অন্দরসজ্জার একাল-সেকাল

একটা সময় ছিল যখন বাড়ি তৈরি করার কথা ভাবা হতো তখন কিন্তু কেউ ইন্টেরিয়র ডিজাইন বা অন্দরসজ্জা নিয়ে এতটা ভাবত না। বাড়ি এক রকম গোছানো হলেই হলো! ভাবুন না একবার, আপনি আপনার দিনের অধিকাংশ সময় কোথায় ব্যয় করেন? ব্যাপারটা খুবই সহজ, আপনার স্বপ্নের বাড়িতে।

ঘরটা হবে দক্ষিণ দুয়ারি। জানালার ফাঁক গলে মিষ্টি নরম রোদ আলতো করে ছুঁয়ে যাওয়া কিংবা এক চিলতে বারান্দায় বসন্তের খোলা হাওয়ায় মন জুড়িয়ে যাওয়া এমন একটি ঘরের কল্পনা উঁকি দিয়ে যায় সবার মনে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের রুচিরও পরিবর্তন হয়েছে। অফিস কিংবা বাসাÑসর্বত্রই এমন রুচিশীল মানুষ তাঁদের নান্দনিকতার ছোঁয়া রাখছে। দৃষ্টিনন্দন করে সাজাচ্ছে নিজের ঘরের প্রতিটি স্থান। বর্তমানে ঘর সাজানোর এই কাজটি সহজ করে দেয় ইন্টেরিয়র ডিজাইনাররা।

মানুষের জীবনযাত্রায় সেকাল ও একালে রয়েছে বিস্তর ফারাক। স্মৃতির আয়নায় শুধু রোমান্থনে এ ব্যবধানকে স্মরণীয় করে রাখে। তন্মধ্যে মানুষের মনে জাগরিত হয় অতীত জীবনযাত্রা। অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে যুগ যাত্রায় মানুষের প্রয়োজনে। জীবনযাত্রার আঙ্গিকে এসেছে নতুনত্বের ছোঁয়া।

বর্তমানে ইন্টেরিয়র ডিজাইনাররা তাঁর শৈল্পিক মনের ছোঁয়াতে সাজিয়ে তোলেন চার দেয়াল। তাঁদের হাতের ছোঁয়ায় একটি সাধারণ ঘরও হয়ে ওঠে অসাধারণ। এককথায় বলা চলে, ঘরের দেয়ালের রং, মানানসই আসবাবের ডিজাইন ও রং থেকে শুরু করে স্বল্প পরিসরের জায়গাকে কীভাবে বেশি করে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে যাবতীয় আলোচনা, ডিজাইন ও বাস্তবায়ন, পুরোনোকে নতুন রূপ দেওয়াই ইন্টেরিয়র ডিজাইনারের কাজ।

সিঁড়ি

একটা সময় ছিল যখন সিঁড়ি যে অন্দরসজ্জার একটা অংশ হতে পারে তা নিয়ে এত ভাবত না কেউ। একতলা বাড়ি হলে সিঁড়ি ছিল ছাদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যম। সিঁড়ি যে বাড়ির অন্দরসজ্জা বা বাইরের রূপ বদলে দিতে পারে, এমন চিন্তা হয় তো খুব একটা কাউকেই ভাবায়নি। কিন্তু আধুনিক ইন্টেরিয়র কনসেপ্ট বলছে ভিন্ন কথা। ইন্টেরিয়রের অংশ এই সিঁড়ি খুব সহজেই বাড়ির পুরো দৃশ্যপট বদলে দিতে পারে। সিঁড়ি যে শুধুই দুটি ভিন্ন তলার মাঝে যোগাযোগ স্থাপন করবে এমন কিন্তু নয়, এক চিলতে নান্দনিক সিঁড়িঘরের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যে বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে।

সেকালে যাঁরা একটু শৌখিন ছিলেন তাঁরা সিঁড়িতে কারুকার্যময় রেলিং, হ্যান্ডেল, নইচা ব্যবহার করতেন। একালে সেই ধারণাকে মাথায় রেখে ডুপ্লেক্স বা ট্রিপ্লেক্স ফ্ল্যাটের সিঁড়ির ডিজাইনে সেই কনসেপ্ট ব্যবহার করা হচ্ছে ভিন্ন রূপে। কাঠের কারুকার্যের সঙ্গে কাচ, এসএস, মার্বেল, রড আয়রন ইত্যাদি যুক্ত করে তৈরি করা হচ্ছে নানা রকম নান্দনিক সব সিঁড়ি।

