দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার পাশাপাশি মানুষের আবাসন সেবা নিশ্চিত করতে অনন্য ভূমিকা রাখছে আবাসনশিল্প তথা নির্মাণ খাত। এই শিল্পের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে শত শত সংযোগ শিল্প। বর্তমান করোনা-দুর্যোগে অন্যান্য সেক্টরের মতো স্থবিরতা নেমে আসে আবাসন খাতে। আবাসন ব্যবসায় নামে ভয়াবহ ধস! অচলাবস্থা বিরাজ করায় একদিকে যেমন ক্রেতারা সময়মতো বুঝে পাননি তাঁদের কাক্সিক্ষত ফ্ল্যাট, অন্যদিকে আবাসন ব্যবসায়ীরাও গ্রাহকের কাছ থেকে কিস্তির টাকাও পাননি সময়মতো। ফলে অনেকটাই অনিশ্চয়তায় পড়ে ব্যবসায়ী, ক্রেতাসহ এ সম্পর্কিত সব খাত ও পেশাজীবীরা। করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় বিশাল ধাক্কা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে আবাসন খাত। আবার শুরু হয়েছে নির্মাণযজ্ঞ। ফলে ফ্ল্যাট কেনার জন্য এখন ক্রেতাদের আগ্রহ লক্ষণীয়। ক্রেতারা ফ্ল্যাটের খোঁজখবর নিচ্ছেন; অনেকেই কিনছেন; নইলে বুকিং দিচ্ছেন। এতে ফ্ল্যাট বিক্রি বেড়েছে অনেক আবাসন প্রতিষ্ঠানের। স্বল্পপরিসরে হলেও নির্মাণকাজ শুরু হওয়ায় যেমন প্রাণ ফিরেছে এই খাতে, পাশাপাশি চাঙাভাব বিরাজ করছে সংযোগ শিল্পগুলোতেও। খাতসংশ্লিষ্ট স্থপতি, প্রকৌশলী, ঠিকাদার, নির্মাণশ্রমিক ও অন্য পেশাজীবীরাও ফিরছেন তাঁদের আয়ের পথে।
যে কারণে চাঙাভাব
করোনা মহামারির পর থেকে ফ্ল্যাটের কেনাবেচা নেমে আসে প্রায় শূন্যের কোঠায়। তবে বিগত কয়েক মাসে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বিক্রি অনেক কম হলেও এখন তা অনেকটাই বেড়েছে। বিক্রি শুরু হওয়ায় নতুন প্রকল্পও নিতে শুরু করেছে অনেক আবাসন প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে জমির মালিকেরাও নতুন চুক্তিতে আসতে শুরু করেছে। আবাসন খাতের এই চাঙাভাব করোনা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি বা লকডাউন উঠিয়ে নেওয়ায় বিষয়টি কিন্তু এমন নয়। বরং চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে বিনা প্রশ্নে কালোটাকা (অপ্রদর্শিত অর্থ) ফ্ল্যাট ও জমি ক্রয়ে বিনিয়োগের সুবিধা দেওয়ায় আবাসন খাতে হয়েছে শাপেবর। এখন থেকে ফ্ল্যাট ও জমি কিনলে আয়তনভেদে নির্দিষ্ট কর দিলেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কোনো প্রশ্ন করবে না। এ সুযোগ প্রদানের কারণেই মূলত এ খাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পূরণ হয়েছে আবাসন ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবিও। আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের ফলে কারোনাভাইরাসের কারণে বিপর্যস্ত এই খাতটি আবারও চাঙা হচ্ছে। এ ছাড়া ব্যাংকঋণে সুদের হার হ্রাস পাওয়ায় ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে এ খাতে।
অপ্রদর্শিত অর্থ দিয়ে ফ্ল্যাট ও জমি কিনলে স্থানভেদে আয়তনের ওপর নির্দিষ্ট কর নির্ধারণ করা হয়েছে। ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে গুলশান, বনানী, বারিধারা, মতিঝিল ও দিলকুশার বাণিজ্যিক এলাকায় প্রতি বর্গমিটারে ৪ থেকে ৬ হাজার টাকা এবং ধানমন্ডি, প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের হাউজিং সোসাইটি (ডিওএইচএস), মহাখালী, লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি, উত্তরা মডেল টাউন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, কারওয়ান বাজার, বিজয়নগর, নিকুঞ্জ, ওয়ারী, সেগুনবাগিচা এবং চট্টগ্রামের খুলশী, আগ্রাবাদ, নাসিরাবাদে প্রতি বর্গমিটারে ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা হারে কর দিতে হবে। এসব এলাকার বাইরে যেকোনো সিটি করপোরেশনে কর দিতে হবে প্রতি বর্গমিটারে ৭০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা।
