সারা বিশ্ব যখন করোনায় বিপর্যস্ত তখন ‘ইকোসিস্টেম রেস্টোরেশন’ এই স্লেøাগানকে সামনে রেখে ৫ জুন ২০২১ বিশ্বজুড়ে পালিত হলো বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এবারের আয়োজক দেশ ছিল পাকিস্তান। যদিও করোনা মানবজাতির ওপর নেমে এসেছে অভিশাপ হয়ে, তবুও পরিবেশবাদীরা এটাকে প্রকৃতির জন্য আশীর্বাদ বলেই ভাবছেন। কারণ, এ সময়ে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই চলছে লকডাউন। ফলে গাড়ি ও কলকারখানা অনেক কম চালু ছিল বিধায় পরিবেশদূষণের অন্যতম উপাদান কার্বন নির্গমনও হচ্ছে কম। এক-দেড় বছরের কার্বন নির্গমন প্রকৃতিকে হয়তোবা কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে, কিন্তু বিগত বছরগুলোতে মানুষ পরিবেশের যে ক্ষতি করেছে তা কি পূরণ করা সম্ভব? অবশ্যই না! এর সত্যতা মেলে ৫ জুনের ভারতীয় পত্রিকার পাতায়। এই দিনে ‘দি ট্রিবিউন’, ‘মুসলিম মিরর’ বা ‘ইন্দো-এশিয়ান নিউজ সার্ভিস’সহ আরও কয়েকটি পত্রিকার হেডলাইন ছিল ’‘Has Taj Mahal Become safe from environmental pollutoin’ অর্থাৎ তাজমহল কি পরিবেশদূষণের হাত থেকে নিরাপদ? এই রিপোর্টের ভাষ্যমতে, এটা মোটেই নিরাপদ নয়। দেখা যাক কী ছিল এই রিপোর্টসমূহে!
রিপোর্ট মতে, আমরা এমন একটি সময় বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করছি, যখন গোটা বিশ্ব করোনা (COVID-19) মহামারিতে বিপর্যস্ত, এ অবস্থায় প্রতিমাতুল্য তাজমহল দূষণ থেকে নিরাপদ কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আগ্রার সবুজযোদ্ধারা। ১৯৯৩ সালের পর থেকে তাজমহল ও এর চারপাশের এলাকা যা ‘তাজ ট্রাপিজিয়াম জোন’ নামে পরিচিত, তাকে দূষণের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য দেশটির সুপ্রিম কোর্ট বিভিন্ন সময় হস্তক্ষেপ করেন। একাধারে বেশ কিছু আদেশ ও নিষেধাজ্ঞা জারির মাধ্যমে তাঁদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। সেই সঙ্গে ইউনিয়ন ও রাজ্য সরকার এ এলাকার বায়ুদূষণ রোধ করার বা কমিয়ে আনার জন্য কোটি কোটি রুপির প্রকল্প গ্রহণ করে।
যদিও পরিবেশবাদীদের বক্তব্য হচ্ছে, এসব উদ্যোগের ইতিবাচক ফলাফল কোনো না কোনো সময় অবশ্যই তারা দেখতে পাবে। কিন্তু কঠিন বাস্তবতা হচ্ছে, তাজমহল বা পাশর্^বর্তী ১০ হাজার বর্গকিলোমিটারের মধ্যে বায়ুদূষণের মাত্রা এখন পর্যন্ত না ন্যূনতম পরিমাণে কমেছে, না সাধারণ জীবনমানের কোনো উন্নয়ন হয়েছে। অথচ এই এলাকাটির পরিবেশ অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচ্য। তাজমহলের চতুর্দিকের বাতাসে ভারী বস্তুকণা (Suspended Particulate matter-SPM) প্রতিবছর বিপজ্জনক হারে বাড়ছে। একই সঙ্গে যমুনার পানিদূষণ ও পানি কমে যাওয়া তাজমহলসহ যমুনাপারের অন্যান্য মোগল স্থাপনার জন্য আরেকটি হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে।
