স্নিগ্ধ সাজে বর্ষার অন্দর

গ্রীষ্মের প্রচণ্ড সূর্যতাপ জাদুর পরশে শীতল হয় বর্ষায়। আর বর্ষার সৌন্দর্য শুধু প্রকৃতিতেই সীমাবদ্ধ নয়, এর স্পর্শ ছুঁয়ে যায় মানুষের মননের গভীরে। তবে বর্ষায় ঝোড়ো বৃষ্টি, বাইরের ঝক্কি-ঝামেলার কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। বর্ষায় ঘরে বসে বৃষ্টি দেখাটা বেশির ভাগ সময়ই উপভোগ্য। প্রকৃতির এই নান্দনিক ঝরনাধারা মানব মনে ফেলে অসামান্য প্রভাব। আকাশে মেঘ আর বাতাসে বৃষ্টির ঘনঘটাকে সঙ্গী করে আসে নীলাম্বরী বর্ষা। সব মিলিয়ে প্রকৃতিতে চলে পরিকল্পিত আষাঢ়ে আয়োজন। নীল রঙের আঁধারে সে আয়োজন হোক না আরেকটু মধুময়। বর্ষা যেন প্রাকৃতিক উৎসবের অনন্য এক নাম, নগরজীবনকে আপন করে ছুঁয়ে যায় বর্ষার স্নিগ্ধতা। ছুঁয়ে যায় গ্রামবাংলার প্রতিটি       নদ-নদী, ঘরবাড়ি আর এলোমেলো পথঘাট। এখানে বর্ষা মানে সবুজ জলের সন্তরণে ভেসে ওঠা নীল আকাশের ছবি, যেখানে শহুরে জীবনে বর্ষার বর্ষণ শুধুই ব্যস্ত জীবনের ছন্দপতন। নীল শুধু পোশাকে নয়, ভরা বর্ষায় নীল ছুঁয়ে যায় সাজ অনুষঙ্গের সর্বত্রই। বর্ষাজুড়ে ফ্যাশনে নীলের প্রভাবটা লক্ষণীয়; সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ যুগের বাঙালিরা এখন রং আর ঋতু-সচেতন। আর তাই বর্ষার পোশাক মানেই নীল গ্রহণ। আজকাল নীলের পাশাপাশি সবুজ, হলুদ, কমলা রংও যুক্ত হচ্ছে বর্ষাকে গ্রহণ করতে। তাই মানুষ নিজের অন্দরমহল সাজাতেও পিছিয়ে নেই এই ঋতুকে ঘিরে।

ঘরের কোনায় ছোট্ট কুশন কাভার থেকে শুরু করে বিছানার চাদর, পর্দা এসবেও নীলের ব্যবহার বর্ষাকে আরও বেশি উপভোগ্য ও রঙিন করে তোলে। তাই এমন সাজে সাজিয়ে তুলুন আপনার অন্দরকে। বর্ষার অন্দর সাজাতে এমন কিছু উপাদান ব্যবহার করুন, যেগুলো আপনার পুরো পরিবেশকে করে তুলবে অনেক বেশি নীলাভ। যদি ঘর ছোট হয় তাহলে একরঙা নীল পর্দা ব্যবহার করুন। আর বড় ঘরের জন্য নীলের কোনো ছাপাও মানিয়ে যাবে অনায়াসে। কুশনে কাভারগুলোতে নীল ভাবনাটা রাখতে চেষ্টা করুন। বিছানার চাদর নীল অথবা নীল-সাদার মিশেলে রাখুন। আর খাবার টেবিলে রাখুন নীলরঙা ন্যাপকিন। দেখবেন এই বর্ষায় বর্ষা আপনাকে আলিঙ্গন করবে নীল চাদরে জড়িয়ে।

বর্ষায় গুমোট আবহাওয়ায় সব যেন কেমন আর্দ্র হয়ে ওঠে! পানি জমে কিংবা পানিতে ভিজে যেখানে সেখানে ঘটে জীবাণুর সংক্রমণ। সবচেয়ে বড় কথা হলো পোকামাকড়ের উপদ্রবও হয় খুব বেশি। বর্ষায় এসব থেকে মুক্তি পেতে চাই বাড়তি সতর্কতা। বর্ষার রিনিঝিনি বর্ষণ উপভোগ করার জন্য তাই মনোযোগ দিতে হবে অন্দর সুরক্ষায়। এ ক্ষেত্রে সবার আগে লক্ষ রাখতে হবে ঘরে ঠিকমতো আলো-বাতাস প্রবেশ করছে কি না। বর্ষার ঘন বর্ষণ হোক কিংবা হালকা অন্দরের প্রায় সর্বত্রই কিন্তু গুমোট একটা ভাব লক্ষনীয়। মাঝেমধ্যে হালকা একটা অস্বস্তিকর বাজে গন্ধেরও উপক্রম হয়। তার চেয়ে বড় সমস্যা যেখানে অনেক স্থানেই ফাঙ্গাস বা ছত্রাকের সৃষ্টি হয়। যাঁদের একটু পুরোনো বাসা, তাঁদের এই সমস্যা তো আছেই, কিন্তু যাঁদের নতুন বাসা তাঁদেরও এই সমস্যার হাত থেকে রেহাই নেই।