প্রসঙ্গত, এত দিন শুধু ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রেই কালোটাকা সাদা করা যেত। এলাকাভিত্তিক এখন নির্দিষ্ট হারে কর দিয়ে জমি কেনায়ও এই সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এমনকি অপ্রদর্শিত অর্থে আগের কেনা সম্পদের বিপরীতেও নির্ধারিত হারে কর দিয়ে যেকোনো পরিমাণ টাকা সাদা করা যাবে। ঢাকার বাইরে যেকোনো সিটি করপোরেশন এলাকায় জমি কিনলে প্রতি বর্গমিটারে ৫ হাজার টাকা কর দিতে হবে। আর রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা, মতিঝিল ও দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় জমি কিনলে প্রতি বর্গমিটারে ২০ হাজার টাকা কর দিতে হবে। ধানমন্ডি, প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের হাউজিং সোসাইটি (ডিওএইচএস), মহাখালী, লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি, উত্তরা মডেল টাউন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, কাওরান বাজার, বিজয়নগর, নিকুঞ্জ, ওয়ারী ও সেগুনবাগিচা এবং চট্টগ্রামে খুলশী, আগ্রাবাদ, নাসিরাবাদে জমি কিনলে প্রতি বর্গমিটারে কর দিতে হবে ১৫ হাজার ৫০০ টাকা।
আবাসন ও সংযোগ খাতে করোনাকালীন যত ক্ষতি
দেশে বছরে চাহিদা ১ লাখ ২০ হাজার ফ্ল্যাটের। এ খাতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১৫-১৭ শতাংশ। কিন্তু হঠাৎ বজ্রপাতের মতো এ শিল্পের ওপর আঘাত হেনেছে করোনাভাইরাস। মহামারিতে আবাসন খাতের ৫৮ হাজার কোটি টাকার বাজার পড়ে অত্যন্ত ঝুঁকির মুখে। কেনাবেচা, নির্মাণকাজ, কিস্তি আদায় সবকিছুই স্থগিত হওয়ায় আবাসন ব্যবসায় নামে ভয়াবহ ধস। আবাসন খাতের সঙ্গে রড, সিমেন্ট, ইট, বালু, রং ও অন্য যেসব খাত জড়িত, সেগুলোও পড়ে সর্বোচ্চ ক্ষতির মুখে। শুধু স্টিল খাতেই করোনার প্রথম তিন মাসে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া সিমেন্ট খাতে গত মার্চ ও এপ্রিল মাসে খুচরা বাজারমূল্য অনুযায়ী ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া মজুত রয়েছে শত শত কোটি টাকার সিরামিক, লিফট ও অন্যান্য ইন্টেরিয়র-এক্সটেরিয়র সামগ্রী। যেখানে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার বিকিকিনি হতো, সেখানে এখন বিক্রি খুব সামান্যই। এ ছাড়া আবাসনশিল্পের বিভিন্ন খাতে প্রায় ৩৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। করোনার প্রভাবে লকডাউন পরিস্থিতির কারণে নির্মাণকাজ বন্ধ হলে অনেকেই হয়ে পড়ে কর্মহীন। পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে তাঁরা।
