চ্যালেঞ্জই যাঁর ব্যবসার প্রেরণা

বাংলা সাহিত্য ও লোক-সংস্কৃতির অন্যতম লালনক্ষেত্র ফরিদপুর। লোকগীতি, পল্লীগীতি ও বাউলগানের বিশাল ভান্ডারে সমৃদ্ধ এ জনপদ। নদী, খাল, বিল, উর্বর ফসলি ভূমি, অনুকূল আবহাওয়া ও পরিবেশ যুগে যুগে মরমি লোক কবি ও চারণ কবিদের এসব কাব্য সৃষ্টিতে জুগিয়েছে অনুপ্রেরণা। থেমে থাকেননি ব্যবসায়ীরাও। সুপ্রাচীনকাল থেকেই এ জনপদের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে সফল কিছু ব্যবসায়ী রেখেছেন অনন্য অবদান। এ প্রজন্মের সফল একজন ব্যবসায়ী শ্রী বিশ্বনাথ সাহা। চকবাজার, ফরিদপুরের ‘মেসার্স সাহা অ্যান্ড ব্রাদার্স’-এর স্বত্বাধিকারী যিনি। বন্ধন-এর নিয়মিত আয়োজন ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে এবার জানাব এ ব্যবসায়ীর সফলতার গল্প। সঙ্গে ছিলেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির আঞ্চলিক বিপণন ব্যবস্থাপক সুবোধ কুমার বসু।

ব্যবসায়ী বিশ্বনাথ সাহার জন্ম ১৯৬৮ সালের ৩ মে ফরিদপুর জেলার গোয়ালচামটে। বাবা মৃত সতীষ চন্দ্র সাহা ও মা সুরুবালা সাহা। চার ভাই তিন বোনের সবার ছোট। বাবা ছিলেন কাপড়ের ব্যবসায়ী। ১৯৮৪ সালে মহিম ইনস্টিটিউশন থেকে মাধ্যমিক, ১৯৮৬ সালে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর পড়ালেখার ইতি টেনে শুরু করেন নিজস্ব ব্যবসা। বড় ভাই ছিলেন স্থানীয় খাদ্যপণ্য ব্যবসায়ী। সেই সূত্রে তিনিও বেছে নেন একই ব্যবসা। এরপর জড়িয়ে পড়েন পরিবহন ব্যবসায়। চলমান এ ব্যবসাটির পাশাপাশি ২০১২ সালে শুরু করেন নির্মাণপণ্য ব্যবসা। বর্তমানে তিনি আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির ফরিদপুর টেরিটরির  এক্সক্লুসিভ রিটেইলার।

বিশ্বনাথ সাহা ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান হওয়ায় ব্যবসায় সাফল্য লাভের নানা কৌশল রপ্ত করেছেন শুরু থেকেই। আর তাই যে ব্যবসায় তিনি হাত দিয়েছেন, তাতেই হয়েছেন সফল। তিনি সিএন্ডবি ঘাট ক্যারিং কন্ট্রাক্টর হিসেবে আকিজ সিমেন্ট পরিবহনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সেই সুবাদেই পরিচয় কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে। নির্মাণপণ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদা দেখে বুঝতে পারেন ব্যবসাটির ব্যবসায়িক সম্ভাবনা। একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিদের সাহায্যে গড়ে তোলেন সিমেন্ট বিক্রয় প্রতিষ্ঠান। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত তিনি বিক্রি করছেন একমাত্র আকিজ সিমেন্টই। 