শুধু আসবাব বা সাধারণ জিনিসপত্রেই নয়, বর্ষার চাল, ডাল ও আটাতেও কিন্তু পোকার উপদ্রব দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রে রান্নাঘরের যত্নের বিশেষ প্রয়োজন। আনাজপাতির মধ্যে কয়েকটা শুকনা নিমপাতা রেখে দিলে পোকার উপদ্রব অনেকটাই কমে যাবে। এ ছাড়া মশামাছি কমাতে কয়েকটা কর্পূর পানিতে ভিজিয়ে ঘরের কোণে রেখে দিন। নইলে ব্যবহৃত চা-পাতা ভালো করে শুকিয়ে ধূপের মতো ব্যবহার করলেও উপকার পাওয়া যায়। আবার নিমপাতাও এতে খুব কার্যকরী ও প্রয়োজনীয় বস্তু। বর্ষায় পোকামাকড়ের হাত থেকে রক্ষায় এর বিকল্প নেই। আর প্রতিদিন মেঝে পরিষ্কার করার সময় ক্লিনার বা ফিনাইল ব্যবহার করা খুবই জরুরি। এতে ঘরের মেঝে থাকে জীবাণুমুক্ত।

আমাদের সবারই বাসায় কমবেশি কাঠ বা প্রসেস ও উডের তৈরি আসবাব থাকে। আর এই ধরনের আসবাবে ফাঙ্গাস বা ছত্রাক আক্রমণের আশঙ্কা থাকে সবচেয়ে বেশি। তবে আসবাবে ছত্রাক জমে গেলে দূর করার জন্য আছে বিশেষ এক উপায়। চা-পাতা জ্বাল দিয়ে কড়া লিকার বানিয়ে ঠান্ডা করে নিন। এরপর তাতে মেশান অল্প একটু ভিনেগার। নরম একটি কাপড় এই মিশ্রণে ডুবিয়ে ভালো করে চিপে নিন এবং সেটা দিয়ে আসবাবের আক্রান্ত স্থান পরিষ্কার করুন। এতে করে ছত্রাক থেকে কিছুটা হলেও পরিত্রাণ মিলবে। যদি ফাঙ্গাসের পরিমাণ বেশি হয় এবং সেই সঙ্গে পোকার প্রকোপ দেখা দেয়, তবে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক এবং পরামর্শ অনুযায়ী কীটনাশক ব্যবহার করা খুবই জরুরি।

বর্ষার সময় আরেকটি বড় সমস্যা হলো বইপ্রেমীদের জন্য। যাঁদের ঘরে লাইব্রেরি আছে, কিংবা যাঁদের সংরক্ষণে একটু পুরোনো বই বা অনেক বই আছে, তাঁদের এ সময় কিছুটা হলেও ঝামেলা পোহাতে হয়। সাধারণত যে বইগুলো একটু কম নাড়াচাড়া হয় বা পুরোনো, সেগুলো এই মৌসুমে স্যাঁতসেঁতে হয়ে পড়ে। তাই বাসায় স্যাঁতসেঁতে ও ভেজা জায়গায় কখনোই বই রাখা উচিত নয়। মূলত পর্যাপ্ত আলো-বাতাসে বই রাখতে হয়। পোকামাকড়ের উপদ্রব যাতে না হয় সে জন্য বইয়ের ভেতর ন্যাপথলিন রাখা বেশ ভালো। আর বইয়ের তাকে শুকনো নিমপাতাও রাখতে পারেন। আর কোনো বই যদি পোকা বা ছত্রাকের আক্রমণের শিকার হয়, তবে সঙ্গে সঙ্গে তা পরিষ্কার করে কড়া রোদে দিতে হবে। ক্যাবিনেটের জামাকাপড়ে স্যাঁতসেঁতে ভাব নিমেষেই দূর করতে আলমারি কিংবা ওয়ার্ডরোবে একটু বেশি পরিমাণে ন্যাপথলিন রেখে দিন। শুধু তা-ই নয়, ন্যাপথলিন কিন্তু বাথরুম বেসিনের ছিদ্রতেও রাখতে পারেন। এতে করে ন্যাপথলিনের গন্ধে সহজে কোনো পোকামাকড় আসবে না। আর যেসব জায়গায় প্রতিনিয়ত পিঁপড়া বা পোকামাকড় আক্রমণ করে, সেখানে রাতে ঘুমানোর আগে ব্লিচিং পাউডার ছড়িয়ে রাখা ভালো। সকালে সেসব স্থান হালকা গরম পানিতে ফিনাইল বা ক্লিনার দিয়ে মুছে ফেললে অনেক উপকার পাওয়া যাবে।