এভাবে যখন কোনো পণ্যের চাহিদার তুলনায় জোগান বেশি হয়, স্বাভাবিকভাবে বাজার ভারসাম্যের জন্য দাম কিছুটা কমে আসে। কোভিড-১৯ এর আগে রিয়েল এস্টেট বাজারের চাহিদার তুলনায় কিছুটা নির্মাণাধীন বা সম্পূর্ণ নির্মিত ফ্ল্যাটের জোগান ছিল বেশি, তবে ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যান্য খাত সচল থাকায় ভালোই বেচাকেনা চলছিল। কোভিড-১৯ এর কারণে ক্রেতার সংখ্যা হুট করে কমে যায়। কিন্তু বিক্রয়যোগ্য ফ্ল্যাট যথারীতি বাজারে অবস্থান করছে। যে কারণে ছোট ও মাঝারি অনেক ডেভেলপার কোম্পানি নগদ অর্থের সংকটে আছে, তাই অনেকে প্রতিষ্ঠানের আনুষঙ্গিক খরচ ওঠানোর জন্য বিনিয়োগের চেয়েও কম মূল্যে ফ্ল্যাট বিক্রির পরিকল্পনা করছে। ছোট এবং মাঝারি কোম্পানিগুলো এ রকম ব্যবস্থা নেওয়ায় বড় কোম্পানিগুলো অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য হচ্ছে কম মূল্যে বা অধিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাদের পণ্য বিক্রি করতে। বাজারে এই চাহিদার তুলনায় জোগান অনেক বেশি হওয়ায় ক্রেতাদের বিক্রেতার কাছ থেকে অধিক সুবিধা নেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।
করোনায় ক্ষতি ফ্ল্যাট ক্রেতাদের
করোনায় নির্মাণকাজ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় প্রকল্প সম্পাদন ও ফ্ল্যাট হস্তান্তরের সময়সীমা দেড় বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব (রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ)। এতে যেসব ক্রেতা করোনার আগে চলমান প্রকল্পের ফ্ল্যাট বুকিং দিয়েছিলেন, তাঁদের ফ্ল্যাট বুঝে পেতে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় লাগতে পারে। বর্তমানে রিহ্যাবের সদস্যসংখ্যা ১ হাজার ২০০। আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো বছরে গড়ে ১০-১২ হাজার ফ্ল্যাট ক্রেতাদের কাছে হস্তান্তর করে। তবে কিছু প্রতিষ্ঠান সময়মতো ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দেওয়ায় খাতটির প্রতি আস্থাও হারিয়েছেন অনেক ক্রেতা। এই করোনার ফলে সময়মতো ফ্ল্যাট বুঝে না পাওয়ায় যেমন আর্থিক ক্ষতির শিকার হবে ক্রেতারা, অন্যদিকে এ সময়ে যদি নির্মাণপণ্যের মূল্য বাড়ে, তবে সামগ্রিক মূল্য বেড়ে বাড়তে পারে ব্যয়ও। তখন ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
আবাসন খাতে উত্থান-পতনের নেপথ্যে
বাংলাদেশে আশির দশকে শুরু হয় আবাসন ব্যবসা, তবে তা ছিল খুবই সীমিত পরিসরে। ধীরে ধীরে এই ব্যবসার পরিসর বাড়লে নব্বইয়ের দশকে জন্ম হয় রিহ্যাবের। তবে ২০০০ সালের পর থেকে আবাসন খাতে প্রভূত উন্নয়ন ঘটে। কয়েক বছরের ব্যবধানে গড়ে ওঠে অসংখ্য আবাসন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান। জমে ওঠে আবাসন ব্যবসা। কিন্তু জায়গা, নির্মাণসামগ্রী, ব্যাংকঋণের সুদের হার ও মজুরি বেড়ে যাওয়ায় প্রায়ই এ খাতটির গতি কমে। ২০০৭ ও ২০০৮ সালে তত্ত¡াবধায়ক সরকারের আমলে বিনা প্রশ্নে কালোটাকা সাদা করার প্রথম সুযোগ আসে। তখন আবাসন খাতে প্রচুর বিনিয়োগ আসায় এই খাত চাঙা হয়।
২০১২ সাল থেকে খাতটিতে দেখা দেয় মন্দা। পরের কয়েক বছর টানা রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সেটি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। সে সময় ফ্ল্যাটের মূল্য কমিয়েও ক্রেতা খুঁজে পায়নি অনেক প্রতিষ্ঠান। কিস্তি দিতে না পারায় অনেক ফ্ল্যাটের ক্রেতা বুকিং পর্যন্ত বাতিল করেছেন। সেই অস্থির সময় পার করে ২০১৬ সালের দিকে পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হলেও সংকট কাটেনি। তবে ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে সরকারি কর্মচারীদের ৫ শতাংশ সুদে গৃহঋণ দেওয়ার ঘোষণা আসে। আবার গত বছর শুরু হয় নিবন্ধন ব্যয় কমানোর প্রক্রিয়াও। ফলে করোনার আগপর্যন্ত আবাসন ব্যবসা ইতিবাচক ধারায় ছিল। দীর্ঘদিন ক্ষতিগ্রস্ত থাকার পর ২০১৯ সাল থেকে কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে আবাসন শিল্প। ১৬-১৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধিও অর্জন করে। ফলে আবারও নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন এ শিল্পের উদ্যোক্তারা। কিন্তু সে স্বপ্নœ থামিয়ে দেয় করোনা। এভাবে নানা উত্থান-পতনের মাধ্যমে খাতটি এগিয়ে চললেও টেকসই ও জনবান্ধব খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আবাসন ব্যবসায়ীরা সমাজের বিত্তবান মানুষের আবাসন চাহিদাই কেবল পূরণ করতে পেরেছেন। যত দিন না এই আবাসনসুবিধা সমাজের মধ্যবিত্ত, নি¤œবিত্ত তথা সাধারণ মানুষের নাগালে আসবে, তত দিন পর্যন্ত এই ব্যবসা টেকসই ও স্বাভাবিক হবে না বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
আবাসন ব্যবসার উন্নয়নে যত প্রতিবন্ধকতা
রাজধানীতে একটি আবাসন প্রকল্পের অনুমোদন নিতে গেলে ১৬টি সরকারি সংস্থার ছাড়পত্র নিতে হয়। প্রতিটি দপ্তরে ঘুরে একটি প্রকল্প অনুমোদনে এক থেকে দেড় বছর লেগে যায়। দিতে হয় অনৈতিক সুবিধাও। দীর্ঘদিন ধরে রাজউকে একটি ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেল করার দাবি করে আসছে রিহ্যাব। মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার এ বিষয়ে বৈঠক হলেও এখনো কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তাতে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ে, যা কিনা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়ে গিয়ে চাপে। রিহ্যাবের তথ্যমতে, প্রতিবছর ১৫ হাজার থেকে ১৭ হাজার ফ্ল্যাট সরবরাহ করা হয়। যার মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই প্রবাসে বসবাসকারী ক্রেতা। বর্তমানে করোনা পরিস্থিতিতে প্রচুর প্রবাসী শ্রমিক কাজ হারিয়ে দেশে ফিরছেন। এটা দেশের অর্থনীতি তথা আবাসন খাতের জন্য বড় ধাক্কা। এ ছাড়া অসংখ্য মানুষ চাকরি হারানো ও ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইচ্ছে থাকলেও অধরা থেকে যাচ্ছে একটি ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন। এ ছাড়া অন্য যে কারণগুলোয় সম্ভাবনাময় আবাসনশিল্পটি দুর্দশাগ্রস্ত; সেগুলো হচ্ছে-
- জমির উচ্চমূল্য
- নির্মাণসামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি
- ব্যাংকঋণের জটিলতা, সীমাবদ্ধতা ও উচ্চ সুদের হার
- বিদ্যুৎ ও গ্যাসসংকট
- রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা
- ব্যাপক চাঁদাবাজি
- সঠিক পরিকল্পনার অভাব
- সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অসহযোগী মনোভাব
- সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা
- বিনিয়োগস্বল্পতা
- বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত পাওয়ার অনিশ্চয়তা
- ভূমিস্বল্পতা
- ভূমিনীতি
- ট্যাক্স জটিলতা
- মূল্যবৃদ্ধি ও মূল্যহ্রাসের ব্যাপক তারতম্য
- মধ্যস্বত্বভোগী ও দালালদের দৌরাত্ম্য
- উঁচু স্থাপনা নির্মাণে কড়াকড়ি আরোপ প্রভৃতি।
টেকসই আবাসন উন্নয়নে আশু করণীয়