‘ভারতের পর্যটন দেবী, জাগতিক ভালোবাসার প্রতীক, সতেরো শতাব্দীতে শে^^ত মর্মরে তৈরি সমাধিমন্দির তাজমহল আজ প্রকৃতি ও এর মানবসন্তান দ্বারা সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। আজ যদি এই স্মৃতি স্থাপনা পর্যটকদের কাছে রুগ্্ণ ও বিবর্ণ দেখায়, তবে তার কারণ হবে শুকনো ও চরম দূষিত যমুনা নদী, যা একসময় তাজমহল কমপ্লেক্সের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।’ বললেন রিভার কানেক্ট ক্যাম্পেইন’-এর বিশিষ্ট পরিবেশবিদ দেবাশিস ভট্টাচার্য। ভট্টাচার্য আরও বলেন, ‘গ্রীষ্মকালে যখন প্রচণ্ড দাবদাহ চলে তখন প্রতিবেশী রাজস্থানের মরুভূমি থেকে উড়ে আসা হলুদাভ বালিকণা পুরো তাজমহলকে ঢেকে ফেলে। এ অবস্থা দেখে যেকোনো সাধারণ দর্শকও সহজেই বলতে পারে গ্রীষ্মের উত্তাপ তাজমহল থেকে যেন তার মাশুল আদায় করছে। নিরন্তর ভালোবাসার সমাধিমন্দির ধ্বংস হচ্ছে মরা যমুনার বালি আর রাজস্থানের মরুভূমি থেকে উড়ে আসা ধূলিকণার আঘাতে।’
আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, আরাবল্লি অঞ্চলের অবৈধ ভূগর্ভস্থ খনন কার্যক্রম আগ্রার বাতাসে ভারী বস্তুকণা বা এসপিএম বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য বিশেষ ভূমিকা রাখছে। যেখানে এক ঘন মিটারে সর্বোচ্চ ১০০ মাইক্রোন ভারী বস্তু কণা বা এসপিএম গ্রহণযোগ্য, সেখানে এই এলাকায় ৩০০ মাইক্রোন পর্যন্ত ভারী বস্তু কণা বা এসপিএম সব সময় পাওয়া যায়। আর গ্রীষ্মকালে এটি ৫০০ মাইক্রোন পর্যন্ত পৌঁছায়। ফলে সমস্যা হচ্ছে, বাতাসে ভাসমান এসব ভারী বস্তুকণা বায়ুপ্রবাহের সময় তাজমহলের মসৃণ মার্বেলের ওপর দিয়ে বয়ে গেলে ঘর্ষণের ফলে সাদা মার্বেলে দাগ তৈরি হয়ে এর মসৃণতা কমে। ফলে এর যে সৌন্দর্য তা নষ্ট হতে থাকে।
তাজ ট্রাপিজিয়াম জোনের মধ্যে পরিবেশগত দিক থেকে অন্যতম বড় বিপত্তি হচ্ছে অবিরামভাবে বেড়ে চলা মোটরযানের সংখ্যা। গত তিন দশকে এই অঞ্চলে মোটরযানের সংখ্যা হাজার পেরিয়ে লাখে পৌঁছেছে। তবে আশার কথা হচ্ছে, শহর এলাকায় এসব যানবাহনের অধিকাংশই ডিজেল বা পেট্রলের পরিবর্তে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস বা সিএনজি ব্যবহার করে। ১৯৯৬ সাল হতে দেশের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এই জোনের মধ্যে সব কয়লাচালিত শিল্পকারখানা নিষিদ্ধ করা হয়। তবে যেসব কারখানায় গ্যাস বা সিএনজি ব্যবহার করা হয়, সেসব কারখানাকে এই নির্দেশনার বাইরে রাখা হয়েছে।
