শৈলীতে অনন্য
মেয়র মোহাম্মদ হানিফ জামে মসজিদ

মসজিদের শহর ঢাকা। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এ দেশে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার সময় সূচনা হয় মসজিদ স্থাপনার। ১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে বাংলায় শুরু হয় মোগল শাসন। তখন থেকে এ দেশের মসজিদ স্থাপত্যকলার নির্মাণশৈলী ও আলংকারিক রীতিনীতি মোগলদের কাছে সম্পূর্ণভাবে গ্রহণযোগ্য না হলেও একেবারে বর্জনীয়ও নয়। বরং সামান্য পরিবর্তন ও নতুন কিছু সংযোজনের মাধ্যমে বাংলার মুসলিম স্থাপত্য পেয়েছে আরও পূর্ণতা। তাই বাংলার মসজিদ স্থাপত্যে স্বদেশি ও বহির্দেশীয় স্থাপত্যরীতির অপূর্ব সমন্বয় দৃশ্যমান। সেই সময়কে ছাপিয়ে বাংলাদেশে এখন চর্চিত হচ্ছে আধুনিক মসজিদ স্থাপনারীতি। ঐতিহাসিক অন্তঃসারকে সম্মান রেখে নান্দনিক আধুনিক পরিভাষায় এর প্রকাশেই এখন বেশি দেখা যায়। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের মসজিদের স্থাপত্য ‘ইসলামিক স্থাপনা’কে চ্যালেঞ্জ করে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য খুঁজে চলছে। চিরাচরিত ম্যাটেরিয়াল আর মসজিদ বলতেই গম্বুজ বা মিনারের জায়গাগুলোকে নতুন করে ভেবে দেখার চর্চাও আমরা দেখতে পাই। সেই সঙ্গে নতুন প্রযুক্তির প্রয়োগও বিশেষভাবে উল্লেখ্য। ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানসংলগ্ন এমনই এক ব্যতিক্রমী স্থাপনা মেয়র মোহাম্মদ হানিফ জামে মসজিদ। নান্দনিক এই মসজিদটির স্থপতি রফিক আজম।

প্রতিটি মসজিদ স্থাপত্যেরই রয়েছে সাধারণ গাঠনিক এক রূপ। যেমন-মূল প্রার্থনা কক্ষ, ছাদের ওপর স্থাপিত অর্ধবৃত্তাকার গম্বুজ ও উঁচু মিনার। গাঠনিক এ কাঠামোর ব্যতিক্রমও চোখে পড়ে। বিশেষ করে বিভিন্ন ভূখণ্ডের মানুষের সংস্কৃতি, আবহাওয়া, ভূ-প্রকৃতি, শাসন কাঠামো, রাজনৈতিক পরিস্থিতির মতো দিকই সংশ্লিষ্ট ভূখণ্ডের ধর্মীয় স্থাপত্য নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারকারী। মূলত সুলতানি আমল থেকে মসজিদের স্থাপনাশৈলীর নানা বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয় এবং মোগল আমলে এসে এই শ্রেণিবিন্যাসকরণ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই সময়ের স্থাপনার বৈশিষ্ট্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: মসজিদের বর্গাকার আকৃতি, শান বা বারান্দার ভাবনা একটি মধ্য অক্ষ বিবেচনা করে ধ্রুপদি কায়দার প্রয়োগ, যাতে করে দুই দিকের ভারসাম্য সমান থাকে, ইটের ইমারত, পোড়ামাটির নকশা, আইলের প্রয়োগ প্রভৃতি। মিনারের পেছনের স্বাভাবিক ধারণাটা এ কারণে যে মুয়াজ্জিন যেন একটি নির্দিষ্ট উচ্চতা থেকে এলাকাবাসীকে নামাজ আদায়ের জন্য ডাকতে পারেন। পাশাপাশি মসজিদের অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ এই মিনারের স্থাপত্যশৈলীতেও নানা ধরনের প্রয়োগ দেখা যায়।