গুণগতমানের এ পণ্যটি স্বল্প সময়েই তাঁকে এনে দেয় অভাবনীয় ব্যবসায়িক সাফল্য। তিনি আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির ফরিদপুর টেরিটরির একজন অন্যতম সেরা বিক্রেতা। পণ্যটি বিক্রিতে ২০১৪-১৫ থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের সর্বোচ্চ বিক্রেতা তিনি। পরপর চারবার অত্র টেরিটরিতে অর্জন করেছেন প্রথম স্থান। এমন অভূতপূর্ব সাফল্যে তিনি কোম্পানির পক্ষ থেকে উপহারস্বরূপ পেয়েছেন মোটরসাইকেল, এসি, ডিজিটাল ক্যামেরা, ল্যাপটপ, ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রো ওভেন, স্বর্ণালংকার, প্রাইজ বন্ড, নগদ টাকা প্রভৃতি। এ ছাড়া প্রতিবছর কোম্পানির দেওয়া নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করায় পেয়েছেন আমেরিকা, সুইজারল্যান্ড, চীন, দুবাই, মরিসাস, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, নেপালসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ অফার। 

ফরিদপুর শহরে অনেক স্বনামধন্য ও অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী থাকায় স্বল্পসময়ের মধ্যেই সিমেন্ট ব্যবসায় সফলতা অর্জন  সহজসাধ্য ছিল না। অসাধ্যকে সাধন করার পেছনে এ ব্যবসায়ীর সঙ্গে এলাকাবাসীর সুসম্পর্ক, নিয়মিত ব্যবসায়িক প্রচারণা ও বাজার পরিদর্শন, বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্প পরিদর্শন এবং ক্রেতাকে গুণগত মান বুঝিয়ে পণ্যের বিক্রি ও প্রসার বাড়ানোর মতো সুচিন্তিত পদক্ষেপগুলো দারুণভাবে সহায়তা করেছে। 

ব্যবসায়ী বিশ্বনাথ সাহা বিয়ে করেন ১৯৯৭ সালে। তাঁর স্ত্রী মানষী সাহা। এ দম্পতির দুই ছেলে। বড় ছেলে নিবিড় সাহা (অভি) রাজবাড়ী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ছেন এবং ছোট ছেলে অয়ন সাহা ফরিদপুর পুলিশ লাইন উচ্চবিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। নির্মাণপণ্য ব্যবসার পাশাপাশি তাঁর রয়েছে ট্রান্সপোর্ট, হ্যাচারি ও ব্রিকফিল্ডের ব্যবসা। এ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংগঠনিক কাজেও জড়িত তিনি। ফরিদপুর জেলা মিনি পিকআপ ও ট্রাক মালিক সমিতির সহসভাপতি, ফরিদপুর জেলা সিঅ্যান্ডবি ঘাট ক্যারিং কন্ট্রাক্টর অ্যাসোসিয়েশনের সমিতির সহসভাপতি, ফরিদপুর ও রাজবাড়ী পোলট্র্রি অ্যান্ড হ্যাচারি সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং ফরিদপুর হিন্দু সম্প্রদায় ট্রাস্টের সাম্মানিক সদস্য। 

একসঙ্গে কয়েকটি ব্যবসা পরিচালনা করছেন ব্যবসায়ী বিশ্বনাথ সাহা। একজন মানুষের পক্ষে কাজটি কঠিন হলেও তিনি তা করছেন দক্ষতার সঙ্গে। প্রতিটি সেক্টরে তিনি দক্ষ ও বিশ্বস্ত লোকবল গড়ে তুলেছেন। ফরিদপুরের স্থানীয় বাজার অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ। ক্রমেই তা আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে। এ ব্যবসায় তাঁরাই টিকে থাকবেন, যাঁরা উন্নত ব্র্যান্ডের গুণগতমানের পণ্য বিক্রি করবেন। একই সঙ্গে থাকবে সততা, লেনদেনে স্বচ্ছতা ও সময়মতো পণ্য পৌঁছানোর প্রতিশ্রুতি। উল্লেখিত এসব ব্যবসায়িক কৌশলের সবগুলোই গভীরভাবে ধারণ করেন ব্যবসায়ী বিশ্বনাথ সাহা। আর এ কারণেই ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ নিতে সদা প্রস্তুত তিনি।

প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০২তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৮

মাহফুজ ফারুক
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top