‘একজন ক্রেতা সব সময়ই চান কম দামে ভালো পণ্য পেতে। কিন্তু পণ্যের মান ভালো হলে দাম একটু বেশি হবেই! অনেক সময় ক্রেতা এটি বুঝতে চান না। তাঁদের বোঝাতে হয়, দিতে হয় মানসিক সমর্থন। ক্রেতা কথায় ও ব্যবহারে সন্তুষ্ট হলে পণ্য কিনবেই।’ এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন সফল নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী আলহাজ মো. আবদুল ওয়াহাব। চাঁচকৈড় বাজার, গুরুদাসপুর, নাটোরের ‘মেসার্স ত্বাহা ট্রেডিং’-এর স্বত্বাধিকারী যিনি। ঐতিহ্যবাহী বাজার চাঁচকৈড়। পাশ দিয়েই বয়ে গেছে ঐশ্বর্য্যমণ্ডিত নদী আত্রাই ও নন্দকুঁজা। এই নদীর কারণেই এ জনপদটিতে গড়ে উঠেছে বিশাল এক বাজার, অনেকটা বন্দর নগরীর মতো। বন্ধন-এর নিয়মিত আয়োজন ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে এবার জানাব তরুণ এ ব্যবসায়ীর সাফল্য-রহস্য। সঙ্গে ছিলেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির জ্যেষ্ঠ আঞ্চলিক বিপণন কর্মকর্তা মো. নুরুজ্জামান সরকার।
ব্যবসায়ী আবদুল ওয়াহাবের জন্ম ১৯৮২ সালের ২৯ মে চাঁচকৈড়, নাটোরে। বাবা আলহাজ গিয়াস উদ্দিন ও মা সাজেদা বেগম। তিনি গুরুদাসপুর পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২০০৩ সালে মাধ্যমিক এবং ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ২০০৮ সালে স্থাপত্যে ডিপ্লোমা করেন। এরপর চাকরি করেছেন কিছুদিন। ভালো না লাগায় তা ছেড়ে দিয়ে যুক্ত হন বাবার ব্যবসায়। বাবার ছিল ধান-চালের (চাতাল) ব্যবসা; বিসিআইসির সারের স্থানীয় ডিলারও তিনি। তবে চাতাল ব্যবসা তাঁর কাছে যুগোপযোগী মনে হলেও এই ব্যবসায় ঝক্কি-ঝামেলাও কম নয়। তা ছাড়া তিনি যেহেতু স্থাপত্য নিয়ে লেখাপড়া করেছেন, তাই এমন একটি ব্যবসা করতে চেয়েছিলেন, যা হবে একাডেমিক শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সবদিক বিবেচনায় ২০১৩ সালে শুরু করেন নির্মাণপণ্য ব্যবসা। তবে রড, সিমেন্টের পাশাপাশি সারের ব্যবসাটিও তিনি অব্যাহত রাখেন। বর্তমানে তিনি আকিজ সিমেন্টের নাটোর টেরিটরির অন্যতম সেরা বিক্রেতা। পাশাপাশি বিএসআরএম স্টিল ও আরো কয়েকটি ব্র্যান্ডের সিমেন্টের থানা পর্যায়ের ডিলার।
ব্যবসায়ী আবদুল ওয়াহাবের ব্যবসার শুরুই আকিজ সিমেন্ট বিক্রির মাধ্যমে। গুণগতমানের এ পণ্যটি খুব কম সময়েই তাঁকে এনে দিয়েছে অভাবনীয় ব্যবসায়িক সাফল্য। ২০১৪ সাল থেকে এখনো নাটোর টেরিটরির সর্বোচ্চ আকিজ সিমেন্ট বিক্রেতা তিনি। পণ্যটি বিক্রিতে প্রতিবছরই অর্জন করেছেন সেরা বিক্রেতা হওয়ার প্রথম কৃতিত্ব। সিমেন্ট ছাড়াও স্টিল বিক্রিতেও দারুন সফল। এমন অভূতপূর্ব বিক্রয় সাফল্যে তিনি কোম্পানির পক্ষ থেকে পেয়েছেন মোটরসাইকেল, এসি, ফ্রিজ, টিভি, ল্যাপটপ, স্মার্টফোন, ডিনার সেট, স্বর্ণালংকারসহ নানা উপহার ও সম্মাননা। এ ছাড়া প্রতিবছর কোম্পানির দেওয়া নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করায় পেয়েছেন দুবাই, মরিশাস, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সৌদি আরবে ওমরাহ হজসহ নানা দেশ ভ্রমণের অফার।