অমিত সম্ভাবনার আবাসনশিল্প। করোনা মহামারি ও বিগত দিনের ক্ষতি পুষিয়ে চলছে শিল্পটির এগিয়ে যাওয়ার সংগ্রাম। সম্ভাবনাময় এই শিল্পটি যদি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে, তবে দেশের আবাসন সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি সৃষ্টি হবে অর্থনীতির শক্তিশালী এক ভিত। শক্তিশালী খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে অধিকসংখ্যক মানুষকে আবাসিক সুবিধা দেওয়ার জন্য নিতে হবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। ফ্ল্যাটের দাম আনতে হবে ক্রেতার লাগালের মধ্যে। ব্যবসায় মুনাফা মুখ্য হলেও তা অবশ্যই হতে হবে গণমুখী। টেকসই ও উন্নতমানের শিল্প খাত গড়ে তুলতে প্রয়োজন সঠিক পরিসংখ্যান ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার।
কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জরিপ মতে, রাজধানীর প্রায় ২৫ লাখ পরিবারের ৮৩ শতাংশ অর্থাৎ ২০ লাখ ৭৫ হাজার পরিবারেরই বসবাসের নিজস্ব কোনো আবাসনব্যবস্থা নেই। বিপুলসংখ্যক মানুষকে তাই ভাড়া বাসার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ১৯৯১ সাল থেকে বিগত ২০ বছরে রাজধানীতে বাড়িভাড়া বেড়েছে ৩২৫ শতাংশ। সাধারণ মানুষের আয়ের ৬০ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয় বাড়িভাড়ার পেছনে। অথচ একজন নাগরিকের আবাসন বাবদ আয়ের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ ব্যয় হওয়া উচিত। অবশিষ্ট যা থাকে তা খাদ্য, বস্ত্র, পরিবহন, চিকিৎসা, সন্তানের লেখাপড়াসহ আনুষঙ্গিক নানা প্রয়োজনে ব্যয় হয়। সব প্রয়োজন মেটানোর পর একটি ফ্ল্যাট কিনতে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন, তা সারা জীবনেও জোগাড় করা সম্ভব হয় না স্বল্প আয়ের এসব মানুষের। আর তাই আপন নীড়ের স্বপ্ন দূরকল্পনাতেই রয়ে যায় তাঁদের। করোনাকালে ভাড়াটেদের অনেকেই বাড়িভাড়ার টাকা জোগাড় করতে না পেরে ছেড়ে দিচ্ছেন বাসা। এমন পরিস্থিতিতে আবাসনশিল্পকে বিকশিত করতে যা যা করা প্রয়োজন সেগুলো হচ্ছে-
- পরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প গ্রহণ
- স্বল্পবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের জন্য পৃথক আবাসন পরিকল্পনা
- অধিক ইউনিটবিশিষ্ট সুউচ্চ ভবন নির্মাণ
- ছোট আকারের ফ্ল্যাট নির্মাণ
- দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি-সুবিধা প্রদান
- আয় বিবেচনায় কিস্তির হার ধার্যকরণ
- ব্যাংকঋণের সহজ প্রাপ্যতা
- সুদের হার কমানো
- ঋণ পরিশোধের সময়কাল বাড়ানো
- রেজিস্ট্রেশন ফি ও কর হার কমিয়ে ৬-৭ শতাংশে নামিয়ে আনা
- অযৌক্তিক ও অতিরিক্ত চার্জ কমানো
- ভূমির বৈজ্ঞানিক ব্যবহার বাড়ানো
- নির্মাণকৌশল পরিবর্তন
- বিকল্প নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার বাড়ানো
- নির্মাণসামগ্রীর দাম ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা
- প্রতিষ্ঠান কর্তৃক গ্রাহক প্রতারণা ও হয়রানি বন্ধ করা
- পরিবেশবান্ধব খুদে শহর ও উপশহর গড়ে তোলা
- প্ল্যান পাসের ক্ষেত্রে রাজউক ও অন্যান্য সংস্থার জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা কমানো
- পুরোনো ফ্ল্যাটের বেচাকেনাকে উৎসাহিত করতে আবাসন খাতে সেকেন্ডারি মার্কেট গড়ে তোলা প্রভৃতি।
ফ্ল্যাট কিনতে এ সময়ের সতর্কতা
