জলবায়ুর পরিবর্তনে বৈশি^ক উষ্ণতা ক্রমেই বাড়ছে। পৃথিবীর কোথাও প্রখর সৌরতাপ, আবার কোথাও হিমশীতলা। এমন পরিস্থিতিতে মানব শরীরের জন্য সহনীয় তাপমাত্রা বজায় রাখা রীতিমত চ্যালেঞ্জিং। উপযোগী পোশাকের মাধ্যমে সমস্যাটির সমাধান করা গেলেও আবাসনে স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখার বিষয়টি বেশ কষ্টসাধ্য। প্রখর সৌরতাপ যেমন ভবনকে উত্তপ্ত করে তোলে, তেমনি হিমবাহ করে শীতল। ফলে ভবনে সহনীয় তাপমাত্রা নিশ্চিত করতে চালাতে হয় এসি, এয়ারকুলার, ফ্যান, রুম হিটার মতন যন্ত্রাংশ। তাতেও যেন গরম বা শীত কমতে চায় না। আবার বৈদ্যুতিক ডিভাইসের যথেচ্ছ ব্যবহারে বাড়ে বিদ্যুৎ বিল। এই সমস্যাটির সমাধানে ভবনে থার্মাল ইনস্যুলেশন অত্যন্ত কার্যকরী পন্থা। বহু বছর ধরে গরম বা শীতপ্রধান দেশগুলোতে ভবনে স্থাপন করা হয় এই প্রযুক্তি। তবে সম্প্রতি থার্মাল ইনস্যুলেশন ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে দারুন এক প্রযুক্তি স্প্রে পলিইউরেথিন ফোম (SPF)। এটি একধরনের তরল ফেনা, যা স্প্রে করার পর শক্ত ফোমে পরিণত হয় এবং দেয়ালকে সিল করার মাধ্যমে নিশ্চিত করে ভবনের থার্মাল ইনস্যুলেশন। শীত, গরম কিংবা অতিরিক্ত শব্দ থেকে অত্যন্ত আরামদায়ক অন্দর উপহার দিতে চমৎকার অন্তরক হিসেবে কাজ করে ফোমের এই নবপ্রযুক্তি।
রাসায়নিক গঠনে স্প্রে পলিইউরেথিন ফোম
ভবনের থার্মাল ইনস্যুলেশন নিশ্চিত করতে অত্যন্ত কার্যকরী পন্থা এই স্প্রে ফোম বেশ আলোড়ন তুলেছে স্থাপনা শিল্পে। মূলত এটি এক ধরনের ফেনা-জাতীয় রাসায়নিক উপাদান, যার রয়েছে ব্যাপক সম্প্রসারণ ক্ষমতা। মূলত দুই ধরনের রাসায়নিকের মিশ্রণে উৎপন্ন হয় এই ফোম। তা হচ্ছে-
১. আইসোসায়ানাইট (Isocyanate) এবং
২. পলিওল রেসিন (Polyol Resin)
এই দুই রাসায়নিককে একে অন্যের সঙ্গে মেশানো হয় তরল অবস্থায় বায়ুরোধী করে। কিন্তু তা যখন কোথাও স্প্রে করা হয় তখন তা বাতাসের সংস্পর্শে পরিমাণে বাড়ে ৩০ থেকে ৬০ গুণ। দেয়ালের সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ছিদ্র ঢাকতে এই তরল ফোম বেশ কার্যকরী, যা অন্য কোনো ইনস্যুলেটর দিয়ে অসম্ভব।
ইতিহাসের পাতায়
পলিইউরেথিন আবিষ্কারের পর জার্মান রসায়নবিদ অটো বায়ার (Otto Bayer) ১৯৩৭ সালে এই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন। তিনি পলিইউরেথিন ফোমকে সিনথেরাইজ করে তাতে অল্প পরিমাণে রাসায়নিক ব্যবহার করে ড্রাই ফোমে রূপান্তরে সক্ষম হন। পরবর্তীতে তা বিভিন্ন শিল্পপণ্যে ব্যবহারের মাধ্যমে পলিইউরেথিনের মানোন্নয়ন হতে থাকে। বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন যেমন, জুতার তলা, ফ্রিজের অভ্যন্তরের অন্তরক ও অন্যান্য শিল্পকারখানার