১৯৮৫ সালে আগ্রায় যানবাহনের সংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ হাজারের মতো। এ সময় ফিরোজাবাদও আগ্রা জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু এখন তা ১০ লাখের ওপরে। যমুনা এক্সপ্রেসওয়ে ও আগ্রা-লক্ষ্নৌ এক্সপ্রেসওয়ে চালু হওয়ার পর এই অঞ্চলে হালকা ও মাঝারি যান চলাচলের মাত্রা বেড়েছে বহুগুণে। একই সঙ্গে দিল্লি-কলকাতা ও দিল্লি-মুম্বাই জাতীয় মহাসড়ক আগ্রার ওপর দিয়ে যাওয়ার ফলে ভারী যান চলাচলের মাত্রাও বেড়েছে বিস্ময়করভাবে।
যদিও বর্তমানে কোভিড-১৯-এর কারণে তাজমহল এখন একটু অবকাশ পেয়েছে অনেকটা স্বস্তির নিশ্বাস নিতে, কিন্তু যখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকে তখন দর্শকের আনাগোনায় শে^তপাথরের এই সমাধি যে ধকল পোহায় তা অস্বাভাবিক। মাত্র কয়েক দশক আগে যখন দর্শনার্থীর সংখ্যা প্রতিদিন ছিল মাত্র কয়েক শ, বর্তমানে এ সংখ্যা পৌঁছায় হাজারের ঘরে। বলে রাখা ভালো, এই সংখ্যার হিসাব ১৫ বছরের নিচের দর্শনার্থীরা ছাড়াই। কারণ, ১৫ বছরের নিচের দর্শনার্থীদের এখানে প্রবেশের জন্য টিকিট কাটতে হয় না।
আবার বছরের পাঁচটি বিশেষ দিন এই স্থাপনা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। এই পাঁচ দিন অন্তত লাখখানেক দেশি-বিদেশি পর্যটক-দর্শনার্থী এখানে উপস্থিত হয়। যেসব দর্শনার্থী প্রথমবারের মতো তাজমহল দেখতে আসেন, গাইডদের কাছে তাঁদের প্রায় সবারই একটা সাধারণ প্রশ্ন থাকে, ‘এটা কি হলুদ হয়ে যাচ্ছে?’ এর উত্তরে গাইডরা জানান, এটা অনেকটা প্রাকৃতিক কারণ। হয়তো এর বয়স হচ্ছে তাই। কিন্তু এর মূল কারণ শিল্পকারখানার দূষণ নিয়ে এসব সাধারণ গাইডদের কিছু করার নেই। যদিও আগ্রা এলাকায় সুপ্রিম কোর্ট দূষণকারী শিল্পকারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন, এরপরও ক্ষতি যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে।
তাজমহল যার অন্য আরেকটি নাম হচ্ছে ‘বাগ-ই-বাসিত’ বা স্বর্গীয় উদ্যান। দূষণের দাগ মুছে ফেলে এই স্বর্গীয় উদ্যানের উজ্জ্বল শুভ্রতাকে ধরে রাখার জন্য কিছুদিন পরপর আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া ‘ফুলার্স আর্থ বা মুলতানি মাটি’ ব্যবহার করে। এ ছাড়া প্রতি শুক্রবার সাবান-পানি দিয়ে একে ধোয়া হয়। সপ্তাহের এই দিনটিতেই তাজমহল একটু স্বস্তিতে দিন পার করে।