এখনই সময় ফ্ল্যাট কেনার। একজন সচেতন ক্রেতা বা বিনিয়োগকারী হিসেবে যেমন এই সময় বিনিয়োগ করার সুবিধা অনেক বেশি, তেমনি বেশ কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। আপনি যে ফ্ল্যাট অথবা কমার্শিয়াল স্পেস কিনতে যাচ্ছেন, তা কোভিড-১৯ এর আগে দাম কী রকম ছিল এবং বর্তমানে বিক্রেতা কী রকম দাম চাইছে তা একজন রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগ পরামর্শকের সঙ্গে আলোচনা করে সঠিক ভ্যালুয়েশন বা মূল্য নির্ধারণ করে নিতে হবে। সাধারণত মূল্য কমার ক্ষেত্রে ১০ থেকে ২০ শতাংশ বা আরও বেশি হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জমির মালিক বা আগে যাঁরা ফ্ল্যাট কিনেছেন, তাঁদের কাছ থেকে আরও কম মূল্যে পেতে পারেন। তবে মনে রাখতে হবে, যেসব ডেভেলপার কোম্পানির কাছে নগদ অর্থের পর্যাপ্ত সরবরাহ আছে, তারা এই মুহূর্তেও মূল্য হ্রাস করতে রাজি হবে না।
এ ছাড়া এই সময় কারা বাজারমূল্য থেকেও কম দামে ফ্ল্যাট বিক্রি করতে প্রস্তুত তার সঠিক তথ্য রিয়েল এস্টেট পরামর্শকের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অবশ্যই চেষ্টা করবেন প্রজেক্ট এর নির্মাণকাজের শেষ পর্যায়ে বা সম্পূর্ণ নির্মিত প্রজেক্ট থেকে কিনতে। তবে বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির নির্মাণাধীন প্রজেক্ট থেকেও ফ্ল্যাট কেনা যেতে পারে। কয়েক বছরের পুরোনো ফ্ল্যাটের মূল্য নির্ধারণ করেও কেনা যেতে পারে। অবশ্যই একজন ক্রেতা হিসেবে বিক্রয় চুক্তিনামায় ভোক্তাবান্ধব সর্বোচ্চ সুবিধাগুলো নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগের জন্য সব আইনগত ও কৌশলগত বিষয়সহ রিয়েল এস্টেট পয়েন্ট অব ভিউ থেকে একজন দক্ষ পরামর্শকের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ফরম্যাট এবং চেকলিস্ট অনুসরণ করে প্রপার্টি ভ্যালুয়েশন করে নিতে হবে। কোনো অবস্থায় যাতে বিপণন ফাঁদে না পড়েন, সে দিকে লক্ষ রেখেই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যেসব ক্রেতা চিন্তা করেছিলেন এ বছর বা আগামী বছর ফ্ল্যাট বুকিং দেবেন, তাঁদের জন্য সম্ভব হলে এ বছরই চিন্তা করা ভালো। কারণ, একটা সময় পর অর্থনীতির এই মন্দা অবস্থা কেটে যাবে। ফ্ল্যাটের দাম এই অবস্থা থেকে হুট করে বাড়বে। রিয়েল এস্টেট খাতে এই মহা বিপর্যয়ে একমাত্র প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরা টিকতে পারবে বাকিদের ঝরে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
পরিশেষে
আবাসনশিল্পকে ঘিরে পুরো দেশকেই আনতে হবে মহাপরিকল্পনার আওতায়। শিল্পটির সঙ্গে যেহেতু অসংখ্য জীবন-জীবিকা জড়িত। দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে উঠেছে আবাসনশিল্প। এ শিল্পটির ক্রমবর্ধমান বিকাশ প্রমাণ করে, শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। কিছু ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে এ শিল্প অর্থনীতিতে রাখবে অসামান্য অবদান। সব সমস্যাকে পেরিয়ে নব উদ্যমে শুরু হোক নির্মাণযজ্ঞ; শিল্পটি ফিরে পাক নতুন প্রাণচাঞ্চল্য। আবাসনশিল্পে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলো আবারও হয়ে উঠুক উৎপাদনমুখী-কর্মমুখর।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১২২তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০২০