ধৈর্য্যশীলতায় সফলতা

তখন সবেমাত্র মাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়েছেন। কিশোর বয়স। এই সময়েই বাবা পাড়ি দেন না-ফেরার দেশে। সংসারের বড় সন্তান বিধায় সংসারের দায়ভার পড়ে তাঁরই কাঁধে। কীভাবে সংসার চালাবেন তা ছিল অনিশ্চিত। কিন্তু কিছু তো একটা করতে হবে! সিদ্ধান্ত নেন ব্যবসা করার। কিন্তু মূলধন কোথায়! বাবাও ছিলেন ব্যবসায়ী। কিন্তু দীর্ঘদিন রোগে ভুগে পরিবারটি প্রায় নিঃস্ব। অনেক কষ্টে বাড়ি থেকে কিছু টাকা জোগাড় করেন। নকলা বাজারে একটি দোকান নিয়ে সীমিত পরিসরে শুরু করেন টিনের ব্যবসা। শুরু তো করলেন কিন্তু বেচাবিক্রির কোনো বালাই নেই। বাজারে অপরিচিত বলে কোনো ক্রেতা তাঁর দোকানে আসত না; এমনকি কেউ পণ্যের দামও জিজ্ঞেস করত না! যাওয়া-আসার খরচটাও নিতে হতো বাড়ি থেকেই। এ পরিস্থিতি চলে টানা ছয় মাস। এমতাবস্থায় হতাশায় পড়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি মোটেও হতাশ হননি; বিশ্বাস ছিল এখন না হোক এক বছর পরে হলেও ক্রেতারা আসবে; বিক্রি হবে। সেই আশায় সবার আগে দোকান খুলতেন, বন্ধও করতেন সবার পরে। তাঁর সেই বিশ্বাস ও ধৈর্য্য বিফলে যায়নি। আজ তিনি স্থানীয়ভাবে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। সফল এ জনের নাম মো. হাসান আলী। কাচারি পুকুরপাড়, নকলা, শেরপুরের ‘মেসার্স আবির এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী। বন্ধন-এর নিয়মিত আয়োজন ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বের এবারের সফল ব্যবসায়ী তিনি। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা মো. জাহিদুল ইসলামের সহযোগিতায় জানাব তাঁরই সফলতার গল্প।

ব্যবসায়ী মো. হাসান আলী ১৯৭৯ সালের ১৭ মে শেরপুরে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মরহুম রুস্তম আলী ও মা মরহুমা হালিমা বেগম। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার বড়। তিনি ১৯৯৭ সালে সাপমারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৯৯ সালে শেরপুর সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ২০০০ সালে ঢেউটিন ব্যবসার মাধ্যমে শুরু করেন নির্মাণপণ্য ব্যবসা। পরে ব্যবসায় যোগ করেন রড ও সিমেন্ট। বর্তমানে তিনি আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের শেরপুর টেরিটরির একজন সম্মানিত এক্সক্লুসিভ ডিলার। 

ব্যবসায়ী হাসান আলী অন্যান্য পণ্যের পাশাপাশি খুচরা পর্যায়ে আকিজ সিমেন্ট বিক্রি করতেন। পণ্যটি বিক্রি করে বেশ লাভ হতে থাকে তাঁর। আকিজ সিমেন্টের সুনাম থাকায় ও পণ্যটি বিক্রি লাভজনক বিধায় ২০১৯ সালে নেন  সিমেন্টটির ডিলারশিপ। পরিবেশকত্ব নেওয়ার পর বদলে যায় ব্যবসার ধরন। দ্রুততার সঙ্গে ঘটে ব্যবসার প্রসার ও বিক্রয় পরিধি। গুণগতমানের এ পণ্যটিই তাঁকে এনে দেয় অভাবনীয় ব্যবসায়িক সাফল্য। অভূতপূর্ব সাফল্যে তিনি আকিজ সিমেন্টসহ বিভিন্ন কোম্পানির পক্ষ থেকে পেয়েছেন ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, টেলিভিশন, স্বর্ণালংকারসহ নগদ টাকা। এ ছাড়া প্রতিবছর কোম্পানির দেওয়া নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করায় পেয়েছেন মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, নেপাল, ভারতসহ নানা দেশ ভ্রমণের অফার।