ব্যবসায়ী আবদুল ওয়াহাব যখন চাঁচকৈড় বাজারে নির্মাণপণ্য ব্যবসা শুরু করেন, তখন ব্যবসাটি ছিল বড় বড় ব্যবসায়ীর দখলে। অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী; বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এসবের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তিনি টিকতে পারবেন তো! এই সংশয় তাঁকে বেশ ভাবিয়েছে। তবে তিনি দমে যাননি। সম্পূর্ণ নিজের বুদ্ধি-বিবেচনায় ব্যবসা চালিয়েছেন। মুনাফাকে প্রাধান্য না দিয়ে তিনি মনোযোগী হন কীভাবে বিক্রি বাড়ানো যায় সেদিকে। চেষ্টা করেন ক্রেতার মন জুগিয়ে ব্যবসা করতে। তবে গুণগত মানের পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে কোনো আপস করেননি তিনি। রড বিক্রির ক্ষেত্রে সঠিক ওজনের ব্যাপারেও তিনি সদা সচেতন। স্থাপত্য বিষয়ে পড়ালেখা করায় ক্রেতাকে নির্মাণ বিষয়ে পরামর্শও দেন। এসব নানা ব্যবসাবান্ধব উদ্যোগের ফলে তিনি হয়ে ওঠেন অত্র এলাকার সফল ও সেরা বিক্রেতা। গুণগত মানের পণ্য ও সঠিক ওজন পাওয়া যাবে এমন আস্থা থেকেই দূর-দূরান্তের ক্রেতারা ভিড় করেন তাঁর দোকানে। কেউ কেউ ফোন করেই প্রয়োজনমতো পণ্য পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ করেন। আর দ্রুততার সঙ্গে মালামাল ক্রেতার দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সদা সচেতন এ ব্যবসায়ী। পণ্য পৌঁছানোর সহায়ক হিসেবে তাঁর রয়েছে তিনটি ট্রাক। ব্যবসাবান্ধব এমন পরিবেশের কারণে চাঁচকৈড় বাজারের সকল নির্মাণপণ্য বিক্রয় প্রতিষ্ঠানে যা বিক্রি হয়, তিনি একাই তা বিক্রি করেন।
ব্যবসায়ী আবদুল ওয়াহাব বিয়ে করেছেন ২০১০ সালের ১০ অক্টোবর। ১০-১০-১০; খুব স্পেশাল একটি দিন। তাঁর সহধর্মিণী শারমিন আফরোজ। তাঁদের এক ছেলে এক মেয়ে। বড় ছেলে ওয়াজিয়া তাওসিফ ত্বাহা নূর একাডেমিতে নার্সারিতে পড়ছে। ছোট মেয়ে আরিয়া আনান, বয়স তিন বছর। ব্যবসাই এখন আবদুুল ওয়াহাব-এর ধ্যান-জ্ঞান; ভালো লাগে ব্যবসায় সময় দিতে। সকাল সকাল দোকানে আসেন যেন কোনো ক্রেতা ফিরে না যান। ব্যবসার পাশাপাশি তিনি গুরুদাসপুর রড-সিমেন্ট দোকান মালিক সমিতির একজন সদস্য। এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানে সাধ্যমতো চেষ্টা করেন সহায়তা করতে। তাঁর বাবাও এই বাজারে দীর্ঘদিন সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করছেন।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৫তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৯।