যখন হাজার হাজার দর্শক এই স্থাপনা দেখে আত্মতৃপ্তি অনুভব করে, তখন তারা এখানে তাদের হাত-পায়ের ছাপ রেখে যায়। একই সঙ্গে তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে রেখে যায় ক্ষতিকর গ্যাস। আপাতদৃষ্টিতে এটা তেমন কিছু ক্ষতিকর মনে না হলেও তাজমহলের মতো স্পর্শকাতর স্থাপনার ওপর এর প্রভাব খুব ক্ষতিকর। এত বিশাল অঙ্কের দর্শনার্থীর মধ্যে মাত্র হাতে গোনা কিছু পর্যটক রয়েছেন, যাঁরা এই ঐতিহাসিক স্থাপনার তাৎপর্য বুঝতে পারেন এবং এর ঐতিহ্যকে যথাযথ মূল্যায়ন করেন। এ ছাড়া বাকি যেসব দর্শনার্থী এখানে আসেন, তাঁরা তাজমহলের পবিত্রতা, ঐতিহ্য বা ঐতিহাসিক গুরুত্বকে নেহাতই উপেক্ষা করেন বলে জানান ব্রজ মণ্ডল হেরিটেজ সোসাইটির প্রেসিডেন্ট সুরেন্দ্র শর্মা।
আগ্রার পর্যটনশিল্পের নেতৃস্থানীয় একজনের ভাষ্য, ‘এই সমাধিমন্দির যখন নির্মাণ করা হয় তখন হিসাব করা হয় যেন প্রতিদিন ৫০ বা ১০০ জন দর্শক এখানে আসতে পারেন। কিন্তু এখন দর্শকের শেষ নেই। এদিকে পর্যটন বিভাগ ও আগ্রা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ পর্যটনশিল্পকে উৎসাহিত করার ফলে প্রতিনিয়ত এখানে পর্যটকের সংখ্যা উত্তরোত্তর বাড়তেই আছে।’
যখন মানুষের চাপে তাজমহল বিপর্যস্ত এবং কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে এ বিপর্যয় ঠেকানোর জন্য, তখন এখানে শুরু হয়েছে নতুন এক উপদ্রব। এদের কারণে কর্তৃপক্ষের নেওয়া সব উদ্যোগ প্রায় মাঠে মারা যাচ্ছে। এখানকার গাইড ও ফটোগ্রাফারদের মতে, তাজমহলের পেছনে যমুনার চর ও পতিত জমি এখন মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। কারণ যমুনায় এখন আর আগের মতো যথেষ্ট পরিমাণে পানি প্রবাহ নেই। ‘এখানে এখন উটের পাল নিয়ে আসা হয়েছে। একসময় হয়তো যমুনার বুকে অতি উৎসাহী হোটেল ব্যবসায়ীরা ‘ডেজার্ট সাফারি’-এর আয়োজন করবে।’ বলে মন্তব্য করেন ট্যুরিস্ট গাইড বেদ গৌতম।
যদিও আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া তাজমহলের পেছনে অবস্থিত ‘মেহতাববাগ’ পুনরুদ্ধার করেছে এবং যমুনার পানির প্রবাহ ও নাব্যতা ঠিক রাখার জন্য নদীর ধারে রাজ্য বন বিভাগ নিবিড় সবুজ বনায়ন প্রকল্প সম্পন্ন করেছে। ‘কিন্তু যদি যমুনায় যথেষ্ট পরিষ্কার পানি প্রবাহিত না হয় এবং তাজমহলের ভিত্তিকে না ছুঁয়ে যায়, তাহলে এর শক অ্যাবজরবিং বাফার (Shock-Absorbing Buffer) ঠিকমতো কাজ করবে না। যে কারণে ভূমিকম্পের ফলে এটা কাত হয়ে হয়ে যেতে পারে, দেবে যেতে পারে, এমনকি এটা ধ্বংস হয়েও যেতে পারে’ বলে শঙ্কিত সংরক্ষণবাদীরা।
ভারতের কোভিড-১৯-এর ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট সারা বিশ্বে যখন আতঙ্ক ছড়াচ্ছে, তখন তাজমহলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার সময় কোথায়? কিন্তু আতঙ্কিত না হই, একটু ভাবার মতো অবকাশ আমাদের সবারই রয়েছে, কারণ তাজমহল আজ যে হুমকির মধ্যে এ যে শুধু আমাদেরই কর্মফল।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১৩১তম সংখ্যা, জুলাই ২০২১।