কাজে ব্যবহার করা হয়। ১৯৪০ সালে রিজিড ফোম ব্যবহৃত হয় বিমানে। এ ছাড়া পণ্যের প্যাকেজিংয়ে বিশেষ করে জাহাজে পরিবহনকৃত বিভিন্ন মালামাল যেমন, ভাস্কর্য, বিশাল ফসিল, কাচ, ফার্নিচার, কংকাল ও মূল্যবান সামগ্রীর ক্ষেত্রে। ১৯৭৯ সাল থেকে পলিইউরেথিন ফোমের ব্যবহার শুরু হয় স্থাপনাতে। তবে তা স্প্রে আকারে নয়। স্প্রে পদ্ধতি উদ্ভাবনের পর বিশ^ব্যাপী বেড়ে যায় এর ব্যবহার।
স্প্রে পলিইউরেথিন ফোমের থার্মাল ক্ষমতা
সম্প্রতি শীত ও গ্রীষ্মপ্রধান দেশগুলোতে এই উপাদানটির ব্যাপক ব্যবহার ও চাহিদা লক্ষণীয়। কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ের মতো শীতপ্রধান দেশ ছাড়া থাইল্যান্ড, চীন ও জাপানের মতো দেশগুলোতেও ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এটি। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের বিল্ডিং কোডেও এই প্রযুক্তি ব্যবহারের নির্দেশনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্প্রে ফোম ইনস্যুলেশনের এই প্রযুক্তিকে বলা হয় ‘ওয়াল ইনজেকশন’। বিশেষ করে ওয়াল রেট্রোফিট করার ক্ষেত্রে এটা অধিক ব্যবহৃত হয়। সম্প্রতি অধিকাংশ কাঠের বাড়িতে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। কাঠের দেয়ালের ফ্রেমের মধ্যে আগে ইনস্যুলেশন ফোম, প্যানেল ও খড়ের ব্লক ব্যবহার করা হতো ঘরের ভেতরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখতে। কিন্তু তাতে সূক্ষ্ম ফাটল ও ছিদ্র বন্ধ করা যেত না। ফলে কাক্সিক্ষত তাপমাত্রা পাওয়াও ছিল দুরূহ। অথচ এই স্প্রে ফোম থেকে দারুণ উপযোগিতা পাওয়া যায়। এই উপকরণটির আর-ভ্যালু (R-Value) অত্যন্ত উচ্চ মানসম্পন্ন। আর-ভ্যালু বলতে বোঝায়, সেলে ঘনত্বের মাত্রা। মানভেদে স্প্রে পলিইউরেথিন ফোমের থার্মাল ক্ষমতা প্রতি ইঞ্চিতে আর-ভ্যালু ১.৮-৬.৭ পাউন্ড।
স্প্রে পলিইউরেথিন ফোমের রকমফের
কার্যকারিতার ভিত্তিতে স্প্রে পলিইউরেথিন ফোম বর্তমানে দুই ধরনের। সেগুলো হচ্ছে-
১. কম ঘনত্বের বা ওপেন সেল
২. মাঝারি ঘনত্বের বা ক্লোজ সেল
কম ঘনত্বের বা ওপেন সেল
কম ঘনত্বের বা ওপেন সেল সাধারণত হাফ-পাউন্ড ফোম নামে পরিচিত। এটি একধরনের সেমি রিজিড মেটেরিয়াল, অনেকটা স্পঞ্জের মতো ইনস্টলেশনের সময় প্রসারিত হয় এবং অনেক সূক্ষ্ম সেল তৈরি করে। পরে তাতে কার্বন-ডাই-অক্সাইড পূর্ণ হয়। এর আর-ভ্যালু প্রতি ইঞ্চিতে ১.৮-৩.৪। ফলে খুব বেশি থার্মাল-সুবিধা পাওয়া যায় না। ফলে হালকাধর্মী ও অস্থায়ী স্থাপনার ক্ষেত্রে অধিক ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া ইন্টেরিয়রে স্থাপন করা হয় শব্দ রোধে।
মাঝারি ঘনত্বের বা ক্লোজ সেল