তবে মেয়র মোহাম্মদ হানিফ জামে মসজিদ নির্মাণে স্থপতির নিজস্ব চেতনা ও দর্শনের প্রকাশ লক্ষণীয়। মসজিদের ডিজাইন শুরুর সময়ে স্থপতির মনে ফিরছিল মরমি কবি জালাল উদ্দিন রুমির অমর বাণী, ‘কেবল তখনই পরম প্রশান্তির সাক্ষাৎ ঘটে, যখন আল্লাহর সঙ্গে তুমি সম্পূর্ণরূপে একাত্ম হও।’ সাতত্যের প্রধান স্থপতি রফিক আজম মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমির চিন্তা-দর্শন দ্বারা ভীষণভাবে প্রভাবিত। তা ছাড়া তিনি নিজে পুরান ঢাকার সন্তান হওয়ায় মসজিদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটাও আত্মিক। লালবাগ দুর্গের মসজিদ চত্বরে ঘুড়ি উড়িয়ে কেটেছে তাঁর সোনালি শৈশব। সেসব স্মৃতির ওপর ভর করে তিনি বাংলাদেশের মসজিদ স্থাপত্য নিয়ে পড়েছেন, জেনেছেন। সেখানে রয়েছে তারা মসজিদ, বেগমবাজার মসজিদ, ছোট সোনা মসজিদসহ বাংলাদেশের নানা ঐতিহ্যবাহী মসজিদ নিয়ে পর্যালোচনা। বাংলাদেশের মসজিদের প্রাচীন ইতিহাস থেকে উদ্বুদ্ধ হয়েই নতুন এই মসজিদের রূপরেখা করা। আমাদের আদি স্থাপত্যশৈলীর রসদকে গুছিয়ে তার এক বিমূর্ত প্রতিরূপই হলো এই মসজিদ। কারণ, এই মসজিদেও দেখা মেলে লম্বা মিনারের, দেখা মেলে বাহারি ইটের কারুকার্যের। অতীতের এই নির্যাসকে সঙ্গে করে এতে যুক্ত হয়েছে স্থাপত্যের আধুনিক চিন্তাচেতনা, যা বর্তমান বাংলাদেশের স্বরূপ নির্ণায়ক।

মসজিদের দক্ষিণে ব্যস্ততম রাস্তা জাগতিক ভাবকে ফুটিয়ে তোলে। সেখান থেকে প্রবেশদ্বারেই থাকা মসজিদের বিশাল শান জাগতিক মানুষের সঙ্গে পরমের সংযোগ ঘটায় আর জাগতিক মোহ থেকে ঘটায় বিচ্যুত। প্রকৃত প্রস্তাবে যা সংযোগ ঘটায় তা কিন্তু বিচ্যুতিরও কারণ। ফলে দুই দিকের দুই ভবনের মধ্যে এই বিশাল শান যেন নশ্বর জীবনের দোদুল্যমান রূপটিকেই ফুটিয়ে তোলে। এ-পার থেকে ও-পারে যাওয়ার জন্য বান্দার প্রস্তুতি বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় দৃশ্যমান এই শানকে। শানের ওপর দিয়ে চলে যাওয়া পুলটিও আমাদের পুলসিরাতের কঠিন যাত্রার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রতীকী অর্থে দৃশ্যমান এই পুলটির জাগতিক অস্তিত্ব তাই যেকোনো মুসলিমের কাছে জাগরণের বার্তাবাহক। তা ছাড়া শান থেকে আজিমপুর কবরস্থানকে এই পুলের নিচ দিয়ে এমন চমৎকার একটি সুচিন্তিত ফ্রেমের মধ্য দিয়ে দেখা যায় যে তা মৃত্যুকে গ্রহণের মধ্য দিয়ে মানব মনের সম্ভাবনাগুলোকে জাগিয়ে তোলে।

আর্কডেইলি

২৩ কাঠা পরিমাণ জমিতে এই মসজিদটি নির্মিত। মসজিদে নারী-পুরুষের আলাদা নামাজের ও অজুর ব্যবস্থা রয়েছে। উন্নত মানের টয়লেট-সুবিধার পাশাপাশি মসজিদটি শীততাপনিয়ন্ত্রিত। ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমের থাকার ব্যবস্থাও মসজিদে ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে লিফটের ব্যবস্থা, যাতে করে শারীরিকভাবে অসুস্থ সব মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। উঁচু মিনারের মাধ্যমে এলাকার সবার উদ্দেশে আজানের ধ্বনি পৌঁছানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। এ ছাড়া নিশ্চিত করা হয়েছে পার্কিংয়ের সুবিধা এবং ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ। বিশেষ দিন উপলক্ষে বর্ধিত মুসল্লিদের কথা ভেবে বিশাল শান নকশা করা হয়েছে, যা আমাদের ঐতিহ্যেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এই মসজিদটিকে আলাদা একটি মাত্রা দিয়েছে আজিমপুর কবরস্থান। জন্ম এবং মৃত্যুর মতো কঠিন সত্য আর কোনো কিছুতেই নেই। এবং মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি মানুষের ইতিবাচক ভাবনা নিশ্চয় তাকে নশ^র এ পৃথিবীতে সুচিন্তক করে তোলে। তার জীবনাচার নিয়ে তাকে করে তোলে সচেতন। একই সঙ্গে প্রিয়জনের মৃত্যুর কথা স্মরণে এলে তখন ব্যক্তি মানুষের দায়িত্ববোধও জাগ্রত হয়। এর ফলে মসজিদের স্থাপত্য যা করতে পারে তা হলো এই ভাবনাকে আরও উসকে দেয়। এই মসজিদের বিশাল এই শান আর ভাসমান পুলটি ঠিক সেই কাজটিই করছে। ব্যস্ততম রাস্তা আর কবরস্থানের মাঝের এই বিষয় দুইটি স্তব্ধতার সৃষ্টি করে, সৃষ্টি করে মনোমুগ্ধকর এক বিষণ্নতার। এই যে মনোজগতের সাময়িক এক স্থিরতা এই ব্যাপারটিই মানব মনে সৃষ্টি করে দারুণ চমৎকারিত্ব।