আসবাবপত্র

আগে আসবাবপত্র মানেই কারুকার্যময় পালঙ্ক, হালকা বা ভারী কাজ করা সোফা, চকি, টুল, মোড়া আর কি! আধুনিক যুগে সেই পুরোনো কনসেপ্টকে দেওয়া হয়েছে নতুন রূপ। বর্তমানে পালঙ্ক  শৌখিন এক ভূমিকা পালন করছে। যাঁরা বেডরুমটি একটু বড় এবং আভিজাত্যের ছোঁয়ায় ভরিয়ে তুলতে চান, তাঁরা আজকাল কারুকার্যময় পালঙ্ক ঘরে ঠায় দেয়। বর্তমানে সেই পালঙ্কের কনসেপ্টকে মাথায় রেখে খাটের দুই পাশে কারুকার্যময় স্ট্যান্ড তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে রাজকীয়ভাবে। খাট বা বেডের হেড রেস্টে যুক্ত করা হচ্ছে ফোম, লেদার। বার্নিশের জায়গায় নতুন করে রূপ নিচ্ছে লেকার ফিনিশিং। আগে বৈঠকখানা বা লিভিং রুম যা-ই বলেন না কেন, সাদামাটা চৌকি কম-বেশি সবার ঘরেই থাকত। এই চৌকিকে বর্তমানে নতুনত্বের রূপ দিতে তৈরি করা হচ্ছে ডিভান। আগে অতিথি আপ্যায়নে কাঠের টুল ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে সেই কাঠের টুল জায়গা করে নিচ্ছে সেন্টার টেবিলের সঙ্গে। স্পেস রক্ষার জন্য সাধারণত ডিজাইনাররা এখন সেন্টার টেবিলের সঙ্গে ছোট ছোট টুলের মতো তৈরি করে ঢুকিয়ে দিচ্ছে টেবিলের নিচে। অতিথি আপ্যায়নের সময় খুব সহজেই যা বের করে বসার ব্যবস্থা করা  যায়। সেকালে মোড়া মানুষের পছন্দের তালিকায় ছিল বসার প্রয়োজনে। বর্তমানে সেই মোড়া নানা ডিজাইনে অন্দরে জায়গা করে নিচ্ছে নান্দনিকতার ছোঁয়া দিতে। সঙ্গে বৈচিত্র্যময় গর্দি যেন এক বাড়তি পাওনা। আগে দোলনা ছিল বাড়ির আঙিনায়, বর্তমানে দোলনা জায়গা করে নিয়েছে ড্রয়িংরুম, বারান্দা এমনকি বেডরুমেও। সময়ের সঙ্গে বদলে গিয়েছে দোলনার আকার ও আকৃতি। আগের দিনে সোফা ছিল কারুকার্যময় কিংবা সিম্পল কাঠের। বর্তমানে সেগুলোর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ফোম, রড আয়রন, লেকার পলিজা, ডুকো পেইন্ট ইত্যাদি। পুরোনো কনসেপ্টের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নানা ধরনের আধুনিক সব মেটেরিয়ালস।

ছবির ফ্রেম

অতীতের আনন্দের মুহূর্তগুলো আশ্রয় নিতো ছবি হয়ে। সেসব স্মৃতি নিয়ে এগোতে হয় সামনে নতুন সময়ে। তবে আগের দিনে নেগেটিভ থেকে ছবি ওয়াশ করে রাখা হতো। কেউ ফ্রেমবন্দী করে রাখতেন আবার কেউ পছন্দের অ্যালবামে জমিয়ে রাখতেন।

এখন ছবি তুলে সংরক্ষণ করে রাখাটা যতটা সহজ সেটা কিন্তু আগে ছিল না। এখন ছবি ফ্রেমে রাখলেও মানুষ সেটিকে অন্দরসজ্জার অংশ করে নিয়েছে। সুন্দর স্মৃতিগুলো যেন টিকে থাকে সব সময় এটাই সবাই চায়। তাই পছন্দের সব ছবিগুলো ফ্রেমবন্দী করে সাজিয়ে নিচ্ছেন সিঁড়ি কিংবা লবির কোনো দেয়ালে। কিংবা বড় ফ্রেম তৈরি করে তাতে বিভিন্ন মুহূর্তের ছবি টাঙিয়ে দিচ্ছেন শোবার ঘর বা বসার ঘরের দেয়ালে।

