুচিত হয়ে বর্তমানে মাত্র ৬০-৬৫ একর জায়গা অবশিষ্ট আছে।

কিন্তু দুংখের বিষয় হলো, দেশের দলাদলির রাজনীতিতে আজ সোহ্্রাওয়ার্দী উদ্যানে সেই ইন্দিরা মঞ্চটি নেই বরং তদস্থলে সেখানে নির্মিত হয়েছে জাতীয় শিশু পার্ক। অতঃপর বিভিন্নভাবে দখল হয়ে ও অপ্রয়োজনীয় নানা স্থাপনা গড়ে তুলে ও নির্মাণ করে বর্তমানে রমনা-সোহ্্রাওয়ার্দী উদ্যানে মাত্র সামান্য কিছু সবুজ হিসেবে অবশিষ্ট আছে। তার মধ্যে ১৯৯৬ সাল থেকে সোহ্্রাওয়ার্দী উদ্যানের উল্লেখযোগ্য জায়গাজুড়ে ‘স্বাধীনতা স্তম্ভ’ নির্মাণ ও সেখানে বিদ্যমান শতবর্ষী অনেক গাছ কাটা নিয়ে এখনো আন্দোলন ও প্রতিরোধ চলমান। এর মধ্যে আবার সেখানে প্রতিষ্ঠিত ‘কালীমন্দির’ ও আশ্রমটি পুনরুজ্জীবিত হয়ে যায়। অপর দিকে সোহ্্রাওয়ার্দী উদ্যানের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশজুড়ে শুরু হয় ‘জাতীয় গ্রন্থমেলা’র আয়োজন, যাতে বর্তমানে এই উদ্যানটিতে সবুজের চেয়ে কংক্রিটের অংশই বেশি।

এর সঙ্গে আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইংরেজি ২০০০ সালে বাংলা নববর্ষ উদ্্যাপনকালে রমনা পার্ক অংশের পশ্চিম প্রান্তে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে ভয়াবহ বোমাবাজি হয়, যার পর থেকে সংগতকারণে রমনা উদ্যানটি সর্বস্তরের জনসাধারণের জন্য আতংকের জায়গায় পরিণত হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৯৭৫-৭৯ সালে বুয়েটে পড়াকালীন আমাদের তথা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেলের ছাত্রছাত্রীদের জন্য এই রমনা উদ্যানই ছিল নিরাপদ বৈকালিক ভ্রমণ ও অবসর কাঠানোর জন্য যথোপযুক্ত স্থান, যা আজ শুধু স্মৃতিতেই অবশিষ্ট রয়েছে।

সব মিলে রমনা-সোহ্্রাওয়ার্দী উদ্যানের এই পরিণতির জন্য কেউ কেউ এই জায়গাটির ওপর ‘আল্লাহর অভিশাপ’ রয়েছে বলে মনে করেন! প্রকাশ, মুঘলদের বিদায়ের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে ঢাকায় মহামারি, অভাব ও দুর্ভিক্ষে তখন যে গণমড়ক হয়, তাতে মারা যাওয়া মানুষগুলোকে উদ্যানটির দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকায় দাফন করা হয় (কারণ, তখন ঢাকায় পরিচিত কবরস্থান ছিল না), যেখানে নাকি অনেক ওলি-আম্বিয়াও ছিলেন!! ব্রিটিশ শাসনামলে পুনরায় এই উদ্যানটির সংস্কারের জন্য ওসব কবর-জঙ্গলসমূহ গণ-আকারে ধ্বংস/অপসারণের কারণে ওই জায়গায় নাকি সেই ওলি-আম্বিয়াদের আত্মার অভিশাপ বা ‘আল্লাহর অভিসম্পাত’ আছে বলে অনেকে মনে করেন!!

যাক, তথাপি আজও রমনা-সোহ্্রাওয়ার্দী উদ্যান ঢাকাবাসীর চিত্তবিনোদনের নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। বর্তমান যান্ত্রিকজীবনেও একদণ্ড নির্মল বায়ু সেবনের উপযুক্ত স্থান হচ্ছে এই জায়গাটি। এ জন্য ভোর না হতেই আশপাশের এলাকা থেকে বয়োবৃদ্ধসহ শিশু-কিশোররা প্রাতর্ভ্রমণের জন্য এখানে ছুটে আসেন। প্রসঙ্গত, দুনিয়ার সব বড় শহর-নগরে পার্ক, খেলার মাঠ, খোলা জায়গা, লেক-খাল-নদী ইত্যাদি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আলাদা কর্তৃপক্ষ (Authority) রয়েছে, এ জন্য সেসব দেশের এসব বিষয় সুন্দর ও পরিচ্ছন্নভাবে রক্ষণাবেক্ষণ হয় বা হচ্ছে। কাজেই আমাদেরও উচিত অবিলম্বে এ ধরনের একটি যথাযথ কর্তৃপক্ষ গঠন করে ঢাকা তথা দেশের সব পার্ক, খেলার মাঠ, লেক-খাল ইত্যাদির রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১৩২তম সংখ্যা, আগস্ট ২০২১।

প্রকৌশলী মো. এমদাদুল ইসলাম
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top