ঘরে ইনডোর প্লান্টসে বৃষ্টির পানি জমলে পানি ঝরিয়ে নিন। জমে থাকা পানিতে গাছের গোড়া পচে গিয়ে পোকার জন্ম হয়, তাই ইনডোর প্লান্টগুলো রাখতে হবে পরম যত্নে। ঘরের ভেতরের ভেজাভাব দূর করার জন্য রুম ফ্রেশনার স্প্রে করুন। তবে সবচেয়ে ভালো প্রাকৃতিক ফ্রেশনার হলো ফুল। এ ছাড়া বাজারে পাওয়া যায় নানা ধরনের সুগন্ধিযুক্ত মোম। হালকা ফুলের সুবাস কিংবা মৃদু সুগন্ধিযুক্ত মোম কিন্তু বর্ষায় অন্দরে ভিন্ন আমেজের সৃষ্টি করে। আর একটা কথা সব সময় স্মরণ রাখা ভালো, সবুজ গাছ আর প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের আলোড়ন ঘরকে সর্বদাই সতেজ আর প্রাণবন্ত রাখতে সহায়ক।

বৃষ্টি এলেই ঘরের জানালা লাগিয়ে দেয়া হয়। তবে এরই মধ্যে বৃষ্টির ছাঁট এসে ভিজে যেতে পারে জানালায় ঝোলানো পর্দাগুলো। তাই এ সময় এমন কাপড়ের পর্দা ব্যবহার করা উচিত, যেন তা ভিজে গেলেও সহজেই শুকিয়ে যায়। কারণ, দীর্ঘক্ষণ পর্দা ভেজা থাকলে পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়ে (সাদ) গন্ধ। পলিয়েস্টার, রেশম বা পাতলা সুতির কাপড়ে তৈরি পর্দা এ সময়টার জন্য বেশ উপযোগী।

আসলে বর্ষায় সৌন্দর্যের উপমা কোনোভাবেই বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। অন্দরের এই অল্প-বিস্তর পরিচর্চায় যদি প্রকৃতির এই অনবদ্য সৌন্দর্য উপভোগ্য হয়ে ওঠে তবে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে! বাইরের হাজারও ঝামেলা রাস্তাঘাটের কাদাপানি অতিক্রম করে এসে যদি অন্দরে বসে বর্ষার আমেজ উপভোগ করা যায়, তবে তা-ই হবে পরিবারের সঙ্গে কাটানো শ্রেষ্ঠ সময়।

প্রয়োজনীয় টিপস

  • বর্ষায় দরজা ও জানালার পর্দা সিনথেটিক হলে ভালো।
  • দেয়াল ও ফার্নিচারের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে বৃষ্টির দিনে উজ্জ্বল রঙের চাদর, কুশন, কভার ও পর্দা নির্বাচন করুন। এতে ঘর হবে আরও উজ্জ্বল।
  • সাধারণত বৃষ্টির সময় দরজা-জানালা বন্ধ রাখতে হয়। এর ফলে গুমোট ভাব দেখা দিতে পারে। গুমোট ভাব দূর করতে ক্রস ভেন্টিলেশন খুব কাজে দেয়।
  • আলমারির তাকে বা কেবিনেটে অল্প কর্পূর অথবা নিমপাতা রেখে দিতে পারেন গুমোট গন্ধ দূর করতে।
  • আলমারির মধ্যে গুমোট ভাব কাটাতে মাঝে মাঝে যখন রোদ থাকবে তখন আলমারির পাল্লা খুলে ফ্যান ছেড়ে দিন। ফ্যান ভেতরের গুমোট বাতাস বের করে আনবে। মাঝেমধ্যে রোদে দিন আলমারির কাপড়।
  • ক্যাবিনেট, আলমারি কিংবা এর তাকে সিলিকা জেল ব্যবহার করুন। সিলিকা জেল ময়েশ্চারাইজার শুষে নেয় এবং ফাঙ্গাস জন্মাতে বাধা দেয় কাপড়ে।
  • পোকামাকড়, ফাঙ্গাস থেকে রক্ষা পেতে ফার্নিচার যতটা সম্ভব দেয়াল থেকে দূরে রাখুন, এতে ড্যাম্পের হাত থেকে রক্ষা পাবেন।
  • ক্যাবিনেটের আর্দ্রতা শুষে নিতে ক্যাবিনেটের ভেতর চক বা চাল রেখে দিন।
  • রান্নাঘরে কিংবা বারান্দায় পোকামাকড়ের উপদ্রব কমাতে তুলসীগাছ রাখুন।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৮তম সংখ্যা, জুন ২০১৮।

ফারজানা গাজী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top