সফল এ ব্যবসায়ী স্থানীয় বাজারে সবচেয়ে বেশি সিমেন্ট ও আনুষঙ্গিক নির্মাণপণ্য বিক্রি করেন। ন্যায্যমূল্যে গুণগত মানের পণ্য পাওয়ায় দূর-দূরান্তের ক্রেতারা ভিড় করেন তাঁর দোকানে। তিনিও চেষ্টা করেন সততার সঙ্গে ব্যবসা করতে, রড বিক্রির ক্ষেত্রে সঠিক ওজন দেওয়ার। খুচরা পর্যায়ে ব্যবসাকালীন দোকানে বেশি সময় দিলেও ডিলারশিপ ব্যবসা শুরুর পর বেড়েছে তাঁর সামগ্রিক ব্যস্ততা। বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী ও বাড়ি নির্মাতাদের কাছে যেতে হয়। পণ্য বিক্রিতে দোকানিদের উৎসাহ দিতে হয়। বর্তমানে তাঁর প্রায় ২০টির মতো খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রিক ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ হার আরও বাড়ানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। নির্মাণপণ্য ব্যবসার মুনাফা দিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন গরু ও মৎস্য খামার। সকালে ও রাতে সময় দেন নিজস্ব খামার উন্নয়নে। 

ব্যবসায়ী হাসান আলী বিয়ে করেন ২০০৩ সালে। তাঁর স্ত্রী মিসেস রুবিয়া খাতুন। এ দম্পতির দুই ছেলে এক মেয়ে। বড় ছেলে মো. আবির হোসেন, শেরপুর সরকারি ভিক্টোরিয়া একাডেমির নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। মেজ মেয়ে জেরিন আক্তার, নবারুন পাবলিক স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে এবং ছোট ছেলে মো. সামিউল ইসলাম, বয়স দুই বছর। 

বর্তমানে সামগ্রিক ব্যবসা ওতপ্রোতভাবে দেখভাল করছেন ব্যবসায়ী হাসানের ছোট ভাই মো. কামাল হোসেন। বড় ভাইয়ের অবর্তমানে তিনিই ব্যবসা দেখভাল করেন। ব্যাংকের লেনদেন, সময়মতো পণ্য পৌঁছে দেওয়া এবং বিক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার কাজটি মূলত নিজেই করেন। মো. কামাল হোসেনের জন্ম ১৯৮৫ সালের ১৬ মে শেরপুরে। বিয়ে করেছেন ২০১২ সালে। স্ত্রী মোছা. রাবেয়া খাতুন। এ দম্পতির রয়েছে ৩ বছর বয়সী একমাত্র পুত্র সন্তান তাহসিন আহমেদ আলিফ। 

একনজরে

  • ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নাম: মেসার্স আবির এন্টারপ্রাইজ 
  • অবস্থান: কাচারি পুকুরপাড়, নকলা, শেরপুর
  • ব্যবসা শুরু: ২০০০ সালে
  • নির্মাণ পণ্য: সিমেন্ট, রড 

সাফল্যসূত্র

ন্যায্যমূল্যে গুণগত মানের পণ্য বিক্রি করায় দূর-দূরান্তের ক্রেতাদের ভিড় লেগেই থাকে তাঁর দোকানে। চেষ্টা করেন সততার সঙ্গে ব্যবসা করতে, সিমেন্ট-রড বিক্রির ক্ষেত্রে সঠিক ওজনে দিতে। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে যান এলাকাভেদে নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী ও বাড়ি নির্মাতাদের কাছে। পণ্য বিক্রিতে দোকানিদের উৎসাহিত করেন নিয়মিত বিরতিতে।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১২৩তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০২০

মাহফুজ ফারুক
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top