মাঝারি ঘনত্বের বা ক্লোজ সেল স্প্রে ফোমকে ২ পাউন্ড (2lb) ফোম হিসেবে রেফার করা হয়। এটা রিজিট ইনস্যুলেশন ম্যাটেরিয়াল হিসেবে দীর্ঘদিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। প্রতি ইঞ্চিতে এর আর-ভ্যালু ৫.১-৬.৭। স্থায়ী স্থাপনাতে সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখতে এই ধরনের ফোম বেশ কার্যকরী। ওপেন সেল ও ক্লোজ সেলের মধ্যে তফাত মিলিয়ন সেল। ক্লোজ সেল অত্যন্ত রিজিড হওয়ায় বাতাস প্রবেশ করতে পারে না। ওপেন সেলের তুলনায় এর আর-ভ্যালুও অনেক বেশি।
ব্যবহারিক পরিসর বা অ্যাপ্লিকেশন
- সব ধরনের দেয়ালের অভ্যন্তরে
- বেইজমেন্ট টাইলস বা ঢালাইয়ের নিচে
- ছাদে টাইলসের নিচে
- পার্কিং লট ও গ্যারেজে
- কোনো দেয়াল সিল করতে
- ডসলিংয়ে
- ওয়ার্কশপে
- বৈদ্যুতিক ওয়্যারিং লাইনের পাশে, ফিটিং ও ফিক্সারসের হোলে
- প্লাম্বিং ভেন্টসে
- মূল্যবান পণ্যের প্যাকেজিংয়ে।
স্প্রে পলিইউরেথিন ফোমের বৈশিষ্ট্য
- তাপরোধী
- বায়ুরোধী
- পানিরোধী
- শব্দ নিরোধক
- অত্যন্ত হালকা
- নমনীয়
- জোড়াবিহীন
- দীর্ঘস্থায়ী
- পরিবেশবান্ধব।
স্প্রে পলিইউরেথিন ফোমের যত উপকারী দিক
স্প্রে পলিইউরেথিন ফোমের রয়েছে নানাবিধ সুবিধা। অন্যান্য ইনস্যুলেটরের চেয়ে অনেক বেশি অন্তরক-সুবিধা দেয় এই ফোম। এটা দেয়ালের সূক্ষ্ম ছিদ্র বন্ধ করতে সক্ষম, যার ফলে শক্তির অপচয় কম হয়। ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব এনার্জির গবেষণায় উঠে আসে, বাসাবাড়িতে ৪০ শতাংশ এনার্জি সাশ্রয় করতে সক্ষম এই স্প্রে ফোম। তা ছাড়া বৃষ্টি, রোদ ও আর্দ্রতাও প্রতিরোধ করে। অতিরিক্ত শব্দ প্রবেশেও বাধা দেয়। কাঠ, কংক্রিট, স্টিল যেকোনো ধরনের স্থাপনায় এটা স্থাপন করা যায়।
- অতিরিক্ত সৌরতাপ ও ঠান্ডা প্রতিহত করে
- অত্যন্ত হালকা বিধায় স্থাপনার ওজন বাড়ায় না
- পানিরোধী বিধায় বৃষ্টি ও বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না
- আর্দ্রতা প্রতিরোধ করে
- অন্তত ৩০ বছর বা এরও বেশি স্থায়ী হয়
- মেইটেন্যান্সের প্রয়োজন নেই
- ছিদ্র হয় না; ফাটে না
- স্প্রে করার পর কাঠামোর শক্তিমাত্রা ২০০-৩০০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়
- ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শক্তি সাশ্রয় করে বিদ্যুতের খরচ কমায়
- ফাঙ্গাস ও পোকামাকড়ে ক্ষতি করতে পারে না
- গরমে ঘরকে রাখে শীতল আর শীতে রাখে উষ্ণ
- মেঝে থেকে তাপ ও আর্দ্রতা শোষণ করে না।
স্প্রে পলিইউরেথিন ফোমের সহায়ক যত অনুষঙ্গ
স্প্রে পলিইউরেথিন ফোমের কাজ করার জন্য কিছু অনুষঙ্গ প্রয়োজন হয়, যেগুলো সাধারণত প্যাকেজ আকারে থাকে। এসব অনুষঙ্গের মধ্যে রয়েছে-
- স্প্রে গান
- ট্রিগার
- ক্যান বা সিলিন্ডার
- নজেল
- পাইপ
স্প্রে করার পদ্ধতি