মসজিদে মহিলাদের জন্য রাখা হয়েছে আলাদা নামাজের ব্যবস্থা, যেটি কোনো বদ্ধ কক্ষ নয়। সুদৃশ্য ইটের জালির দেয়ালের আড়ালে রয়েছে এক চিলতে সবুজ। সেখানে লাগানো একটি বকুলগাছ। স্থপতির চিন্তায় পাওয়া যায় পবিত্র স্থানকে পবিত্রতম করে গড়ে তোলার প্রয়াস। স্থপতি রফিক আজম ভীষণ উচ্ছ্বাসের সঙ্গে এই জায়গাটির কথা বলেছেন। বকুল ফুলের ঘ্রাণে, আলো-বাতাসের বাধাহীন চলাচলের মধ্যে আল্লাহর কাছাকাছি আসতে চাওয়ার বাসনা হয় আরও পরিণত। এই যে মানব মনের মমতাময়, বিনয়ী, আকর্ষণীয় দিকটি স্থাপত্যের দৃষ্টিকোণে ছোট ছোট সিদ্ধান্ত দিয়ে যেভাবে ধরতে চাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, তা প্রশংসার দাবিদার।

মসজিদে বই রাখার ব্যাপারটি আলাদা করে ভাবা হয়েছে। পুরুষ ও মহিলা এই দুই জায়গার নামাজের স্থানেই বইয়ের বিরাট তাক নকশা করা। অনেকে মিলে যেন একসঙ্গে পড়তে পারে, সেই জন্য বিশেষ ধরনের টেবিল নকশা করা হয়েছে। যেখানে বসে পড়া হবে সেই জায়গাটির ওপরে স্কাই লাইট আনার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এবং মেঝেতে বিশেষ ধরনের নীলচে কাচ ব্যবহার করা হয়েছে। 

মসজিদের জুতা রাখার জায়গা থেকে শুরু করে নামাজের স্থানের আবহ সবকিছুতেই যত্নের ছাপ দেখতে পাওয়া যায়। কেবল স্থাপনা শেষ করার মধ্য দিয়েই নয় বরং মসজিদ পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ কমিটির অংশ হয়েছেন স্থপতি নিজ দায়িত্বে। যাতে করে তিনি এই মসজিদটি দীর্ঘদিন সঠিক ডিজাইনে এবং উত্তরোত্তর ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে নানা খুঁটিনাটি সিদ্ধান্ত সংযোগের মাধ্যমে মসজিদটিকে আরও যথাযথ ও ব্যবহারিক দৃষ্টিকোণে সম্পূর্ণতা দিতে পারেন। 

আর্কডেইলি

অজুখানাটিও স্থপতির প্রিয় আরেকটি জায়গা। প্রথমত, প্রক্রিয়াটি নামাজের আগের একটি প্রস্তুতিপর্ব। এই প্রক্রিয়াটিকে মহিমান্বিত করতেই খুব সুন্দর অভিজ্ঞতা ডিজাইন করেছেন স্থপতি। আধুনিক পানির কলের মাধ্যমে অজু করার পাশাপাশি আগেকার মসজিদের চৌবাচ্চার স্মৃতিকে এখানে ধারণ করা হয়েছে। তাতে রয়েছে নানা রঙের মাছ। ইতিমধ্যেই দেখা গেছে শিশুরা সেখানে অজু করতে বেশ আগ্রহী। অজুখানায়ও কোনো বদ্ধ দেয়াল ব্যবহার করা হয়নি। ইটের জালির ওপাশেই রয়েছে সুগন্ধি ফুলের বাগান। ছাদের একাংশ ফাঁকা। তাই দিনের আলো যেমন আসে, তেমনি বর্ষায় ছাদ থেকে নেমে আসা পানি পড়ে চৌবাচ্চায়। এই জায়গাটি খুব শান্ত। অনেকেই ইটের জালির দেয়ালের পাশে বসে সামনের কবরস্থানটি নিভৃতে অবলোকন করেন। এই বিষয়গুলো স্থপতির সুচিন্তিত কাজের প্রায়োগিক ফল।

একনজরে

  • স্থান: আজিমপুর পুরাতন কবরস্থান
  • স্থাপিত: ২০ কার্তিক, ১৪২৫;  ০৪ নভেম্বর, ২০১৮
  • পৃষ্ঠপোষকতায়: ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন
  • নকশাকারী প্রতিষ্ঠান: সাতত্য, সবুজ সচেতন স্থাপত্য
  • ঠিকাদারি প্রতিস্থান: KTA-AT (JV)

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৩তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৯।  

স্থপতি সুপ্রভা জুঁই
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top