বাসনকোসন

আগে মানুষ খাবারের জন্য মাটি কিংবা কাসার থালাবাসন ব্যবহার করত। আজকাল কেউ বংশপরস্পরায় পাওয়া পুরোনো জিনিসগুলো ঝুলিয়ে দিচ্ছেন আধুনিকতার ছোঁয়া। একে ফিউশনও বলা চলে একটা সময় পিতলের, মাটির বা কাঁসার বড় প্লেট শুধু খাবার কাজে ব্যবহার হলেও এখন তা হচ্ছে একটু ভিন্নভাবে। যোগ হয়েছে নান্দনিক নানা অনুষ্ঠানে বড় কাঁসার, মাটির কিংবা পিতলের থালায় ফুলের পাপড়ি কিংবা মোমবাতি দিয়ে সাজিয়ে নিচ্ছেন অনেকেই, পিতলের বড় গামলাও ব্যবহার করা যেতে পারে এ ক্ষেত্রে। বৈশাখ কিংবা পূজার সময় টেবিলের সাজসজ্জায় ব্যবহার করা হচ্ছে এ ধরনের থালা-বাসন নান্দনিকতার ছোঁয়া দিয়ে উৎসবের আমেজ ফুটিয়ে তুলতে।

ফেসবুক

সন্ধ্যাবাতি হারিকেন

গ্রামীণ সমাজের প্রতিটি ঘরে ঘরে একসময় আলোর অন্যতম বাহন হিসেবে ব্যবহৃত হতো হারিকেন। আবার অনেক সময় সবার ঘরে হারিকেন পাওয়া যেত না। কারণ, সাধ আছে সাধ্য নেই। এমন পরিস্থিতিও ছিল তখন মানুষের ঘরে ঘরে। কিন্তু বর্তমানে এর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। গ্রামীণ সমাজের সন্ধ্যাবাতি হারিকেন এখন অতীত স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে বৈদ্যুতিক বাতির যুগে সেই হারিকেনের অবস্থান অন্দরসজ্জার অংশ হিসেবে। ইন্টেরিয়র ডিজাইনাররা মূলত খাবার টেবিল, বসার ঘরের সেন্টার অথবা সাইড টেবিলে হারিকেন শোপিস হিসেবে ব্যবহার করতে পছন্দ করেন। অনেকে ঝুলবারান্দার গাছের ফাঁকে ফাঁকে মাটির হারিকেন বসিয়ে বা ঝুলিয়ে রাখেন। আজকাল বাজারে হারিকেনের আদলে নানা ধরনের মোম স্ট্যান্ডও পাওয়া যায়। ঘরের বিভিন্ন জায়গায় রাখা যেতে পারে হারিকেন। এতে অন্দরসাজে আসে ভিন্ন মাত্রা। চাইলে হারিকেনের মধ্যে রাখা যেতে পারে বৈদ্যুতিক বাল্ব, মোমবাতি কিংবা সলতে। তবে আলোর জন্য ভেতরে যাই থাকুক, আলোটা ঘেরা থাকবে চিমনি দিয়ে। টেবিলের ওপর রাখা হারিকেন টেবিল ল্যাম্পের কাজ করবে। এ ছাড়া খাবার আর বসার ঘরের মাঝে শিকল দিয়ে ঝুলিয়ে দিতে পারেন রংবেরঙের হারিকেন। শোবার ঘরে রাখা যেতে পারে কাঠের হারিকেন। চিমটি কাচের ওপর গ্লাস পেইন্ট দিয়ে আল্পনা করা যেতে পারে পুরোনো হারিকেন আবার নতুনভাবে ফিরে এসেছে ঘর সাজানোর অনুষঙ্গ হিসেবে।

এ ছাড়া পুরোনো দিনের ঘড়ি, টেলিফোন, বাদ্যযন্ত্র যেমন-বাঁশি, একতারা, ঢোল, মাদুর, হাতপাখা, মূর্তিÑসবই আধুনিক যুগের অন্দরসজ্জায় ক্রমেই উল্লেখযোগ্য স্থান করে নিয়েছে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১০০তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৮।

ফারজানা গাজী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top