গানের সাহায্যে যখন ফোম স্প্রে করা হয় তখন তাতে চাপ সৃষ্টি হয়। গানের ট্রিগার চাপলেই প্রচণ্ড বেগে ফোম ছড়িয়ে যেতে থাকে। তরল ফোম সেকেন্ডের মধ্যেই ফুলে-ফেঁপে যায় যা বাতাসের সংস্পর্শে শুকিয়ে পূর্ণতা পায়। এ জন্য ট্রিগার চাপার আগেই সবকিছু ঠিকঠাক করে নিতে হয়। যেমন, পলিথিন বা প্লাস্টিক দিয়ে ঢেকে নিতে হয় স্প্রের বাইরের অংশগুলো। বিশেষ করে দরজা ও জানালার ফ্রেম। এ ছাড়া বৈদ্যুতিক সুইচ ও সকেট বোর্ডগুলোও। প্রয়োজনে একটি পরীক্ষামূলক স্প্রে করে দেখা উচিত তা ঠিকমতো কাজ করছে কি না। স্প্রে করার আগে ক্যান বা সিলিন্ডার ভালোভাবে ঝাঁকিয়ে নিতে হয় যেন রাসায়নিকের মিশ্রণ সঠিক হয়। শুধু তা-ই নয়, কিছুক্ষণ পরপরই তা পুনরায় ঝাঁকাতে হয় যেন মিশ্রণ পৃথক না হয়ে যায়। স্প্রে করার সময় অন্তত ৩০ সেকেন্ড ট্রিগার চেপে এদিক-ওদিক করতে হয় যেন সবখানে সমভাবে রাসায়নিক পৌঁছে সমানভাবে লেয়ার তৈরি হয়। স্প্রে করার পর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় যেন ভালোমতো শুকাতে পারে। তবে ভেজা সারফেসে এই স্প্রে তেমন কাজ করবে না। দেয়ালে বিশ শতাংশের বেশি আর্দ্রতা থাকলে ফোম বেশি শক্ত-মজবুতও হবে না। মসৃণ সারফেস পেতে অসমান ফোম কেটে সহজেই সমান করা যায়।
সতর্কতা যত
স্প্রে ফোম সাধারণত অবিষাক্ত। এর স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলনামূলক কম। তবে স্প্রে করার সময় গ্যাস নির্গত হয় বিধায় দেখতে সমস্যা করে শ^াস-প্রশ^াসে বাধা দেয়। এ ছাড়া সরাসরি চোখে গেলে চোখ জ¦ালাপোড়া করতে পারে এবং ত্বকে লাগলেও র্যাশ দেখা দিতে পারে। আবার অনেকের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে মাথা যন্ত্রণা ও অ্যাজমার সমস্যাও দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া দীর্ঘকালীন ব্যবহারে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তো রয়েছেই। এ জন্য যথাযথব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। যেমন,
- আপাদমস্তক ঢাকা স্যুট বা অ্যাপ্রোন
- ফেইস মাস্ক
- রাসায়নিক রোধী দাস্তানা
- বড় চশমা ব্যবহার করা।
বিশে^র শীত ও গ্রীষ্মপ্রধান দেশগুলোতে এই প্রযুক্তি জনপ্রিয়তা পেলেও এখনো আমাদের দেশে এর প্রচলন শুরুই হয়নি। যদিও এটা কিছুটা ব্যয়বহুল। কারণ, কতিপয় কোম্পানি এই পণ্যটি প্রস্তুত ও বাজারজাত করছে। এর ব্যাপক ব্যবহার শুরু হলে দাম কমে আসবে। ছড়িয়ে পড়বে বিশ^ময়। আমাদের দেশের ভবনে টপ ফ্লোরে, টিনের চালের নিচে ও দেয়ালে এই ফোম ব্যবহার করলে একদিকে যেমন মিলবে প্রশান্তি, অন্যদিকে কমবে বিদ্যুতের খরচ।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৪তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৯।